- টে | ক | স | ই স | হ | জ | পা | ঠ
- জুন ৫, ২০২৬
এআই ডেটা সেন্টার শুষে নিচ্ছে লক্ষ কোটি লিটার পানীয় জল, সতর্কবার্তা রাষ্ট্রপুঞ্জের
একটি প্রশ্ন করলেন। মুহূর্তের মধ্যে উত্তর হাজির। কয়েক সেকেন্ডে তৈরি হয়ে গেল ছবি, ভিডিও কিংবা জটিল কম্পিউটার কোড। প্রযুক্তির বিস্ময়কর ক্ষমতার নেপথ্যে কাজ করছে পৃথিবীর নানা প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা বিশালাকার ডেটা সেন্টার। কিন্তু এ সুবিধার মূল্য কত ? কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তার আড়ালে লুকিয়ে থাকা ভয়াবহ এক বাস্তবতার কথা সামনে আনল রাষ্ট্রপুঞ্জ। তাদের সতর্কবার্তা, ২০৩০ সালের মধ্যে এআই ডেটা সেন্টারগুলির জলচাহিদা এমন পর্যায়ে পৌঁছতে পারে, যা দিয়ে সাব-সাহারান আফ্রিকার ১৩০ কোটি মানুষের এক বছরের ন্যূনতম গার্হস্থ্য প্রয়োজন মেটানো সম্ভব।
রাষ্ট্রপুঞ্জের ইউনিভার্সিটি ইনস্টিটিউট ফর ওয়াটার, এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড হেল্থ (ইউএনইউ-আইএনডব্লিউইএইচ)-এর সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এমনই উদ্বেগজনক তথ্য। গবেষকদের মতে, ২০৩০ সালে বিশ্বজুড়ে ডেটা সেন্টারগুলিতে জলের ব্যবহার দাঁড়াতে পারে ৯.৩ ট্রিলিয়ন লিটার বা প্রায় ৯.৩ লক্ষ কোটি লিটারে। জলবায়ু পরিবর্তন, তাপপ্রবাহ, অনিয়মিত বর্ষণের কারণে পৃথিবীর বিস্তীর্ণ অঞ্চল এই মুহুর্তে জলের সঙ্কটে ভুগছে, এরই মধ্যে রাষ্ট্রপুঞ্জের সতর্কবার্তায় চরম উদ্বেগ ছড়িয়েছে বিশ্বজুড়ে।
প্রশ্ন উঠছে, এআইয়ের জন্য এত জল লাগে কেন? অনেকের কাছেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা একটি সফটওয়্যার মাত্র। মোবাইল বা কম্পিউটারের পর্দায় দেখা কিছু লেখা, ছবি বা উত্তর। কিন্তু বাস্তবে এআই কোনো বিমূর্ত প্রযুক্তি নয়। এর পিছনে রয়েছে হাজার হাজার শক্তিশালী গ্রাফিক্স প্রসেসিং ইউনিট বা জিপিইউ, কোটি কোটি ট্রানজিস্টর, বিশাল সার্ভার ফার্ম এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ। চ্যাটজিপিটি, জেমিনি, ক্লড কিংবা অন্যান্য বৃহৎ ভাষা মডেল প্রতি মুহূর্তে বিপুল পরিমাণ তথ্য বিশ্লেষণ করে। সে কাজ করতে গিয়ে সার্ভারগুলি প্রবল উত্তাপ উৎপন্ন করে। আর ওই তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করতেই প্রয়োজন হয় বিপুল পরিমাণ জলের।
বিশেষজ্ঞদের ব্যাখ্যা, ডেটা সেন্টারগুলিতে সাধারণত দু–ধরনের কুলিং প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়—ইভাপোরেটিভ কুলিং এবং চিলড ওয়াটার সিস্টেম। প্রথম ক্ষেত্রে জলের বাষ্পীভবনের মাধ্যমে গরম বাতাসকে ঠান্ডা করা হয়। দ্বিতীয় ক্ষেত্রে পাইপলাইনের মাধ্যমে ঠান্ডা জল সার্ভার রুমের চারপাশে ঘুরিয়ে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখা হয়। সমস্যার জায়গা হলো, এই ব্যবস্থার জন্য সমুদ্রের নোনা জল বা দূষিত জল ব্যবহার করা যায় না। প্রয়োজন হয় বিশুদ্ধ মিষ্টি জলের। আর সে জল অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আসে ভূগর্ভস্থ জলভাণ্ডার বা মানুষের ব্যবহারযোগ্য জলসম্পদ থেকে।
এআইয়ের ‘তৃষ্ণা’ কতটা ভয়াবহ, তার ধারণা পাওয়া গেছে বিভিন্ন গবেষণায়। ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১০ থেকে ৫০টি সাধারণ প্রশ্নের উত্তর দিতে একটি বৃহৎ ভাষা মডেলের প্রায় ৫০০ মিলিলিটার জল খরচ হতে পারে। সংখ্যাটি আপাতদৃষ্টিতে সামান্য মনে হলেও যখন প্রতিদিন কোটি কোটি মানুষ এই পরিষেবা ব্যবহার করেন, তখন সামগ্রিক জলব্যবহার আকাশছোঁয়া হয়ে ওঠে। বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় এআই পরিষেবাগুলি প্রতিদিন প্রায় ২৫০ কোটি ‘প্রম্পট’ প্রক্রিয়াকরণ করে বলে অনুমান।
