- স | হ | জ | পা | ঠ
- জুলাই ২৮, ২০২৬
‘কৃত্রিম সূর্য’-র আরও কাছে চিন! বিশ্বের বৃহত্তম ‘ফিউশন ম্যাগনেট’ পরীক্ষায় সাফল্য
সীমাহীন ও শূন্য-কার্বন শক্তির ভবিষ্যৎ দখলের দৌড়ে আরও এক ধাপ এগিয়ে গেল চিন। বিশ্বের বৃহত্তম ‘সুপারকন্ডাক্টিং ফিউশন ম্যাগনেট’ তৈরি করে তার সফল পরীক্ষা সম্পন্ন করেছে সে দেশের বিজ্ঞানীরা। ‘কৃত্রিম সূর্য’ নির্মাণ কর্মসূচির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এ সাফল্যকে শুধু একটি প্রকৌশলগত মাইলফলক বললে কম বলা হবে; ভবিষ্যতের ফিউশন বিদ্যুৎ উৎপাদনের পথে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
চিনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম এবং চিনা বিজ্ঞান একাডেমির অধীনস্ত ‘ইনস্টিটিউট অব প্লাজমা ফিজিক্স’-এর তথ্য অনুযায়ী, নতুন ‘টোরয়েডাল ফিল্ড সুপারকন্ডাক্টিং ম্যাগনেট’টি বিশ্বের বৃহত্তম। এর দৈর্ঘ্য ২১ মিটার, প্রস্থ ১২ মিটার এবং ওজন প্রায় ৫৮২ টন। বিশাল ডি-আকৃতির এ কাঠামো ভবিষ্যতের ‘ফিউশন রিঅ্যাক্টর’-এর অন্যতম প্রধান উপাদান হিসেবে কাজ করবে। চিনের বহুদিনের লক্ষ্য, ২০৩০ সালের মধ্যে ‘নিউক্লিয়ার ফিউশন’ প্রযুক্তির সাহায্যে পরীক্ষামূলক ভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু করা। সে লক্ষ্যপূরণের পথে এ সাফল্যকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। যদিও বিজ্ঞানীরা একই সঙ্গে সতর্কও করেছেন— বাণিজ্যিক স্তরে ‘ফিউশন বিদ্যুৎ’ উৎপাদনের আগে এখনো বহু জটিল বৈজ্ঞানিক ও প্রকৌশলগত বাধা অতিক্রম করতে হবে।
‘কৃত্রিম সূর্য’ কথাটি শুনলে অনেকেরই মনে হতে পারে, এটি যেন পৃথিবীতে আর-একটি সূর্য তৈরি করার প্রকল্প। বাস্তবে বিষয়টি সম্পূর্ণ ভিন্ন। এটি এমন একটি ‘নিউক্লিয়ার ফিউশন রিঅ্যাক্টর’, যার উদ্দেশ্য সূর্যের অভ্যন্তরে যে প্রক্রিয়ায় শক্তি উৎপন্ন হয়, সেই একই প্রক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে পৃথিবীতে ঘটানো। সূর্যের কেন্দ্রে প্রচণ্ড তাপমাত্রা ও চাপে হাইড্রোজেন পরমাণু একে অপরের সঙ্গে মিলিত হয়ে হিলিয়ামে পরিণত হয়। এই সংযোজন বা ‘ফিউশন’ বিক্রিয়াতেই বিপুল শক্তি উৎপন্ন হয়। পৃথিবীতেও সেই একই প্রক্রিয়া ঘটানোর চেষ্টা করছেন চিনা বিজ্ঞানীরা। তবে তার জন্য প্রয়োজন প্রায় ১০০ মিলিয়ন ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তারও বেশি তাপমাত্রা— যা সূর্যের কেন্দ্রের তাপমাত্রার চেয়েও বেশি। এত উচ্চ তাপমাত্রায় পদার্থ প্লাজমায় পরিণত হয়। সে প্লাজমাকে কোনো ধাতব পাত্রে আটকে রাখা অসম্ভব। কারণ, মুহূর্তের মধ্যে তা গলে যাবে। সেখানেই প্রয়োজন এই ‘সুপারকন্ডাক্টিং ম্যাগনেট’-এর।
