- দে । শ
- জুন ২, ২০২৬
বিজেপিকে বিদায় ! নতুন রাজনৈতিক দল গঠনের পথে প্রাক্তন আইপিএস আন্নামালাই, তামিল রাজনীতিতে নতুন সমীকরণের ইঙ্গিত
কয়েক মাস ধরেই জল্পনা চলছিল। বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সঙ্গে দূরত্ব কি ক্রমশ বাড়ছে ? এআইএডিএমকের সঙ্গে জোটে ফেরার সিদ্ধান্ত কি মেনে নিতে পারছেন না তিনি ? শেষ পর্যন্ত জল্পনাই সত্যি হল। তামিলনাড়ু বিজেপির প্রাক্তন সভাপতি কে আন্নামালাই মঙ্গলবার নয়াদিল্লিতে দলের জাতীয় সভাপতি নীতিন নবীন এবং জাতীয় সাধারণ সম্পাদক (সংগঠন) বি এল সন্তোষের হাতে পদত্যাগপত্র জমা দিলেন। আর তার পর থেকেই রাজনৈতিক মহলে একটাই প্রশ্ন— দক্ষিণে বিজেপির ‘পোস্টার বয়’ অন্নামালাই কি এ বার নিজের রাজনৈতিক দল গড়তে চলেছেন ?
সূত্রের খবর, প্রাক্তন আইপিএস অফিসার আন্নামালাই আগামী ৬ থেকে ৮ মাসের মধ্যে একটি নতুন আঞ্চলিক রাজনৈতিক দল গঠনের প্রস্তুতি শুরু করেছেন। ঘনিষ্ঠ মহলের দাবি, দলটির মূল আদর্শ হবে ‘তামিল-প্রথম’ এবং ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ রাজনীতি। একই সঙ্গে তা তামিল জাতীয়তাবোধকে গুরুত্ব দিলেও বৃহত্তর জাতীয় পরিসরের সঙ্গে সংযোগ বজায় রাখবে। লক্ষ্য, তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে বিজেপি এবং প্রচলিত দ্রাবিড় দলগুলির বাইরে নতুন বিকল্প শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ। আন্নামালাইয়ের ঘনিষ্ঠরা জানিয়েছেন, দীর্ঘদিন ধরেই তিনি এমন একটি রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মের স্বপ্ন দেখছিলেন, যেখানে আঞ্চলিক পরিচয় ও জাতীয় দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে সমন্বয় থাকবে। বিরোধিতাও হবে ব্যক্তি বা দলকেন্দ্রিক নয়, বরং বিভিন্ন নীতি ও ইস্যুকে ঘিরে। সে ভাবনা ঘিরেই বিজেপির সাম্প্রতিক রাজনৈতিক কৌশলের সঙ্গে ক্রমশ সংঘাতে জড়িয়ে পড়েন তিনি।
বিজেপির অন্দরমহলের সূত্র বলছে, তামিলনাড়ুতে এআইএডিএমকের সঙ্গে জোট পুনরুজ্জীবিত করার সিদ্ধান্ত এবং বিধানসভা নির্বাচনের আগে প্রার্থী নির্বাচন সংক্রান্ত একাধিক বিষয়ে আন্নামালাই অসন্তুষ্ট ছিলেন। তাঁর দাবি ছিল, তামিলনাড়ুতে বিজেপির দীর্ঘমেয়াদি ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে হলে প্রথমে দলের নিজস্ব সাংগঠনিক ভিত্তি শক্তিশালী করা জরুরি। জোটের ভরসায় রাজনৈতিক বিস্তার সম্ভব নয়। কিন্তু দিল্লির নেতৃত্বের অগ্রাধিকার ছিল অন্যত্র। তাদের মতে, ক্ষমতাসীন ডিএমকের মোকাবিলায় এআইএডিএমকের সঙ্গে সমঝোতাই ছিল সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পথ।
এই মতপার্থক্য ধীরে ধীরে রাজনৈতিক দূরত্বে পরিণত হয়। সে সঙ্গে তামিলনাড়ুর রাজনৈতিক পরিস্থিতিতেও দ্রুত পরিবর্তন আসে। অভিনেতা থেকে রাজনীতিক হয়ে ওঠা সি. জোসেফ বিজয়ের উত্থান ও তাঁর দল টিভিকের নির্বাচনী সাফল্য নতুন রাজনৈতিক সম্ভাবনার দরজা খুলে দেয়। আন্নামালাইয়ের ঘনিষ্ঠদের মতে, তিনি মনে করেন রাজ্যের বহু তরুণ পেশাজীবী, শিক্ষিত মধ্যবিত্ত আর প্রথমবার রাজনীতিতে আসতে আগ্রহী মানুষ প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলির প্রতি আস্থা হারিয়েছেন। নতুন রাজনৈতিক শক্তির প্রতি তাঁদের আকর্ষণ তৈরি হয়েছে। এমনও দাবি করা হচ্ছে, বিজেপি থেকে আনুষ্ঠানিক ভাবে বেরিয়ে আসার পর অন্য দলগুলির বেশ কয়েক জন অভিজ্ঞ নেতা তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন। ইতিমধ্যেই নতুন রাজনৈতিক সংগঠনের আইনি কাঠামো নিয়ে কাজ শুরু হয়েছে বলে সূত্রের খবর। নতুন দলের নিবন্ধনের পাশাপাশি একটি সামাজিক সংগঠন তৈরির প্রস্তুতিও চলছে। রাজনৈতিক দল গঠনের আগে সেই সংগঠনকে জনসংযোগের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা হতে পারে।
আন্নামালাইয়ের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে জল্পনা আরও তীব্র হয়েছিল সম্প্রতি। সিবিএসই-র নবম শ্রেণির পড়ুয়াদের জন্য তিন-ভাষা নীতি কার্যকর করার কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তের প্রকাশ্য সমালোচনা করেছিলেন তিনি। বলেছিলেন, কেন্দ্রের এ সিদ্ধান্ত তামিলনাড়ুর ছাত্রছাত্রী এবং অভিভাবকদের ক্ষোভের কারণ হতে পারে। বিজেপি নেতার মুখে কেন্দ্রের নীতির এমন সমালোচনা অনেকের কাছেই তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে হয়েছিল। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, বিজেপির অন্যতম মুখের দল ছাড়ার সিদ্ধান্ত আকস্মিক ঘটনা নয়। বরং কয়েক বছরের রাজনৈতিক টানাপোড়েনেরই পরিণতি। ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত তামিলনাড়ু বিজেপির সভাপতি হিসেবে তিনি দলকে নতুন চেহারা দিয়েছিলেন। দুর্নীতিবিরোধী প্রচার, ডিএমকে সরকারের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক আক্রমণ এবং আক্রমণাত্মক রাজনৈতিক শৈলীর মাধ্যমে তিনি বিজেপিকে রাজ্যের রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসেন।
কর্নাটক পুলিশের প্রাক্তন আইপিএস অফিসার আন্নামালাইকে অনেকেই ‘সিংঙ্ঘম’ নামে চিনতেন। সে ভাবমূর্তিকেই রাজনৈতিক মূলধন করে তিনি বিজেপির জন্য নতুন সমর্থকভিত্তি তৈরি করার চেষ্টা করেন। তাঁর নেতৃত্বে ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে তামিলনাড়ুতে বিজেপির ভোটশেয়ার বেড়ে দাঁড়ায় ১১.২ শতাংশে, যা রাজ্যে দলের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। যদিও সে সাফল্য কোনো আসনে রূপান্তরিত হয়নি। কোয়েম্বাটুর কেন্দ্র থেকে নিজেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন তিনি। ব্যাপক প্রচার সত্ত্বেও তিনি ডিএমকের গণপতি রাজকুমারের কাছে ১৭ হাজার ৮০০-রও বেশি ভোটে পরাজিত হন। ওই ফলাফল বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বকে বুঝিয়ে দেয় যে, ভোটের হার বাড়লেও শক্তিশালী আঞ্চলিক মিত্র ছাড়া তামিলনাড়ুতে ক্ষমতার রাজনীতিতে প্রবেশ করা কঠিন।
