Advertisement
  • পা | র্স | পে | ক্টি | ভ রোব-e-বর্ণ
  • মে ৩১, ২০২৬

বলাগড় বন্দর – বাণিজ্য বনাম বাস্তুতন্ত্র

অয়ন মুখোপাধ্যায়
বলাগড় বন্দর – বাণিজ্য বনাম বাস্তুতন্ত্র

প্রথম পর্ব

পশ্চিমবঙ্গের শিল্প, পরিকাঠামো এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের মানচিত্রে সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে আলোচিত, বিতর্কিত নামগুলোর একটি হলো বলাগড়। হুগলি জেলার শান্ত, সবুজ, লোকসংস্কৃতি ও কৃষিনির্ভর গ্রামীণ জনপদকে কেন্দ্র করে কলকাতা পোর্ট ট্রাস্ট তথা শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী পোর্ট একটি ইনল্যান্ড ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট বা অভ্যন্তরীণ জলপথ টার্মিনাল নির্মাণের চূড়ান্ত পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। বলাগড়ের জিরাট এবং বিখ্যাত পর্যটন কেন্দ্র সবুজ দ্বীপের সংলগ্ন নদী-এলাকায় প্রস্তাবিত এই প্রকল্পটিকে ঘিরে একদিকে যেমন তৈরি হয়েছে অর্থনৈতিক পুনরুজ্জীবনের বিপুল আশা ও উদ্দীপনা, অন্যদিকে তেমনই দানা বেঁধেছে পরিবেশগত বিপর্যয়, নদী ভাঙন এবং স্থানীয় মানুষের জীবিকাচ্যুতির এক গভীর ও মনস্তাত্ত্বিক আশঙ্কা। কোনো অন্ধ রাজনৈতিক আবেগ, কর্পোরেট তোষামোদ বা একপেশে সস্তা বিরোধিতা নয়, বরং নিখাদ তথ্য, ভূগোল এবং আধুনিক অর্থনীতির আলোয় এই প্রকল্পের সামগ্রিক রূপরেখাটি ও তার ভেতরের অন্দরমহলটি বুঝে নেওয়া আজ অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে।

প্রথমেই পরিষ্কার করে নেওয়া দরকার যে, প্রস্তাবিত বলাগড় বন্দর আসলে কোনো সমুদ্র বন্দর নয়। এটি মূলত একটি নদী বন্দর বা জলপথ টার্মিনাল। কেন্দ্রীয় সরকারের উচ্চাকাঙ্ক্ষী সাগরমালা প্রকল্প এবং জাতীয় জল পথ-১ তথা গঙ্গা, ভাগীরথী ও হুগলি নদী ব্যবস্থার আধুনিকীকরণের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ হিসেবে এই টার্মিনালটি গড়ে তোলার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। সর্বোপরি এখানে যেহেতু জমি অধিগ্রহণ বাম আমলে আগে থেকেই করা আছে সেই কারণে এখানে বন্দর তৈরি করাটা সুবিধা কোন জমি জট নেই।

প্রাথমিক ভাবে সরকারি পরিকল্পনা অনুযায়ী, কলকাতা বন্দরের ওপর থেকে অতিরিক্ত মালবাহী জাহাজের চাপ কমাতে এবং বড়ো জাহাজের পারাপারকে সহজতর করতে নদীগর্ভের প্রাকৃতিক নাব্যতাকে কাজে লাগানো হবে । এখানে তৈরি হবে আধুনিক জেটি, মালপত্র ওঠানো-নামানোর স্বয়ংক্রিয় যান্ত্রিক ব্যবস্থা এবং সাময়িকভাবে পণ্য মজুত রাখার জন্য একটি বিশাল লজিস্টিকস পার্ক ও ওয়্যারহাউজিং ব্যবস্থা । এখন প্রশ্ন উঠতেই পারে যে, কলকাতা এবং হলদিয়ার মতো দুটি বিশাল ও ঐতিহাসিক বন্দর সচল থাকতে থাকতে হঠাৎ হুগলি নদীর উজানে এসে বলাগড়ের মতো একটি গ্রামীণ এলাকায় কেন নতুন করে কোটি কোটি টাকা খরচ করে পরিকাঠামো গড়ার প্রয়োজন পড়ল ।

এর পেছনে মূলত তিনটি অত্যন্ত জোরালো কৌশলগত ও অর্থনৈতিক যুক্তি রয়েছে ।

প্রথমত, কলকাতা বন্দর একটি নদী বন্দর এবং সমুদ্র থেকে এর দূরত্ব প্রায় ১২৬ কিলোমিটার । হুগলি নদীর পলি জমার স্বাভাবিক ও প্রাকৃতিক প্রবণতার কারণে এই বন্দরে বড়ো মালবাহী জাহাজ বা মাদার ভেসেলগুলো সরাসরি প্রবেশ করতে পারে না । নদীগর্ভ সচল রাখতে প্রতি বছর সরকারকে ড্রেজিং বা পলি তোলার পেছনে কোটি কোটি টাকা খরচ করতে হয় । বলাগড়ের এই নির্দিষ্ট অংশে নদীর প্রাকৃতিক গভীরতা এবং ভৌগোলিক অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে ছোটো ও মাঝারি আকারের বার্জ বা কার্গো জাহাজের মাধ্যমে পণ্য পরিবহন অনেক বেশি সাশ্রয়ী ও সহজ হতে পারে বলে বন্দর বিশেষজ্ঞদের অভিমত ।


