- এই মুহূর্তে দে । শ
- মে ২০, ২০২৬
সুপ্রিম বিচারপতির মন্তব্যে ক্ষুব্ধ জেন-জি, ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ ঘিরে ডিজিটাল ঝড়
ভারতীয় রাজনীতিতে দল ভাঙা, নতুন দল গঠন, আঞ্চলিক শক্তির উত্থান এসব খবর নতুন নয়। কিন্তু বিচারপতির একটি মন্তব্য ঘিরে যে ‘ককরোচ’ নামের রাজনৈতিক দল তৈরি হতে পারে এবং এবং তা কয়েক দিনের মধ্যে দেশের তরুণ সমাজের ক্ষোভ, হতাশা ও বিদ্রূপের মুখ হয়ে উঠতে পারে, লক্ষ লক্ষ তরুণের সমর্থন পেতে পারে, তা হয়তো কল্পনাও করেননি কেউ। সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের একটি মন্তব্য ঘিরে এ বার সে ঘটনাই ঘটল। আর সেই ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি) এখন নেটদুনিয়ার নতুন রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।
সব কিছুর সূত্রপাত গত শুক্রবার। সুপ্রিম কোর্টে শুনানির সময় প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত মন্তব্য করেন, ‘কিছু মানুষ পরজীবীর মতো সিস্টেমকে আক্রমণ করছে। এমন কিছু যুবক আছে যারা ককরোচের মতো— চাকরি নেই, কোনো পেশায় জায়গা নেই। কেউ মিডিয়ায় যায়, কেউ সোশ্যাল মিডিয়ায়, কেউ আরটিআই অ্যাক্টিভিস্ট হয়ে সবাইকে আক্রমণ করতে শুরু করে।’ মুহূর্তেই এ মন্তব্য মুহূর্তের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক মাধ্যমে। জেন-জি প্রজন্মের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। বহু তরুণ-তরুণী মনে করেন, দেশের ক্রমবর্ধমান বেকারত্ব, মূল্যবৃদ্ধি এবং প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় দুর্নীতির আবহে এমন মন্তব্য আসলে যুবসমাজের অপমান।
পরিস্থিতি দ্রুত জটিল হয়ে ওঠায় পরে ব্যাখ্যা দেন বিচারপতি সূর্য কান্ত। তিনি দাবি করেন, তাঁর মন্তব্যকে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। তিনি না কি ভারতের বেকার যুবকদের উদ্দেশ করে কথা বলেননি। বরং কিছু ভুয়ো ডিগ্রিধারী ব্যক্তিকে লক্ষ্য করেই ওই মন্তব্য করেছিলেন। একই সঙ্গে তিনি জানান, ভারতের যুবসমাজই ‘উন্নত ভারতের স্তম্ভ’। কিন্তু ততক্ষণে বিতর্ক অনেক দূর গড়িয়ে গিয়েছে। দেশজুড়ে যখন সামাজিক মাধ্যমে ক্ষোভ বাড়ছে, তখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগোয় থাকা ৩০ বছর বয়সি ভারতীয় যুবক অভিজিৎ দীপকে এক্স-এ একটি পোস্ট করেন— ‘What if all cockroaches come together?’ অর্থাৎ, ‘ কী হবে যদি সব আরশোলারা জোট বাঁধে?’ প্রথমে নিছক রসিকতা হিসেবেই দেখা হয়েছিল পোস্টটিকে। কিন্তু কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সেটি ভাইরাল হয়ে যায়। এর পর অভিজিৎ তৈরি করেন ‘ককরোচ জনতা পার্টি’।
বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জনসংযোগ বিষয়ে পড়াশোনা করা অভিজিৎ দীপকে সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, গত কয়েক দিনে তিনি প্রায় ঘুমোতেই পারেননি। অবিরাম বার্তা, ফোন, অনলাইন সদস্যপদ, সাক্ষাৎকার— সব সামলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাঁকে। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘ক্ষমতায় থাকা মানুষরা নাগরিকদের ককরোচ আর পরজীবী মনে করেন। কিন্তু তাঁরা ভুলে যান, ককরোচ নোংরা জায়গাতেই জন্মায়। আজকের ভারতও তেমন হয়ে উঠছে।’ তাঁর বক্তব্য, তিনি কখনো ভাবেননি যে একটি ব্যঙ্গাত্মক পোস্ট এত বড়ো আন্দোলনে পরিণত হবে। তাঁর দাবি, গোটা সমর্থন সম্পূর্ণ স্বতঃস্ফূর্ত। এআই ব্যবহার করে মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তিনি দলের লোগো, ওয়েবসাইট, সামাজিক মাধ্যমের প্রচারসামগ্রী এবং ঘোষণাপত্র তৈরি করেছেন। তার পর থেকেই বিস্ফোরণের গতিতে ছড়াতে থাকে সিজেপি।
দলের ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট কয়েক দিনের মধ্যেই ৩০ লক্ষের বেশি অনুসরণকারী পেয়ে যায় বলে দাবি করা হয়েছে। এক্স-এও কয়েক লক্ষ মানুষ তাদের অনুসরণ করতে শুরু করেন। গুগল ফর্মের মাধ্যমে সদস্যপদের আবেদন জমা পড়ে কয়েক লক্ষ। কেউ কেউ একে ‘ভারতের প্রথম পূর্ণাঙ্গ মিম-রাজনৈতিক আন্দোলন’ বলেও বর্ণনা করছেন। তবে, এ আন্দোলনের প্রতি আকর্ষণ শুধু সাধারণ তরুণদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। তৃণমূল কংগ্রেস সাংসদ মহুয়া মৈত্র এবং প্রাক্তন ক্রিকেটার-রাজনীতিক কীর্তি আজাদের মতো পরিচিত মুখও প্রকাশ্যে সমর্থনের সুরে পোস্ট করেন। কীর্তি আজাদ এক্স-এ লেখেন, ‘আমি ককরোচ জনতা পার্টিতে যোগ দিতে চাই। কী যোগ্যতা লাগবে?’ উত্তরে দলের তরফে লেখা হয়, ‘১৯৮৩-র বিশ্বকাপ জেতা যথেষ্ট যোগ্যতা।’ মহুয়া মৈত্রও একটি পোস্ট শেয়ার করে লেখেন, ‘আমি যোগ দিতে চাই, যদিও আমি আগে থেকেই ‘অ্যান্টি-ন্যাশনাল পার্টি’-র সদস্য।’ তার উত্তরে সিজেপি জানায়, ‘গণতন্ত্রের প্রয়োজনীয় সব যোদ্ধাকে স্বাগত।’
দলের সদস্য হওয়ার যোগ্যতার তালিকাও কার্যত ব্যঙ্গের ভাষাতেই তৈরি। সেখানে বলা হয়েছে— সদস্য হতে হলে বেকার হতে হবে, অলস হতে হবে, সারাক্ষণ অনলাইনে থাকতে হবে এবং ‘পেশাদারি ভঙ্গিতে রাগ ঝাড়তে’ জানতে হবে। দলের স্লোগান, ‘যুবকদের দ্বারা, যুবকদের জন্য, যুবকদের রাজনৈতিক ফ্রন্ট। ধর্মনিরপেক্ষ, সমাজতান্ত্রিক, গণতান্ত্রিক, অলস।’ কিন্তু এ রসিকতার ভিতরে রয়েছে তীব্র রাজনৈতিক খোঁচাও। দলের ঘোষণাপত্রে দাবি করা হয়েছে, অবসরের পরে কোনো প্রধান বিচারপতিকে রাজ্যসভার আসন দেওয়া যাবে না। সংসদ ও মন্ত্রিসভায় ৫০ শতাংশ নারী সংরক্ষণের দাবিও তুলেছে তারা। দলবদলকারী সাংসদ-বিধায়কদের ২০ বছরের জন্য নির্বাচনে নিষিদ্ধ করার প্রস্তাবও রয়েছে। ভোট মুছে ফেলার অভিযোগ প্রমাণিত হলে কঠোর ব্যবস্থার কথা বলা হয়েছে। এমনকি শিল্পপতি মুকেশ আম্বানি ও গৌতম আদানির মালিকানাধীন সংবাদমাধ্যমগুলির লাইসেন্স বাতিলের দাবিও তুলেছে সিজেপি। দলের বক্তব্য, কর্পোরেট-নিয়ন্ত্রিত সংবাদমাধ্যম ক্রমাগত ‘ভুল’ তথ্য ছড়াচ্ছে।