‘ফিউশন রিঅ্যাক্টর’-এর ভিতরে থাকা অতিতপ্ত প্লাজমাকে ‘রিঅ্যাক্টর’-এর দেওয়াল থেকে দূরে ভাসমান অবস্থায় ধরে রাখার কাজ করে অত্যন্ত শক্তিশালী চৌম্বক ক্ষেত্র। সেই চৌম্বক ক্ষেত্র তৈরি করে এই ‘সুপারকন্ডাক্টিং ম্যাগনেট’। সহজ ভাষায় বলতে গেলে, এটি এক ধরনের অদৃশ্য ‘চৌম্বকীয় খাঁচা’, যার ভিতরে বন্দি থাকবে ১০০ মিলিয়ন ডিগ্রি সেলসিয়াসেরও বেশি উত্তপ্ত প্লাজমা। প্লাজমা যদি ‘রিঅ্যাক্টর’-এর দেওয়ালে স্পর্শ করে, তবে গোটা ব্যবস্থা মুহূর্তে ভেঙে পড়তে পারে। ফলে ‘ফিউশন প্রযুক্তি’র সাফল্যের অন্যতম পূর্বশর্তই হলো শক্তিশালী ও অত্যন্ত স্থিতিশীল ‘ম্যাগনেটিক কনফাইনমেন্ট’। নতুন তৈরি ম্যাগনেটটি শুধু আকারেই বৃহত্তম নয়। গবেষকদের দাবি, আন্তর্জাতিক ‘ফিউশন’ প্রকল্প ‘আইটিইআর’-এর জন্য তৈরি একই ধরনের ম্যাগনেটের তুলনায় এটি প্রায় ১.৩ গুণ বড় এবং এতে সঞ্চিত চৌম্বকীয় শক্তিও প্রায় তিন গুণ বেশি।
শুধু বিশাল ম্যাগনেট নয়, একই সঙ্গে উচ্চ-তাপমাত্রার ‘সুপারকন্ডাক্টিং সেন্ট্রাল সোলেনয়েড কয়েল’-এর পরীক্ষাতেও সফল হয়েছেন চিনা গবেষকেরা। ‘ফিউশন রিঅ্যাক্টর’-এর ক্ষেত্রে এই অংশটিকে অনেকেই ‘হৃদয়’ বলে থাকেন। গাড়ির ইঞ্জিনে যেমন ‘স্পার্ক প্লাগ’ ইঞ্জিন চালু করতে সাহায্য করে, তেমনই এই ‘সোলেনয়েড কয়েল’ প্লাজমাকে প্রথম প্রজ্বলিত করে এবং দীর্ঘ সময় স্থিতিশীল রাখতে সাহায্য করে। ‘ফিউশন’ বিক্রিয়া ধারাবাহিক ভাবে বজায় রাখার ক্ষেত্রে এই উপাদানটির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে একই সঙ্গে এই প্রযুক্তিরও সফল পরীক্ষা ভবিষ্যতের ‘রিঅ্যাক্টর’ নির্মাণে বড়ো অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
এ প্রকল্পের অন্যতম উল্লেখযোগ্য দিক হলো, বিশাল ‘ম্যাগনেট’ এবং ‘সেন্ট্রাল সোলেনয়েড’— দুটি প্রযুক্তিই সম্পূর্ণ ভাবে চিনের নিজস্ব গবেষণা, উপকরণ, উৎপাদন ব্যবস্থা এবং প্রযুক্তিগত দক্ষতার উপর নির্ভর করে তৈরি হয়েছে। ফলে এত দিন যে সব গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশের জন্য বিদেশি প্রযুক্তি বা সরবরাহকারীদের উপর নির্ভর করতে হত, সে নির্ভরতা অনেকটাই কমে এল বলে দাবি করেছে বেজিং। গবেষক দলের তথ্য অনুযায়ী, ছয় বছরের এই উন্নয়ন কর্মসূচির ফলে ৪৭টি নতুন ‘পেটেন্ট’ এবং ২৫টি ‘শিল্পমান’ তৈরি হয়েছে। যা ভবিষ্যতে চিনের ‘ফিউশন’ প্রযুক্তি শিল্পের ভিত আরও শক্তিশালী করবে। তবে, বিশ্বের বৃহত্তম এই ম্যাগনেট তৈরি করা মোটেই সহজ কাজ ছিল না। একদিকে এটিকে প্রায় ৬০ বছর নির্ভরযোগ্য ভাবে কাজ করার উপযোগী করে তৈরি করতে হয়েছে। অন্যদিকে এর কার্যক্ষমতা বজায় রাখতে হবে মাইনাস ২৬৯ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি তাপমাত্রায়।
শুধু তাই নয়, এই ম্যাগনেটকে এক লক্ষ অ্যাম্পিয়ারেরও বেশি বৈদ্যুতিক প্রবাহ প্রায় কোনো শক্তিক্ষয় ছাড়াই বহন করতে হবে। একই সঙ্গে ‘ফিউশন রিঅ্যাক্টর’-এর অভ্যন্তরে তৈরি হওয়া প্রবল বিকিরণ, তীব্র যান্ত্রিক চাপ ও দীর্ঘমেয়াদি তাপীয় পরিবর্তনও সহ্য করতে হবে। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয়, প্রকৌশলীরা গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থলগুলিতে বৈদ্যুতিক প্রতিরোধ প্রায় শূন্যে নামিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছেন। ফলে শক্তির অপচয় কার্যত নগণ্য রাখা সম্ভব হয়েছে। ভবিষ্যতের বাণিজ্যিক ফিউশন বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য এটি অত্যন্ত প্রয়োজনীয় শর্ত। উল্লেখযোগ্যভাবে, এ বছরই ‘ফিউশন’ গবেষণায় আরও একটি বিশ্বরেকর্ড গড়েছিল চিনের ‘এক্সপেরিমেন্টাল অ্যাডভান্সড সুপারকন্ডাক্টিং টোকামাক’(ইস্ট), যাকে অনেকেই ‘চিনের কৃত্রিম সূর্য’ নামে চেনেন। সে পরীক্ষায় প্রায় ১০০ মিলিয়ন ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় টানা ১,০৬৬ সেকেন্ড ধরে প্লাজমাকে স্থিতিশীল রাখা সম্ভব হয়েছিল। এত দীর্ঘ সময় ধরে ফিউশন বিক্রিয়ার উপযোগী পরিবেশ বজায় রাখার ক্ষেত্রে এটিই বর্তমানে বিশ্বের দীর্ঘতম সাফল্যগুলির অন্যতম। বিজ্ঞানীদের মতে, দীর্ঘ সময় ধরে প্লাজমাকে স্থিতিশীল রাখতে পারা ভবিষ্যতের ‘ফিউশন’ বিদ্যুৎ উৎপাদনের অন্যতম প্রধান শর্ত।
‘ফিউশন’ শক্তিকে বাস্তবের বিদ্যুৎকেন্দ্রে রূপ দিতে ইতিমধ্যেই তিন-পর্যায়ের একটি রোডম্যাপ তৈরি করেছে চিন। প্রথম পর্যায়ে ২০২৭ সালের মধ্যে ‘বার্নিং প্লাজমা এক্সপেরিমেন্টাল সুপারকন্ডাক্টিং টোকামাক’ নির্মাণ শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে। দ্বিতীয় পর্যায়ে ২০৩০ সালের মধ্যে প্রথম বার ফিউশন প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। শেষ ধাপে ‘চায়না ফিউশন ইঞ্জিনিয়ারিং ডেমনস্ট্রেশন রিঅ্যাক্টর’ বা ‘সিএফইডিআর’ তৈরি করা হবে। এটি সফল হলে বিশ্বের প্রথম ‘ফিউশন-ভিত্তিক’ বিদ্যুৎকেন্দ্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে চিন।
চিনের এ সাফল্য নিঃসন্দেহে উল্লেখযোগ্য। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই ‘ফিউশন বিদ্যুৎ’ সাধারণ মানুষের ঘরে পৌঁছে যাবে। বিশ্বের কোনো দেশ এখনো বাণিজ্যিক ভাবে কার্যকর ‘ফিউশন বিদ্যুৎ’ উৎপাদনে সফল হয়নি। সবচেয়ে চ্যালেঞ্জ হলো, ‘রিঅ্যাক্টর’ যত শক্তি ব্যয় করবে, তার চেয়ে ধারাবাহিক ভাবে বেশি শক্তি উৎপাদন করতে পারা— যাকে বিজ্ঞানীরা বলেন ‘নেট এনার্জি গেইন’। এর পাশাপাশি সম্পূর্ণ ‘রিঅ্যাক্টর’-এ সংযোজন, দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা পরীক্ষা, উপকরণের স্থায়িত্ব এবং অর্থনৈতিকভাবে প্রযুক্তিটিকে কার্যকর করে তোলাও এখনো বড়ো চ্যালেঞ্জ।
বিশ্ব যখন জলবায়ু পরিবর্তন, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং জীবাশ্ম জ্বালানির বিকল্প খুঁজছে, তখন ‘নিউক্লিয়ার ফিউশন’কে ভবিষ্যতের সবচেয়ে সম্ভাবনাময় শক্তির উৎস হিসেবে দেখা হচ্ছে। চিনের ‘ফিউশন প্রযুক্তি’ সফল হলে সমুদ্রের জল থেকে পাওয়া হাইড্রোজেন ব্যবহার করে কার্যত সীমাহীন জ্বালানি পাওয়া যেতে পারে। বিদ্যুৎ উৎপাদনের সময় কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গত হবে না, দীর্ঘস্থায়ী তেজস্ক্রিয় বর্জ্যও তুলনায় অনেক কম হবে। প্রচলিত পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো অনিয়ন্ত্রিত ‘মেল্টডাউন’-এর আশঙ্কাও থাকবে না। সে কারণেই বিশ্বের বৃহত্তম ‘সুপারকন্ডাক্টিং ফিউশন ম্যাগনেট’-এর সফল নির্মাণ ও পরীক্ষা শুধু চিনের প্রযুক্তিগত সাফল্য নয়, ভবিষ্যতের পরিচ্ছন্ন শক্তির সন্ধানে গোটা বিশ্বের গবেষণাকেই নতুন গতি দিল বলে মনে করছেন বিজ্ঞানীরা। যদিও সে ভবিষ্যৎ এখনো কিছুটা দূরে, তবু প্রতিটি সফল পরীক্ষা মানবসভ্যতাকে এক ধাপ করে সে লক্ষ্যের কাছেই নিয়ে যাচ্ছে।
❤ Support Us








