Advertisement
  • এই মুহূর্তে বি। দে । শ
  • জুন ২, ২০২৬

ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি! মার্কিন ঘনিষ্ঠ পাকিস্তান, মস্কোর হাত ধরছে তালিবান

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি! মার্কিন ঘনিষ্ঠ পাকিস্তান, মস্কোর হাত ধরছে তালিবান

ইতিহাস কি সত্যিই নিজেকে পুনরাবৃত্তি করেআফগানিস্তানের সাম্প্রতিক কূটনৈতিক সমীকরণ অন্তত সে প্রমাণই দিচ্ছে। যে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে একসময় অস্ত্র তুলে নিয়েছিল আফগান মুজাহিদিনেরা, তাদের উত্তরসূরি বলে পরিচিত তালিবান সরকারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভরসা হয়ে উঠছে রাশিয়া। অন্য দিকেএকদা তালিবানের প্রধান আন্তর্জাতিক পৃষ্ঠপোষক বলে পরিচিত পাকিস্তান ক্রমশ আমেরিকার কাছাকাছি চলে যাচ্ছে। ফলে চার দশক আগের ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ যেন উল্টে গিয়ে নতুন রূপে ফিরে এসেছে।

সম্প্রতি তালিবান সরকারের প্রতিরক্ষামন্ত্রী মাওলভি মহম্মদ ইয়াকুব মুজাহিদ এবং রাশিয়ার নিরাপত্তা পরিষদের সচিব সের্গেই শোইগুর মধ্যে সামরিক-প্রযুক্তিগত সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। চুক্তির লক্ষ্য আফগানিস্তানে থাকা সোভিয়েত ও রুশ নির্মিত অস্ত্রহেলিকপ্টার এবং সামরিক যানবাহনের মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ। কিন্তু এ সমঝোতার রাজনৈতিক তাৎপর্য অনেক গভীর। আফগানিস্তানের ইতিহাস বুঝতে গেলে ফিরে তাকাতে হয় ড. মহম্মদ নাজিবুল্লাহর শাসনকালের দিকে। সোভিয়েত-সমর্থিত আফগানিস্তানের শেষ রাষ্ট্রপতি নাজিবুল্লাহ ছিলেন এমন এক নেতাযাঁর পতনের মধ্য দিয়েই কার্যত শুরু হয়েছিল আফগান ভূমের অস্থিরতার যুগ। যার পরিণতিতে তালিবানের উত্থান।

১৯৭৮ সালের সৌর বিপ্লব’-এর মাধ্যমে আফগানিস্তানে কমিউনিস্টপন্থী পিপলস ডেমোক্র্যাটিক পার্টি অব আফগানিস্তান ক্ষমতায় আসে। ভূমি সংস্কারনারীশিক্ষার প্রসারধর্মনিরপেক্ষ প্রশাসন প্রতিষ্ঠাসহ একাধিক আধুনিকীকরণ কর্মসূচি গ্রহণ করলেও তা গ্রামীণ ও রক্ষণশীল সমাজের এক বড়ো অংশের তীব্র বিরোধিতার মুখে পড়ে। বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়লে ১৯৭৯ সালের ডিসেম্বরে সোভিয়েত ইউনিয়ন সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপ করে। শুরু হয় দীর্ঘ এক দশকের সোভিয়েত-আফগান যুদ্ধ। ১৯৮৬ সালে সোভিয়েত নেতৃত্ব বাবরাক কারমালকে সরিয়ে নাজিবুল্লাহকে দেশের শীর্ষপদে বসায়। তিনি ছিলেন আফগান গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান এবং ক্ষমতাসীন দলের অন্যতম প্রভাবশালী মুখ। দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি বুঝতে পারেন যে, শুধুমাত্র সামরিক শক্তির উপর নির্ভর করে সরকার টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। তাই তিনি জাতীয় পুনর্মিলন’ নীতি গ্রহণ করেন।