শুধু তাই নয়, সাম্প্রতিক ‘নিট’ পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস এবং সিবিএসই-র রিভিউ ফি নিয়েও সরব হয়েছে তারা। তাদের দাবি, পরীক্ষার পুনর্মূল্যায়নের নামে নেওয়া ফি ‘প্রকাশ্য দুর্নীতি’। তরুণ প্রজন্মের হতাশা, চাকরির অনিশ্চয়তা, প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় দুর্নীতি; সব কিছুই এই ব্যঙ্গাত্মক আন্দোলনের ভিতরে জায়গা করে নিয়েছে। দেশের অবসরপ্রাপ্ত আমলাদের একাংশও এই আন্দোলনের প্রতি সহানুভূতি দেখিয়েছেন। অবসরপ্রাপ্ত কেন্দ্রীয় আমলা অশীষ যোশী বলেন, ‘গত এক দশকে দেশে ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়েছে। মানুষ কথা বলতে ভয় পায়। ভারত এত ঘৃণায় ভরে উঠেছে যে ককরোচ জনতা পার্টি যেন এক ঝলক তাজা হাওয়া।’ তাঁর মতে, ‘আরশোলাকে মানুষ ঘৃণা করে ঠিকই, কিন্তু তারা টিকে থাকতে জানে। এখন মনে হচ্ছে তারা দল গড়ে গোটা ব্যবস্থার বুকের উপর হেঁটে বেড়াতেও পারে।’ প্রবীণ আইনজীবী ও মানবাধিকার কর্মী প্রশান্ত ভূষণের বক্তব্যও তাৎপর্যপূর্ণ। তাঁর মতে, প্রধান বিচারপতির মন্তব্য ‘তরুণ ও অ্যাক্টিভিস্টদের প্রতি গভীর বিদ্বেষের প্রতিফলন’। ভূষণের দাবি, দীর্ঘ দিন ধরেই দেশে এমন এক ক্ষোভ জমে উঠছে, যা কোনো না কোনো ভাবে বিস্ফোরিত হওয়ার অপেক্ষায় ছিল। তাঁর মতে, ‘দেশের অর্থনীতি ও সমাজ কর্পোরেট পুঁজিপতিদের স্বার্থে ক্ষতবিক্ষত হচ্ছে। মানুষ প্রশ্ন করতে শুরু করেছে।’
এরই মধ্যে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’-র পাল্টা হিসেবেও তৈরি হয়েছে ‘ন্যাশনাল প্যারাসিটিক ফ্রন্ট’ বা এনপিএফ। তারা নিজেদের ‘ককরোচ জনতা পার্টি এবং সমস্ত জড়তার রাজনীতির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক বিরোধী শক্তি’ বলে দাবি করছে। তাদের ওয়েবসাইটে লেখা হয়েছে, ‘আমরা ভাঙা ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত আছি তা থেকে খাওয়ার জন্য নয়, ভিতর থেকে বদলানোর জন্য।’ তারা অপরাধমুক্ত সংসদ, শিক্ষিত জনপ্রতিনিধি, উন্নত পরিকাঠামো এবং কার্যকর প্রশাসনের দাবিও তুলেছে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই ঘটনাই দেখিয়ে দিচ্ছে ভারতীয় রাজনীতিতে নতুন এক ভাষার জন্ম হচ্ছে। আগে রাজনৈতিক ক্ষোভ প্রকাশ পেত মিছিল, সভা বা পোস্টারে। এখন সেই জায়গা দখল করছে মিম, ব্যঙ্গ, ডিজিটাল প্রচার এবং অনলাইন সংগঠন। জেন-জি প্রজন্মের একাংশের কাছে এগুলিই হয়ে উঠছে রাজনৈতিক প্রতিবাদের নতুন মাধ্যম।
এই মুহূর্তে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ বা ‘ন্যাশনাল প্যারাসিটিক ফ্রন্ট’— কোনোটিই নির্বাচন কমিশনের স্বীকৃত রাজনৈতিক দল নয়। তারা আদৌ ভবিষ্যতে আনুষ্ঠানিক রাজনীতিতে নামবে কি না, তাও স্পষ্ট নয়। তবে, কয়েক দিনের মধ্যেই তারা এমন এক আলোচনার কেন্দ্র তৈরি করেছে, যা দেশের মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলিকেও ভাবাচ্ছে। কারণ, শেষ পর্যন্ত ব্যঙ্গের ভিতরে লুকিয়ে রয়েছে এক গভীর বাস্তবতা— বেকারত্বে জর্জরিত, ক্রমশ হতাশ, কিন্তু ডিজিটালি অত্যন্ত সক্রিয় এক প্রজন্ম নিজেদের ক্ষোভ প্রকাশের নতুন ভাষা খুঁজে পেয়েছে। আর সে ভাষার নাম— ‘ককরোচ রাজনীতি’।
❤ Support Us







