- দে । শ প্রচ্ছদ রচনা
- এপ্রিল ২৪, ২০২৬
‘বিশ্ববিদ্যালয়ে দেশবিরোধী চর্চা, পড়াশোনা হয় না’— ভোটপ্রচারে এসে যাদবপুর নিয়ে টিপ্পনি প্রধানমন্ত্রীর । ‘প্রতিবাদ গণতন্ত্রের অঙ্গ’, পাল্টা মন্তব্য মুখ্যমন্ত্রীর
পশ্চিমবঙ্গে বাম রাজনীতির অন্যতম পীঠস্থান বলে পরিচিত যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়। সত্তরের দশক থেকেই জাতীয় রাজনীতির আঙিনায় শাসক-বিরোধী ভূমিকায় বারবার সক্রিয়ভাবে থাকতে দেখা গেছে যাদবপুরের পড়ুয়াদের। দক্ষিণপন্থী রাজনীতির ধারাকে যুক্তিতক্কে বিঁধেছে বারবার। তা হোক নকশাল আন্দোলন বা এমার্জেন্সীর সময়, এমনকি সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম আন্দোলনে বামফ্রন্ট সরকারের বিরুদ্ধেও সরব ছিল এই বিশ্ববিদ্যালয়। প্রায়ই এ ক্যাম্পাসে স্লোগান উঠতে দেখা যায়, ‘যাদবপুরের দেওয়ালে দেওয়ালে ব্রিদ্রোহ লেখা আছে।’ ছাত্রদের মতে এ বিদ্রোহ সমাজের বৈষম্যের বিরুদ্ধে, শাসনের অপ্রয়োগের বিরুদ্ধে, সাম্যের পক্ষে। কিন্তু দর্শন যাইহোক, যাদবপুরকে ঘিরে বিতর্কের শেষ নেই। বিজেপি তো বটেই রাজ্যের ক্ষমতাসীন তৃণমূলও বারবার নানা ইস্যুতে নিশানা করেছে যদু-পড়ুয়াদের। এ বার, সরাসরি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নিশানায় দেশের অন্যতম ‘শ্রেষ্ঠ’ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।
রাজ্যে এখন ভোটের মরশুম। রাজনৈতিক তাপমাত্রার পারদ ক্রমশ চড়ছে। রাজনৈতিক দলগুলি একে অপরকে এক ইঞ্চি জমি ছেড়ে দিতে নারাজ। তপ্ত বাক বিনিময় এখন প্রতিদিনের স্বাভাবিক ঘটনা। দফার ভোট মিটতেই দ্বিতীয় দফার প্রচারে গতি আনতে শুক্রবার দক্ষিণ ২৪ পরগনার বারুইপুরে শুক্রবার জনসভা করেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। আর সেই সভামঞ্চ থেকেই রাজ্যের শাসকদলকে আক্রমণের পাশাপাশি তিনি টেনে আনেন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় প্রসঙ্গ। অভিযোগ তোলেন, একসময়ের গর্বের এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আজ ‘অরাজকতা’র কবলে, দেশবিরোধী চর্চার অন্যতম জায়গা।
ফলে, প্রধানমন্ত্রীর সকালের গঙ্গাবিহারের নরম আবহ দ্রুত মিলিয়ে গিয়েছে রাজনৈতিক উত্তাপে। বারুইপুরের টংতলা মাঠে দাঁড়িয়ে প্রধানমন্ত্রী দাবি করেছেন, যাদবপুরের ক্যাম্পাসে আজ ‘ভয় ও হুমকি’র পরিবেশ। দেওয়ালজুড়ে দেশবিরোধী স্লোগান, পড়াশোনার পরিবর্তে আন্দোলনে নামতে বাধ্য করা হচ্ছে ছাত্রছাত্রীদের। এমনই চিত্র তুলে ধরেন তিনি বলেন, ‘জাতীয়তাবাদের দর্শনে তৈরি এই বিশ্ববিদ্যালয় একসময় বিশ্বজুড়ে সম্মান পেত। আজ সে পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। আমরা অরাজকতা নয়, শিক্ষার পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে চাই।’
এ মন্তব্যেই যেন মূহূর্তেই আগুনে ঘি পড়ে। প্রতিক্রিয়ায় সরব হন যাদবপুরের পড়ুয়া থেকে শিক্ষকরা। তাঁরা বলছেন, যেহেতু ছাত্রছাত্রীরা বিজেপির ফ্যাসিবাদী চরিত্র, সাম্প্রদায়িক রাজনীতি, সরকার চালাতে অপদার্থতার যুক্তিসঙ্গত সমালোচনা করে, তাই এভাবে নিশানা করা হচ্ছে। দ্রুত প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জিও। সমাজমাধ্যমে তিনি প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যকে ‘বাংলার অপমান’ বলে আখ্যা দেন। তাঁর স্পষ্ট বক্তব্য, ‘প্রশ্ন করা অরাজকতা নয়। যাদবপুরের ছাত্রছাত্রীরা মেধার জোরে নিজেদের জায়গা করে নেয়। তাঁদের প্রতিবাদ গণতন্ত্রের অঙ্গ।’ মুখ্যমন্ত্রী আরও মনে করিয়ে দেন, কেন্দ্রেরই নির্ধারিত এনআইআরএফ র্যাঙ্কিংয়ে প্রতি বছর দেশের সেরা প্রতিষ্ঠানগুলির তালিকায় উপরের দিকেই থাকে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়। এরকম প্রতিষ্ঠানের মানহানি করে রাজনৈতিক ফায়দা তোলার চেষ্টা হচ্ছে বলেও অভিযোগ তাঁর। কটাক্ষের সুরে প্রশ্ন ছুড়ে দেন, ‘যে প্রতিষ্ঠানকে আপনারাই সেরা বলেন, তাকেই আবার জনসভায় অপমান করছেন— এ কেমন শিষ্টাচার ?’
শুধু প্রতিরক্ষায় থেমে না থেকে ‘অরাজকতা’ শব্দটির পাল্টা ব্যাখ্যাও দেন তৃণমূল নেত্রী। তাঁর মতে, অরাজকতা হল প্রশাসনিক ক্ষমতার অপপ্রয়োগ, মানুষের কণ্ঠরোধ, কিংবা ধর্মের ভিত্তিতে বিভাজন তৈরি করা। কেন্দ্রের বিভিন্ন নীতিকে নিশানা করে তিনি বলেন, ‘যেখানে মানুষ নিজের কথা বলতে পারে না, সেটাই অরাজকতা। মণিপুরে না গিয়ে ভোটপ্রচারে মত্ত থাকা অজারকতা।’ রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, যাদবপুরকে কেন্দ্র করে এই নতুন বিতর্ক আসলে, গেরুয়া শিবিরের দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টারই অঙ্গ।ভোটের আগে এই বাক্যযুদ্ধ কতদূর গড়ায়, তা এখন দেখার। তবে বারুইপুরের সভা যে বাংলার রাজনীতিতে নতুন বিতর্কের সূত্রপাত করল, সে বিষয়ে সন্দেহ নেই।
❤ Support Us





