Advertisement
  • এই মুহূর্তে দে । শ
  • অক্টোবর ২৭, ২০২৫

দেশের ৪ হাজার আদালতে বাদ ‘টাইপিং’, বিচার ব্যবস্থায় শুরু এআই বিপ্লব

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
দেশের ৪ হাজার আদালতে বাদ ‘টাইপিং’, বিচার ব্যবস্থায় শুরু এআই বিপ্লব

আদালতের করিডোরে গুঞ্জন ওঠে। না, কোনো রোমহর্ষক খুনের মামলার উত্তেজনা নয়, কিংবা বিচারকের তীক্ষ্ণ নির্দেশও নয়।টাইপ রাইটারের খটাখট একঘেয়ে আওয়াজ নয়।  এ এক্কেবারে নতুন গুঞ্জন, যা বলছে, বিচার প্রক্রিয়ায় এআই এসে গেছে। দেশের প্রায় ৪ হাজার আদালতে কেস নথিভুক্তি, জবানবন্দীর প্রক্রিয়া চিরতরে বদলে যেতে চলেছে।

এক সময় আইনজীবীরা ও সাক্ষীরা টাইপিংয়ের গতি মেনে চলার চেষ্টা করতেন, আর বিচারকরা মাঝেমধ্যেই হাহাকার করে উঠতেন, ‘Write submitted, not said’— কিন্তু এবার আর সে দৃশ্য সহজে চোখে পড়বে না। কারণ আদালতে এখন কথা বললেই তা তৎক্ষণাৎ তা অক্ষরে রূপান্তরিত হবে। অন্ধ্রপ্রদেশের একটি জেলা আদালতের বিচারক শিরিন সুলতানা মাইকে বললেন, ‘পরবর্তী মামলা, প্লিজ।’ কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই ক্লার্ক একটি ফাইল তুলে নেন, এরপর আরেকটি নতুন ফাইল সাজানো হয়। আদালতের করিডোরে মানুষ বেরিয়ে যেতে শুরু করে, কয়েক মিনিটের মধ্যে কক্ষে ভিড় কমে যায়। এখন বিচার দ্রুত চলছে, ঝামেলা কমে গেছে, এবং মামলা নিষ্পত্তি হচ্ছে যেমনটি আগে স্বপ্নেও দেখা যেত না। এই সাফল্য আদালতের পেছনের করিডোরে চর্চা শুরু করেছে। মানুষ এখন আগ্রহী হয়ে বলছে, ‘ বিচারক শিরিন সুলতানার কক্ষে কীভাবে সব কিছু এত দ্রুত হচ্ছে!’

দেশে এখন প্রায় ৫ কোটি মামলা বিচারাধীন। বিশেষজ্ঞরা হিসাব করেছেন, যদি বর্তমান গতিতে কাজ চলতে থাকে, তাহলে পূর্ববর্তী সব মামলা নিষ্পন্ন করতে প্রায় ৩০০ বছর লাগবে। আর এই দেরির কারণে দুঃসহ সমস্যা ভোগ করবেন লাখো লাখো মানুষ। তাঁরা, তাদের জীবনের যাবতীয় কাজ স্থগিত রেখে কোর্টে দিন কাটাচ্ছেন। কিন্তু এবার এআই এসেছে সেই বিশাল বোঝা কমানোর জন্য। বিপ্লবের কেন্দ্রবিন্দু ‘আদালত এআই’। হায়দরাবাদের আইআইআইটি-এইচ-এর গবেষক অর্ঘ্য ভট্টাচার্য তৈরি করেছেন এই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। এটি শুধু মুখের কথা তৎক্ষণাৎ সঠিকভাবে লিখতেই সক্ষম নয়, আদালতের জটিল আইনি শব্দভাণ্ডারও এর নখদর্পণে। ফলে স্টেনোগ্রাফারদের কাজের চাপ কমছে। কেরালা, কর্ণাটক, বিহারসহ ৯টি রাজ্যের ৪০০০ এরও বেশি আদালত ইতিমধ্যেই এই প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। যদিও এখনো এটি দেশের বৃহৎ বিচার ব্যবস্থার একটি ছোটো অংশ, তবে যেভাবে এটি দ্রুত কাজ করছে, তাতে ধীরে ধীরে সকল আদালতে এটির প্রভাব পড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।

