- এই মুহূর্তে বি। দে । শ
- এপ্রিল ২২, ২০২৬
ছাত্ররাজনীতিতে নিষেধাজ্ঞা, দুর্নীতি, ভারতীয় পণ্যে কড়া শুল্ক । শাহ সরকারের বিরুদ্ধে ফুঁসছে নেপাল। পদত্যাগ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর
ক্ষমতায় আসার এক মাসও পূর্ণ হয়নি। অথচ তার আগেই বহুমুখী সঙ্কটে জর্জরিত নেপালের প্রধানমন্ত্রী বলেন শাহের সরকার। দুর্নীতি বিরোধী, কর্মসংস্থানের প্রশ্নে শুরু হওয়া যে ‘জেন জি’ আন্দোলনের উপর ভিত্তি করে বদলে গেছিল নেপালের রাজনৈতিক সমীকরণ, সেই আন্দোলনের উপর দাঁড়িয়ে যে প্রশাসন বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল, সেই সরকারকেই এখন রাস্তায় নেমে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছেন সাধারণ মানুষ, ছাত্রছাত্রী, রাজনৈতিক কর্মী থেকে নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা। কাঠমান্ডু থেকে বিরগঞ্জ, এমনকি দেশের প্রশাসনিক হৃদপিণ্ড সিংহ দরবার চত্বরেও বিক্ষোভের ঢেউ আছড়ে পড়েছে।
জনরোষের কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে একাধিক ইস্যু, যার মধ্যে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ভারত-নেপাল সীমান্ত বাণিজ্য সংক্রান্ত শুল্কনীতির কড়াকড়ি। বহু দশক ধরে কার্যত উন্মুক্ত এই সীমান্তে মানুষের যাতায়াত ও পণ্য আনা-নেওয়া ছিল দৈনন্দিন জীবনের অঙ্গ। নেপালের সীমান্তবর্তী অঞ্চলের বাসিন্দারা নিয়মিত ভারতীয় বাজার থেকে সস্তায় নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী; খাদ্যদ্রব্য, ওষুধ, পোশাক, গৃহস্থালির সরঞ্জাম এমনকি বিয়ে বা উৎসবের প্রয়োজনীয় জিনিসও কিনে আনতেন। এই প্রথার উপর ভর করেই গড়ে উঠেছিল এক বিশেষ অর্থনৈতিক কাঠামো, যার সঙ্গে জড়িয়ে ছিল হাজার হাজার মানুষের জীবন-জীবিকা।
কিন্তু বলেন শাহ সরকারের নতুন নিয়মে সেই চিরাচরিত ব্যবস্থাই এখন সংকটে। সরকারের নির্দেশ অনুযায়ী, ১০০ নেপালি রুপির বেশি মূল্যের কোনো পণ্য ভারত থেকে আনলেই শুল্ক দিতে হবে, যার হার ৫ শতাংশ থেকে সর্বোচ্চ ৮০ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছতে পারে। নতুন নীতিতে ক্ষোভে ফুঁসছে সাধারণ মানুষ, বিশেষত সীমান্তবর্তী এলাকার বাসিন্দারা। ইতিমধ্যেই সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একাধিক ভিডিওতে দেখা গিয়েছে, ভারত থেকে কেনা পণ্য নিয়ে ফেরার সময় নেপালের নাগরিকদের সঙ্গে নিরাপত্তা ও কাস্টমস কর্মীদের তীব্র বাকবিতণ্ডা হচ্ছে।
এ সিদ্ধান্তে নেপালের সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতায় বড়ো ধাক্কা লাগবার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। প্রতিবাদীদের দাবি, এতে বাজারে দ্রব্যমূল্য আরও বাড়বে এবং সীমান্তবর্তী অঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রা বিপর্যস্ত হবে। এক বিক্ষোভকারীর বলেছেন, জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত