- দে । শ প্রচ্ছদ রচনা
- জুন ১১, ২০২৬
দেশজুড়ে আন্দোলনের ডাক ‘ককরোচ জনতা পার্টি’-র, শিক্ষা সংস্কারের সুপারিশ-সহ ইস্তাহার প্রকাশ
মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগেও সামাজিক মাধ্যমে অনেকের কাছেই ছিল অপরিচিত নাম। কিন্তু পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁস, নিয়োগে অনিয়ম এবং ফলপ্রকাশে বিলম্ব নিয়ে ক্ষোভে ফুঁসতে থাকা দেশের একাংশ তরুণ-তরুণীর কাছে এখন প্রতিবাদের নতুন মুখ— ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি)। গত সপ্তাহেই দিল্লির যন্তর–মন্তরে ‘ককরোচ’-দের ডাকে অনুষ্ঠিত হয়েছিল বড়ো মাপের জনসমাবেশ। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজার হাজার ছাত্রছাত্রী, চাকরিপ্রার্থী, তরুণ-তরুণীরা সেই কর্মসূচিতে যোগ দেন।সরকারের বিরুদ্ধে সরব হন বিক্ষোভকারীরা। মঞ্চ থেকে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ দাবি তুলে, কেন্দ্র সরকারকে ৭ দিনের আলটিমেটাম দিয়েছিলেন সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে।
‘সিজেপি’-র পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল, নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে কোনো উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ না নেওয়া হলে আন্দোলন দেশজুড়ে ছড়িয়ে দেওয়া হবে। ২০ জুন ফের যন্তর–মন্তরেই আরও বৃহত্তর সমাবেশের পরিকল্পনা করেছে সিজেপি। সংগঠনের হুঁশিয়ারি, তার আগে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ না হলে দিল্লিতে অনির্দিষ্টকালের অবস্থান-বিক্ষোভ শুরু করা হবে। এরই মধ্যে বৃহস্পতিবার মহারাষ্ট্রের পুণে থেকে তাঁরা দেশব্যাপী আন্দোলনের সূচনা করল। একই সঙ্গে প্রকাশ করল শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার সংক্রান্ত একটি ইস্তাহার।
সাভিত্রীবাই ফুলে পুণে বিশ্ববিদ্যালয় (এসপিপিইউ) চত্বরে আয়োজিত বিক্ষোভ কর্মসূচির আগে সাংবাদিক বৈঠকে ‘সিজেপি’-র প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে দাবি করেন, দেশের লক্ষ লক্ষ ছাত্রছাত্রীর ভবিষ্যৎ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। প্রশ্নপত্র ফাঁস, পরীক্ষার ফল প্রকাশে দেরি, মূল্যায়ন পদ্ধতি নিয়ে বিতর্ক এবং নিয়োগ পরীক্ষায় স্বচ্ছতার অভাব— এসব সমস্যার বিরুদ্ধে সরব হতেই তাঁদের আন্দোলন। অভিজিৎ বলেন, ‘আমরা আজ থেকে দেশজুড়ে আন্দোলন শুরু করছি। সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণভাবে, সংবিধানের নিয়ম মেনেই চলবে আন্দোলন। একই সঙ্গে আমরা শিক্ষা-সংক্রান্ত একটি ইস্তাহার প্রকাশ করছি, যেখানে ছাত্রছাত্রীদের দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলির সমাধানের প্রস্তাব রয়েছে।’
‘সিজেপি’-র প্রকাশিত ইস্তাহারে ৫টি বিষয়কে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধে কঠোর ব্যবস্থা, সময়মতো পরীক্ষার ফল প্রকাশ, নিয়োগ ও প্রবেশিকা পরীক্ষায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, পরীক্ষার দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলির জবাবদিহিতা বৃদ্ধি এবং পরীক্ষার সময়সূচি ও মূল্যায়ন সংক্রান্ত অনিয়মের কারণে ছাত্রছাত্রীদের ভোগান্তি কমানো। দেশব্যাপী আন্দোলনের প্রথম পর্ব শুরু হয়েছে পুণে থেকে। তবে এখানেই শেষ নয়। অভিজিৎ জানিয়েছেন, আগামী কয়েক দিনের মধ্যে জয়পুর, লখনৌ, অমৃতসর, বেঙ্গালুরু-সহ দেশের একাধিক শহরে কর্মসূচি সংগঠিত করা হবে। শেষ পর্যায়ে ২০ জুন দিল্লির যন্তর–মন্তরে বৃহৎ জমায়েতের পরিকল্পনা রয়েছে। দিপকের দাবি, ‘শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ না হওয়া পর্যন্ত এ আন্দোলন থামবে না। দেশের এক কোটিরও বেশি ছাত্রছাত্রীর ভবিষ্যৎ নিয়ে যে ভাবে ছেলেখেলা হয়েছে, তার দায় কেন্দ্র সরকার এড়াতে পারে না।’
