- এই মুহূর্তে দে । শ
- এপ্রিল ২৩, ২০২৬
ভোটের দিনেই কৃষ্ণনগর থেকে ‘পরিবর্তন’-এর ডাক, কমিশনের প্রশংসায় পঞ্চমুখ প্রধানমন্ত্রী মোদি
প্রথম দফার ভোটগ্রহণের দিনেই রাজ্যে এসে রাজনৈতিক পারদ আরও চড়ালেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। বৃহস্পতিবার দুপুরে নদিয়ার কৃষ্ণনগরের জনসভা থেকে যেমন নির্বাচন কমিশনের ভূয়সী প্রশংসা করলেন, তেমনই তৃণমূল সরকারের বিরুদ্ধে একের পর এক অভিযোগের তির ছুড়লেন তিনি। দিনের শুরুতেই নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী কৃষ্ণনগরের সভা, তার পর দক্ষিণ ২৪ পরগনার মথুরাপুরে দ্বিতীয় জনসভা এবং বিকেলে হাওড়ায় রোড শো, প্রথম দফার ভোটের দিনেই টানা প্রচারে ব্যস্ত প্রধানমন্ত্রী।
কৃষ্ণনগরের সভামঞ্চে দাঁড়িয়ে মোদির কণ্ঠে প্রথমেই ধ্বনিত হয় নির্বাচন কমিশনের প্রশংসা। তাঁর দাবি, গত ৫ দশকের মধ্যে এ বারই বাংলায় সবচেয়ে কম হিংসার মধ্যে ভোট হচ্ছে। ‘আমি ৫০ বছরের রাজনৈতিক জীবনে এমন নির্বাচন দেখিনি’—বলতে শোনা যায় তাঁকে। অতীতের নির্বাচনী হিংসার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, আগে খুনের ঘটনাকে আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠত। বর্তমান পরিস্থিতিকে তুলনায় ‘শান্তিপূর্ণ’ বলে উল্লেখ করে কমিশনকে অভিনন্দন জানান তিনি। একই সঙ্গে ভোটারদের উদ্দেশে তাঁর বার্তা, ‘গণতন্ত্রের এই উৎসব সবাইকে মিলেই পালন করতে হবে।’
ভোটের দিনে রাজ্যের সরকারি কর্মচারীদের ভূমিকাও বিশেষভাবে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘ওঁরা দায়িত্ব নিয়ে কাজ করছেন, সকলকে অভিনন্দন জানাই।’ একইসঙ্গে তিনি দাবি করেন, এ বারের ভোটদানের হার ইতিমধ্যেই বহু পুরনো রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে। এই বিপুল ভোটদানের প্রবণতাকে তিনি গণতন্ত্রের প্রতি মানুষের আস্থা হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। কৃষ্ণনগরের মঞ্চ থেকে ‘ভয়মুক্ত’ ভোটের প্রসঙ্গ তুলেও রাজনৈতিক বার্তা দেন মোদি। তাঁর বক্তব্য, ‘বাংলার মানুষ ভয় কাটিয়ে বেরিয়ে আসছেন। ভয় থেকে মুক্তি পেতেই তাঁরা ভোট দিচ্ছেন।’ রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে ঘুরে তিনি নাকি একটাই সুর শুনেছেন— পরিবর্তনের দাবি। সে সুরকে আরও জোরালো করে তিনি দাবি করেন, বহু জেলায় তৃণমূল ‘খাতাই খুলতে পারবে না’।
তৃণমূলের বিরুদ্ধে আক্রমণের ঝাঁজ আরও বাড়িয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, গত ১৫ বছরে তৃণমূলের সরকার উন্নয়নের বদলে ‘লুটপাটে’ বেশি মন দিয়েছে। তৃণমূলের লোক কেবল লুট করতে ব্যস্ত। তিনি আশ্বাস দেন, ক্ষমতায় এলে দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ‘‘অত্যাচারী ও দুর্নীতিবাজদের কোনও জায়গা হবে না। আইন অনুযায়ী সকলের বিচার হবে এবং লুটের টাকা ফেরত আনার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
