Advertisement
  • দে । শ ন | ন্দ | ন | চ | ত্ব | র
  • এপ্রিল ২৩, ২০২৬

যুদ্ধের ঘনঘটায় ঐতিহ্যে আশ্রয়, কাশ্মীরে পারস্য পাণ্ডুলিপি সংরক্ষণের উদ্যোগ

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
যুদ্ধের ঘনঘটায় ঐতিহ্যে আশ্রয়, কাশ্মীরে পারস্য পাণ্ডুলিপি সংরক্ষণের উদ্যোগ

পশ্চিম এশিয়ার আকাশে দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয়ে উঠছে যুদ্ধের ছায়া। ভূখণ্ড পেরিয়ে সংঘাতের প্রভাব পড়েছে ফেলছে বিশ্ব অর্থনীতিজ্বালানি নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের উপর। এরই মধ্যে কাশ্মীরে ভিন্ন সুর। ইরানি ঐতিহ্য রক্ষার উদ্যোগে ব্যস্ত ভারতের উপত্যকা।

শ্রীনগরের কাশ্মীর বিশ্ববিদ্যালয়ে ৫০ হাজার পারস্য পাণ্ডুলিপি ডিজিটাইজ করার প্রকল্প নিছক একটি অ্যাকাডেমিক কর্মসূচি নয়এর তাৎপর্য বহুমাত্রিক। কেন্দ্র সরকারের সর্বভারতীয় উদ্যোগের অংশ হিসেবে বহু শতাব্দী ধরে সযত্নে রক্ষিত হাতে লেখা পাণ্ডুলিপিগুলি সময়ের ভারে আজ ভঙ্গুর। সে ক্ষয় রোধ করতেই ডিজিটাল রূপ দেওয়ার প্রয়াস। এ প্রকল্পকে ঘিরে ইতিমধ্যেই আগ্রহ তৈরি হয়েছে শিক্ষাজগতে।  এই কর্মযজ্ঞ যেমন প্রাচীন দলিল সংরক্ষণের প্রচেষ্টাতেমনই এটি ভারতের বহুসাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ পুনঃস্মরণ।

প্রশ্ন উঠতে পারেযুদ্ধঅর্থনৈতিক সঙ্কটকূটনৈতিক টানাপোড়েনের এই সময়ে পাণ্ডুলিপি সংরক্ষণ কতটা জরুরিউত্তরটি ইতিহাসেই নিহিত। তিহাস বলছেএকসময় ভারতীয় উপমহাদেশের প্রশাসনিক ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করত ফার্সি ভাষা। জম্মুকাশ্মীরের  প্রশাসনশিক্ষা ও সাহিত্যের প্রধান ভাষা ছিল এটি। আদালতের নথি থেকে কবিতার পুঁথিসবেতেই ছিল  ভাষার প্রভাব। আজ সেসব দলিলই ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে নানা গ্রন্থাগারব্যক্তিগত সংগ্রহ কিংবা অচেনা অন্ধকার কোণে। সেগুলিকে উদ্ধারতালিকাভুক্ত ও ডিজিটাল আর্কাইভে সংরক্ষণের কাজ শুরু হয়েছে ইতিমধ্যেই।  

কাশ্মীর বিশ্ববিদ্যালয়ের পারস্য বিভাগের প্রধান অধ্যাপক জাহাঙ্গীর ইকবাল জানিয়েছেনপাণ্ডুলিপিগুলির বিষয়বৈচিত্র্য বিস্ময়কর। কবিতাধর্মচিকিৎসাবিজ্ঞান থেকে প্রশাসনিক দলিলসবই রয়েছে এই ভাণ্ডারে। তাঁর মতে, ‘দলিলগুলি শুধু অতীতের স্মারক নয়গবেষণার অমূল্য সম্পদ। ডিজিটাইজেশনের ফলে বিশ্বের যে কোনো প্রান্ত থেকে গবেষকরা এগুলির নাগাল পাবেন।’ এখানেই এই উদ্যোগের গভীরতা। আধুনিক ইরানের-এর সঙ্গে কাশ্মীরের সম্পর্ক শুধু কূটনৈতিক নয়তা বহুকাল ধরে সাংস্কৃতিক ও বৌদ্ধিক আদানপ্রদানের উপর প্রতিষ্ঠিত। সুফি সাধকদের আগমনকারুশিল্পের বিকাশস্থাপত্যের ধারাসবই সেই মেলবন্ধনের ফল।

