- দে । শ প্রচ্ছদ রচনা
- এপ্রিল ২১, ২০২৬
‘নির্বাচনের পরই ভোটার তালিকায় জুড়ব প্রত্যেক গোর্খার নাম’, এসআইআর ইস্যুতে শাহ প্রতিশ্রুতি
প্রথম দফার ভোটের প্রচার শেষের মুখে। পাহাড়ে এসে একযোগে প্রতিশ্রুতি ও আক্রমণের সুর চড়ালেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। মঙ্গলবার কার্শিয়াঙের জনসভা থেকে তিনি ঘোষণা করলেন, ভোট মিটলেই ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়া প্রত্যেক গোর্খার নাম ফের যুক্ত করা হবে। একই সঙ্গে নির্দিষ্ট দিনক্ষণ বেঁধে দিয়ে জানালেন, ৬ মে-র মধ্যেই দীর্ঘদিনের গোর্খা সমস্যার সমাধান করবে বিজেপি সরকার—‘যাতে প্রত্যেক গোর্খার মুখে হাসি ফুটে ওঠে।’
মঙ্গলবার প্রথম দফার ভোটপ্রচারের শেষ দিন। শেষ লগ্নে পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে ৪ টি সভার সূচি রয়েছে অমিত শাহের— কার্শিয়াং, কুলটি, শালবনি ও চণ্ডীপুর। দিনের শুরুতেই তিনি পৌঁছন কার্শিয়াঙে। সভা শুরুর আগেই সেখানে দলীয় পতাকা, স্লোগানে মুখর পাহাড়ি জনপদ। সভামঞ্চে উপস্থিত ছিলেন দার্জিলিংয়ের সাংসদ রাজু বিস্তা, গোর্খা রাজনীতির পরিচিত মুখ বিমল গুরুং-সহ একাধিক নেতা। মঞ্চে উঠে প্রথমেই অনুপস্থিতির প্রসঙ্গ টেনে শাহ জানান, এর আগে দার্জিলিংয়ের সভায় আসার কথা থাকলেও খারাপ আবহাওয়ার কারণে হেলিকপ্টার উড়তে পারেনি। তবে তখনই তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন ২১ তারিখে অবশ্যই আসবেন। প্রতিশ্রুতি রাখতে এদিন পাহাড়ে এসেছেন বলেই জানান তিনি।
এরপরই রাজ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আক্রমণাত্মক সুরে বক্তব্য শুরু করেন শাহ। তাঁর দাবি, গোটা পশ্চিমবঙ্গ ঘুরে প্রচারের শেষ দিনে তিনি পাহাড়ে এসেছেন, এবং এবার রাজ্যে বিজেপি সরকার গঠন নিশ্চিত। সরাসরি মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জিকে নিশানা করে তিনি বলেন, ‘আমাদের উপর অত্যাচার করা মমতাদিদিকে টাটা বাই বাই করার সময় হয়ে গিয়েছে।’ তাঁর কথায়, গত কয়েক বছরে রাজ্যে নারী নির্যাতনের একাধিক ঘটনা ঘটেছে— সন্দেশখালি থেকে শুরু করে মাটিগাড়া, বাগডোগরা, দুর্গাপুর, দক্ষিণ কলকাতার ল কলেজ, আরজি কর, সব ক–টি ঘটনার উল্লেখ করে তিনি অভিযোগ করেন, রাজ্যে আইনশৃঙ্খলা ভেঙে পড়েছে। বিজেপি ক্ষমতায় এলে ‘প্রত্যেক ধর্ষককে বেছে বেছে জেলে ঢোকানো হবে’ এ বার্তাও দেন তিনি।
কার্শিয়াঙের সভায় অন্যতম প্রধান ইস্যু হয়ে ওঠে ভোটার তালিকা। শাহ অভিযোগ করেন, রাজ্য প্রশাসনের ‘ষড়যন্ত্রে’ বহু গোর্খার নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। তাঁর কথায়, ‘মমতাদিদির কালেক্টররা কয়েক জন গোর্খার নাম কেটে দিয়েছে। কিন্তু কোনো সমস্যা নেই। আসন আমরা জিতবই। ভোট শেষ হওয়ার পর বেছে বেছে প্রত্যেক গোর্খাকে আবার ভোটার তালিকায় জুড়ে দেবে বিজেপি।’ গোর্খা সমস্যার প্রসঙ্গ টেনে শাহ আরও এক ধাপ এগিয়ে নির্দিষ্ট সময়সীমা ঘোষণা করেন। তিনি বলেন, বিজেপি সরকার গঠিত হলে ৬ মে-র মধ্যেই এমন সমাধান বের করা হবে যাতে ‘প্রত্যেক গোর্খার মুখে সন্তুষ্টির হাসি থাকে।’
কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর অভিযোগ, কংগ্রেস, সিপিএম ও তৃণমূল— ৩ দলই এতদিন ধরে গোর্খাদের সঙ্গে অন্যায় করেছে। তিনি নিজে গত ৯ বছর ধরে পাহাড়ে আসছেন বলে উল্লেখ করে বলেন, ‘আমি আপনাদের কথা দিয়ে যাচ্ছি, এত দিন ধরে ঝুলে থাকা সমস্যার সমাধান করব, আর সেই সমাধান হবে গোর্খাদের মনের মতো করেই।’ পাশাপাশি তিনি জানান, ৩১ জুলাইয়ের মধ্যে গোর্খাদের বিরুদ্ধে থাকা সমস্ত মামলা প্রত্যাহার করা হবে, কারণ মামলাগুলির মাধ্যমে গোর্খা আন্দোলনকে দমন করা হয়েছে বলে তাঁর দাবি।
উত্তরবঙ্গের উন্নয়ন নিয়েও একাধিক ঘোষণা করেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তাঁর কথায়, বিজেপি সরকার গঠিত হলে উত্তরবঙ্গে একটি পৃথক এইমস গড়ে তোলা হবে, ৫০০ শয্যার ক্যানসার হাসপাতাল তৈরি হবে, আইআইটি ও আইআইএম স্থাপন করা হবে। গোর্খা তরুণদের জন্য ক্রীড়া বিশ্ববিদ্যালয় এবং একটি আদিবাসী বিশ্ববিদ্যালয় তৈরির প্রতিশ্রুতিও দেন তিনি। পাশাপাশি উত্তরবঙ্গে চারটি নতুন শিল্পশহর গড়ে তোলা, সরকারি কর্মীদের ৪৫ দিনের মধ্যে সপ্তম পে কমিশনের সুবিধা দেওয়া, চা-বাগানে স্কুল তৈরি, শ্রমিকদের জমির পাট্টা প্রদান এবং ৭ বছরের মধ্যে মজুরি ৫০০ টাকার বেশি করার আশ্বাস দেন।
পরিকাঠামো উন্নয়নের খতিয়ান তুলে ধরে শাহ বলেন, ইতিমধ্যেই উত্তরবঙ্গে একাধিক প্রকল্প চলছে। ৩টি বন্দে ভারত ট্রেন চালু হয়েছে এই অঞ্চলে, ১২ হাজার কোটি টাকার সেবক-রংপো রেললাইন প্রকল্প শেষের পথে, নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশনের উন্নয়ন হচ্ছে। বাগডোগরা বিমানবন্দরকে ৩০০০ কোটি টাকা ব্যয়ে নতুন করে গড়ে তোলার কাজ চলছে এবং ২০২৭ সালের মধ্যে সেটিকে দেশের সপ্তম বৃহত্তম বিমানবন্দর হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি দার্জিলিংয়ের জন্য বিকল্প মহাসড়ক তৈরির কাজও চলছে বলে জানান তিনি। এমনকি ভবিষ্যতে শিলিগুড়ি থেকে বারাণসী পর্যন্ত বুলেট ট্রেনে কাশী বিশ্বনাথ দর্শনের সুযোগও তৈরি হবে বলে দাবি করেন।
এদিন রাজ্যের অর্থনৈতিক বৈষম্যের অভিযোগও তোলেন শাহ। তাঁর দাবি, উত্তরবঙ্গের জন্য রাজ্য সরকারের বাজেট মাত্র ২০০০ কোটি টাকা, যেখানে অন্য জায়গার সংখ্যালঘু সম্প্রদায় ও মাদ্রাসার জন্য বরাদ্দ ৫৮০০ কোটি টাকা। এই তুলনা টেনে তিনি প্রশ্ন তোলেন, ‘এ অন্যায় আর কতদিন চলবে?’ একই সঙ্গে অনুপ্রবেশ ইস্যুতেও সরব হয়ে তিনি প্রশ্ন তোলেন, বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গাদের তাড়ানো উচিত কি না! সভায় জিটিএ-র দুর্নীতি নিয়েও তদন্তের আশ্বাস দেন শাহ। পাশাপাশি দাবি করেন, বিজেপি সরকার গঠিত হলে কোনো জনকল্যাণমূলক প্রকল্প বন্ধ করা হবে না, বরং বিদ্যমান প্রকল্পগুলির সঙ্গে নতুন প্রকল্পও যুক্ত হবে। ভয় পেয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ‘গুজব ছড়াচ্ছেন’ বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
❤ Support Us