শুধু জল নয়, রাষ্ট্রপুঞ্জের রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বিশ্বজুড়ে ডেটা সেন্টারগুলি মোট ৪৪৮ টেরাওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ ব্যবহার করেছে। এই পরিমাণ বিদ্যুৎ সৌদি আরবের মোট বিদ্যুৎ ব্যবহারেরও বেশি। সেই সঙ্গে ব্যবহৃত হয়েছে প্রায় ৪.৫ ট্রিলিয়ন লিটার জল এবং নির্গত হয়েছে ১৮৯ মিলিয়ন টন কার্বন ডাই-অক্সাইড। গবেষকদের মতে, বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ২০৩০ সালের মধ্যে বিদ্যুৎ ব্যবহার বেড়ে ৯৪৫ টেরাওয়াট-ঘণ্টায় পৌঁছবে। যা প্রায় জাপানের মোট বার্ষিক বিদ্যুৎ ব্যবহারের সমান, পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও নাইজেরিয়ার সম্মিলিত বিদ্যুৎ চাহিদার প্রায় তিনগুণ।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৫ সালে ডেটা সেন্টারগুলির ব্যবহৃত বিদ্যুৎ দিয়ে ১৩০ কোটি মানুষের আবাসিক বিদ্যুৎ চাহিদা টানা আড়াই বছরেরও বেশি সময় মেটানো যেত। যদি ডেটা সেন্টারগুলিকে একটি পৃথক দেশ ধরা হয়, তবে বিদ্যুৎ ব্যবহারের নিরিখে তারা বিশ্বের একাদশ বৃহত্তম শক্তি-গ্রাহক সত্তা হিসেবে গণ্য হতো। রাষ্ট্রপুঞ্জের গবেষকদের মতে, পরিবেশগত প্রভাবের ক্ষেত্রে শুধু কার্বন নিঃসরণ দেখলে চলবে না। বিদ্যুতের পাশাপাশি প্রতিটি ইউনিট শক্তির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে জল ব্যবহার, জমির ব্যবহার এবং প্রাকৃতিক সম্পদের উপর চাপ। ২০২৫ সালে ডেটা সেন্টারগুলির মোট ভূমি-পদচিহ্ন ছিল প্রায় ৬,৯০০ বর্গকিলোমিটার। ২০৩০ সালের মধ্যে তা বেড়ে ১৪,৫০০ বর্গকিলোমিটারেরও বেশি হতে পারে। অর্থাৎ, প্রায় একটি মাঝারি আকারের দেশের সমান এলাকা এআই অবকাঠামোর জন্য প্রয়োজন হবে।
এআই-এর বাড়বাড়ন্ত ঘিরে আরও বড়ো উদ্বেগ হল তথাকথিত ‘ডেটা হিট আইল্যান্ড’ প্রভাব। এখনো সমীক্ষা-পর্যালোচনার অপেক্ষায় থাকা এক গবেষণায় দাবি করা হয়েছে, কোনো এআই ডেটা সেন্টার চালু হওয়ার পর আশপাশের এলাকার ভূমিপৃষ্ঠের তাপমাত্রা গড়ে ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। চরম ক্ষেত্রে সেই বৃদ্ধি ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পৌঁছতে পারে। গবেষকদের মতে, ডেটা সেন্টার থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূর পর্যন্ত এই প্রভাব অনুভূত হতে পারে। এর ফলে বিশ্বজুড়ে ৩৪ কোটিরও বেশি মানুষ প্রভাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। রাষ্ট্রপুঞ্জের রিপোর্টে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক তত্ত্বের উল্লেখ করা হয়েছে—‘জেভন্স প্যারাডক্স’। এ তত্ত্ব অনুযায়ী, কোনো প্রযুক্তি যত বেশি দক্ষ ও সস্তা হয়, তার ব্যবহারও তত দ্রুত বাড়ে। ফলে মোট সম্পদ ব্যবহার কমার বদলে বরং বেড়ে যায়। গবেষকদের আশঙ্কা, এআইয়ের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটতে পারে। প্রযুক্তি যত উন্নত হবে, তত বেশি মানুষ এবং প্রতিষ্ঠান তা ব্যবহার করবে। ফলে শক্তি ও জল ব্যবহারের চাপ আরও বাড়বে।
