ভবিষ্যতের বৈপ্লবিক বদলের মুখে দাঁড়িয়ে চিকিৎসাবিজ্ঞানমাত্র একটি রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমেই যদি জানা যায় আগামী ১০ থেকে ১৫ বছরের মধ্যে কারও স্ট্রোকহার্ট ফেলিওর বা গুরুতর হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা কতটাতা হলে যে প্রতিরোধমূলক চিকিৎসার ধারণাই পাল্টে যেতে পারে। হংকং বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের নির্মিত ‘কার্ডিওমিকস্কোর’ নামে এআইও পরিচালিত রক্তপরীক্ষার বিশেষ পদ্ধতি অসাধ্য সাধনের কথাই বলছে।

আচমকা স্ট্রোক। কিংবা হঠাৎ বুক চেপে ধরা ব্যথাদরদর করে ঘামআর তার পরেই মাটিতে লুটিয়ে পড়া। চিকিৎসকের কাছে পৌঁছনোর সময়টুকুও অনেক ক্ষেত্রে পাওয়া যায় না। গত কয়েক বছরে এমন অগণিত ঘটনার সাক্ষী থেকেছে দেশ-বিদেশ। হাঁটতে হাঁটতেজিমে শরীরচর্চা করতে গিয়েনাচের অনুষ্ঠানে কিংবা অফিসের মাঝেই আচমকা থেমে গিয়েছে হৃদ্‌স্পন্দন। সবচেয়ে ভয়াবহ হলো, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আক্রান্ত ব্যক্তি আগে থেকে বুঝতেই পারেন না শরীরের ভিতরে কী বিপদ তৈরি হচ্ছে। বাইরে থেকে সুস্থ দেখালেও ভেতরে ভেতরে ধমনিতে জমছে কোলেস্টেরলতৈরি হচ্ছে ব্লকেজঅথবা মস্তিষ্কে রক্ত চলাচলের সূক্ষ্ম পরিবর্তন ভবিষ্যতের স্ট্রোকের ইঙ্গিত দিচ্ছেঅথচ বাইরে তার কোনো স্পষ্ট লক্ষণ নেই। এ পরিস্থিতিতেই আশার আলো দেখাচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই নির্ভর এক নতুন রক্ত পরীক্ষা। হংকং বিশ্ববিদ্যালয়ের-এর ‘এককেএস ফ্যাকাল্টি অফ মেডিসিন’-এর ফার্মাকোলজি ও ফার্মেসি বিভাগ’-এর গবেষকেরা তৈরি করেছেন কার্ডিওমিকস্কোর’ নামে একটি অত্যাধুনিক এআই-চালিত রক্ত পরীক্ষার পদ্ধতি। গবেষকদের দাবিএ পরীক্ষার মাধ্যমে একজন মানুষের ভবিষ্যতে হৃদ্‌রোগস্ট্রোক বা হার্ট ফেলিওরের ঝুঁকি রয়েছে কি নাতা প্রায় ১৫ বছর আগেই আন্দাজ করা সম্ভব হতে পারে। আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী ‘নেচার’-এ ইতিমধ্যেই প্রকাশিত হয়েছে গবেষণাপত্রটি।

চিকিৎসাবিজ্ঞানের পরিভাষায় কার্ডিওভাসকুলার রোগ এখন বিশ্বে মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী২০২২ সালেই প্রায় ১ কোটি ৯৮ লক্ষ মানুষের মৃত্যু হয়েছে হৃদ্‌রোগ এবং রক্তনালীর জটিলতায়। অথচ চিকিৎসকদের বক্তব্যঅধিকাংশ রোগীই নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করান না। বুক ধড়ফড়হালকা ক্লান্তিমাথা যন্ত্রণা কিংবা অস্বাভাবিক ঘাম— এই উপসর্গগুলিকে অনেকেই গুরুত্ব দেন না। ফলে রোগ ধরা পড়ে তখনইযখন পরিস্থিতি অনেকটাই জটিল হয়ে গিয়েছে। হার্টের চিকিৎসকদের একাংশ বলছেনএখন কম বয়সিদের মধ্যেও হৃদ্‌রোগের প্রবণতা উদ্বেগজনক ভাবে বাড়ছে। আগে যেখানে ৫০ বা ৬০ বছরের পরে হার্ট অ্যাটাকের আশঙ্কা বেশি দেখা যেতএখন ৩০ কিংবা ৪০-এর কোঠাতেও বহু মানুষ আক্রান্ত হচ্ছেন। বিশেষ উদ্বেগ বাড়াচ্ছে সাইলেন্ট হার্ট অ্যাটাক। এ ধরনের ক্ষেত্রে আগে থেকে তেমন কোনো লক্ষণ থাকে না। আচমকাই হার্টের রক্ত চলাচলে সমস্যা তৈরি হয় এবং অনেক সময় রোগীকে বাঁচানোর সুযোগ পর্যন্ত পাওয়া যায় না।

