Advertisement
  • স | হ | জ | পা | ঠ
  • মে ২৯, ২০২৬

সাত দশকের ধাঁধার সমাধান, কার্বন ছাড়াই ‘ফেরোসিন’ গড়ে রসায়নে নতুন যুগের সূচনা ভারতীয় বিজ্ঞানীদের

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
সাত দশকের ধাঁধার সমাধান, কার্বন ছাড়াই ‘ফেরোসিন’ গড়ে রসায়নে নতুন যুগের সূচনা ভারতীয় বিজ্ঞানীদের

রসায়নের ইতিহাসে বহু ক্ষেত্রে একটি আবিষ্কার গোটা বিজ্ঞানচর্চার গতিপথ বদলে দিয়েছে। গত শতকের পঞ্চাশের দশকে আবিষ্কৃত ফেরোসিন’ ছিল তেমনই যুগান্তকারী যৌগ। একটি লোহার পরমাণুকে দুদিক থেকে ঘিরে রাখা সমতল কার্বন-রিংয়ের অদ্ভুত স্যান্ডউইচ’ গঠন বদলে দিয়েছিল অর্গানো-মেটালিক রসায়নের ধারণাকে। সাত দশক ধরে বিশ্বের বিজ্ঞানীরা প্রশ্ন তুলেছিলেন— কার্বন ছাড়া কি এমন গঠন সম্ভব উত্তর মেলেনি। অবশেষে সাত দশকের ধাঁধার সমাধান করলেন ভারতীয় গবেষকেরা।  

আইআইটি মাদ্রাজের অধ্যাপক সুন্দরগোপাল ঘোষ ও গবেষক স্তুতি মহাপাত্রআইআইএসসি বেঙ্গালুরুর অধ্যাপক এলুভাথিঙ্গাল ডি জেমিসের সহযোগিতায় তৈরি করেছেন বিশ্বের প্রথম সম্পূর্ণ কার্বন-মুক্ত ফেরোসিন-সদৃশ অণু। যেখানে লোহার বদলে রয়েছে অসমিয়ামআর কার্বন-রিংয়ের জায়গায় বোরন-ভিত্তিক রিং। গবেষণাপত্রটি সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ বৈজ্ঞানিক সাময়িকী সায়েন্স’-এ। আবিষ্কারের কথা সামনে আসতেই হইচই পড়ে গিয়েছে বিশ্বের বিজ্ঞান মহলে এ আবিষ্কারকে ইতিমধ্যেই রসায়নের দুনিয়ার ‘যুগন্তকারী আবিষ্কার’ বলা হচ্ছে। কারণএত দিন পর্যন্ত মনে করা হতো, ফেরোসিনের অসাধারণ স্থিতিশীলতার পিছনে মূল রহস্য কার্বনের বিশেষ রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য। সে ধারণাকেই কার্যত চ্যালেঞ্জ জানাল ভারতীয় গবেষকদের  সাফল্য।

ফেরোসিন প্রথম আবিষ্কৃত হয় প্রায় ৭৫ বছর আগে। তার গঠন ছিল (C5H5)Fe(C5H5)— অর্থাৎ একটি লোহার পরমাণুকে দুপাশ থেকে ঘিরে রেখেছে দুটি সাইক্লোপেন্টাডিয়েনাইল কার্বন-রিং। দেখতে ঠিক যেন স্যান্ডউইচ। সে সময়ের যৌগের গঠন বিজ্ঞানীদের বিস্মিত করেছিল। তৎকালীন রাসায়নিক বন্ধনের প্রচলিত তত্ত্ব দিয়ে এমন গঠন ব্যাখ্যা করা কঠিন ছিল। পরে এই যৌগ থেকেই অর্গানো-মেটালিক রসায়নের নতুন দিগন্ত খুলে যায়। আজ ওষুধ শিল্পব্যাটারি প্রযুক্তিউন্নত উপাদানইলেকট্রনিক্সএমনকি শিল্পক্ষেত্রের নানা রাসায়নিক বিক্রিয়াতেও ফেরোসিন ব্যবহৃত হয়।

কিন্তু প্রশ্ন ছিল অন্যত্র। কার্বনের পরিবর্তে অন্য কোনো উপাদান কি একই ধরনের স্থিতিশীল রিং তৈরি করতে পারেবহু বছর ধরে সেই উত্তর খুঁজেছেন গবেষকেরা। বিশ্বের নানা গবেষণাগারে নানা ধরনের পরীক্ষা হয়েছে। কিন্তু সম্পূর্ণ কার্বন-মুক্তঅথচ ফেরোসিনের মতো স্থিতিশীল ও একই ধরনের গঠনবিশিষ্ট অণু তৈরি করা সম্ভব হয়নি। এবার সেই অসম্ভবকেই সম্ভব করলেন ভারতীয় গবেষকদল। নতুন অণুর গঠন— ((B5H10)Os(B5H10))। এখানে কেন্দ্রে রয়েছে অসমিয়াম (Os), যা পর্যায় সারণিতে লোহা গোষ্ঠীর ধাতু। তাকে ঘিরে রয়েছে বোরন ও হাইড্রোজেন-গঠিত দুটি রিং। গবেষকেরা জানিয়েছেনগঠনগত ভাবে এটি ফেরোসিনের অত্যন্ত কাছাকাছি। শুধু তাই নয়প্রাথমিক পরীক্ষায় দেখা গিয়েছেঅসমিয়াম ও বোরন-রিংয়ের মধ্যে বন্ধন অত্যন্ত শক্তিশালী। নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে তা ফেরোসিনের চেয়েও বেশি স্থিতিশীল হতে পারে।

