Advertisement
  • টে | ক | স | ই প্রচ্ছদ রচনা
  • মে ২০, ২০২৬

এআই-শাসিত দ্বীপ ! গান্ধী-চার্চিলের ‘ডিজিটাল মন্ত্রিসভা’ গড়তে চলেছেন ব্রিটিশ উদ্যোক্তা

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
এআই-শাসিত দ্বীপ ! গান্ধী-চার্চিলের ‘ডিজিটাল মন্ত্রিসভা’ গড়তে চলেছেন ব্রিটিশ উদ্যোক্তা

এ যেন কোনো কল্পবিজ্ঞান উপন্যাসের কাহিনি। কিংবা ভবিষ্যতের পৃথিবী নিয়ে তৈরি হলিউডি থ্রিলারের চিত্রনাট্য। কিন্তু কল্পনা নয়বাস্তবেই ফিলিপাইনের একটি ছোট দ্বীপকে সম্পূর্ণ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর হাতে তুলে দেওয়ার পরিকল্পনা করছেন এক প্রযুক্তি উদ্যোক্তা। সেখানে প্রশাসন চালাবে মানুষের নির্বাচিত সরকার নয়বরং ইতিহাসের বিখ্যাত রাষ্ট্রনেতা ও দার্শনিকদের আদলে তৈরি এআই মন্ত্রিসভা। আর সে পরিকল্পনাকে ঘিরেই ইতিমধ্যে তীব্র কৌতূহল যেমন তৈরি হয়েছেতেমনই বাড়ছে উদ্বেগও।

ফিলিপাইনের পালাওয়ান দ্বীপপুঞ্জের মধ্যে ছোট্ট একটি দ্বীপ সেনসে। আয়তন মাত্র ৩.৬ বর্গকিলোমিটার। ২০২৫ সালে দ্বীপটি কিনে নেন ব্রিটিশ প্রযুক্তি উদ্যোক্তা ড্যান থমসন। তিনি একটি এআই চ্যাটবট সংস্থা পরিচালনা করেন। তাঁর লক্ষ্যসেনসেকে বিশ্বের প্রথম এআই-শাসিত মাইক্রোনেশন’-এ পরিণত করা। থমসনের পরিকল্পনা অনুযায়ীদ্বীপটির প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নেবে ১৭ সদস্যের একটি ডিজিটাল কাউন্সিল। সে কাউন্সিলে থাকবেন মহাত্মা গান্ধীউইনস্টন চার্চিলনেলসন ম্যান্ডেলাএলিনর রুজভেল্টমার্কাস অরেলিয়াসলিওনার্দো দা ভিঞ্চি ও সান জুর মতো ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বদের এআই প্রতিরূপ। তাঁদের লেখাবক্তৃতাদর্শনরাজনৈতিক অবস্থান ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ধরন বিশ্লেষণ করেই তৈরি করা হয়েছে ডিজিটাল ব্যক্তিত্ব

উদ্যোক্তার দাবিতাঁরা কেবল তথ্য বিশ্লেষণই করবেন নানিজেদের মতাদর্শ অনুযায়ী বিতর্ক করবেনমত দেবেন এবং ভোটাভুটির মাধ্যমে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তও নেবেন। থমসনের মতে, ‘মানবশাসনের সবচেয়ে বড়ো সমস্যা ব্যক্তিগত স্বার্থলবিবাজি ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্য। আমরা দেখতে চাইযদি ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ চিন্তাবিদদের দর্শনের ভিত্তিতে কোনো রাষ্ট্র চালানো হয়তবে সেটি কতটা নিরপেক্ষ ও কার্যকর হতে পারে।’ তবে এ প্রকল্পকে ঘিরে আশঙ্কাও কম নয়। প্রযুক্তিবিদদের একাংশের মতেমানুষের প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণ ছাড়া এআই-কে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা দেওয়া অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। বর্তমানে সেনসের এআই কাউন্সিলের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জন্য মানব প্রতিনিধিদের ব্যবহার করা হলেওভবিষ্যতে সেই ব্যবস্থাকে আরও স্বাধীন করে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। জানা গিয়েছেআগামী দিনে এআই কাউন্সিলকে সরাসরি ব্যাঙ্ক কার্ডক্রিপ্টো কারেন্সি এবং আর্থিক লেনদেন ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করা হতে পারে। অর্থাৎমানুষের অনুমতি ছাড়াই এআই কর্মী নিয়োগঅর্থ প্রদান বা প্রশাসনিক খরচ নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হবে।

