- এই মুহূর্তে বি। দে । শ
- মে ২০, ২০২৬
আফ্রিকা থেকে ছড়াচ্ছে বিরল ইবোলা, কাঁপছে বিশ্ব, সতর্ক ভারত
করোনা অতিমারির বিভীষিকা কাটিয়ে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক জীবনে ফিরেছে পৃথিবী, ঠিক তখনই মধ্য আফ্রিকা থেকে নিঃশব্দে মাথা তুলছে আরও এক ভয়ঙ্কর ভাইরাস। নাম তার ইবোলা। ডেমোক্র্যাটিক রিপাবলিক অব কঙ্গো এবং উগান্ডা জুড়ে দ্রুত ছড়িয়ে পড়া এই সংক্রমণ এখন গোটা বিশ্বকে নতুন করে আতঙ্কের মুখে দাঁড় করিয়েছে। পরিস্থিতির ভয়াবহতায় উদ্বিগ্ন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ইতিমধ্যেই জারি করেছে আন্তর্জাতিক জনস্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা। বিশ্বজুড়ে সর্বোচ্চ স্তরের সতর্কতা জারি হয়েছে।
আতঙ্কের কারণও যথেষ্ট। কারণ এবার যে ইবোলা ছড়াচ্ছে, তা ইবোলা ভাইরাসের এক বিরল রূপ— বান্ডিবুগিও স্ট্রেন। এ সংক্রমণ প্রথম ধরা পড়ে ২০০৭ সালে উগান্ডার বান্ডিবুগিও জেলায়। সে সময় ১৪৯ জন আক্রান্ত হয়েছিলেন এবং মৃত্যু হয়েছিল ৩৭ জনের। পরে ২০১২ সালে কঙ্গোর ইসিরো স্বাস্থ্য অঞ্চলে দ্বিতীয় প্রাদুর্ভাব দেখা যায়। সেখানে ৫২ জন আক্রান্ত হন এবং মৃত্যু হয় ২৯ জনের। সবচেয়ে ভয়ঙ্কর বিষয়, এই স্ট্রেনের বিরুদ্ধে এখনো পর্যন্ত কোনো নির্দিষ্ট ওষুধ বা অনুমোদিত টিকা নেই। এ মুহূর্তে পরীক্ষামূলক কিছু টিকা ও ওষুধ নিয়ে আলোচনা চলছে। মার্ক সংস্থার এরভেবো, ম্যাপ বায়োফার্মাসিউটিক্যালের এমবিপি-১৩৪ এবং অরো ভ্যাকসিনসের ভেসিকুলোভ্যাক্স নিয়ে গবেষণা চলছে। চিনের একটি বার্তাবাহক আরএনএ-ভিত্তিক টিকা পরীক্ষাগারে আশাব্যঞ্জক ফল দেখালেও তা এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। ফলে আক্রান্তকে আলাদা রাখা, সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের খুঁজে বের করা, নিরাপদ চিকিৎসা এবং সতর্কতাই এখন একমাত্র অস্ত্র।
পূর্ব কঙ্গোর পরিস্থিতি ইতিমধ্যেই ভয়াবহ আকার নিয়েছে। সরকারি হিসেব অনুযায়ী এ পর্যন্ত ১২০ জনেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। একাধিক আন্তর্জাতিক রিপোর্টে মৃতের সংখ্যা ১৩০ ছাড়িয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে। আক্রান্ত কয়েকশো। সন্দেহভাজন সংক্রমণের সংখ্যা ৫০০-রও বেশি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, নজরদারি যত বাড়বে, প্রকৃত সংক্রমণের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। কারণ বহু প্রত্যন্ত অঞ্চলে এখনো স্বাস্থ্যকর্মীরা পৌঁছতেই পারেননি। আরও উদ্বেগজনক বিষয়, সংক্রমণ এখন আর নির্দিষ্ট অঞ্চলে সীমাবদ্ধ নেই। কঙ্গোর বুনিয়া, গোমা, মঙ্গবালু, বুটেম্বো এবং নিয়াকুন্ডের মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় ইতিমধ্যেই সংক্রমণ নিশ্চিত হয়েছে। বিশেষ করে গোমা শহর নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। কারণ উত্তর কিভুর ওই এলাকা বিদ্রোহী-নিয়ন্ত্রিত এবং সেখানে দীর্ঘদিন ধরেই অস্থিরতা চলছে। যুদ্ধবিধ্বস্ত পরিস্থিতি, দুর্বল স্বাস্থ্যব্যবস্থা এবং মানুষের ঘনবসতি— সব মিলিয়ে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে উঠছে। ইতিমধ্যেই উগান্ডাতেও সংক্রমণের ঘটনা সামনে এসেছে। ফলে সীমান্ত পেরিয়ে রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা প্রবল।