এ দিনের সভায় আবারও উঠে আসে ‘ঝালমুড়ি’ প্রসঙ্গ। সম্প্রতি এই বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক তরজা চলছিল। সে প্রসঙ্গেই খানিক ব্যঙ্গের সুরে মোদী বলেন, ‘৪ মে বিজেপির বিজয়োৎসব হবে। মিষ্টি দেওয়া হবে, ঝালমুড়িও দেওয়া হবে। তবে আমি শুনেছি, ঝালমুড়ি কিছু লোককে জোর ধাক্কা দিয়েছে। ঝালমুড়ি আমি খেয়েছি, কিন্তু ঝাল লেগেছে তৃণমূলের।’ তাঁর এই মন্তব্যে সভামঞ্চে উপস্থিত কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে হাসির রোল ওঠে। নির্বাচনকে তিনি শুধুমাত্র রাজনৈতিক দলগুলোর লড়াই হিসেবে দেখছেন না বলেও স্পষ্ট করে দেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘এই ভোটে জনতা লড়ছে।’ ১৫ বছর আগে বামেদের বিরুদ্ধে জনতার ‘ফুঁ’ দেওয়ার প্রসঙ্গ টেনে এনে তিনি বলেন, এ বার তৃণমূলের ‘জঙ্গলরাজের’ বিরুদ্ধে মানুষ শঙ্খধ্বনি তুলেছে। তাঁর দাবি, সরকারি কর্মচারীরা ভয় কাটিয়ে ভোট দিচ্ছেন, চিকিৎসকেরা উন্নত স্বাস্থ্যব্যবস্থার জন্য ভোট দিচ্ছেন, আইনজীবীরা ন্যায় প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ভোট দিচ্ছেন, শিক্ষকরা ভয়মুক্ত শিক্ষাঙ্গনের দাবিতে ভোট দিচ্ছেন এবং পুলিশও জনতার সেবার উদ্দেশ্যে ভোটে অংশ নিচ্ছে।
অনুপ্রবেশের ইস্যুতেও এদিন সরব হন মোদি। তাঁর অভিযোগ, রাজ্যে অনুপ্রবেশ সবচেয়ে বড়ো সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে, এ বিষয়ে সমাধান করতে তৃণমূল সরকার ব্যর্থ। সীমান্ত সুরক্ষার প্রশ্নে তিনি বলেন, পুলিশ, সেনা, বিএসএফ এবং সাধারণ মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টাতেই প্রকৃত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব। সেই সঙ্গেই তাঁর প্রতিশ্রুতি, ‘৪ মে-র পর সুরক্ষার নতুন গ্যারান্টি শুরু হবে।’ পাশাপাশি, মতুয়া সম্প্রদায়ের উদ্দেশে বিশেষ বার্তা দিতে ভোলেননি প্রধানমন্ত্রী। তাঁদের আশ্বস্ত করে তিনি বলেন, ‘তৃণমূলকে ভয় পাওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। আপনাদের গায়ে কেউ হাত লাগাতে পারবে না।’ একই সঙ্গে নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (সিএএ) কার্যকর করার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করে তিনি জানান, বিজেপি সরকার গঠিত হলে নাগরিকত্ব দেওয়ার প্রক্রিয়া আরও দ্রুত হবে।
মহিলা সংরক্ষণ বিল নিয়েও সরব হন মোদি। তাঁর অভিযোগ, সংসদে বিল আটকে দেওয়ার ক্ষেত্রে তৃণমূল ও কংগ্রেসের ভূমিকা রয়েছে। পাশাপাশি মহিলাদের নিরাপত্তা ও আর্থিক সুরক্ষার লক্ষ্যে প্রতিশ্রুতি দেন, বিজেপি সরকার রাজ্যের ক্ষমতায় এলে প্রতি ব্লকে মহিলা থানা গঠন, রাস্তায় নিরাপত্তা বাড়ানো, পুলিশে মহিলাদের সংখ্যা বৃদ্ধি, এবং ‘মাতৃশক্তি ভরসা কার্ড’-এর মাধ্যমে বছরে ৩৬ হাজার টাকা আর্থিক সহায়তা করা হবে। শিশু লালনপালন ও মেয়েদের উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রেও অতিরিক্ত আর্থিক সাহায্যের আশ্বাস দেন তিনি। ডাক দেন, ‘ডবল ইঞ্জিন সরকার’ গঠনের। তাঁর দাবি, কেন্দ্র ও রাজ্যে একই দলের সরকার থাকলে উন্নয়ন দ্বিগুণ গতিতে এগোবে। সে কারণেই বিজেপি প্রার্থীদের জয়ী করার আহ্বান জানান তিনি। প্রথম দফার ভোটের অর্ধেক দিন কাটতে না কাটতেই আত্মবিশ্বাসী সুরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বাংলা থেকে ভয় পালাচ্ছে, ভরসা দৃঢ় হচ্ছে।’ তাঁর দাবি, ভোটদানের প্রবণতাই ইঙ্গিত দিচ্ছে যে ফলাফলেও বিজেপি বড়ো ব্যবধানে জিততে চলেছে। উত্তর থেকে দক্ষিণ, সর্বত্রই তিনি ‘পরিবর্তনের ঝড়’ দেখতে পাচ্ছেন।
❤ Support Us







