Advertisement
  • স | হ | জ | পা | ঠ
  • জুন ২৯, ২০২৬

রাজারহাটে নতুন প্রজাতির বোলতার সন্ধান, ‘বাঁটুল’ স্রষ্টার নামে নামকরণ বিজ্ঞানীদের

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
রাজারহাটে নতুন প্রজাতির বোলতার সন্ধান, ‘বাঁটুল’ স্রষ্টার নামে নামকরণ বিজ্ঞানীদের

বাংলার জনপ্রিয় সংস্কৃতির সঙ্গে বিজ্ঞানের এমন মেলবন্ধন সচরাচর দেখা যায় না। রাজারহাটের জলাভূমিতে নতুন প্রজাতির এক ক্ষুদ্র বোলতার সন্ধান পেয়ে, সে আবিষ্কারকে চিরস্মরণীয় করে তুলতে তার নাম জুড়ে দেওয়া হলো বাঙালির শৈশবের অবিচ্ছেদ্য অংশ, কিংবদন্তি কার্টুনিস্ট নারায়ণ দেবনাথের সঙ্গে। শতবর্ষের প্রাক্কালে ‘বাঁটুল’, ‘নন্টে-ফন্টে’, ‘হাঁদা-ভোঁদা’-র স্রষ্টাকে এই অভিনব উপায়ে শ্রদ্ধা জানালেন একদল পতঙ্গবিদ। তাঁদের আবিষ্কৃত নতুন পরজীবী বোলতার বৈজ্ঞানিক নাম রাখা হয়েছে টেট্রাস্টিকাস নারায়ণদেবনাথি (Tetrastichus narayandebnathi)।

রাজারহাটের জলাভূমি এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে চলা গবেষণায় দেখা মিলেছে নতুন প্রজাতির বোলতার সন্ধান। কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের গবেষক অর্ণব চক্রবর্তী ও বনানী ভট্টাচার্য এবং মিশরের কায়রো বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান অনুষদের কীটতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক নেভিন এস. গাদাল্লাহর যৌথ গবেষণায় এসেছে সাফল্য। গবেষণাপত্রটি আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বিজ্ঞান সাময়িকী ‘ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অব ট্রপিক্যাল ইনসেক্ট সায়েন্স’-এ প্রকাশের জন্য গৃহীতও হয়েছে। গবেষকদের মতে, এ শুধু একটি নতুন প্রজাতির সন্ধান নয়, নগরাঞ্চলের জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশগত ভারসাম্য সম্পর্কে নতুন করে ভাবনারও সুযোগ।

নামকরণের নেপথ্যের গল্পও কম তাৎপর্যপূর্ণ নয়। নতুন কোনো প্রাণী বা উদ্ভিদ প্রজাতি আবিষ্কারের পর তার নাম নির্ধারণের অধিকার আবিষ্কারকদেরই থাকে। সে অধিকার প্রয়োগ করেই তাঁরা আবিষ্কৃত নতুন বোলতার নাম রেখেছেন নারায়ণ দেবনাথের নামে। গবেষক দলের অন্যতম সদস্য ও পতঙ্গবিদ অর্ণব চক্রবর্তী জানান, ‘নারায়ণ দেবনাথ এমন এক শিল্পী, যিনি প্রজন্মের পর প্রজন্মের বাঙালি শিশুর শৈশবকে কল্পনা, হাস্যরস ও আনন্দে ভরিয়ে দিয়েছেন। তাঁর সৃষ্ট চরিত্রগুলি আমাদের বেড়ে ওঠার অবিচ্ছেদ্য অংশ। এমন এক কিংবদন্তী শিল্পীর প্রতি শ্রদ্ধা জানাতেই আমরা এই নতুন প্রজাতির নাম তাঁর নামে রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’