আর এই সম্ভাবনাই উদ্বেগ বাড়াচ্ছে বিশেষজ্ঞ মহলে। কারণএকবার যদি এআই নিজস্ব সিদ্ধান্ত বাস্তব জগতে কার্যকর করতে শুরু করেতবে তার ফলাফল কোথায় গিয়ে দাঁড়াবেতা নিয়ে নিশ্চিত নন কেউই। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে থমসন নিজেও সম্ভাব্য বিপদের কথা স্বীকার করেছেন। তিনি বলেছে, ‘যদি কোনো দিন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা অস্ত্র সংগ্রহ করতে শুরু করে বা পাশের দ্বীপে আক্রমণের মতো সিদ্ধান্ত নেয়তা হলে পরিস্থিতি ভয়ঙ্কর হতে পারে।’ যদিও তাঁর দাবি, ‘এমন কিছু ঘটার সম্ভাবনা অত্যন্ত কম।’ সম্ভাব্য বিপদ মোকাবিলার জন্য ইতিমধ্যেই হিউম্যান ওভাররাইড অ্যাসেম্বলি’ নামে মানুষের কমিটিও গঠন করা হয়েছে। সেখানে থাকবেন ৯ জন নির্বাচিত সদস্যযাঁরা প্রয়োজন পড়লে এআই কাউন্সিলের সিদ্ধান্ত বাতিল করতে পারবেন।

খনো পর্যন্ত সেনসে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পায়নি। তবে পরীক্ষামূলক এই প্রকল্প ঘিরে সাধারণ মানুষের আগ্রহ ক্রমশ বাড়ছে। উদ্যোক্তার দাবিইতিমধ্যেই ১২ হাজারেরও বেশি মানুষ ‘ডিজিটাল নাগরিক’ হওয়ার জন্য আবেদন করেছেন। যাদের আবেদন মঞ্জুর হবে, সংস্থার তরফে তাদের একটি ডিজিটাল পরিচয়পত্র দেওয়া হবে, যার মাধ্যমে ভবিষ্যতে দ্বীপের বিভিন্ন অনলাইন পরিষেবা ব্যবহার করা যাবে। থমসনের মতেএত মানুষের আগ্রহের নেপথ্যে রয়েছে বর্তমান রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি ক্রমবর্ধমান অনাস্থা। তিনি বলেছেন, ‘অনেকেই তাঁদের নিজেদের সরকারের উপর আস্থা হারাচ্ছেন। তাই বিকল্প শাসনব্যবস্থা নিয়ে মানুষের কৌতূহল বাড়ছে।’

বর্তমানে সেনসে দ্বীপে স্থায়ীভাবে থাকেন মাত্র একজন গ্রাউন্ডসকিপার। তবে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে সেখানে ৩০টি আবাসন নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। পর্যটনকেন্দ্র হিসেবেও দ্বীপটিকে গড়ে তুলতে চান উদ্যোক্তা। পাশাপাশি নবীকরণযোগ্য শক্তিনির্ভর বিদ্যুৎ ব্যবস্থাগবেষণাগার এবং ডিজিটাল অবকাঠামো গড়ে তোলার কাজও শুরু হতে পারে ২০২৬ সালের মধ্যেই। সেনসের ওয়েবসাইট সূত্রে জানা গিয়েছে২০২৭ সালে পূর্ণাঙ্গ ই-রেসিডেন্সি প্রকল্প চালু হবে। সে সময় থেকেই ধাপে ধাপে স্থায়ী বাসিন্দাদেরও থাকার অনুমতি দেওয়া হতে পারে। চমকপ্রদ, যুগন্তকারী এই ‘রাষ্ট্রব্যবস্থা’র পরিকল্পনা দেখে একদিকে যেমন বিশ্বজুড়ে আগ্রহ বাড়ছে, তেমনি প্রশ্ন উঠছে, ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ মনীষীদের ডিজিটাল অবতার’ কি সত্যিই নিরপেক্ষ ও মানবিক শাসন দিতে পারবেনা কি প্রযুক্তির উপর অতিরিক্ত নির্ভরতা ভবিষ্যতের আরও বড়ো সঙ্কট ডেকে আনবেউত্তর এখনও অজানা। 


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!