তাঁদের হাত ধরেই কাশ্মীরের কার্পেট বোনাপেপিয়ার-ম্যাশে শিল্প কিংবা স্থাপত্যে এসেছে নতুন মাত্রা। প্রাচীন বাণিজ্যপথ শুধু পণ্য নয়বইচিন্তাধারা ও সংস্কৃতির আদানপ্রদানও ঘটিয়েছে অবাধে। আজ যখন সে অঞ্চল রাজনৈতিক টানাপোড়েনে বিদীর্ণতখন এই ঐতিহ্য সংরক্ষণ যেন এক নীরব প্রতিরোধবিভেদের বিরুদ্ধেবিস্মৃতির বিরুদ্ধে। ইরানের সদ্য নিহত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লাহ আলি খামেনেইও একসময় কাশ্মীর সফর করেছিলেন। ১৯৮০ সালেইরানি বিপ্লবের পরপরই তাঁর সে সফর এবং শ্রীনগরের জামিয়া মসজিদে ভাষণ আজও আলোচিত।

ডিজিটাল প্রকল্পে যুক্ত গবেষকরা জানিয়েছেনপারস্য ভাষা বিশেষজ্ঞআর্কাইভবিদ ও সংরক্ষণ বিশেষজ্ঞদের তত্ত্বাবধানে ধাপে ধাপে পাণ্ডুলিপিগুলির ক্যাটালগ তৈরি হচ্ছে। ডিজিটাল সংরক্ষণের মাধ্যমে একদিকে যেমন ক্ষয় রোধ করা সম্ভব হবেতেমনই তৈরি হবে এক বিস্তৃত অনলাইন ভাণ্ডার। গবেষকদের মতেএ উদ্যোগ ভারতের পারস্য-চর্চায় নতুন গতি আনতে পারে।
ইন্দো-পারস্য সংস্কৃতির গবেষক ড. মেহনাজ খানের কথায়
, ‘ভারতের প্রশাসনিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস বোঝার ক্ষেত্রে পাণ্ডুলিপিগুলির গুরুত্ব অপরিসীম। ডিজিটাল মাধ্যমে এগুলি সহজলভ্য হলে গবেষণার ক্ষেত্র আরও প্রসারিত হবে।’    অধ্যাপক ইকবালের সংযোজন, ‘কাশ্মীর একসময় জ্ঞানচর্চার প্রধান কেন্দ্র ছিল। সেই ঐতিহ্যের সাক্ষ্য বহন করছে এই পাণ্ডুলিপিগুলি। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এগুলিকে সংরক্ষণ করা আমাদের দায়িত্ব।’

তবে এই প্রকল্পকে ঘিরে কিছু প্রশ্নও অগ্রাহ্য করা যায় না। ডিজিটাইজেশন নিঃসন্দেহে সংরক্ষণের আধুনিক উপায়কিন্তু তার সঙ্গে যুক্ত থাকে প্রযুক্তিগত পরিকাঠামোদীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ এবং উন্মুক্ত প্রবেশাধিকারের প্রশ্ন। পাণ্ডুলিপিগুলি কি কেবল গবেষণাগারের গণ্ডিতেই সীমাবদ্ধ থাকবেনাকি বৃহত্তর জনপরিসরে পৌঁছবেভাষাগত বাধা অতিক্রম করে এগুলিকে অনুবাদ ও ব্যাখ্যার মাধ্যমে সাধারণ পাঠকের নাগালে আনার উদ্যোগ কি নেওয়া হবেএ প্রশ্নগুলির উত্তরই প্রকল্পটির প্রকৃত সাফল্য নির্ধারণ করবে।  আরও একটি দিক উল্লেখযোগ্য। ইতিহাসের পুনরুদ্ধার কখনো নিরপেক্ষ প্রক্রিয়া নয়তা প্রায়শই সমকালীন রাজনীতির প্রেক্ষিতে পুনর্ব্যাখ্যাত হয়। অতএবএই পাণ্ডুলিপিগুলির সংরক্ষণ ও উপস্থাপনার ক্ষেত্রে বহুমাত্রিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রয়োজনযাতে কোনো একপাক্ষিক ব্যাখ্যা ইতিহাসের বহুস্বরতাকে আড়াল না করে।

তবু সমস্ত সংশয়ের মধ্যেও এই উদ্যোগের ইতিবাচক তাৎপর্য অস্বীকার করা যায় না। সংঘাতের সময়ে সংস্কৃতির দিকে ফিরে তাকানোঅতীতের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করা— এ এক প্রয়োজনীয় মানবিক প্রয়াস। যখন রাজনীতি বিভাজনের রেখা টানেতখন ইতিহাস ও সাহিত্যই প্রায়শই সেতুবন্ধনের কাজ করে। যুদ্ধের উত্তাপে যখন পশ্চিম এশিয়া অস্থিরতখন কাশ্মীরের এই উদ্যোগ বার্তা দেয়সংঘাতের মধ্যেও ইতিহাস ও সংস্কৃতির সেতুবন্ধন রক্ষাই শেষ পর্যন্ত মানবতার সবচেয়ে ড়ো আশ্রয়।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!