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালক টেড্রোস আধানম গেব্রেইসাস বলেছেন, ‘সংক্রমণের মাত্রা এবং গতিবেগ অত্যন্ত উদ্বেগজনক। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে।’ চিকিৎসকরা বলছেন, ইবোলা এমন এক নীরব শত্রু, যে প্রথমে সাধারণ ভাইরাল জ্বরের মতো শরীরে ঢোকে। জ্বর, গা ব্যথা, দুর্বলতা, মাথাব্যথা, গলা ব্যথা বা ডায়রিয়ার মতো উপসর্গ দেখা দেয়। অনেকেই প্রথমে বিষয়টিকে সাধারণ সংক্রমণ বলে ভুল করেন। কিন্তু ধীরে ধীরে ভাইরাস শরীরের ভিতরে ভয়ঙ্কর ধ্বংসলীলা শুরু করে। শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকে। লিভার, কিডনি, হার্ট বিকল হতে শুরু করে। শুরু হয় অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণ। অনেক ক্ষেত্রে চোখ, নাক, মুখ কিংবা চামড়ার নীচ থেকেও রক্তপাত হতে থাকে। শেষ পর্যন্ত একাধিক অঙ্গ বিকল হয়ে মৃত্যু ঘটে। আক্রান্ত হওয়ার পর উপসর্গ দেখা দিতে দুই দিন থেকে তিন সপ্তাহ পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। সাধারণত আট থেকে দশ দিনের মধ্যে লক্ষণ স্পষ্ট হয়। তবে উপসর্গ প্রকাশ না পাওয়া পর্যন্ত আক্রান্ত ব্যক্তি সংক্রামক হন না। কিন্তু এক বার লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত অন্যের শরীরে ভাইরাস ছড়িয়ে পড়তে পারে।
তবে, এ ভাইরাস করোনা ভাইরাসের মতো হাঁচি-কাশির মাধ্যমে দূরত্বে ভেসে গিয়ে সংক্রমণ ঘটায় না ইবোলা। কিন্তু আক্রান্তের রক্ত, ঘাম, লালা, চোখের জল, বমি, মল বা শরীরের অন্যান্য তরলের সংস্পর্শে এলেই বিপদ। আক্রান্তের ব্যবহৃত জামাকাপড়, বিছানা বা চিকিৎসার সরঞ্জাম থেকেও ভাইরাস ছড়াতে পারে। চিকিৎসক, নার্স, ত্রাণকর্মী এবং পরিবারের সদস্যরাই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন। ইতিমধ্যেই একাধিক স্বাস্থ্যকর্মীর মৃত্যু হয়েছে বলে আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ইবোলার সবচেয়ে বড়ো বাহক এক ধরনের ফলখেকো বাদুড়। বাদুড় নিজেরা অসুস্থ না হলেও তাদের শরীরে ভাইরাস বাসা বাঁধে। সেখান থেকে তা বাঁদর, বনমানুষ বা বন্যপ্রাণীর শরীরে ছড়ায়। পরে কোনো ভাবে মানুষ আক্রান্ত প্রাণীর সংস্পর্শে এলে বা মাংস খেলে ভাইরাস মানবদেহে ঢুকে পড়ে। তারপর এক জন থেকে অন্য জনের শরীরে ছড়িয়ে পড়তে থাকে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, মধ্য আফ্রিকার বনভূমি ধ্বংস, জলবায়ু পরিবর্তন, বন্যপ্রাণীর আবাসস্থলে মানুষের অনুপ্রবেশ এবং দুর্বল স্বাস্থ্যব্যবস্থাই এই ধরনের ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার অন্যতম কারণ। করোনা, নিপা, হান্টাভাইরাস, বার্ড ফ্লু— একের পর এক সংক্রমণ এখন আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয় বলেই মনে করছেন গবেষকরা। এ পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠছে, আফ্রিকার হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে বসে ভারতের উদ্বিগ্ন হওয়ার কী কারণ? চিকিৎসকদের মতে, ভয় পাওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে। করোনা অতিমারিও প্রথমে