- দে । শ
- এপ্রিল ২৪, ২০২৬
মণিপুর-মিজোরাম থেকে ‘প্রতিশ্রুত ভূমি’: বেনে মেনাশেদের নিয়ে ইজরায়েলের নীরব অভিযান
পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত, কূটনৈতিক উত্তাপ আর যুদ্ধবিরতির টানাপোড়েনের আবহে, ভারতের উত্তর-পূর্বের পাহাড়ি জনপদ থেকে একেবারে অন্যরকম অভিযান চালিয়ে চলেছে ইজরায়েল। প্রচারের আলো থেকে খানিক দূরে, প্রায় নিঃশব্দে শুরু হয়েছে ‘অপারেশন উইংস অব ডন’। সে অভিযানের প্রথম ধাপে, বৃহস্পতিবার প্রায় ২৫০ জন ইহুদি বেনে মেনাশে সম্প্রদায়ের সদস্যকে দিল্লি হয়ে তেল আভিভে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
গত বছর ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু এই পরিকল্পনার ঘোষণা করেছিলেন। তিনি জানিয়েছিলেন, ভারতের মণিপুর ও মিজোরামে বসবাসকারী ‘হারানো গোত্র’ বেনে মেনাশে সম্প্রদায়ের ৫ হাজার সদস্যকে ধাপে ধাপে ইজরায়েলে নিয়ে আসা হবে। ইতিমধ্যেই গত দুই দশকে প্রায় সমসংখ্যক মানুষ সেখানে পাড়ি জমিয়েছেন। ইজরায়েলের অভিবাসন মন্ত্রী অফির সোফার জানিয়েছেন, ‘এটি কেবল সূচনা। প্রতি বছর প্রায় ১,২০০ জনকে নিয়ে গিয়ে পুরো সম্প্রদায়কে স্থানান্তরের পরিকল্পনা রয়েছে।’
বেনে মেনাশে— এই নামের মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে বহু শতাব্দীর ইতিহাস। ইহুদি ধর্মগ্রন্থ অনুযায়ী, প্রাচীন ইজরায়েল ১২টি গোত্রে বিভক্ত ছিল, যার একটি ছিল ‘মেনাশে’। খ্রিস্টপূর্ব ৭২২ সালে আসিরীয়দের হাতে উত্তর ইসরায়েল রাজ্যের পতনের পর গোত্রগুলি নির্বাসিত হয় বেনে মেনাশে সম্প্রদায় নিজেদের সেই ‘হারানো দশ গোত্র’-এর অন্যতম বলে দাবি করে। তাদের কথিত ইতিহাসে রয়েছে এক দীর্ঘ পরিযান— পারস্য, আফগানিস্তান, তিব্বত, চিন হয়ে অবশেষে ভারতের উত্তর-পূর্বে আগমন। বর্তমানে মণিপুর ও মিজোরামের পাহাড়ি অঞ্চলে প্রায় ১০,০০০ মানুষের বসতি। স্থানীয় ভাবে তারা কুকি জনজাতির অংশ হিসেবেই পরিচিত। যদিও কুকিদের অধিকাংশই খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত, বনে মেনাশে সম্প্রদায় নিজেদের ইহুদি ধর্মাচারে অটল রেখেছে।
এই স্থানান্তরের মূল চালিকাশক্তি ধর্মীয় পরিচয়। দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলে ইহুদি ধর্মাচার পালনে নানা অসুবিধার কথা জানিয়েছেন সম্প্রদায়ের সদস্যরা। প্রার্থনার জন্য প্রয়োজনীয় ‘মিনিয়ান’ অর্থাৎ দশ জন প্রাপ্তবয়স্ক ইহুদির সমাবেশ অনেক ক্ষেত্রেই সম্ভব হয় না। কোশের খাদ্য বা উপযুক্ত উপাসনালয়ের অভাবও বড়ো সমস্যা। ফলে বহুদিন ধরেই ইজরায়েলে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা লালন করছেন তাঁরা। ইতিমধ্যেই অনেকেই হিব্রু ভাষা শেখার চেষ্টা শুরু করেছেন। নেতানিয়াহু সরকার এ উদ্যোগকে ‘জায়নিস্ট আদর্শের’ অংশ বলেই চিহ্নিত করেছে। তবে, বিপুল এই মানবস্থানান্তরের পেছনে কেবল ধর্মীয় আবেগই কাজ করছে, এমনটা মনে করা কঠিন।