সবুজ দ্বীপের গা ঘেঁষে এই বন্দর গড়ার কথা, তা এক অনন্য এবং সংবেদনশীল নদী-বাস্তুতন্ত্রের অংশ । নদীর ভাঙন সমস্যা এই অঞ্চলের মানুষের নিত্যদিনের সঙ্গী, সেখানে ভারী জাহাজের অনবরত আনাগোনা এবং যান্ত্রিক ড্রেজিং নদীর গতিপ্রকৃতিকে কতটা বিপজ্জনকভাবে বদলে দেবে, তা নিয়ে পরিবেশবিদদের কপালে চিন্তার ভাঁজ স্পষ্ট ।


দ্বিতীয়ত, পশ্চিমবঙ্গ, ঝাড়খণ্ড, বিহার এবং ওড়িশার মতো খনিজ সমৃদ্ধ শিল্পাঞ্চল থেকে উৎপাদিত পণ্য, বিশেষ করে তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় কয়লা এবং অন্যান্য ভারী খনিজ সামগ্রী সড়ক বা রেলের পরিবর্তে জলপথে পরিবহন করা অনেক বেশি লাভজনক । বলাগড় টার্মিনালটি তৈরি হলে হলদিয়া বা সাগর দ্বীপ থেকে আসা কাঁচামালবাহী জাহাজগুলো সহজেই এখানে এসে খালি হতে পারবে এবং এখান থেকে রেল বা সড়কপথে সেই পণ্য উত্তর ও দক্ষিণবঙ্গের বিভিন্ন প্রান্তে কম খরচে ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব হবে ।

প্রস্তাবিত বন্দর নির্মাণের জন্য নির্দিষ্ট স্থান  

তৃতীয়, কারণটি অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী । জাতীয় জলপথ-১ কেবল ভারতের অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য বাড়াবে না, এটি ভারত-বাংলাদেশ প্রোটোকল রুটের সাথেও সরাসরি যুক্ত । বলাগড় টার্মিনালটি পুরোপুরি চালু হলে কলকাতা থেকে উত্তর-পূর্ব ভারতের রাজ্যগুলো এবং বাংলাদেশে পণ্য পাঠানো অনেক দ্রুত হবে । সড়কপথের যানজট এবং অতিরিক্ত জ্বালানি খরচ এড়াতে জলপথই যে ভবিষ্যৎ, এই আধুনিক অর্থনৈতিক তত্ত্বই বলাগড় প্রকল্পের মূল ভিত্তি ।

অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির এই খতিয়ান আপাতদৃষ্টিতে অত্যন্ত আকর্ষণীয় এবং প্রগতিশীল মনে হলেও, কয়েনের উল্টো পিঠটি এড়িয়ে যাওয়া চরম আত্মঘাতী হবে । যে সবুজ দ্বীপের গা ঘেঁষে এই বন্দর গড়ার কথা, তা এক অনন্য এবং সংবেদনশীল নদী-বাস্তুতন্ত্রের অংশ । নদীর ভাঙন সমস্যা যেখানে এই অঞ্চলের মানুষের নিত্যদিনের সঙ্গী, সেখানে ভারী জাহাজের অনবরত আনাগোনা এবং যান্ত্রিক ড্রেজিং নদীর গতিপ্রকৃতিকে কতটা বিপজ্জনকভাবে বদলে দেবে, তা নিয়ে পরিবেশবিদদের কপালে চিন্তার ভাঁজ স্পষ্ট । পরিকাঠামো উন্নয়ন ছাড়া কোনো রাজ্যের অর্থনৈতিক স্থবিরতা কাটানো সম্ভব নয়, এই যুক্তি যেমন অকাট্য, ঠিক তেমনই স্থানীয় প্রকৃতি ও মানুষের জীবনকে বিপন্ন করে চাপিয়ে দেওয়া উন্নয়নও কখনো টেকসই হতে পারে না । বলাগড় বন্দর প্রকল্প ঠিক এই জটিল সামাজিক ও অর্থনৈতিক দোমাথায় দাঁড়িয়ে রয়েছে ।

                    বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য নির্মিত সেতু

তবে এই বৃহৎ প্রকল্পের আসল উপযোগিতা কেবল বড়ো বড়ো জাহাজের আনাগোনা বা কর্পোরেট বাণিজ্যের খতিয়ানেই সীমাবদ্ধ নয়। এই প্রকল্পের আসল গ্রামীণ ও সামাজিক সাফল্য লুকিয়ে আছে বন্দরের চারপাশে গড়ে ওঠা স্থানীয় মানুষের ছোটো ছোটো দোকানপাট, বাজার এবং চায়ের দোকান থেকে শুরু করে স্বনির্ভরতার নতুন রসদ জোগানোর মধ্যে । বন্দরে যখন বাইরের হাজারো মানুষের যাতায়াত শুরু হবে, তখন স্থানীয় মানুষের তৈরি পণ্যের বাজার তৈরি হবে । এলাকার সাধারণ মানুষের দৈনিক রুটি-রুজির এই বুনিয়াদি ক্ষেত্রগুলোকে এবং তাদের ছোটখাটো ব্যবসার অধিকারকে পরিকল্পনার কেন্দ্রে রেখে যদি এগোনো যায়, তবেই এই প্রকল্পের প্রকৃত সার্থকতা মিলবে । আগামী পর্বে আমি এই বিষয়ে বিশদে বিশ্লেষণ করব এই বন্দর নির্মাণ বলাগড় তথা গোটা রাজ্যের অর্থনীতি ও বৃহৎ কর্মসংস্থানে ঠিক কী ধরনের জোয়ার আনতে পারে ।

♦–♦•♦–♦


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!