ভারতের প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্রপুঞ্জের সতর্কবার্তা আরও তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ সম্প্রতি দেশ জুড়ে দ্রুত গড়ে উঠছে একের পর এক মেগা ডেটা সেন্টার। কেন্দ্র এবং বিভিন্ন রাজ্য সরকার বিদেশি বিনিয়োগ টানতে সস্তায় জমি, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ এবং জল সরবরাহের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। কিন্তু একই সময়ে চেন্নাই, বেঙ্গালুরু, হায়দরাবাদ-সহ একাধিক শহর গ্রীষ্মকালে ভয়াবহ জলসংকটের মুখোমুখি হচ্ছে। ২০১৯ সালে চেন্নাই কার্যত ‘ডে জিরো’-র অভিজ্ঞতার সাক্ষী হয়েছিল। শহরের প্রধান জলাধারগুলি শুকিয়ে গিয়েছিল। অথচ সেই চেন্নাইই আজ দেশের অন্যতম বৃহত্তম ডেটা সেন্টার হাব। বেঙ্গালুরু– হায়দ্রাবাদেও একই ছবি। প্রতি বছর গরম পড়লেই জল ট্যাঙ্কারের জন্য দীর্ঘ লাইন দেখা যায়। অথচ একই সময়ে প্রযুক্তি সংস্থাগুলির জন্য নিশ্চিত করা হচ্ছে লক্ষ লক্ষ গ্যালন বিশুদ্ধ জলের সরবরাহ।
পরিবেশবিদদের একাংশের মতে, এটাই ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড়ো দ্বন্দ্ব—ডিজিটাল অর্থনীতি বনাম প্রাকৃতিক সম্পদ। একদিকে কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন, অন্যদিকে পানীয় জল, কৃষি এবং স্থানীয় পরিবেশের সুরক্ষা।বিতর্কের মুখে বহু প্রযুক্তি সংস্থা নিজেদের ‘ওয়াটার পজিটিভ’ বলে দাবি করছে। অর্থাৎ, তারা যতটা জল ব্যবহার করবে, তার চেয়ে বেশি জল প্রকৃতিতে ফিরিয়ে দেবে। বৃষ্টির জল সংরক্ষণ, জলাশয় পুনরুদ্ধার ও পুনর্ব্যবহারের মতো প্রকল্পের কথা বলা হচ্ছে। তবে পরিবেশবিদদের প্রশ্ন, যে এলাকায় জল ব্যবহার করা হচ্ছে, সে এলাকার মানুষ কি সত্যিই তার সুফল পাচ্ছেন? না কি অন্য কোথাও প্রকল্প দেখিয়ে কেবল পরিসংখ্যানের খাতায় ভারসাম্য বজায় রাখা হচ্ছে?
উদ্বেগের মধ্যেও কিছু সম্ভাবনার কথা বলছেন বিশেষজ্ঞরা। লিকুইড ইমার্সন কুলিংয়ের মতো নতুন প্রযুক্তি জলের ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে পারে। এই পদ্ধতিতে সার্ভারগুলিকে বিশেষ ধরনের ডাই-ইলেকট্রিক তরলের মধ্যে রাখা হয়, যা বিদ্যুৎ পরিবহণ করে না, কিন্তু তাপ দ্রুত শোষণ করতে পারে। একই সঙ্গে ক্লোজড-লুপ কুলিং ব্যবস্থা এবং পুনর্ব্যবহৃত জলের ব্যবহারও ডেটা সেন্টারের জলনির্ভরতা কমাতে সাহায্য করতে পারে। তবে রাষ্ট্রপুঞ্জের গবেষকদের মতে, প্রযুক্তিগত সমাধানই যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন কঠোর নীতি, স্বচ্ছতা আর পরিবেশগত জবাবদিহি। কোন এলাকায় ডেটা সেন্টার তৈরি হবে, কত জল ব্যবহার হবে, কতটা পুনর্ব্যবহার করা হবে—এসব তথ্য জনসমক্ষে আনা জরুরি। একই সঙ্গে জলসংকটপ্রবণ অঞ্চলে নতুন ডেটা সেন্টার অনুমোদনের আগে পরিবেশগত মূল্যায়ন বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন।
প্রযুক্তির ইতিহাসে এআই নিঃসন্দেহে এক যুগান্তকারী উদ্ভাবন। কিন্তু রাষ্ট্রপুঞ্জের সতর্কবার্তা স্পষ্ট—এআইয়ের প্রকৃত মূল্য শুধু বিদ্যুতের বিল বা সফটওয়্যারের সাবস্ক্রিপশনে মাপা যাবে না। তার হিসাব রাখতে হবে জল, জমি, খনিজ, পরিবেশ আর ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অধিকারের খাতাতেও। কারণ পর্দার ওপারে যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আমাদের জীবন সহজ করে তুলছে, তার নেপথ্যে কোথাও না কোথাও হয়তো ক্রমশ শুকিয়ে আসছে একটি জলাধার, নেমে যাচ্ছে ভূগর্ভস্থ জলের স্তর, কিংবা আরও কঠিন হয়ে উঠছে কোনো মানুষের দৈনন্দিন জল সংগ্রহের লড়াই।
❤ Support Us