এই অণু তৈরির পিছনে রয়েছে প্রায় দেড় দশকের গবেষণা। আইআইএসসি-র ইনঅর্গানিক অ্যান্ড ফিজিক্যাল কেমিস্ট্রি বিভাগের ন্যাশনাল সায়েন্স বহু বছর ধরে চেষ্টা করছিলেন ফেরোসিনের কার্বন-রিংয়ের বিকল্প হিসেবে বোরনের ব্যবহার সম্ভব কি না তা খতিয়ে দেখতে। সে কাজেই যুক্ত হন আইআইটি মাদ্রাজের সুন্দরগোপাল ঘোষ। অরবিটাল ইঞ্জিনিয়ারিং’-এর ধারণা ব্যবহার করে তাঁরা শেষ পর্যন্ত এ নতুন যৌগের নকশা তৈরি করেন। ল্যাবরেটরিতে যৌগটি তৈরির জন্য ব্যবহার করা হয় থার্মোলাইসিস’ পদ্ধতি। ১০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় একটি অসমিয়াম-প্রিকার্সরকে বোরন-হাইড্রোজেন উৎসের সঙ্গে উত্তপ্ত করা হয়। প্রতিক্রিয়ার পরে গবেষকেরা একটি বর্ণহীন কঠিন পদার্থ পৃথক করতে সক্ষম হন। পরে এক্স-রে বিশ্লেষণ ও এনএমআর স্পেকট্রোস্কোপির সাহায্যে নিশ্চিত হওয়া যায় যেসত্যিই একটি স্যান্ডউইচ’ গঠন তৈরি হয়েছে।

বৈজ্ঞানিক দলের অন্যতম সদস্য সুন্দরগোপাল ঘোষ জানিয়েছেন, ‘যেমন ফেরোসিন অর্গানো-মেটালিক রসায়নে নতুন যুগের সূচনা করেছিলতেমনই এই আবিষ্কার ইনঅর্গানো-মেটালিক রসায়নের নতুন যুগের সূচনা করবে আর শীঘ্রই এ গবেষণা অজৈব রসায়নের পাঠ্যবইয়ের অংশ হতে চলেছে।’ এ গবেষণার পথে আরও একটি চমকও পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা। তাঁরা নতুন যৌগটির একটি ভিন্ন আইসোমার’-ও আবিষ্কার করেছেনযেখানে বোরন-রিং ধাতুর সঙ্গে এক অভিনব উপায়ে যুক্ত হয়েছে। কার্বন-ভিত্তিক ফেরোসিনে এমন গঠন আগে দেখা যায়নি। ফলে বিজ্ঞানীদের মতেবোরন-ভিত্তিক রসায়নের সম্ভাবনা হয়তো কার্বনের থেকেও অনেক বেশি বিস্তৃত হতে পারে।

এই আবিষ্কারের সম্ভাব্য ব্যবহার নিয়ে ইতিমধ্যেই আলোচনা শুরু হয়েছে। যদিও গবেষকেরা সতর্ক। তাঁদের বক্তব্যআপাতত এটি একটি মৌলিক বৈজ্ঞানিক সাফল্য। তবে ভবিষ্যতে এর ব্যবহার হতে পারে উন্নত উপাদানশক্তি সঞ্চয় ব্যবস্থাসেমিকন্ডাক্টর প্রযুক্তি বা শিল্পক্ষেত্রের ক্যাটালিসিসে। গত এক দশকে বোরোফিন’ নিয়ে বিশ্বজুড়ে গবেষণা দ্রুত বেড়েছে। গ্রাফিনের বিকল্প হিসেবে বোরনের দ্বিমাত্রিক গঠনকে ঘিরে আশাবাদী বিজ্ঞানীরা। গবেষক এলুভাথিঙ্গাল জেমিস বলেছেন, ‘খুব শীঘ্রই ধাতু-স্যান্ডউইচড বোরন-ভিত্তিক বিলেয়ার বা মাল্টিলেয়ার গঠন বাস্তব হয়ে উঠতে পারে।’ তাঁর দাবিএ ধরনের উপাদান ভবিষ্যতে গ্রাফিনের সঙ্গেও পাল্লা দিতে পারে। ভারতীয় গবেষণার চরম সাফল্য তাই শুধু একটি রাসায়নিক ধাঁধার সমাধান নয়। বরং তা নতুন উপাদান বিজ্ঞানভবিষ্যতের ইলেকট্রনিক্স এবং শক্তি প্রযুক্তির ক্ষেত্রেও নতুন দিগন্ত খুলে দিতে পারে বলেই মনে করছে বিজ্ঞানীরা।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!