দূরের দেশের সমস্যা বলেই মনে হয়েছিল। পরে আন্তর্জাতিক যাতায়াতের মাধ্যমে তা মুহূর্তে পৃথিবী জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। এখনো প্রতিদিন আফ্রিকা-সহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বহু মানুষ ভারতে আসছেন। ভারতীয়রাও নিয়মিত বিদেশ সফরে যাচ্ছেন। ফলে কোনো আক্রান্ত ব্যক্তি যদি অজান্তে ভারতে প্রবেশ করেন, তা হলে ঘনবসতিপূর্ণ দেশে পরিস্থিতি দ্রুত জটিল হয়ে উঠতে পারে।
যদিও ভারতের স্বাস্থ্য মন্ত্রক জানিয়েছে, দেশে এখনো পর্যন্ত কোনো ইবোলা আক্রান্তের খবর মেলেনি। তবু ঝুঁকি নিতে নারাজ কেন্দ্র। ইতিমধ্যেই স্বাস্থ্যমন্ত্রক, ন্যাশনাল সেন্টার ফর ডিজ়িজ় কন্ট্রোল, ইন্টিগ্রেটেড ডিজিজ সার্ভেইল্যান্স প্রোগ্রাম, আইসিএমআর এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সংস্থাকে নিয়ে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক হয়েছে। পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে বিমানবন্দর এবং সমুদ্রবন্দরে নজরদারি বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বিদেশ থেকে ফেরা যাত্রীদের কড়া স্ক্যানিং শুরু হয়েছে। সন্দেহভাজন রোগীদের দ্রুত শনাক্ত করে পরীক্ষার ব্যবস্থা রাখা হচ্ছে। পুনের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ভাইরোলজি এবং দিল্লির ন্যাশনাল সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোলকে পরিকাঠামো আরও জোরদার করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজন হলে অতিরিক্ত পরীক্ষাগারও প্রস্তুত রাখা হবে।
তবে চিকিৎসকরা বারবার বলছেন, আতঙ্ক নয়, সচেতনতাই এখন সবচেয়ে জরুরি। এখনই মাস্ক বা ওষুধ মজুত করার প্রয়োজন নেই। বরং নিয়মিত হাত ধোওয়া, অসুস্থ ব্যক্তির সংস্পর্শ এড়ানো, অন্যের খাবার না খাওয়া এবং আন্তর্জাতিক সফরের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকাই জরুরি। বিশেষ করে বন্যপ্রাণী বা বাদুড়ের সংস্পর্শ এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে চিকিৎসকরা সতর্ক করছেন আরও একটি বিপদের বিষয়ে— গুজব। তাঁদের বক্তব্য, ভাইরাসের থেকেও দ্রুত ছড়ায় সামাজিক মাধ্যমের আতঙ্ক এবং ভুয়ো খবর। করোনা অতিমারির সময়ও গুজব পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছিল। তাই তথ্য যাচাই না করে আতঙ্ক ছড়াতে নিষেধ করা হয়েছে।
তবু বিশেষজ্ঞদের একাংশ বলছেন, প্রকৃতির এই অদৃশ্য শত্রুকে হালকাভাবে নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। কারণ ইবোলা এমন এক রোগ, যার মৃত্যুহার অনেক বেশি। ১৯৭৬ সালে প্রথম ইবোলার প্রকোপ ধরা পড়ার পর থেকে বহু বার আফ্রিকায় আঘাত হেনেছে এ ভাইরাস। কিন্তু দুর্বল স্বাস্থ্যব্যবস্থা এবং প্রয়োজনীয় পরিকাঠামোর অভাবে প্রতিবারই পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়েছে। অ্যাজিলাস ডায়াগনস্টিকসের প্রধান মাইক্রোবায়োলজিস্ট ডা. মমতা কুমারী বলেছেন, ‘বিশ্বজুড়ে তাপমাত্রা বৃদ্ধি, অনিয়মিত বৃষ্টি, বন্যা, খরা এবং বন উজাড়ের ফলে বাদুড়, ইঁদুর এবং বন্যপ্রাণীরা মানুষের বসতির কাছাকাছি চলে আসছে। ভারতও ব্যতিক্রম নয়, ফলে ভাইরাস ছড়ানোর ঝুঁকি বাড়ছে।’
❤ Support Us







