- এই মুহূর্তে দে । শ
- এপ্রিল ২২, ২০২৬
ভোটের মুখে কবি শ্রীজাত-র বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা, প্রতিবাদে সরব নাগরিক মহল । কী বলছে কমিশন ?
ভোট একেবারে দোরগোড়ায়, রাজ্যের রাজনৈতিক আবহ যখন ক্রমশ উত্তপ্ত, ঠিক সেই সময়েই নতুন বিতর্কের কেন্দ্রে কবি শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায়। কৃষ্ণনগর আদালতের নির্দেশে তাঁর বিরুদ্ধে জারি হয়েছে গ্রেফতারি পরোয়ানা, আর তা ঘিরেই সাহিত্যমহলে ছড়িয়ে পড়েছে তীব্র চাঞ্চল্য, প্রশ্ন, প্রতিবাদ এবং পাল্টা রাজনৈতিক তর্ক।
আদালত সূত্রে জানা গিয়েছে, বহু বছরের পুরনো একটি মামলায় তলব পাওয়া সত্ত্বেও হাজির না হওয়ায় এই পদক্ষেপ। এসিজেএম অশোক হালদার এই পরোয়ানা জারি করেছেন। অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছে ‘অভিশাপ’ নামের একটি কবিতা, যা নাকি হিন্দু ধর্মাবেগে আঘাত করেছে— এমনই দাবি তুলে মামলাটি করেছিলেন আইনজীবী রমিত শীল। পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য হয়েছে আগামী ১১ জুন। আইনি পদক্ষেপের খবর প্রথমে সংবাদমাধ্যম মারফতই জানতে পারেন কবি নিজে। বুধবার সকালে তিনি জানান, ‘ঠিক কী হয়েছে, কোন মামলা, কিছুই স্পষ্ট জানি না। আইনজীবীর কাছ থেকে শুনেছি একটি গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হতে পারে। শুনছি, ৯ বছর আগের একটি কবিতা না কি গণতান্ত্রিক পরিসরের জন্য বিপজ্জনক বলে বিবেচিত হয়েছে। তাই ভোটের আগে গ্রেফতার করা জরুরি হয়ে পড়েছে। ২০২৬ সালে কবিতা লেখার জন্য গ্রেফতারি পরোয়ানা, এ নিয়ে আমার সত্যিই কিছু বলার নেই।’ আবার অন্য এক প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেন, বিষয়টি সম্পর্কে বিস্তারিত না জেনে তড়িঘড়ি মন্তব্য করতে চান না, আগে আইনজীবীর সঙ্গে কথা বলতে চান।
ঘটনার পটভূমিতে উঠে আসছে নির্বাচন কমিশনের কড়াকড়ি। আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনের আগে কমিশন নির্দেশ দিয়েছিল, রাজ্যের সমস্ত পুরনো ও অসম্পূর্ণ মামলাগুলিকে দ্রুত নিষ্পত্তির পথে আনতে হবে এবং অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রশাসনিক সূত্রের দাবি, সে নির্দেশ কার্যকর করতেই পুরনো ফাইল খুলে দেখা হচ্ছে, আর ওই সূত্রেই সামনে এসেছে শ্রীজাতের বিরুদ্ধে মামলাটি। কমিশনের যুক্তি, অবাধ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন নিশ্চিত করতে এমন ‘সতর্কতামূলক’ ব্যবস্থা জরুরি, বিশেষ করে যদি কোনো ব্যক্তির বক্তব্য বা উপস্থিতি থেকে উত্তেজনা ছড়ানোর আশঙ্কা থাকে।
তবে প্রশ্ন উঠছে সময় নিয়ে। ভোটের ঠিক আগের দিন, একজন প্রতিষ্ঠিত কবির বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির ঘটনাকে ‘নজিরবিহীন’ বলেই মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল। ইতিমধ্যেই বিষয়টি ঘিরে শুরু হয়েছে তীব্র রাজনৈতিক চাপানউতর। তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষ থেকে অভিযোগ তোলা হয়েছে, বাংলার কৃষ্টি ও সংস্কৃতির উপর আঘাত হানার চেষ্টা চলছে। এর নেপথ্যে বিরোধী শক্তির প্ররোচনা থাকতে পারে। দলের নেতা জয়প্রকাশ মজুমদার অভিযোগ করেন, “বিজেপি বাংলার কৃষ্টি ও সংস্কৃতির উপর আঘাত হানতে চাইছে। তাদের প্ররোচনাতেই এই ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। আমরা এর তীব্র নিন্দা করছি।’ অন্যদিকে বিজেপি এ অভিযোগ সম্পূর্ণ উড়িয়ে দিয়েছে। বিজেপি নেতা দেবজিৎ সরকার বলেন, ‘নির্দেশ দিয়েছে আদালত। এখানে বিজেপির কোনো ভূমিকা নেই। তৃণমূল নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থে বিষয়টিকে অন্য দিকে ঘোরানোর চেষ্টা করছে।’ তাঁর দাবি, নির্বাচনের আগে সম্ভাব্য পরাজয়ের আশঙ্কায় শাসকদল জনমত প্রভাবিত করতে এই ইস্যুতে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে।
রাজনীতির বাইরে, সাহিত্যিক ও বুদ্ধিজীবী মহলেও প্রতিক্রিয়া কম তীব্র নয়। কবি অংশুমান কর সরাসরি বলেছেন, ‘একজন কবিকে যদি কবিতা লেখার জন্য জেলে যেতে হয়, তা হলে বলতে হয় সমাজে ফ্যাসিবাদের আগমন ঘটেছে।’ তাঁর আরও প্রশ্ন, বহু উস্কানিমূলক মন্তব্য করেও রাজনৈতিক নেতারা যখন মুক্ত, তখন এত বছর আগের একটি কবিতার মামলা ভোটের মুখে হঠাৎ সক্রিয় হয়ে ওঠার অর্থ কী? প্রবীণ সাহিত্যিকদের একাংশ একই সুরে প্রশ্ন তুলেছেন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পরিসর কি ক্রমশ সঙ্কুচিত হচ্ছে? প্রবীণ সাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় এবং বিনোদ ঘোষাল–সহ অন্যান্যদের প্রতিক্রিয়ায়ও একই উদ্বেগের সুর শোনা গিয়েছে। তাঁদের বক্তব্যের নির্যাস, একজন কবি বা সাহিত্যিকের সঙ্গে এভাবে আচরণ করা যায় কীভাবে? মতপ্রকাশের স্বাধীনতার উপর এ ধরনের পদক্ষেপ বড়ো ধরণের প্রশ্নচিহ্ন তুলে দিচ্ছে।
ঘটনার সূত্রপাত ফিরে যায় ২০১৭ সালের ১৯ মার্চে। সেদিন সামাজিক মাধ্যমে ‘অভিশাপ’ কবিতাটি পোস্ট করেছিলেন শ্রীজাত। উত্তরপ্রদেশে বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল এবং যোগী আদিত্যনাথ-এর মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে অভিষেকের প্রেক্ষিতে লেখা ওই কবিতার কয়েকটি লাইন ঘিরেই শুরু হয় বিতর্ক। অভিযোগ ওঠে, কবিতার ভাষা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করেছে। শিলিগুড়ির সাইবার ক্রাইম থানায় সেই সময় অভিযোগও দায়ের হয়। অভিযোগকারী হিসেবে উঠে আসে এক কলেজ ছাত্রের নাম, যিনি ‘হিন্দু সংহতি’ নামের একটি সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত বলে স্থানীয় সূত্রে দাবি। তবে দীর্ঘ সময় ধরে মামলাটি কার্যত নিষ্ক্রিয় ছিল। কেন এত বছর পরে, তাও নির্বাচনের ঠিক আগে পুরনো মামলার এমন গতিবেগ, সে প্রশ্নই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে সর্বত্র। সাধারণ মানুষের মধ্যেও তৈরি হয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া, কেউ এটিকে আইনের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া বলছেন, আবার অনেকেই দেখছেন মতপ্রকাশের স্বাধীনতার উপর চাপ হিসেবে।
যদিও নির্বাচন কমিশনের তরফে বলা হয়েছে, শ্রীজাতর বিরুদ্ধে কোনো গ্রেফতারি পরোয়োনা জারি হয়নি ।
❤ Support Us







