Advertisement
  • দে । শ প্রচ্ছদ রচনা
  • মার্চ ২৬, ২০২৬

ভোটের অঙ্কে মূলনিবাসী-জনজাতি ‘ফ্যাক্টর’ ! প্রতিশ্রুতির লড়াইয়ে অধিকার নিয়ে অনিশ্চয়তা

ইমরাজ হাসান
ভোটের অঙ্কে মূলনিবাসী-জনজাতি ‘ফ্যাক্টর’ ! প্রতিশ্রুতির লড়াইয়ে অধিকার নিয়ে অনিশ্চয়তা

বাংলার আকাশে-বাতাসে এই মুহূর্তে ধ্বনিত হচ্ছে একটাই শব্দ— ‘ভোট আসছে’। পাহাড় থেকে সমতলে, উপকূল আর জঙ্গলে গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড়ো পরব ঘিরে সাজো সাজো রব। ফ্লেক্স, ব্যানার, ফেস্টুন, পতাকা ঘিরে নিভৃত জনপদ আজ কলতানে মুখর। প্রতিশ্রুতির ঝাঁপি খুলে বসেছেন নেতারা। গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে ছুটে বেড়াচ্ছেন প্রার্থীরা, উন্নয়নের আশ্বাসে ভরছে জনসভা। চেনা এ ছবির আড়ালেই থেকে যাচ্ছে বিশাল সংখ্যক নাগরিকের দীর্ঘদিনের বঞ্চনার কাহিনি। আর সে সঙ্গে স্পষ্ট হয়ে উঠছে জনজাতি ও মূলনিবাসী ভোটব্যাঙ্কের ক্রমবর্ধমান গুরুত্ব। পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, বীরভূম, বনগাঁ, দক্ষিণ চব্বিশ পরগণা, জঙ্গলমহল থেকে উত্তরবঙ্গ; বিস্তীর্ণ এই অঞ্চলে বসবাসকারী ‘সংখ্যালঘু’ সমাজ এ বার নিজেদের অধিকার, জমি রক্ষা ও উন্নয়নের দাবিতে আগের চেয়ে অনেক বেশি সোচ্চার। ভোটের আগে তাঁদের মনে যেমন প্রত্যাশা, তেমনই গভীর সংশয়ও দানা বেঁধেছে।

ভোটের দিনক্ষণ ঘোষণা হতেই জঙ্গলমহলের বিস্তীর্ণ অঞ্চলের বহু মূলনিবাসী ও জনজাতি সম্প্রদায়ের মানুষের মনে আজ এক অদ্ভুত মিশ্র অনুভূতি। বারবার উঠে আসছে একটাই প্রশ্ন— ভোটার তালিকায় নাম থাকবে তো ? নিজের জমিতে, নিজের গ্রামে থাকার অধিকার আদৌ সুরক্ষিত তো ? ভোটাধিকার নিয়েই যখন সংশয় তৈরি হচ্ছে, তখন গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার প্রতি আস্থাও কিছুটা হলেও টাল খাচ্ছে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। অন্যদিকে উন্নয়নের আশ্বাসে উজ্জ্বল প্রত্যাশায়, হাজারো সংশয়ের মাঝেই ভোটের লাইনে দাঁড়ানোর প্রস্তুতি নিচ্ছেন তাঁরা, অধিকার রক্ষার দায়বদ্ধতা থেকেই। একই ছবি ‘মতুয়া বেল্ট’-এ। ভোটের আগে আমজনতার দ্বৈত মানসিকতাই স্পষ্ট করে দিচ্ছে, এবারের নির্বাচনে সমস্ত রাজনৈতিক দলের কাছে এই ‘ভোটব্যাঙ্ক’ কতটা তাৎপর্যপূর্ণ। তৃণমূল, বিজেপির উত্তরবঙ্গ থেকে প্রচার শুরু করবার সিদ্ধান্ত এরই ইঙ্গিত দেয়। জনসভা, পথসভা, দরজায় দরজায় প্রচার, সব জায়গাতেই এখন মূলনিবাসী ও জনজাতি সমাজের উন্নয়ন, ভাষা-সংস্কৃতির সংরক্ষণ এবং সামাজিক নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি তুলে ধরা হচ্ছে।