নানান আচার-অনুষ্ঠানের জন্য প্রয়োজনীয় জিনিস ভারত থেকেই আসে, এমনকি কৃষিকাজের সারও অনেক সময় সেখান থেকেই সংগ্রহ করতে হয়। এই পরিস্থিতিতে শুল্ক আরোপকে তিনি ‘অঘোষিত অবরোধ’-এর সঙ্গে তুলনা করেছেন। ক্ষুব্ধ ব্যবসায়ী মহলের আশঙ্কা, এই নীতি কার্যকর হলে দীর্ঘদিনের অনানুষ্ঠানিক বাণিজ্য ব্যবস্থা ভেঙে পড়বে এবং স্থানীয় অর্থনীতিতে ধাক্কা লাগবে। ইতিমধ্যেই সীমান্তবর্তী বাজারগুলিতে ক্রেতার সংখ্যা কমতে শুরু করেছে বলে খবর।
শুধু সীমান্তেই নয়, রাজধানী কাঠমান্ডু-সহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। রাষ্ট্রীয় একতা দলের চেয়ারম্যান বিনয় যাদব নয়া পদক্ষেপকে ১৯৫০ সালের ‘ভারত-নেপাল শান্তি ও মিত্র চুক্তি ১৯৫০’-এর পরিপন্থী বলে দাবি করেছেন। তাঁর বক্তব্য, গৃহস্থালির প্রয়োজনীয় পণ্যের উপর থেকে অবিলম্বে শুল্ক প্রত্যাহার করা উচিত। নেপালি কংগ্রেসও ইতিমধ্যেই শুল্কনীতিকে ‘জনবিরোধী’ ও ‘সংবেদনহীন’ বলে আখ্যা দিয়ে প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে। এমনকি শাসক দল রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতা পার্টির অন্দর থেকেও সমালোচনার সুর উঠেছে। দলেরই নেতা রাজীব ঝা এই সিদ্ধান্তকে ‘অবাস্তব’ বলে মন্তব্য করে দ্রুত পুনর্বিবেচনার দাবি জানিয়েছেন। যদিও, এই শুল্কনীতি যে সম্পূর্ণ নতুন, তা নয়। অতীতেও এর অস্তিত্ব ছিল, কিন্তু এতদিন তা শিথিলভাবেই প্রয়োগ করা হতো। অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে সীমান্ত এলাকায় বসবাসকারী মানুষজন নিয়মিত ভারতীয় বাজারে গিয়ে পণ্য কেনাকাটা করায় নেপালের স্থানীয় ব্যবসায়ী ও সরকারি রাজস্ব ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছিল। সে প্রেক্ষিতেই নতুন করে এ নিয়ম কঠোরভাবে কার্যকর করার সিদ্ধান্ত নেয় সরকার।
মসনদে বসেই একাধিক সংস্কারমূলক পদক্ষেপ নিয়েছেন বলেন শাহ। পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পরীক্ষাব্যবস্থা তুলে দিয়ে বিকল্প মূল্যায়ন চালু, স্কুলের ‘পশ্চিমী’ নাম বদলে স্থানীয় নামকরণ, ছাত্র সংগঠনে নিষেধাজ্ঞা, মন্ত্রী-সরকারি কর্মচারীদের সন্তানদের সরকারি স্কুলে পড়ার বাধ্যবাধকতা, সরকারি কর্মীদের পাক্ষিক বেতন চালু, দীর্ঘদিন নিষ্ক্রিয় ব্যাংক আমানত রাষ্ট্রীয় কোষাগারে স্থানান্তর, ‘ভিআইপি সংস্কৃতি’ বন্ধ করা এবং আর্থিকভাবে দুর্বলদের জন্য হাসপাতালে ১০% শয্যা সংরক্ষণের মতো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। সামাজিক ন্যায়বিচারের ক্ষেত্রে ‘জেন-জি’ আন্দোলনে নিহত পড়ুয়াদের পরিবারকে সরকারি চাকরি দেওয়ার সিদ্ধান্তও নিয়েছেন শাহ। একইসঙ্গে ‘জেন জি’ আন্দোলনের দমন-পীড়নের অভিযোগে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী কে পি ওলি-সহ কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
