Advertisement
  • এই মুহূর্তে দে । শ
  • অক্টোবর ২৯, ২০২৫

ভাস্কর্যের অগ্রদূত উমা সিদ্ধান্ত প্রয়াত

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
ভাস্কর্যের অগ্রদূত উমা সিদ্ধান্ত প্রয়াত

ভারতীয় ভাস্কর্যের পথিকৃত উমা সিদ্ধান্ত প্রয়াত। মঙ্গলবার সকালে দক্ষিণ কলকাতার হিন্দুস্তান রোডের নিজস্ব বাসভবনে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। মৃত্যুকালে বয়স হয়েছিল ৯২ বছর। দীর্ঘদিন ধরে ডিমেনশিয়া ও বার্ধক্যজনিত নানা শারীরিক সমস্যায় ভুগছিলেন শিল্পী। শেষ কয়েক বছর স্মৃতিভ্রংশ তাঁকে নিঃশব্দ জীবনে অভ্যস্ত করে তুলেছিল।

১৯৩৩ সালের ১১ জানুয়ারি বরাহনগরের বনহুগলিতে মামার বাড়িতে জন্ম উমার। ছোটবেলা থেকেই হাতে-কলমে কাজের প্রতি টান ছিল তাঁর— ছবি আঁকা, বাটিক, চামড়ার কাজ, টেরাকোটা, এমনকি গয়না বানানোতেও দক্ষ ছিলেন। কিন্তু কৈশোরে মাটির সঙ্গে, কাঠের সঙ্গে, ধাতুর সঙ্গে তাঁর যে সম্পর্ক গড়ে ওঠে, সেটাই হয়ে ওঠে আজীবনের সাধনা— ভাস্কর্য। নন্দলাল বসুর ছাত্র ফণীভূষণ দাসের কাছে শিল্পকলার প্রাথমিক শিক্ষা নিয়েছিলেন উমা। পরে সরকারি আর্ট কলেজে ভাস্কর্য নিয়ে পড়ার জন্য আবেদন করেন। সে সময় কলেজে মেয়েরা সাধারণত চিত্রকলা বা কারুশিল্প বিভাগে ভর্তি হতেন না। ভাস্কর্য বিভাগের দরজা তখনো নারীদের জন্য পুরোপুরি খোলা হয়নি। ভর্তি নিয়ে অনেক প্রশ্ন উঠেছিল— ‘একজন মেয়ে কি পারবে এত কঠিন শ্রমের কাজ সামলাতে?’ কিন্তু উমা থেমে থাকেননি। নিজের দৃঢ়তায় তিনি জয় করেন সে লড়াই, তিনিই গভর্নমেন্ট কলেজ অব আর্ট অ্যান্ড ক্রাফটের ভাস্কর্য বিভাগের প্রথম স্নাতক ছাত্রী।

বসন্ত রায় রোডের ছোট্ট স্টুডিয়োতেই শুরু তাঁর পেশাগত জীবন। পরে হিন্দুস্তান রোডে নিজের বাড়িতে তৈরি করেন শিল্পের এক অভয়ারণ্য। ঘরের প্রতিটি কোণে ছড়িয়ে ছিল তাঁর ছোটো-বড়ো অসংখ্য ভাস্কর্য— জীবনের নানান মুখ সেখানে রূপ পেয়েছে ধাতু, কাঠ ও পাথরের শরীরে। ষাটের দশকে তাঁর কাজ প্রাচীন ভারতীয় শৈলীতে অনুপ্রাণিত হলেও সত্তর দশক থেকে পাশ্চাত্য প্রভাব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। শুধু ভাস্কর নন, একাধারে চিত্রকর, সূচিশিল্পী, শিক্ষক, এমনকি টেরাকোটার কাজেও ছিলেন পারদর্শী। সংসার, সন্তান, অধ্যাপনা, সামাজিক দায়বদ্ধতা, সব সামলেই শিল্পের প্রতি তাঁর অনুরাগ ছিল অটুট। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে ৩০তম কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত হয় অবন্তী সিংহ পরিচালিত তথ্যচিত্র ‘উমা’, শিল্পীর আলোকিত জীবন ও দর্শনকে নতুন আলোয় তুলে ধরে সেটি। একই সময়ে আকৃতি আর্ট গ্যালারিতে অনুষ্ঠিত হয় তাঁর শেষ প্রদর্শনী। দুই ক্ষেত্রেই উমাকে ঘিরে উচ্ছ্বাস দেখা গিয়েছিল শিল্প-অনুরাগীদের মধ্যে। অবন্তী বলেন, ‘আমি উমা-দিকে এক নীরব বিপ্লবী মনে করি। শিল্পের জগতে নারীর জন্য যে দরজা তিনি খুলেছিলেন, তা আজও নতুন প্রজন্মের কাছে অনুপ্রেরণা।’