পুরুলিয়া ও সংলগ্ন এলাকায় চিত্র কিছুটা আলাদা হলেও উদ্বেগ একই রকম প্রকট। সেখানে কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য পরিষেবার অভাবই ভোটের মূল ইস্যু। যুবসমাজ কাজের খোঁজে বাইরে যেতে বাধ্য হচ্ছে, পড়াশোনার সুযোগ সীমিত, স্বাস্থ্য পরিকাঠামোও অপর্যাপ্ত— এই সমস্ত প্রশ্নই ভোটের আগে সাধারণ মানুষের আলোচনার কেন্দ্রে। শিলিগুড়ি মহকুমার নকশালবাড়ি ব্লকের প্রত্যন্ত গ্রামগুলিতে বসবাসকারী ধীমাল জনজাতির জীবনও বদলের অপেক্ষায় থমকে। নকশালবাড়ির গ্রামেগঞ্জে প্রার্থীদের আনাগোনা, বাড়ি বাড়ি গিয়ে সমস্যা শোনার চেষ্টা, উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি, সবই চলছে নিয়ম মেনে। কিন্তু স্থানীয়দের একাংশের কথায়, প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন খুব কমই দেখা যায়। ভোটের আগে ‘পায়ে ধরা’, আর ভোটের পরে ‘বাঘ হয়ে ওঠা’— গ্রামবাংলার সেই চিরাচরিত প্রবাদ আজও অমোঘ সত্য হয়ে ধরা দেয়।

শিলিগুড়ি সংলগ্ন এই নকশালবাড়ি ব্লকের হাতিঘিসা, মনিরাম, কেতুগাবুর, সাদামল্লিকজোত, কুচাইমল্লিক, নিহালজোত-সহ প্রায় ১৮টি প্রত্যন্ত গ্রামে ছড়িয়ে রয়েছে ধীমালদের বসতি। মেচি নদীর ধার ঘেঁষে থাকা এই গ্রামগুলিতে মিলিয়ে মোটামুটি দু–বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে তাঁদের বাস। একসময় যেখানে এই জনজাতির সংখ্যা ছিল মাত্র ৫০০ থেকে ১০০০, এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৮০০-র কাছাকাছি। তবে ভোটারের সংখ্যা এখনও সীমিত—প্রায় ৭৫০ থেকে ৮০০। ‘এসআইআর’-এ নথির অভাবে অনেকের নাম এখনও তালিকাভুক্ত হয়নি, আবার কারও নাম বাদও পড়েছে, ফলে ভোটার তালিকা নিয়েও রয়েছে অনিশ্চয়তা।

ধীমাল জনজাতির দৈনন্দিন জীবন এখনো মূলত কৃষিকাজ, চা-বাগানের শ্রম এবং পশুপালনের উপর নির্ভরশীল। ধীমাল মহিলারা কেউ কেউ ডোকরা শিল্পের সঙ্গে যুক্ত হয়ে বিকল্প আয়ের পথ খুঁজছেন। তবু আর্থিক সঙ্কট কাটেনি। শিক্ষার হার অত্যন্ত কম, এখনো পর্যন্ত মাত্র তিন জন বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরিয়েছেন বলে স্থানীয়দের দাবি। অনেকেই মাধ্যমিকের পর পড়াশোনা ছেড়ে কাজে যোগ দেন। ফলে যুবসমাজের বড়ো অংশ কাজের সন্ধানে ভিনরাজ্যে পাড়ি দিতে বাধ্য হচ্ছে। সংস্কৃতি ও ভাষার ক্ষেত্রেও সংকট ক্রমশ প্রকট। ধীমালদের নিজস্ব ভাষা ‘ভাটে বার্মেলি’ আজ বিলুপ্তির মুখে। লিখিত পুঁথি বা গ্রন্থ না থাকায় প্রজন্মান্তরে ভাষা হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা বাড়ছে। রাজ্য সরকারের বিভিন্ন প্রকল্প—বাংলার আবাস যোজনা, লক্ষ্মীর ভাণ্ডার, যুবসাথী, কন্যাশ্রীর মতো উদ্যোগ—এই জনজাতির মানুষের কাছে কিছুটা পৌঁছেছে। সম্প্রতি ‘আমাদের পাড়া আমাদের সমাধান’ প্রকল্পের মাধ্যমে গ্রামে রাস্তা তৈরি হয়েছে, বসেছে আলো। শিলিগুড়ি মহকুমা পরিষদের উদ্যোগে বিদ্যুৎ, পানীয় জল, স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও শিশু শিক্ষা কেন্দ্রও গড়ে উঠেছে।