গবেষকরা জানিয়েছেন, নতুন প্রজাতির এই বোলতা আদতে একটি ‘পরজীবী বোলতা’। সাধারণ পরজীবীর সঙ্গে এর পার্থক্য, এ ধরনের জীবেরা তাদের জীবনচক্রের বড়ো অংশ একটি মাত্র পোষক জীবের শরীরের উপর বা ভিতরে কাটায়। শেষ পর্যন্ত সেই পোষককে মেরে ফেলে। নতুন আবিষ্কৃত বোলতাটি একটি ‘কচ্ছপ-পোকা পিউপাকে পোষক হিসেবে ব্যবহার করে। অর্থাৎ কচ্ছপ-পোকার পিউপার শরীরেই এর বংশবিস্তার ঘটে, সেখান থেকেই পূর্ণাঙ্গ বোলতার জন্ম হয়।  আবিষ্কারের পিছনেও রয়েছে এক আকর্ষণীয় ঘটনাক্রম। গবেষণার সময় রাজারহাটের একটি ঘাসের পাতায় থাকা কচ্ছপ পোকার একটি পিউপা গবেষকদের নজর কাড়ে। আশপাশের অন্যান্য কোকুনের তুলনায় সেটির গাঢ় হলদে-কমলা রং ছিল আলাদা। অস্বাভাবিক রঙের কারণেই সেটি সংগ্রহ করা হয়। পরে পোল্যান্ডের ‘ইউনিভার্সিটি অব ভ্রৎসওয়াফ’-এর অধ্যাপক জোলান্টা শ্ভিয়েনতোইয়ান্সকা পিউপাটির পরিচয় নিশ্চিত করেন। তার পর সেটিকে কলকাতার প্রকৃতি গবেষণা সংস্থা ‘আইফরনেচার’-এর গবেষণাগারে নিয়ন্ত্রিত তাপমাত্রা ও আর্দ্রতার মধ্যে সংরক্ষণ করা হয়। কয়েক দিন পর সেই একটি মাত্র পিউপা থেকে বেরিয়ে আসে মোট আটটি বোলতা— পাঁচটি স্ত্রী এবং তিনটি পুরুষ।

চমকপ্রদ এ আবিষ্কারের বৈজ্ঞানিক গুরুত্বও কম নয়। অর্ণব চক্রবর্তীর জানিয়েছেন, ‘বিশ্বে টেট্রাস্টিকাস গণের প্রায় ৫০০টি বৈধ প্রজাতি রয়েছে। কিন্তু কচ্ছপ-পোকার উপপরিবার-এর পরজীবী হিসেবে এ গণের সদস্যের নথিভুক্ত ঘটনা এ পর্যন্ত মাত্র তিন বার পাওয়া গিয়েছে। আবার ভারতের ৮৬টি বৈধ টেট্রাস্টিকাস প্রজাতির মধ্যে এ ধরনের সম্পর্কের এটিই দ্বিতীয় নথিভুক্ত উদাহরণ।’ গবেষকদের দাবি, নতুন প্রজাতিটি গঠনগত দিক থেকে ‘টেট্রাস্টিকাস টিউনিকা নারেন্দ্রন, ১৯৮৯’ -এর সঙ্গে কিছুটা সাদৃশ্যপূর্ণ হলেও শরীরের বিভিন্ন অনুপাত, পায়ের রং এবং স্ত্রী বোলতার দেহের শেষাংশে থাকা হাইপোপাইজিয়াম-এর দৈর্ঘ্যের মতো একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্যে তা স্পষ্ট ভাবে আলাদা। সে কারণেই এটিকে সম্পূর্ণ নতুন প্রজাতি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। পরিচয় নিশ্চিত করতে গবেষকরা সুইডেনের লুন্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের কীটতত্ত্ববিদ ক্রিস্টার হ্যানসনের সহযোগিতা নেন। গবেষকদের মতে, এই তথ্য ভবিষ্যতে পরজীবী পতঙ্গের বিবর্তন, পোষক-পতঙ্গের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক এবং জৈবিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা নিয়ে গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।

বিজ্ঞানীদের আরও দাবি, দ্রুত নগরায়নের মধ্যেও রাজারহাটের জলাভূমি এখনো সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্যের আশ্রয়স্থল। এই নতুন আবিষ্কার প্রমাণ করে, শহরের প্রান্তবর্তী জলাভূমি ও সবুজ অঞ্চলগুলি শুধু পরিবেশ রক্ষার জন্য নয়, অজানা প্রাণীজগতের সন্ধান পাওয়ার ক্ষেত্রেও সমান গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক স্তরে এই গবেষণাপত্র গৃহীত হওয়ায় বাংলার বিজ্ঞান গবেষণার মানও নতুন করে স্বীকৃতি পেল বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহল।

উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, অর্ণব চক্রবর্তীর গবেষণা-জীবনে এ ধরনের নামকরণ এই প্রথম নয়। এর আগেও তাঁর গবেষকদল সল্টলেকের বনবিতান-এর নামে একটি নতুন বোলতা প্রজাতির নামকরণ করেছিল। সে ধারাবাহিকতায় এ বার বাংলার সাংস্কৃতিক ইতিহাসের অন্যতম উজ্জ্বল নাম নারায়ণ দেবনাথকে চিরস্থায়ীভাবে জায়গা করে দিল জীববিজ্ঞানের আন্তর্জাতিক শ্রেণিবিন্যাসের পাতায়। বিজ্ঞান ও সংস্কৃতির এই অনন্য মেলবন্ধন তাই শুধু একটি নতুন পতঙ্গ আবিষ্কারের খবর নয়, বরং বাংলার সৃজনশীল ঐতিহ্য এবং বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধিৎসার এক বিরল সম্মিলন হিসেবেও স্মরণীয় হয়ে থাকবে।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!