তাঁর ছেলে আশিস সিদ্ধান্ত মঙ্গলবার জানান, ‘মায়ের মতো কর্মঠ মানুষ আমি খুব কম দেখেছি। ৮৫ বছর বয়সেও নিজের তৈরি বিশাল ভাস্কর্যগুলো নিজে হাতে পরিষ্কার করতেন। হাঁটুতে একাধিক অস্ত্রোপচার, ভাঙা হাত, তবু কোনো শারীরিক প্রতিবন্ধকতা কোনো কিছুই তাঁকে দমাতে পারেনি। মা কাজকে ভালোবাসতেন প্রাণ দিয়ে, আর সে ভালোবাসাই তাঁকে এতদিন সজীব করে রেখেছিল।’ তাঁর শেষ জীবনে স্মৃতির আলো নিভে এলেও হাতের ছোঁয়ায় গড়া সৃষ্টিগুলি আজও জ্বলজ্বল করে। ‘প্রিমিটিভ-১’ ভাস্কর্যের জন্য ১৯৯২ সালে তিনি পান ললিতকলা অ্যাকাডেমির জাতীয় পুরস্কার। লোকশিল্পের মাধ্যমে গণশিক্ষার নতুন পদ্ধতি প্রবর্তনের জন্য ১৯৭৯ ও ১৯৮০ সালে পান জাতীয় সম্মান। দীর্ঘদিন ধরে তিনি শ্রীশিক্ষায়তন কলেজে অধ্যাপনা করেছেন।

উমা সিদ্ধান্তের শিল্পে শুধু সৌন্দর্যের অন্বেষণ ছিল না, ছিল মানুষের রোজনামচা, হতাশা, ক্রোধ, দুঃখ, মাতৃত্ব, সংগ্রাম, ভালোবাসা— সবকিছুই একাকার হয়ে উঠেছিল তাঁর হাতে। আহত ষাঁড় থেকে গর্ভবতী নারী, পরিশ্রমে ক্লান্ত সাধারণ মানুষ, তাঁর সৃষ্টিতে মূর্ত হয়ে উঠেছিল জীবনেরই এক অনন্ত ভাস্কর্য। শোনা যায়, তাঁর প্রথম মুক্তমঞ্চ ভাস্কর্য ‘মা ও শিশু’ যখন যতীন দাশ পার্কে স্থাপন করা হয়, বিখ্যাত ভাস্কর রামকিঙ্কর বেইজ সে কাজ দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন। পরবর্তীকালে মেট্রো রেলের নির্মাণকাজের জন্য ভাস্কর্যটি সরিয়ে ফেলা হয়। শিল্প-সমালোচক প্রশান্ত স্মরণ করিয়ে দেন, ‘উমা-দি প্রদোষ দাসগুপ্তের অন্যতম প্রিয় ছাত্রী ছিলেন। বাস্তবধর্মী কাজের মধ্য দিয়ে শুরু হলেও তাঁর শিল্প ভাবনা ক্রমে প্রকৃতি, মনস্তত্ত্ব ও প্রতীকবাদের দিকে বিস্তৃত হয়। আশির দশকের শেষদিকে সিগমুন্ড ফ্রয়েডের মনোবিজ্ঞানের প্রভাব তাঁর কাজে স্পষ্টভাবে ধরা দেয়।’

শিল্পের উপর সীমানা এঁকে দেওয়া তিনি কখনো বরদাস্ত করেন নি। সূচিশিল্প থেকে চিত্রকলা, এমনকি সুপারি গাছের ছালের উপরও তিনি আঁকতেন। আশিস কুমার সিদ্ধান্ত জানান, ‘মা-ই সম্ভবত প্রথম শিল্পী যিনি বকুলবাগান পুজোর জন্য থিম দুর্গা প্রতিমা তৈরি করেছিলেন। মিনোয়ান শিল্প থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে সেই প্রতিমা গড়েছিলেন তিনি।’ ‘গ্যালারি ৮৮’-এর কর্ণধার সুপ্রিয়া বন্দ্যোপাধ্যায় স্মরণ করেন, ‘যখন প্রথম উমা-দির সঙ্গে দেখা, দেখি তিনি তাঁর নাতির স্কুল নাটকের জন্য সেট ডিজাইন করছেন। শিল্প আর সংসারকে তিনি সমান দক্ষতায় সামলাতেন।’ সম্প্রতি তাঁর কাজের উপর কলকাতায় একটি প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়। ছেলের কথায়, ‘শেষ জীবনে স্মৃতি ক্রমে মুছে যাচ্ছিল, কিন্তু তাঁর হাতের ছোঁয়া এখনো যেন প্রতিটি মূর্তির ভেতর বেঁচে আছে।’ আজ তিনি নেই, কিন্তু তাঁর গড়া পাথর, কাঠ, ব্রোঞ্জের শরীরের ভেতর দিয়ে ধ্বনিত হচ্ছে এক শিল্পীর অমোঘ স্পন্দন, যে বলেছিল, সৃষ্টিই জীবনের প্রকৃত মুক্তি। যিনি হাতুড়ি ও ছেনির মধ্য দিয়ে লিখেছিলেন অকুতোভয় শিল্পীর সাহসের অনন্য অধ্যায়।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!