- এই মুহূর্তে দে । শ
- মে ২০, ২০২৬
সরকারি হাসপাতালে নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলায় কড়াকড়ি। পাঁচ মেডিক্যাল কলেজে পুলিশি নজরদারি, বায়োমেট্রিক হাজিরা বাধ্যতামূলক
রাজ্যের সরকারি হাসপাতালগুলিতে নিরাপত্তা, শৃঙ্খলা এবং পরিষেবার মান উন্নত করতে একগুচ্ছ কড়া পদক্ষেপ নিল নতুন সরকার। কলকাতার পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল— এসএসকেএম, নীলরতন সরকার, আর জি কর, ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজ এবং কলকাতা মেডিক্যাল কলেজে এবার থেকে চালু হচ্ছে বিশেষ নিরাপত্তা ও নজরদারি ব্যবস্থা। সরকারি সম্পত্তি ভাঙচুর বা হাসপাতাল চত্বরে অশান্তি রুখতে কঠোর পুলিশি তৎপরতার পাশাপাশি জেল ও মোটা অঙ্কের জরিমানার ব্যবস্থাও রাখা হচ্ছে।
স্বাস্থ্যভবন সূত্রে খবর, সোমবার রাতে পাঁচটি সরকারি হাসপাতালের সুপার ও অধ্যক্ষদের নিয়ে এক জরুরি বৈঠকে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বৈঠকে হাসপাতালগুলির নিরাপত্তা ব্যবস্থা, চিকিৎসকদের উপস্থিতি, জরুরি পরিষেবার মান এবং হাসপাতালের সামগ্রিক প্রশাসনিক শৃঙ্খলা নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা হয়। বৈঠকের পর কলকাতা পুলিশের তরফে সংশ্লিষ্ট হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে বিশেষ নির্দেশিকা পাঠানো হয়েছে। হাসপাতালগুলিতে দ্রুত যোগাযোগের জন্য প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে ওয়্যারলেস সেট রাখা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। হাসপাতালের সুপার, অধ্যক্ষ, স্থানীয় থানা, ডিভিশনাল পুলিশ এবং লালবাজার কন্ট্রোল রুমের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ ব্যবস্থাও গড়ে তোলা হবে।
রাতের বেলায় হাসপাতাল চত্বরে যৌথ পুলিশ টহল চালানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। নিরাপত্তারক্ষীর সংখ্যাও বাড়ানো হবে। হাসপাতালের প্রবেশপথে কড়া নজরদারি, তল্লাশি এবং প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা কার্যকর করা হবে। ভিজিটিং আওয়ার ছাড়া রোগীর আত্মীয়দের যাতায়াত সীমিত রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বাইরের যানবাহনের প্রবেশেও কড়াকড়ি আরোপ করা হচ্ছে। হাসপাতালের ভিতরে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করতে সব অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র ও হাইড্র্যান্ট সর্বদা সচল রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। দমকল বিভাগের সঙ্গে নিয়মিত সমন্বয় বজায় রাখার কথাও বলা হয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে। একই সঙ্গে হাসপাতালগুলিতে কর্মরত বেসরকারি নিরাপত্তারক্ষী, অ্যাম্বুল্যান্স পরিষেবা প্রদানকারী এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট কর্মীদের পূর্ণাঙ্গ তথ্যভান্ডার তৈরি করা হবে আগামী এক মাসের মধ্যে। হাসপাতাল চত্বরে অবৈধ পার্কিং সম্পূর্ণ বন্ধ করারও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। রোগীর পরিবার, চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের নির্দিষ্ট যানবাহন ছাড়া অন্য কোনও গাড়ি হাসপাতাল এলাকায় পার্কিং করতে পারবে না। হাসপাতালের প্রধান গেট সংলগ্ন এলাকা হকারমুক্ত রাখার উপরও জোর দেওয়া হয়েছে।
শুধু নিরাপত্তা নয়, হাসপাতালের প্রশাসনিক শৃঙ্খলাতেও কড়া নজরদারি চালু হচ্ছে। চিকিৎসকদের ডিউটি ফাঁকি, অনুপস্থিতি এবং হাজিরা জালিয়াতি রুখতে এবার থেকে বায়োমেট্রিক হাজিরা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। চিকিৎসক, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মী এবং চতুর্থ শ্রেণির কর্মীদের সকলকেই এই ব্যবস্থার আওতায় আনা হবে। স্বাস্থ্যভবনের নির্দেশ অনুযায়ী, প্রতি মাসের ২৫ তারিখের মধ্যে আগামী মাসের পূর্ণাঙ্গ ডিউটি রোস্টার জমা দিতে হবে। কোন চিকিৎসক কখন এবং কোন হাসপাতালে ডিউটিতে থাকবেন, তার বিস্তারিত তালিকা আগাম পাঠাতে হবে স্বাস্থ্যভবনে। রোস্টার অনুযায়ী দায়িত্বে গাফিলতি ধরা পড়লে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে স্পষ্ট জানানো হয়েছে।
জরুরি বিভাগগুলিতেও বাড়ানো হচ্ছে নজরদারি। এতদিন একজন মেডিক্যাল অফিসার ও একজন সিনিয়র রেসিডেন্ট চিকিৎসক দায়িত্বে থাকলেও এবার থেকে অতিরিক্ত একজন অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর পদমর্যাদার চিকিৎসককে ২৪ ঘণ্টা জরুরি বিভাগে মোতায়েন রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। হাসপাতালের জরুরি বিভাগে ২৪ ঘণ্টা সিসিটিভি নজরদারির ব্যবস্থাও চালু হচ্ছে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, এই ক্যামেরাগুলির পর্যবেক্ষণ সরাসরি স্বাস্থ্যভবন থেকে করা হবে। অর্থাৎ সংশ্লিষ্ট হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের পরিবর্তে কেন্দ্রীয়ভাবে নজরদারি চালানো হবে, যাতে কোনও অনিয়ম বা তথ্য গোপনের সুযোগ না থাকে। মর্গে ময়নাতদন্ত ঘিরে অর্থ লেনদেনের অভিযোগের বিষয়েও কড়া অবস্থান নিয়েছে স্বাস্থ্যদপ্তর। অভিযোগ প্রমাণিত হলে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।
এছাড়া চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য পৃথক পরিচয়পত্র চালু করার সিদ্ধান্তও কার্যত চূড়ান্ত। পরিচয়পত্র ছাড়া হাসপাতালের ওয়ার্ডে প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হবে বলে জানা গিয়েছে। প্রতি সপ্তাহে সিভিল পোশাকে পুলিশি টহলের ব্যবস্থাও চালু করা হচ্ছে। স্বাস্থ্যভবনের এক কর্তা জানান, সরকারি হাসপাতালের পরিষেবা ব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছ, সুশৃঙ্খল এবং নিরাপদ করে তুলতেই এই পদক্ষেপ। হাসপাতাল চত্বরে অরাজকতা, দালালচক্র, ভাঙচুর এবং দায়িত্বে গাফিলতি রুখতেই এবার প্রশাসন কড়া অবস্থান নিতে চলেছে।
❤ Support Us