বিশ্লেষকদের মতে, এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে কৌশলগত ও অর্থনৈতিক বাস্তবতাও। ২০২৩ সালে হামাসের হামলার পর শুরু হওয়া দীর্ঘ সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে ইজরায়েল। এরপরও ইরান-লেবানন সহ একাধিক দেশের সাথে এই মুহুর্তে সংঘাত চলছে। যুদ্ধ পরিস্থিতির ফলে দেশের শ্রমবাজারে ব্যাপক প্রভাব পড়ে। বহু মানুষ সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ায় শ্রমশক্তি কমে যায়, পাশাপাশি, ভারত, নেপাল ও থাইল্যান্ডের মতো দেশ থেকে আসা অভিবাসী শ্রমিকদের সংখ্যা হ্রাস পায়। এখানেই শেষ নয়, পুনর্বাসন পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত রয়েছে জনসংখ্যাগত ও কৌশলগত দিকও। নতুন আগতদের উত্তর ইজরায়েলের গ্যালিলি অঞ্চলে বসানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে— যেখানে আরব-ইহুদি জনসংখ্যার ভারসাম্য রক্ষার বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে। ফলে এ উদ্যোগকে অনেকেই বৃহত্তর রাষ্ট্রনৈতিক কৌশলের অংশ হিসেবে দেখছেন।
এই প্রেক্ষাপটে বেনে মেনাশে সম্প্রদায়ের মানুষদের পুনর্বাসন শ্রমঘাটতি পূরণে সহায়ক হতে পারে। ইতিমধ্যেই ইজরায়েলে বসবাসকারী এই সম্প্রদায়ের সদস্যদের অনেকেই নির্মাণ, পরিবহণ ও উৎপাদন খাতে কাজ করছেন। তাদের আয়ের পার্থক্যও বিস্ময়কর— মণিপুরে যেখানে বছরে গড়ে ১,২০০ ডলার আয়, সেখানে ইজরায়েলে তা বেড়ে দাঁড়াচ্ছে প্রায় ৫৫,০০০ ডলারে। অর্থনৈতিক উন্নতির এ সম্ভাবনাও অনেকের কাছে তীব্র আকর্ষণ হয়ে উঠেছে। তবে এ যাত্রা নিছক স্বপ্নপূরণের গল্প নয়, এর মধ্যে রয়েছে তীব্র বৈপরীত্যও। মণিপুরে মেইতেই ও কুকি সম্প্রদায়ের সংঘর্ষ, ইতিমধ্যেই বহু মানুষের জীবন ও জীবিকাকে বিপর্যস্ত করেছে। এই অস্থিরতা অনেককেই ইজরায়েলে যাওয়ার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। কিন্তু যে দেশে তারা যাচ্ছেন, সেখানেও সংঘাতের আবহে। গাজায় যুদ্ধ, লেবানন সীমান্তে হিজবুল্লাহর সঙ্গে উত্তেজনা, সব মিলিয়ে পরিস্থিতি সেখানেও শান্ত নয়। অর্থাৎ, এক সংঘাতপীড়িত অঞ্চল থেকে আরেক সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে যাত্রা।
পাশাপাশি, ইজরায়েলে পৌঁছে নতুন জীবন শুরু করাও সহজ নয়। আগে যাঁরা সেখানে গিয়েছেন, তাঁদের অভিজ্ঞতা মিশ্র। প্রযুক্তিনির্ভর উন্নত সমাজে মানিয়ে নেওয়ার চ্যালেঞ্জ যেমন রয়েছে, তেমনই রয়েছে সামাজিক সমস্যাও। বর্ণবিদ্বেষের অভিযোগ উঠে এসেছে বারবার, চেহারাগত কারণে অনেক সময় তাঁদের ‘চিনা’ বলে কটাক্ষ করা হয়। অর্থনৈতিক টানাপোড়েন ও সাংস্কৃতিক মানিয়ে নেওয়ার সমস্যাও কম নয়। তার পরেও, মিজোরাম-মণিপুরের বেনে মেনাশে সম্প্রদায়ের এই দীর্ঘ যাত্রার প্রতি আকর্ষণ অটুট। অনেকের বিশ্বাস, এটি অভিবাসন নয়, নিজেদের ঐতিহাসিক শিকড়ে ফিরে যাওয়ার এক অনিবার্য পথ। এক সম্প্রদায় সদস্যের কথায়, ‘ভারত আমাদের জন্মভূমি, কিন্তু ইজরায়েল আমাদের নিয়তি, আমাদের প্রতিশ্রুত ভূমি।’
তেল আভিভ জানিয়েছে, ২০৩০ সালের মধ্যে ‘অপারেশন উইংস অব ডন’-এর মাধ্যমে ভারতের উত্তর-পূর্বে বসবাসকারী প্রায় ৬,০০০ সদস্যকে ধাপে ধাপে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্য রয়েছে। ইতিমধ্যেই নফ হা-গালিল ও কিরিয়াত ইয়ামের মতো অঞ্চলে তাদের জন্য আবাসন ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। সরকারি দফতর, আন্তর্জাতিক ইহুদি সংগঠন এবং নানা স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার যৌথ উদ্যোগে এই প্রকল্প এগোচ্ছে। নতুন আগতদের জন্য ভাষা, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থাও করা হচ্ছে।
❤ Support Us





