- এই মুহূর্তে দে । শ
- জুন ২, ২০২৬
উপেক্ষিত মাটির স্বাস্থ্য, চাষে অনীহা নতুন প্রজন্মের : দ্বৈত সংকটে ভারতীয় কৃষিব্যবস্থা
ভারতের কৃষিক্ষেত্র কি ধীরে ধীরে ‘আইসিইউ’-র দিকে এগিয়ে যাচ্ছে ? এধরনের আলোচনা উঠলেই সাধারণত ফসলহানি, ঋণের বোঝা, কৃষক আত্মহত্যা কিংবা বাজারদরের অস্থিরতার কথা সামনে আসে। কিন্তু এই বহুচর্চিত সমস্যাগুলির আড়ালে আরও নীরব সংকট ক্রমশ প্রকট হয়ে উঠছে। একদিকে, ক্ষয়, ক্রমবর্ধমান রাসায়নিক নির্ভরতার জেরে মাটির জৈবিক স্বাস্থ্য দ্রুত অবনতির দিকে যাচ্ছে, একই সঙ্গে কৃষিকাজের প্রতি নতুন প্রজন্মের অনীহা বাড়ছে। ফলে, কৃষি উৎপাদন, জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশে বিপদের ঘণ্টা বেজে চলছে অবিরাম। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই দুই প্রবণতা একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত এবং ভবিষ্যতে ভারতের খাদ্যনিরাপত্তা, গ্রামীণ অর্থনীতি ও জনস্বাস্থ্যের জন্য বড়ো চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
সম্প্রতি সেন্টার ফর সায়েন্স অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট (সিএসই)-এর উদ্যোগে আয়োজিত ‘ইমপ্রুভিং সয়েল বায়োলজিক্যাল হেলথ’ শীর্ষক এক আলোচনাসভায় দেশের বিশিষ্ট মৃত্তিকা বিজ্ঞানী, কৃষি বিশেষজ্ঞ, নীতিনির্ধারক এবং কৃষি-প্রযুক্তি উদ্যোক্তারা এ বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। সেখানে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, ভারতের কৃষিনীতি দীর্ঘদিন ধরে মাটির রাসায়নিক উপাদানকে গুরুত্ব দিলেও মাটির জৈবিক স্বাস্থ্যের প্রশ্নটি কার্যত উপেক্ষিত থেকেছে।
বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য, মাটির মধ্যে থাকা ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক, কেঁচো এবং অসংখ্য অণুজীবই আসলে কৃষি উৎপাদনের অদৃশ্য ভিত্তি। অণুজীবগুলি মাটিতে থাকা পুষ্টি উপাদানকে উদ্ভিদের গ্রহণযোগ্য রূপে পরিণত করে, মাটির আর্দ্রতা ও তাপমাত্রার ভারসাম্য বজায় রাখে এবং জমির স্বাভাবিক উর্বরতা রক্ষা করে। কিন্তু নির্বিচারে রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার, ফসলের অবশিষ্টাংশ পোড়ানো, একফসলি চাষ, উচ্চফলনশীল জাতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা, জৈব পদার্থের ঘাটতি এবং যান্ত্রিক কৃষিকাজের ফলে পরিচিত প্রাকৃতিক জীববৈচিত্র্য ক্রমশ ধ্বংস হচ্ছে।
ফলে, এই মুহূর্তে এমন এক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে যেখানে মাটির উর্বরতা ধরে রাখতে আরও বেশি পরিমাণে রাসায়নিক সার প্রয়োগ করতে হচ্ছে। অথচ সেই সারের বড়ো অংশ ফসলের কাজে লাগছে না। বিশেষজ্ঞদের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে নাইট্রোজেন সারের মাত্র ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ এবং ফসফরাসের মাত্র ১৫ থেকে ২০ শতাংশ উদ্ভিদ গ্রহণ করতে পারে। বাকি অংশ মাটি, জল ও পরিবেশকে দূষিত করছে। এর প্রভাব শুধু কৃষিক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়। অতিরিক্ত নাইট্রোজেন ভূগর্ভস্থ জলে নাইট্রেট হিসেবে মিশে পানীয় জলের গুণমান নষ্ট করছে। কেন্দ্রীয় ভূগর্ভস্থ জল পর্ষদের তথ্য অনুযায়ী, দেশের বহু জেলায় নিরাপদ সীমার চেয়ে বেশি নাইট্রেট দূষণ ধরা পড়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং ভারতীয় মান ব্যুরোর নির্ধারিত নিরাপদ মাত্রা প্রতি লিটারে ৪৫ মিলিগ্রাম হলেও বহু এলাকায় সে সীমা অতিক্রম করেছে।
অন্যদিকে, অতিরিক্ত রাসায়নিক ব্যবহারের ফলে নাইট্রাস অক্সাইডের মতো শক্তিশালী গ্রিনহাউস গ্যাসের নিঃসরণও বাড়ছে, যা জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে তুলছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, মাটির স্বাস্থ্যহানির ফলে ফসলে জিঙ্ক, আয়রনের মতো গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি উপাদানের পরিমাণও কমে যাচ্ছে। এর সঙ্গে শিশুদের অপুষ্টি, খর্বাকৃতি বৃদ্ধি, মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট ঘাটতি এবং জনস্বাস্থ্যের বিভিন্ন সমস্যার সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। এ প্রসঙ্গে দেশের বর্তমান কৃষিনীতি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, বহু বছর ধরে রাসায়নিক সার ব্যবহারে উৎসাহ দিয়ে, বিপুল ভর্তুকি দিয়ে এবং উৎপাদন বৃদ্ধিকেই কৃষির একমাত্র সাফল্যের মাপকাঠি হিসেবে তুলে ধরে সরকার, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও বাজার যৌথভাবে একটি নির্দিষ্ট কৃষি মডেলকে প্রতিষ্ঠা করেছে। এ মডেলের দৌলতেই আজ মাটির স্বাস্থ্য সংকটে।
সবুজ বিপ্লবের সময় রাসায়নিক সারের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। খাদ্যাভাব কাটিয়ে ভারতকে খাদ্যে স্বনির্ভর করে তুলতে সে সময়ের বিজ্ঞানী ও কৃষকদের অবদান অনস্বীকার্য। কিন্তু খাদ্য উৎপাদনের লক্ষ্য অর্জনের পরেও কেন দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির বিষয়ে কৃষকদের যথেষ্ট সতর্ক করা হয়নি, এ প্রশ্ন এখন ক্রমশ জোরালো হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে কেন্দ্রীয় কৃষি মন্ত্রক ‘সেভ দ্য ফিল্ডস’ অভিযান শুরু করেছে। একই সঙ্গে আইসিএআর এবং আইসিএমআর যৌথ ভাবে মাটি, খাদ্য এবং জনস্বাস্থ্যের পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে কাজ শুরু করেছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধুমাত্র সচেতনতা কর্মসূচি বা পুনরুদ্ধার প্রকল্প যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন দায়বদ্ধতার স্পষ্ট স্বীকৃতি এবং কৃষকদের টেকসই কৃষি ব্যবস্থায় রূপান্তরের জন্য বাস্তব সহায়তা।
তবে মাটির সংকটের পাশাপাশি আরেকটি সামাজিক সংকটও সমান উদ্বেগের কারণ। কৃষিকাজ আজ আর দেশের বহু তরুণ-তরুণীর কাছে আকর্ষণীয় পেশা নয়। এক সময় গ্রামের পরিবারগুলির স্বপ্ন ছিল সন্তানরা পড়াশোনা করে সরকারি চাকরি, ইঞ্জিনিয়ারিং, চিকিৎসা, নার্সিং কিংবা তথ্যপ্রযুক্তি ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত হবে। স্বপ্নের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল কৃষিকাজের অনিশ্চয়তা থেকে মুক্তি। কৃষক পরিবারের বহু সদস্য এখন বিশ্বাস করেন, চাষবাস করে স্থায়ী ভবিষ্যৎ গড়া সম্ভব নয়। কারণ একজন কৃষককে আজ ব্যবসায়ীর মতো ঝুঁকি নিতে হলেও তাঁর হাতে ব্যবসায়ীর মতো আর্থিক নিরাপত্তা নেই। আবহাওয়ার অনিশ্চয়তা, সার-বীজের মূল্যবৃদ্ধি, বাজারদরের ওঠানামা, মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য এবং ঋণের চাপ— সব মিলিয়ে কৃষিকাজ ক্রমশ অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে।