তবে বাসিন্দাদের মতে, এই উন্নয়ন তাঁদের মৌলিক সমস্যার সমাধান নয়। ভাষা ও ঐতিহ্য সংরক্ষণের জন্য প্রাথমিক স্তরে মাতৃভাষায় শিক্ষার দাবি তুলছেন স্থানীয়রা। পাশাপাশি উচ্চশিক্ষার জন্য স্কলারশিপ এবং বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির দাবিও জোরালো হচ্ছে। ধীমাল অধ্যুষিত এলাকাগুলিকে পর্যটন মানচিত্রে এনে হোম-স্টে চালুর মতো উদ্যোগ নিলে আর্থিক উন্নয়নের নতুন পথ খুলতে পারে বলেও মনে করছেন অনেকে। তবে, ধীমাল জনজাতির মানুষের মূল দাবি— তফশিলি উপজাতির স্বীকৃতি। তাঁদের বক্তব্য, এই স্বীকৃতি মিললেই শিক্ষা ও চাকরিতে সংরক্ষণ পাওয়ার সুযোগ তৈরি হবে, যা তাঁদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতিতে বড়ো ভূমিকা নিতে পারে।

২০০৮ সালে রাজ্যের কালচারাল রিসার্চ ইনস্টিটিউট ধীমালদের জীবনযাত্রা, খাদ্যাভ্যাস ও সংস্কৃতি নিয়ে একটি রিপোর্ট তৈরি করে কেন্দ্রের কাছে পাঠায়। কিন্তু এক দশকের বেশি সময় কেটে গেলেও সেই প্রক্রিয়া আর এগোয়নি। অন্যান্য জনজাতির জন্য উন্নয়ন বোর্ড গঠিত হলেও ধীমালরা সে তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। অভিযোগ, ২০২১ সালের নির্বাচনের আগে ভোট চাইতে এলেও পরে আর দেখা যায়নি জনপ্রতিনিধিকে। তবু সমস্ত হতাশার মাঝেও গণতন্ত্রের উপর আস্থা হারাননি তাঁরা। ভোট এলেই লাইনে দাঁড়ান, ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন। হয়তো এই আশায়—কোনও একদিন তাঁদের অস্তিত্বের স্বীকৃতি মিলবে, বদলাবে তাঁদের জীবনযাত্রা। যদিও সংশ্লিষ্ট বিধায়ক তথা বর্তমান প্রার্থী আনন্দময় বর্মনের দাবি, তিনি নিয়মিত যোগাযোগ রাখেন এবং ক্ষমতায় এলে স্বীকৃতি আদায়ের চেষ্টা করবেন।

‘ভোটব্যাঙ্ক’-এর এমন জটিল সমীকরণ মাথায় রেখেই প্রার্থী বাছাই করছে রাজনৈতিক দলগুলি। কোথাও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়, কোথাও তফসিলি জাতি বা উপজাতির প্রতিনিধিত্ব— সব কিছু মিলিয়ে সূক্ষ্ম অঙ্ক কষে প্রার্থী তালিকা তৈরি হয়েছে। আধা শহুরে এলাকায় উচ্চবর্ণের পাশাপাশি সদগোপ প্রার্থীদের গুরুত্ব যেমন রয়েছে, তেমনই গ্রামীণ অঞ্চলে স্থানীয় সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদেরই অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। জনজাতি ভোটারদের মন জয়ের লড়াইয়ে গেরুয়া শিবিরের তরফে নাগরিকত্ব ও ‘ডবল ইঞ্জিন সরকার’-এর ব্যাপক উন্নয়নের আশ্বাসই মূল হাতিয়ার। ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনের অভিজ্ঞতাও রাজনৈতিক দলগুলির কাছে গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্লেষকদের মতে, তফসিলি জাতি ও উপজাতি সম্প্রদায়ের সমর্থন ছাড়া সেই নির্বাচনে বিজেপি-র সাফল্য এতটা সহজ হতো না। ফলে এ বারও সেই ভোটব্যাঙ্ককে ঘিরেই কৌশল নির্ধারণ করছে শমীক-শুভেন্দুরা।

