- দে । শ
- ডিসেম্বর ৯, ২০২৫
প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের পথে পাকিস্তান। পরিকল্পনা ঘিরে নয়া আশঙ্কা,বাড়ছে অন্দরের ক্ষোভ
পাকিস্তানের রাজনৈতিক পরিসর আবার উত্তাল। দেশটির শেহবাজ শরিফ সরকার সম্প্রতি নতুন প্রদেশ তৈরির পরিকল্পনা নিয়েছেন, যা রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা কেবল প্রশাসনিক পুনর্গঠন হিসেবে দেখছেন না। দেশটির ফেডারেল কমিউনিকেশনস মন্ত্রী আব্দুল আলীম খান রবিবার রাতে শেখপুরার এক সভায় ঘোষণা করেছেন যে, পাকিস্তানে ছোটো ছোটো প্রশাসনিক প্রদেশ সৃষ্টি করা এখন অনিবার্য। তার যুক্তি, এই পদক্ষেপ প্রশাসনিক কার্যকারিতা বাড়াবে এবং নাগরিকদের জন্য পরিষেবা আরও সহজ ও কার্যকর হবে। তবে বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা, এই পদক্ষেপ দেশটিকে উপকারের চেয়ে ক্ষতির দিকে ঠেলে দিতে পারে বেশি।
প্রশ্ন উঠছে, এমন পদক্ষেপ এখন কেন ? এবং কীভাবে তা বাস্তবায়ন করা হবে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রকল্পের আড়ালে আসল লক্ষ্য হতে পারে বালোচিস্তান ও খাইবার পাখতুনখোয়া নিয়ন্ত্রণে আনা। এই দুই প্রদেশে গত কয়েক বছর ধরে বিদ্রোহী কার্যকলাপ বেড়েছে এবং পাকিস্তান সেনা সেখানে ইতিমধ্যেই কোণঠাসা অবস্থায় রয়েছে। পাশাপাশি বালোচিস্তান এবং খাইবার পাখতুনখোয়ায় সক্রিয় জঙ্গি সংগঠন তেহরিক-ই-তালিবান পাকিস্তানের (টিটিপি) উপস্থিতি পরিস্থিতি আরো জটিল করে তুলেছে। পাকিস্তান স্বাধীনতার সময় পাঁচটি প্রদেশ নিয়ে গঠিত ছিল, যার মধ্যে ছিল পূর্ব বঙ্গ, পশ্চিম পাঞ্জাব, সিন্ধ, বালোচিস্তান এবং নর্থ-ওয়েস্ট ফ্রন্টিয়ার প্রভিন্স। পাকিস্তান এবং ‘বিভাজন’—এই শব্দটি শুনলেই ইতিহাসের এক বিতর্কিত অধ্যায় মনে আসে, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পর স্বাধীন বাংলাদেশের আত্মপ্রকাশের কথা মনে আসে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা লাভের এর ফলে পাকিস্তানে বর্তমানে চারটি প্রদেশ অবশিষ্ট রয়েছে। পশ্চিম পাঞ্জাব এবং নর্থ-ওয়েস্ট ফ্রন্টিয়ার প্রভিন্সকে খাইবার পাখতুনখোয়া নামে পুনঃনামকরণ করা হয়েছে।
আব্দুল আলীম খানদের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ওই চারটি প্রদেশকে ভেঙে প্রতিটিতে তিনটি করে নতুন প্রদেশ গঠন করা হবে। অর্থাৎ অদূর ভবিষ্যতে পাকিস্তানে মোট ১২টি প্রদেশ তৈরি হবে। মন্ত্রী জোর দিয়ে বলেন, প্রতিবেশী দেশগুলিতে ছোটো ছোটো প্রদেশ রয়েছে, যা প্রশাসনিক কার্যকারিতা বাড়িয়েছে এবং স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করেছে। এহেন ঘোষণা সামনে আসতেই তীব্র বিতর্ক শুরু হয়েছে পাকিস্তান জুড়ে। বহু বিরোধী রাজনৈতিক দল এই পদক্ষেপকে সমর্থন করছে না। এমনকি পাকিস্তান পিপলস পার্টি, যেটি বর্তমানে শাসক জোটের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, ইতিমধ্যেই জানিয়েছে যে, তারা সিন্ধ প্রদেশকে ভেঙে নতুন প্রদেশ তৈরির বিপক্ষে। সিন্ধ প্রদেশে রাজনৈতিক প্রভাব সবচেয়ে শক্তিশালী এই দলের। সিন্ধের মুখ্যমন্ত্রী মুরাদ আলি শাহ হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, তারা পাঞ্জাব প্রদেশ বা পাকিস্তানের স্বার্থবিরোধী কোনো পদক্ষেপ বরদাস্ত করবেন না। এছাড়া মুতাহিদা কওমি মুভমেন্ট-পাকিস্তান নতুন প্রদেশ তৈরির পক্ষে আইনগত পদক্ষেপ নেয়ারও ঘোষণা দিয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই সিদ্ধান্তে সরকারের চেয়ে অনেক বেশি প্রভাব থাকতে পারে পাক সেনার। আসিম মুনির নেতৃত্বাধীন সেনাশক্তি নতুন প্রদেশ তৈরির পেছনে কার্যত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে বলে মনে করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, শুধু প্রদেশ সংখ্যা বাড়িয়ে সেই দেশকে সুশাসনের পথে নিয়ে যাবে না। পাকিস্তানের মূল সমস্যা হলো দুর্বল প্রতিষ্ঠান, অসম নিয়ম প্রয়োগ এবং স্থানীয় প্রশাসনের দুর্বলতা। সৈয়দ আখতার আলী শাহের মতো প্রবীণ ব্যুরোক্র্যাটরা বলছেন, এই কাঠামোগত ফাঁকগুলো ঠিক না করে নতুন প্রদেশ তৈরি করলে পরিস্থিতি আরও জটিল হবে। পাকিস্তান ভিত্তিক চিন্তাশীল সংস্থা ‘পিলদাত’-এর সভাপতি আহমেদ বিলাল মেহবুব, বলেছেন, ‘বড়ো প্রদেশের সংখ্যা নয়, ক্ষমতার স্থানীয় পর্যায়ে হস্তান্তরই মূল সমস্যা। নতুন প্রদেশ তৈরি করা খরচসাপেক্ষ, জটিল এবং রাজনৈতিকভাবে বিপজ্জনক। যে কোনো প্রশাসনিক পুনর্গঠন কার্যকর করতে হলে প্রথমে বিদ্যমান প্রদেশগুলোতে ক্ষমতা হস্তান্তর, স্থানীয় সরকারের শক্তিকরণ এবং আইন-শৃঙ্খলা ও সেবাদান ব্যবস্থার অভ্যন্তরীণ সংস্কার করা অপরিহার্য। নতুবা নতুন প্রদেশ তৈরি করা কেবল রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব বাড়াবে এবং জনসাধারণের মধ্যে অসন্তোষকে তীব্র করবে।’ সাম্প্রতিক সময়ে, বালোচিস্তান ও খাইবার পাখতুনখোয়ায় বিদ্রোহী কার্যকলাপ এবং জঙ্গি সংগঠনগুলোর সক্রিয় উপস্থিতি নতুন প্রদেশ তৈরিকে আরও বিতর্কিত করছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, যদি বিদ্যমান প্রশাসনিক দুর্বলতা ঠিক না করা হয়, তবে এই পদক্ষেপ দেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিকর প্রমাণিত হতে পারে।
❤ Support Us