১৯৮৯ সালে সোভিয়েত সেনা আফগানিস্তান থেকে প্রত্যাহার করে নেওয়ার পর অধিকাংশ আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক মনে করেছিলেননাজিবুল্লাহ সরকার দ্রুত ভেঙে পড়বে। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। সুসংগঠিত সেনাবাহিনী, মস্কো থেকে নিয়মিত অর্থজ্বালানি ও অস্ত্র সহায়তার জোরে তাঁর সরকার আরও  বছর টিকে ছিল। এমনকি জালালাবাদের মতো গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধে মুজাহিদিনদের বিরুদ্ধে সরকারি বাহিনী সাফল্যও অর্জন করেছিল। কিন্তু ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের সঙ্গে সঙ্গে সহায়তা বন্ধ হয়ে যায়। অর্থনৈতিক ও সামরিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে কাবুল। একের পর এক সামরিক কমান্ডার সরকারের প্রতি আনুগত্য ত্যাগ করতে শুরু করেন। শেষ পর্যন্ত ১৯৯২ সালে নাজিবুল্লাহ ক্ষমতাচ্যুত হন। মুজাহিদিন বাহিনী কাবুলে প্রবেশ করে। মুজাহিদিন আন্দোলনের উত্থানের পিছনে ছিল আমেরিকার সিআইএপাকিস্তানের আইএসআই এবং সৌদি আরবের অর্থ ও অস্ত্র

এ সময় আফগানিস্তানে শান্তি তো ফেরেনি, বরং মুজাহিদিন গোষ্ঠীগুলির মধ্যে ক্ষমতার লড়াই শুরু হয়। রাজধানী কাবুল ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়হাজার হাজার সাধারণ মানুষ নিহত হন।  গৃহযুদ্ধ ও অরাজকতার পরিবেশেই ১৯৯৪ সালে দক্ষিণ আফগানিস্তানে তালিবান আন্দোলনের উত্থান ঘটে। যুদ্ধক্লান্ত মানুষের কাছে নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তারা দ্রুত শক্তিশালী হয়ে ওঠে। ১৯৯৬ সালে তালিবান কাবুল দখল করার পর নাজিবুল্লাহর জীবনের শেষ অধ্যায় রচিত হয়। রাষ্ট্রপুঞ্জের কার্যালয় থেকে তাঁকে এবং তাঁর ভাইকে টেনে বের করে আনে তালিবান যোদ্ধারা। পরে তাঁদের হত্যা করে রাজধানীর একটি জনবহুল মোড়ে দেহ ঝুলিয়ে রাখা হয়। সেই ঘটনা শুধু আফগানিস্তান নয়গোটা বিশ্বকে স্তম্ভিত করেছিল। ইতিহাসের পরিহাস এখানেই যেযে কমিউনিস্ট সরকারের পতনের মাধ্যমে তালিবানের উত্থানের পথ প্রশস্ত হয়েছিলআজ সেই তালিবানই সোভিয়েত ইউনিয়নের উত্তরসূরি রাশিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলতে আগ্রহী। ফলে আফগানিস্তানের বর্তমান রাজনৈতিক সমীকরণে নাজিবুল্লাহর অধ্যায় নতুন তাৎপর্য নিয়ে ফিরে আসছেযেন অতীতের প্রতিধ্বনি আবারও শোনা যাচ্ছে বর্তমানের ভূ-রাজনীতিতে।

তবে তালিবানের ইতিহাস শুধু সোভিয়েত-বিরোধী সংগ্রামের ধারাবাহিকতা নয়আমেরিকার সঙ্গে তাদের সংঘাতও আধুনিক বিশ্বের দীর্ঘতম যুদ্ধগুলির একটি। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর নিউ ইয়র্ক ও ওয়াশিংটনে ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলার পর আমেরিকা আল-কায়দা প্রধান ওসামা বিন লাদেনকে হস্তান্তরের দাবি জানায়। তালিবান সে দাবি প্রত্যাখ্যান করলে অক্টোবর মাসে আফগানিস্তানে সামরিক অভিযান শুরু করে আমেরিকা ও তার মিত্র বাহিনী। মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই তালিবান সরকার ক্ষমতাচ্যুত হয়। কাবুলে প্রতিষ্ঠিত হয় আমেরিকা-সমর্থিত নতুন সরকার। প্রথমে হামিদ কারজাই এবং পরে আশরাফ গনি রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন। শিক্ষাস্বাস্থ্যপরিকাঠামো, নিরাপত্তা খাতে কোটি কোটি ডলার বিনিয়োগ করে ওয়াশিংটন। কিন্তু তালিবান সম্পূর্ণ নির্মূল হয়নি। পাকিস্তান সীমান্তবর্তী অঞ্চলে তারা পুনর্গঠিত হয়, ধীরে ধীরে শক্তি সঞ্চয় করতে থাকে