বর্তমান অস্থিরতার পরিস্থিতিতে ঘৃতাহুতি দিয়েছে এই ছাত্র সংগঠনে নিষেধাজ্ঞা সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত। সরকারের ১০০ দফা কর্মসূচির অংশ হিসেবে রাজনৈতিকভাবে যুক্ত ছাত্র সংগঠনগুলিকে তুলে দেওয়ার পরিকল্পনা ঘোষণা হতেই ক্ষোভ ছড়ায় শিক্ষাঙ্গনে। বিকল্প হিসেবে ‘স্টুডেন্ট কাউন্সিল’ গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হলেও তা মানতে নারাজ ছাত্রনেতাদের একাংশ।তাঁদের অভিযোগ, ‘আলোচনার পথ এড়িয়ে সরকার একতরফা সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিচ্ছে।’ তারই প্রতিবাদে রাস্তায় নেমেছেন হাজার হাজার ছাত্রছাত্রী। ‘অল নেপাল ন্যাশনাল ফ্রি স্টুডেন্টস ইউনিয়ন’-এর সভাপতি দীপক ধামির বক্তব্য, ‘সরকার সংবিধানপ্রদত্ত অধিকার কেড়ে নিতে চাইছে। নেপালের ছাত্র আন্দোলনের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। গণতন্ত্র রক্ষায় তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। ফলে এই সিদ্ধান্ত অপরিণত ও অচিন্তিত। প্রয়োজনে আমরা রাস্তায় নামব।’
তবে ভিন্ন মতও রয়েছে। নেপালের সংবিধান বিশেষজ্ঞ চন্দ্রকান্ত গিয়াওয়ালির মতে, সরকার ছাত্র সংগঠন পুরোপুরি নিষিদ্ধ করেনি, বরং কেবল রাজনৈতিক দল-সংযুক্ত সংগঠনগুলিকে ভেঙে দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে, যা সংবিধানবিরোধী নয়। এমনকি ছাত্র সংগঠনের অন্দর থেকেও কিছু আত্মসমালোচনার সুর শোনা গিয়েছে। কমিউনিস্ট ঘরানার ছাত্রনেতা বিজয় সাপকোটার কথায়, ‘আমাদের স্বীকার করতে হবে যে, সাম্প্রতিক সময়ে ছাত্র সংগঠনগুলি আদর্শভাবে কাজ করেনি। কিন্তু সেই কারণ দেখিয়ে পুরো সংগঠন ভেঙে দেওয়া সমাধান হতে পারে না।’
সরকারবিরোধী ক্ষোভ আরও ঘনীভূত হয়েছে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সুদান গুরুংকে ঘিরে ওঠা আর্থিক অনিয়মের অভিযোগে।তাঁর বিরুদ্ধে অসামঞ্জস্যপূর্ণ সম্পত্তি এবং সন্দেহজনক আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে তাঁর কিছু বিতর্কিত ব্যবসায়িক যোগসূত্রের ইঙ্গিত মিলেছে, যা নিয়ে সরব হয়েছে বিরোধী দল ও নাগরিক সমাজ। চাপে পরে, বুধবার পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন নেপালের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। সব মিলিয়ে, ক্ষমতায় আসার এক মাস পূর্ণ হওয়ার আগেই কার্যত অগ্নিপরীক্ষার মুখে পড়েছে বলেন শাহ। অর্থনৈতিক বাস্তবতা, শিক্ষাঙ্গনের গণতন্ত্র এবং প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, তিন ক্ষেত্রেই জমাট বাঁধছে তীব্র জনরোষ। অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, এ ধরনের জনঅসন্তোষ যদি আরও তীব্র হয়, তবে তা নেপালের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার উপরও বড়োসড়ো প্রভাব ফেলতে পারে, যেমনটা সাম্প্রতিক সময়ে কে পি ওলির সরকারের ক্ষেত্রেও দেখা গিয়েছিল।
❤ Support Us







