- দে । শ
- জুন ২৯, ২০২৬
অরুণাচল সীমান্তে চিনের অনুপ্রবেশ ঘিরে উদ্বেগ, অবিলম্বে কেন্দ্র-রাজ্যের হস্তক্ষেপের দাবি
ভারত-চিন সীমান্তে নতুন করে উত্তেজনার আবহ। অরুণাচল প্রদেশের আপার সুবনসিরি জেলার টাকসিং সেক্টরে ভারতীয় ভূখণ্ডের একাংশে গত কয়েক বছরে ধাপে ধাপে স্থায়ী সামরিক পরিকাঠামো গড়ে তুলেছে চিনের পিপলস লিবারেশন আর্মি (পিএলএ)— এমনই গুরুতর অভিযোগ তুলেছে সীমান্তবর্তী এলাকার জনজাতি সংগঠন ‘নাহ্ ওয়েলফেয়ার সোসাইটি’।
সংগঠনের দাবি, শুধু সীমান্তে টহল বাড়ানো নয়, রাস্তা, সেতু, সামরিক শিবির এবং অন্যান্য পরিকাঠামো নির্মাণের মাধ্যমে কার্যত ভারতীয় ভূখণ্ডের কয়েকটি অংশ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নিয়েছে চিনা সেনা। তার জেরে বহু প্রজন্ম ধরে স্থানীয় জনজাতির মানুষ যে জমিতে চাষ করতেন, পশুচারণ করতেন, বনজ সম্পদ সংগ্রহ করতেন, সেই সব এলাকায় গত কয়েক বছর ধরে তাঁদের প্রবেশই বন্ধ হয়ে গিয়েছে। যদিও এ সমস্ত অভিযোগের সত্যতা এখনও স্বাধীন ভাবে যাচাই করা যায়নি। প্রতিবেদন প্রকাশ পর্যন্ত আপার সুবনসিরি জেলা প্রশাসন, অরুণাচল প্রদেশ সরকার কিংবা কেন্দ্রীয় প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কোনো সরকারি বক্তব্য সামনে আসেনি। তবু সীমান্তবর্তী এলাকার মানুষের এমন অভিযোগ প্রকাশ্যে আসতেই নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা (এলএসি) বরাবর চিনের অবকাঠামো নির্মাণ এবং সীমান্ত নিরাপত্তা নিয়ে।
চিন অধিকৃত তিব্বতের সীমানা ঘেঁষে অবস্থিত আপার সুবনসিরি জেলার দুর্গম টাকসিং অঞ্চল দীর্ঘদিন ধরেই কৌশলগত দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ওই এলাকাতেই বসবাস ‘নাহ্’ জনজাতির মানুষের। গত ২৬ জুন জেলার ডেপুটি কমিশনারের কাছে একটি বিস্তারিত স্মারকলিপি জমা দেয় ‘নাহ্ ওয়েলফেয়ার সোসাইটি’। ওই স্মারকলিপিতে দাবি করা হয়েছে, গত ১০ থেকে ১৫ বছর ধরে সীমান্তবর্তী এলাকায় ‘পিএলএ’-র তৎপরতা ধীরে ধীরে বাড়লেও ২০২০ সালের পর থেকে তা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। এর পর থেকেই ভারতের দাবি করা কয়েকটি এলাকায় স্থায়ী সামরিক উপস্থিতি গড়ে তুলেছে চিনা বাহিনী। কেরু চাদেরের বলেছেন, ