Advertisement
  • ন | ন্দ | ন | চ | ত্ব | র
  • মে ২০, ২০২৬

‘শহীদ তর্পণ’-এ কবি-সাহিত্যিকদের কণ্ঠে উনিশের আহ্বান

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
‘শহীদ তর্পণ’-এ কবি-সাহিত্যিকদের কণ্ঠে উনিশের আহ্বান

বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষার লড়াই কেবল অতীতের স্মৃতি নয়, চলমান সাংস্কৃতিক দায়। দুই বাংলা, অসমের অমোঘ নিয়তি।
স্মৃতি-সত্তার সজল বাতাস আর বর্তমান অভিঘাতের সে উচ্চারণই বারবার ধ্বনিত হলো মঙ্গল সন্ধ্যায়। ১৯ মে ভাষা শহিদ দিবস উপলক্ষে বরাক উপত্যকা বঙ্গ সাহিত্য ও সংস্কৃতি সম্মেলন, কলকাতা অধ্যায়ের উদ্যোগে আয়োজিত হয়েছে একাদশ ‘শহীদ তর্পণ’। সল্ট লেকের বঙ্গীয় গ্রন্থাগার পরিষদের সভাগৃহে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে সাহিত্য, সংস্কৃতি ও ভাষাচর্চার উন্মুক্ত পাখি সীমান্তহীন উড়ানে মিলেমিশে একাকার।

অনুষ্ঠানের সূচনায় ভাষা শহিদদের ছবিতে মাল্যদান করেন অনুপ সেন ও সংস্থার প্রাক্তন সভাপতি রণবীর পুরকায়স্থ। উপস্থিত ছিলেন কবি রথীন কর, নাট্যকার ধনঞ্জয় আঢ্য এবং প্রাবন্ধিক অনিরুদ্ধ রাহার মতো বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব। উদ্বোধনী সঙ্গীতে সুর বেঁধে দেন  সংস্থার সম্পাদক সুজাতা চৌধুরী। উদ্বোধনী বক্তব্য রাখেন সংস্থার সভাপতি অনুপ সেন। ১৯৬১ সালের বরাক উপত্যকার ভাষা আন্দোলনের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরে তিনি বলেন, বাংলা ভাষার অধিকার রক্ষার জন্য যে আত্মত্যাগ, তার তাৎপর্য আজও ফুরিয়ে যায়নি। বর্তমান সময়ে ভাষা ও সংস্কৃতির উপর নানা চাপের প্রসঙ্গও উঠে আসে তাঁর বক্তব্যে।

অনুষ্ঠানের আলোচনাপর্বে একের পর এক বক্তার বক্তব্যে উঠে আসে ভাষা, সংস্কৃতি এবং বাঙালির আত্মপরিচয়, অস্তিত্ব আর সংকটের প্রশ্ন। কবি কালী কৃষ্ণ গুহ বলেন, শুধু স্বীকৃত ভাষাই নয়, স্বীকৃতির বাইরেও থাকা প্রতিটি ভাষার মর্যাদা রক্ষা করা সমান জরুরি। ভাষাগত বৈচিত্র্য রক্ষার দায় সমাজের সকলের। ‘আরম্ভ’ পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা, সম্পাদক বাহার উদ্দিন তাঁর বক্তব্যে বাংলা ভাষার বর্তমান ব্যবহারে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। ভাষার ক্রমবর্ধমান অপপ্রয়োগের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ভাষার প্রতি দায়বদ্ধতা কমে গেলে সংস্কৃতির ভিতও দুর্বল হয়ে পড়ে। পাশাপাশি, ১৯ মে-র মতো ঐতিহাসিক দিন নিয়ে শিল্পীমহলের একাংশের উদাসীনতাও তাঁকে ভাবাচ্ছে বলে জানান।

পরবর্তী বক্তা সৌমিত্র লাহিড়ী ১৯ মে-র ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে ২১ ফেব্রুয়ারির ঐতিহাসিক যোগসূত্রের প্রসঙ্গ টেনে আনেন। সমকালীন বাঙালির সাংস্কৃতিক সঙ্কট, ভাষা-চর্চার সংকোচন এবং স্মৃতিহীনতার বিপদের কথা উচ্চারিত হয় বারবার। আলোচনাপর্বের শেষ বক্তা ছিলেন একুশ শতক প্রকাশনার কর্ণধার অরুণ কুন্ডু। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের চর্চা বাড়ানোর উপর বিশেষ গুরুত্ব দেন তিনি। নতুন প্রজন্মকে বই ও ভাষার সঙ্গে আরও নিবিড়ভাবে যুক্ত করার প্রয়োজনীয়তার কথাও শোনান। জয়তোষ দত্ত চৌধুরীর নিবিড় ব্যবস্থাপনা, সুজাতা চৌধুরী এবং আজমল হোসেনের প্রাণমুখর সঞ্চালনায় শ্রোতারা জুড়ে যান শব্দ আর নৈঃশব্দ্যের বাতাবরণে।

অনুষ্ঠানের সাংস্কৃতিক পর্ব ছিল বৈচিত্র্যময়। স্বরচিত কবিতা পাঠ করেন শর্মিলা ভট্টাচার্য, সুধাংশু রঞ্জন সাহা, শুভদীপ সেনশর্মা, তীর্থঙ্কর দাশ পুরকায়স্থ, খগেশ্বর দাস, উদয়ন ভট্টাচার্য, শান্তনু গঙ্গারিডি, জন্মেজয় দেব এবং কপোতাক্ষী ব্রহ্মচারী চক্রবর্তী। কবি শ্যামলী করের কবিতা পাঠ করেন মানসী নন্দী। আবৃত্তি পরিবেশন করে প্রশংসা কুড়োয় শিশুশিল্পী আদ্বিক কর। সঙ্গীত পরিবেশন করেন পৌষালী কর, সপ্তপর্ণা চক্রবর্তী এবং ভাস্বতী ভট্টাচার্য। গল্প পাঠ করেন সুনন্দ অধিকারী। অনুষ্ঠানের এক বিশেষ পর্বে কবি মনোতোষ চক্রবর্তী পাঠ করেন মেঘমালা দে রচিত ‘হৃদয়ে রবীন্দ্রনাথ চেতনায় উনিশ’ শীর্ষক নিবন্ধ। নিবন্ধের সমকালীন প্রাসঙ্গিকতা ব্যাখ্যা করেন তিনি।

সবশেষে ধন্যবাদজ্ঞাপন করেন রণবীর পুরকায়স্থ। অনুষ্ঠানের মঞ্চ থেকেই প্রতি বছরের মতো এ বারও প্রকাশিত হয় শান্তনু গঙ্গারিডি সম্পাদিত ‘উনিশে মে’ পত্রিকা। সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত নামলেও, সভাঘরে উচ্চারিত আর অনুচ্চারিত শব্দেরা প্রশ্ন তুলছে তখনো, বহুভাষাভাষী এ বিশাল ভুখণ্ডে দাঁড়িয়ে, অতীতের রক্তস্নাত স্মৃতি বুকে নিয়ে আজ বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির ভবিষ্যৎ কোন পথে যাচ্ছে?


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!