অন্য দিকে, আন্নামালাইয়ের আক্রমণাত্মক রাজনীতি বিজেপির সম্ভাব্য মিত্র এআইএডিএমকের সঙ্গে সম্পর্কও তিক্ত করে তোলে। সি. এন. আন্নাদুরাই এবং জে. জয়ললিতাকে নিয়ে তাঁর কিছু মন্তব্যকে কেন্দ্র করে দু-দলের সম্পর্কের অবনতি হয়। এআইএডিএমকে নেতৃত্ব প্রকাশ্যে তাঁর সমালোচনা করে ক্ষমাপ্রার্থনার দাবি তোলে। যদিও প্রথম দিকে বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব তাঁর পাশেই দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু ২৬-এর বিধানসভা নির্বাচন ঘনিয়ে আসতেই পরিস্থিতি বদলে যায়। বিজেপি নেতৃত্ব এআইএডিএমকের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের পথে হাঁটে। সে প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই ২০২৫ সালের এপ্রিলে আন্নামালাইকে সরিয়ে তামিলনাড়ু বিজেপির সভাপতি করা হয় নৈনার নাগেন্দ্রনকে, যিনি এক সময় এআইএডিএমকের মন্ত্রী ছিলেন। রাজনৈতিক মহলের বড়ো অংশের মতে, এটাই ছিল স্পষ্ট বার্তা— জোট রাজনীতির স্বার্থে বিজেপি নতুন সমীকরণে যেতে প্রস্তুত।
এর পর ধীরে ধীরে সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থেকেও দূরে সরে যেতে থাকেন আন্নামালাই। ২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে তাঁকে প্রার্থীও করা হয়নি। প্রচারেও তাঁর ভূমিকা সীমিত রাখা হয়। সমর্থকদের একাংশের বিশ্বাস, এআইএডিএমকের সঙ্গে সম্পর্ক মেরামত করতে গিয়ে বিজেপি কার্যত নিজেদের একনিষ্ঠ নেতাকে বলি দিয়েছে। তবে বিজেপির এ কৌশলও শেষ পর্যন্ত প্রত্যাশিত ফল দেয়নি। এআইএডিএমকের শরিক হয়ে নির্বাচনে লড়ে বিজেপি মাত্র ১টি আসন জেতে। ভোটশেয়ারও নেমে আসে ৩ শতাংশের নীচে। অন্য দিকে, বিজয়ের নেতৃত্বাধীন টিভিকে রাজ্যের রাজনীতিতে শক্তিশালী শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আন্নামালাইয়ের প্রস্থান শুধুমাত্র একজন নেতার দলত্যাগ নয়; তামিলনাড়ুতে বিজেপির ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কৌশল নিয়েও প্রশ্নচিহ্ন তুলে দিল। এক দিকে রয়েছে দীর্ঘমেয়াদি সাংগঠনিক বিস্তারের স্বপ্ন, অন্য দিকে তাৎক্ষণিক নির্বাচনী লাভের হিসাব। বিজেপি দ্বিতীয় পথটি বেছে নিয়েছে। আর সে পথেই দলের সবচেয়ে জনপ্রিয় আঞ্চলিক মুখগুলির এক জন সরে দাঁড়ালেন। এখন নজর অন্নামালাইয়ের পরবর্তী পদক্ষেপে। তিনি কি সত্যিই নতুন রাজনৈতিক দল গড়বেন? নাকি সামাজিক আন্দোলনের পথ বেছে নেবেন? উত্তর এখনো অজানা। তবে তাঁর পদত্যাগ যে তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে নতুন সমীকরণের সূচনা করে দিল, সে বিষয়ে রাজনৈতিক মহলে কোনো দ্বিমত নেই।
❤ Support Us