পাটনার জেলা আদালতের এক ৩৪ বছরের জজের উদাহরণ অন্য রকম। তিনি একাই ৩ জনের কাজ করছেন—স্টেনোগ্রাফার, ডিপোজিশন লেখক এবং বিচারকীয় কার্য। আগে তিনি দিনে ৪টি মামলা নিষ্পন্ন করতেন, এখন সে সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৮-এ । তিনি বলেন, ‘স্টেনোগ্রাফার না থাকলে নিজের হাতের লেখা পড়তেও সমস্যা হত। এখন সব রেকর্ড এক মাইকের মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে লেখা হচ্ছে। এটি সময় বাঁচাচ্ছে, মান ঠিক রাখছে, এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, আবেদনকারীদের সময় বাঁচাচ্ছে।’ কিন্তু এই প্রযুক্তি গ্রহণে সব বিচারক অবশ্য সহজে রাজি হননি। কর্ণাটকের একটি প্রশিক্ষণ সেশনে ৪জন বিচারক প্রাথমিকভাবে নয়া প্রযুক্তি সম্পর্কে সন্দিহান ছিলেন। তাঁরা দ্রুত কথা বলে, আইনি শব্দ জটিলভাবে মিশিয়ে, পরীক্ষা করেন, এআই কি তা বুঝতে পারছে কি না। ফলাফলে দেখা যায় ৯৫ শতাংশ সফলতা। চমকপ্রদ এ দৃশ্য দেখার পর বিচারকদের ধারণা বদলায়। এই মুহূর্তে, মালায়ালম, হিন্দি, তামিল— ভিন্ন ভাষার আঞ্চলিক ব্যাকরণ ও উচ্চারণের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর জন্য ওই আদালত এআই-তে বিশেষ ভাষা বিশেষজ্ঞ যুক্ত করেছে।

এআই প্রযুক্তির এমন কর্মক্ষমতা দেখে প্রথমে কিছু স্টেনোগ্রাফার ভয় পেয়েছিলেন যে, এবার হয়তো তাদের আর চাকরি থাকবে না। কেউ কেউ আদালতে এটির ব্যবহার বন্ধের জন্য বিরোধিতাও করেছেন। কিন্তু এআই-এর কার্যকারিতা দেখার পর আর কেউ প্রতিরোধ করতে পারেননি। এখন তারা অন্যান্য প্রশাসনিক কাজে মনোযোগ দিতে পারছেন, যেমন লাইভ কোর্ট সিস্টেমে আপলোড এবং নথি পরিচালনা। একজন স্টেনোগ্রাফার হেসে বলেন, ‘কিন্তু সে কাজও আগামীতে এআই-ই করবে। হয়তো আমাদের অন্য ডিপার্টমেন্টে স্থানান্তরিত করা হবে।’ ভারত সরকারও এই ডিজিটাল রূপান্তরের প্রতি দৃঢ়। ই-কোর্টস ফেজ ৩-তে বরাদ্দ হয়েছে ৭ হাজার ২১০ কোটি টাকা, যার মধ্যে ৫০ কোটি টাকা প্রাথমিকভাবে নির্ধারিত হয়েছে এআই ও ব্লকচেইনসহ অন্যান্য ভবিষ্যৎ প্রযুক্তিতে। সরকারি এই উদ্যোগই এআই ব্যবহারের পথ সুগম করছে, যাতে বিচারকরা এবং কোর্টের কর্মীরা ন্যায়বিচারে সময় দিতে পারেন।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!