এর পর শুরু হয় দুদশকের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ। পাহাড়মরুভূমি এবং প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে তালিবান গেরিলা কৌশলে আমেরিকা ও ন্যাটো বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালাতে থাকে। সে যুদ্ধে লক্ষাধিক আফগান নাগরিক নিহত হন। প্রাণ হারান হাজার হাজার মার্কিন ও ন্যাটো সেনাও। প্রায় ২ ট্রিলিয়ন ডলারের ব্যয় সত্ত্বেও আমেরিকা আফগানিস্তানে স্থায়ী রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। অবশেষে, ২০২০ সালে কাতারের দোহায় আমেরিকা ও তালিবানের মধ্যে ঐতিহাসিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। সে চুক্তির ভিত্তিতেই আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের পথ প্রশস্ত হয়। ২০২১ সালের আগস্টে শেষ মার্কিন সেনা দেশ ছাড়ার আগেই তালিবান দ্রুত একের পর এক প্রদেশ দখল করে নেয়। প্রেসিডেন্ট আশরাফ গনি দেশত্যাগ করেন। তালিবান দ্বিতীয়বার কাবুলে প্রবেশ করে ক্ষমতা দখল করে।

বিশ্বরাজনীতির সবচেয়ে বড়ো পরিহাস সম্ভবত এখানেই। যে তালিবানকে উৎখাত করতে আমেরিকা ২০ বছর ধরে যুদ্ধ চালিয়েছেসে তালিবানই শেষ পর্যন্ত আফগানিস্তানের ক্ষমতায় ফিরে আসে। আর আজ সেই তালিবানই এমন এক রাশিয়ার দিকে ঝুঁকছেযার পূর্বসূরি সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে তাদের পূর্বসূরিরা একসময় আমেরিকার সমর্থনে যুদ্ধ করেছিল। পরিস্থিতিকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে পাকিস্তানের ভূমিকা। একসময় তালিবানের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মিত্র বলে পরিচিত ইসলামাবাদ এখন ক্রমশ ওয়াশিংটনের কাছে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হয়ে উঠছে। সীমান্ত সংঘর্ষ ও নিরাপত্তা ইস্যুতে পাকিস্তান এবং তালিবানের মধ্যে সম্পর্কের অবনতি ঘটেছে। আফগান ভূখণ্ডে জঙ্গি কার্যকলাপ নিয়ে দুদেশের মধ্যে বারবার উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। এমনকি এ বছর পাকিস্তানের সামরিক পদক্ষেপকে আমেরিকার সমর্থনও কাবুলের উদ্বেগ বাড়িয়েছে।

এ পরিস্থিতিতে রাশিয়া ও তালিবানের ঘনিষ্ঠতা নিছক কূটনৈতিক ঘটনা নয়বরং বদলে যাওয়া আন্তর্জাতিক শক্তির ভারসাম্যের প্রতিফলন। দুপক্ষেরই সাধারণ শত্রু এখন ইসলামিক স্টেট খোরাসান প্রদেশ (আইএসকেপি)। মস্কোর ক্রোকাস সিটি হল হামলা থেকে শুরু করে  আফগানিস্তানের অভ্যন্তরে ধারাবাহিক জঙ্গি আক্রমণ— উভয় পক্ষই এই সংগঠনকেএই মুহুর্তে বড়ো হুমকি হিসেবে দেখছে। ফলে নিরাপত্তা স্বার্থই প্রাক্তন শত্রুদের কাছে টেনে এনেছে। আফগানিস্তানের ইতিহাসে তাই আজ এক বিরল দৃশ্য দেখা যাচ্ছে। একসময় সোভিয়েত-বিরোধী যুদ্ধে আমেরিকার মিত্র ছিল যাদের রাজনৈতিক পূর্বসূরিরাপরে সে তালিবানই আমেরিকার বিরুদ্ধে দুই দশকের যুদ্ধ লড়েছে। আর এখন আমেরিকার সঙ্গে পাকিস্তানের ঘনিষ্ঠতা বাড়ার প্রেক্ষাপটে তালিবান নতুন আশ্রয় খুঁজছে মস্কোয়। শীতল যুদ্ধসন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ এবং বর্তমান বহুমেরু বিশ্ব— তিনটি যুগের সংঘাত ও জোট যেন এসে মিলেছে এই এক বিন্দুতে। আফগানিস্তান আবারও প্রমাণ করলআন্তর্জাতিক রাজনীতিতে স্থায়ী বন্ধু বা স্থায়ী শত্রু বলে কিছু নেই। থাকে শুধু স্বার্থনিরাপত্তা আর ক্ষমতার পরিবর্তনশীল সমীকরণ। সে সমীকরণই আজ ইতিহাসের পুরনো অধ্যায়কে নতুন ভাষায় লিখছে।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!