ফলত, নতুন প্রজন্ম গ্রাম ছেড়ে শহরমুখী হচ্ছে। কেউ পরিষেবা ক্ষেত্রে কাজ খুঁজছে, কেউ ডেলিভারি, লজিস্টিকস বা ডিজিটাল অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে। এমনকি কৃষিবিজ্ঞান নিয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণকারী তরুণদের একাংশও মাঠে নেমে চাষ করতে আগ্রহী নয়। তাঁদের লক্ষ্য কর্পোরেট সংস্থা, গবেষণা প্রতিষ্ঠান বা সরকারি চাকরি। অর্থাৎ কৃষি শেখা হচ্ছে, কিন্তু কৃষিকাজ করা হচ্ছে না। বিশেষজ্ঞদের মতে, এ প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে দেশে কৃষিকাজ করা মানুষের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যেতে পারে। বর্তমানে যাঁরা চাষ করছেন, তাঁদের গড় বয়স ক্রমশ বাড়ছে। নতুন প্রজন্মের অনুপস্থিতি খাদ্য উৎপাদনের ধারাবাহিকতাকে প্রশ্নের মুখে ফেলতে পারে। একই সঙ্গে গ্রামীণ সমাজের দীর্ঘদিনের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কাঠামোও ভেঙে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে। কৃষির সঙ্গে যুক্ত পরিবেশবান্ধব ও স্থানীয় জ্ঞানও হারিয়ে যেতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে আরেকটি আশঙ্কার কথাও উঠে এসেছে। কৃষিক্ষেত্র থেকে ছোট ও মাঝারি কৃষকদের সরে যাওয়া অব্যাহত থাকলে বৃহৎ কর্পোরেট সংস্থাগুলির হাতে জমির নিয়ন্ত্রণ ক্রমশ বৃদ্ধি পেতে পারে। কৃষির চরিত্রই বদলে যেতে পারে। এমন অবস্থায় শুধু আবেগ বা নৈতিক আবেদন দিয়ে যুবসমাজকে কৃষিক্ষেত্রে ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয় বলেই মত কৃষি বিশেষজ্ঞদের। তাঁদের মতে, কৃষিকে লাভজনক, প্রযুক্তিনির্ভর এবং সামাজিকভাবে মর্যাদাপূর্ণ পেশা হিসেবে পুনর্গঠন করতে হবে। আধুনিক সেচব্যবস্থা, উন্নত সংরক্ষণ পরিকাঠামো, সহজ ঋণপ্রাপ্তি, নির্ভরযোগ্য বাজার, ন্যায্য মূল্য ও ডিজিটাল প্রযুক্তির বিস্তার ছাড়া পরিবর্তন সম্ভব নয়। পাশাপাশি গ্রামীণ স্বাস্থ্যব্যবস্থা, শিক্ষা এবং ইন্টারনেট পরিষেবার উন্নয়নও সমান জরুরি।
আলোচনায় অংশগ্রহণকারী গবেষকরা আরও বলেন, কৃষকদের শুধু সাহায্যপ্রার্থী বা ভর্তুকিনির্ভর শ্রেণি হিসেবে দেখার মানসিকতা বদলাতে হবে। তাঁদের দক্ষ পেশাজীবী হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে, বাজারে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা বাড়াতে হবে। কারণ কৃষক যদি নিজেই বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেন যে তাঁর পেশা তাঁর সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়তে পারে, তবে কৃষিক্ষেত্রের সংকট আরও গভীর হবে। তাঁদের মতে, ভারতের মাটির সংকট কেবল কৃষির সংকট নয়; এটি খাদ্য, পরিবেশ, অর্থনীতি এবং জনস্বাস্থ্যের সম্মিলিত সংকট। এই সংকটের মোকাবিলা করতে হলে মাটির জৈবিক পুনরুজ্জীবনের পাশাপাশি কৃষিপেশার প্রতি সমাজের আস্থা ও মর্যাদাও ফিরিয়ে আনতে হবে। অন্যথায় আগামী দিনের সবচেয়ে বড়ো প্রশ্ন হয়ে উঠতে পারে— দেশে কৃষিযোগ্য জমি থাকলেও সে জমিতে চাষ করবে কে?
❤ Support Us