ক্ষমতাসীন তৃণমূলের তরফেও এসেছে একাধিক পদক্ষেপ। মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি জনজাতি ও অনগ্রসর সম্প্রদায়ের উন্নয়নের লক্ষ্যে নতুন পাঁচটি সাংস্কৃতিক ও উন্নয়ন বোর্ড গঠনের ঘোষণা করেছেন। মুন্ডা ও কোরা (তফসিলি উপজাতি), ডোম (তফসিলি জাতি), কুম্ভকার ও সদগোপ (ওবিসি)—এই ৫টি সম্প্রদায়ের ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ এবং শিক্ষা-স্বাস্থ্য-কর্মসংস্থানের উন্নয়নই এই বোর্ডগুলির মূল লক্ষ্য বলে জানানো হয়েছে। সরকারের দাবি, কোনো সম্প্রদায় যেন উন্নয়ন থেকে পিছিয়ে না থাকে, সে লক্ষ্যেই এই উদ্যোগ। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, ভোটের আগে এই ধরনের ঘোষণা শুধুমাত্র উন্নয়নের অঙ্গীকার নয়, বরং স্পষ্ট রাজনৈতিক বার্তাও বয়ে আনে।

পরিসংখ্যান বলছে, ২০১১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী পশ্চিমবঙ্গে মূলনিবাসী ও জনজাতীর জনসংখ্যা প্রায় ৫২.৯ লক্ষ, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৫.৮ শতাংশ। অন্যদিকে তফসিলি জাতির সংখ্যা প্রায় ২.১৪ কোটি, অর্থাৎ ২৩.৫ শতাংশেরও বেশি। ফলে নির্বাচনের অঙ্কে এই শ্রেণিগুলির ভোটারদের গুরুত্ব যে কতটা, তা বলাই বাহুল্য। রাজ্যের ২৯৪টি বিধানসভা আসনের মধ্যে ৬৮টি তফসিলি জাতির জন্য এবং ১৬টি তফসিলি উপজাতির জন্য সংরক্ষিত হলেও, সংরক্ষিত আসনের বাইরেও তাঁদের প্রভাব বিস্তৃত।  বিশেষজ্ঞদের মতে, অন্তত ১২০টি আসনের ফল নির্ভর করে তফসিলি জাতির বিভিন্ন সম্প্রদায়ের ভোটের উপর। রাজবংশী, মতুয়া, নমশূদ্র, বাগদি, বৌরি বা পদ পৌণ্ড্র—প্রত্যেকটিরই নিজস্ব সামাজিক ভিত্তি রয়েছে। একইভাবে মুসলিম ভোটাররাও, যারা রাজ্যের প্রায় ২৭-২৮ শতাংশ, বহু আসনে ফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়, বিশেষ করে মুর্শিদাবাদ, মালদা বা দক্ষিণ ২৪ পরগনার মতো জেলায়। সব মিলিয়ে, ভোটের আবহে পশ্চিমবঙ্গের জনজাতি, মূলনিবাসী ও সংখ্যালঘু মুসলিম সমাজ এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি, স্বীকৃতির দাবি এবং অধিকার রক্ষার লড়াই, এই তিনের টানাপোড়েনেই গড়ে উঠছে এবারের নির্বাচনী সমীকরণ। এখন দেখার, প্রতিশ্রুতির এই লড়াইয়ের শেষে বাস্তবের মাটিতে কতটা পরিবর্তন ধরা পড়ে, দীর্ঘদিনের বঞ্চনার অবসান আদৌ ঘটে কি না।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!