কেন্দ্র সরকারের তরফে যদিও এ পর্যন্ত ‘সিজেপি’-র দাবির বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। অভিজিতের অভিযোগ, তাঁদের বক্তব্য শুনতে বা আলোচনায় বসতে আগ্রহ দেখানোর বদলে সামাজিক মাধ্যমে সংগঠনের উপস্থিতি খর্ব করার চেষ্টা হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘সরকার যদি মনে করে যুবসমাজের ক্ষোভকে উপেক্ষা করা যাবে, তা হলে ভুল করবে। আমাদের আন্দোলনকে ভুয়ো বলে উড়িয়ে দেওয়ার আগে দেশের তরুণদের বাস্তব সমস্যাগুলি বোঝার চেষ্টা করা উচিত।’ সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক মাধ্যমে দ্রুত জনপ্রিয়তা পেয়েছে ককরোচ জনতা পার্টি। পরীক্ষায় অনিয়ম সংক্রান্ত একাধিক ইস্যুকে সামনে রেখে প্রচার চালিয়েছে তারা। বিশেষ করে ‘নিট-ইউজি’ প্রশ্নপত্র ফাঁস, সিবিএসই মূল্যায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে বিতর্ক, বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার অনিয়মের অভিযোগকে কেন্দ্র করে ছাত্রসমাজের একাংশের মধ্যে সমর্থন বাড়িয়েছে সংগঠনটি।
এদিনের ‘ককরোচ জনতা পার্টি’-র কর্মসূচিকে সমর্থন জানিয়েছেন পরিবেশ ও সমাজকর্মী সোনম ওয়াংচুক-সহ পুণের কয়েক জন অধ্যাপকও। বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে দু ঘণ্টার জন্য বিক্ষোভ কর্মসূচি পালনের অনুমতি দিয়েছে পুলিশ। আন্দোলনের সূচনাস্থল হিসেবে পুণেকে বেছে নেওয়ার কারণও ব্যাখ্যা করেছেন অভিজিৎ দিপকে। তাঁর দাবি, ‘পূর্বের অক্সফোর্ড’ নামে পরিচিত এ শহর দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাকেন্দ্র। তাই শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন শুরু করার জন্য এর চেয়ে উপযুক্ত জায়গা আর হতে পারে না। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, গত কয়েক বছরে দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মান নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে। তাঁর অভিযোগ, ‘এক সময় যে বিশ্ববিদ্যালয় দেশের সেরা প্রতিষ্ঠানগুলির মধ্যে ছিল, এখন তার অবস্থান অনেকটাই নীচে নেমে গিয়েছে। এ নিয়ে প্রশ্ন তোলা একান্ত প্রয়োজন।’
তবে রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, সামাজিক মাধ্যমের জনপ্রিয়তাকে বাস্তব রাজনৈতিক শক্তিতে রূপান্তর করা সহজ হবে না। ‘সিজেপি’ এখনো পর্যন্ত কোনো নির্বাচনী পরিকল্পনার কথা ঘোষণা করেনি। সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতার বক্তব্য, আপাতত তাঁদের লক্ষ্য শুধুমাত্র শিক্ষা ও পরীক্ষাব্যবস্থার সংস্কারের দাবিকে জাতীয় স্তরে তুলে ধরা। ‘এক দিনে সব সমস্যা সমাধান হবে না। আমরা এক একটি বিষয় নিয়ে মানুষের আস্থা অর্জন করতে চাই’ বলেছেন অভিজিৎ দিপকে। তাঁর সংযোজন, ‘মাত্র পনেরো দিন হয়েছে। মানুষ যদি বারো বছর সময় দিতে পারে, তবে আমাদের অন্তত বারো সপ্তাহ সময় দেওয়া উচিত।’ সামাজিক মাধ্যম থেকে শুরু হওয়া এ আন্দোলন রাজনৈতিক ক্ষেত্রে আগামী দিনে কতটা বিস্তার লাভ করবে, আদেও করবে কি না; তা নিয়ে এখনই নিশ্চিত করে কিছু বলা না গেলেও, শিক্ষা ও কর্মসংস্থান-সংক্রান্ত ক্ষোভকে কেন্দ্র করে নতুন এক যুব-আন্দোলনের সম্ভাবনা যে তৈরি হয়েছে, তা মানছেন অনেকেই।
❤ Support Us