গবেষকদের দাবি, ‘কার্ডিওমিকস্কোর’ ঠিক এই অদৃশ্য ঝুঁকিগুলিকেই অনেক আগে থেকে শনাক্ত করতে পারবে। সাধারণ রক্ত পরীক্ষায় কেবল সুগারকোলেস্টেরল বা কয়েকটি নির্দিষ্ট সূচক ধরা পড়ে। কিন্তু শরীরের ভিতরে আণবিক স্তরে কী পরিবর্তন হচ্ছেরক্তনালীর দেওয়ালে কী ধরনের ক্ষয় তৈরি হচ্ছেবিপাকক্রিয়ায় কী বদল আসছে কিংবা রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার সূক্ষ্ম প্রতিক্রিয়া কেমন— এসব জটিল তথ্য সাধারণ পরীক্ষায় ধরা সম্ভব নয়। এখানেই কাজ করবে এআই। এ গবেষণায় ব্যবহৃত হয়েছে মাল্টিওমিক্স’ প্রযুক্তি। অর্থাৎ জিনোমিক্সমেটাবোলোমিক্স এবং প্রোটিওমিক্স— এই তিন ধরনের জৈবিক তথ্য একত্র করে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। ‘ইউকে বায়োব্যাঞক’-এর বিপুল তথ্যভান্ডার ব্যবহার করে গবেষকেরা রক্তে উপস্থিত ২,৯২০টি রক্তে সঞ্চরণশীল প্রোটিন এবং ১৬৮টি বিপাকজাত পদার্থ পরীক্ষা করেছেন। গবেষকদের মতে, এই পদার্থগুলি আসলে শরীরের বর্তমান অবস্থার রিয়েল টাইম রেকর্ডার। শরীরের ভিতরে কোথাও প্রদাহ বাড়ছে কি নাধমনী শক্ত হয়ে যাচ্ছে কি নারক্ত জমাট বাঁধার প্রবণতা  তৈরি হচ্ছে কি না— তার ইঙ্গিত এদের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে।

গবেষণায় আরও দাবি করা হয়েছেএই প্রযুক্তি করোনারি আর্টারি ডিজিজস্ট্রোকহার্ট ফেলিওরঅ্যাট্রিয়াল ফাইব্রিলেশনপেরিফেরাল আর্টারি ডিজিজ এবং ভেনাস থ্রম্বোএম্বোলিজম— এর মতো গুরুতর রোগের ঝুঁকি নির্ণয়ে কার্যকর। শুধু তা-ই নয়বহু ক্ষেত্রে রোগের উপসর্গ প্রকাশ পাওয়ার প্রায় ১৫ বছর আগেই উচ্চ ঝুঁকির সতর্কবার্তা দিতে পারে এই পরীক্ষা। গবেষকেরা মনে করছেনভবিষ্যতে এ প্রযুক্তি সফল ভাবে প্রয়োগ করা গেলে অসংখ্য মানুষের প্রাণ বাঁচানো সম্ভব হতে পারে। বিশেষ করে যাঁদের পরিবারে উচ্চ কোলেস্টেরলহৃদ্‌রোগ বা ব্রেন স্ট্রোকের ইতিহাস রয়েছেতাঁদের ক্ষেত্রে এই ধরনের আগাম ঝুঁকি নির্ণায়ক পরীক্ষা অত্যন্ত কার্যকর হতে পারে। জীবনযাত্রায় পরিবর্তনখাদ্যাভ্যাস নিয়ন্ত্রণনিয়মিত ব্যায়াম এবং প্রয়োজনীয় ওষুধের মাধ্যমে ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব বলেও মনে করছেন চিকিৎসকেরা।

চিকিৎসাবিজ্ঞানের জগতে এখন প্রিসিশন মেডিসিন’-এর উপর জোর বাড়ছেযেখানে প্রত্যেক মানুষের শরীরকে আলাদা ভাবে বিশ্লেষণ করে চিকিৎসা পরিকল্পনা তৈরি করা হবে। গবেষকদের মতে, ‘কার্ডিওমিকস্কোর’ সে ভবিষ্যতেরই ইঙ্গিত বহন করছে। হয়তো আগামী দিনে একটি ছোটো রক্তের নমুনাই বলে দেবেশরীরের ভিতরে নীরবে বাড়তে থাকা বিপদ কতটা গুরুতর এবং ঠিক কোন সময় থেকে সতর্ক হওয়া প্রয়োজন।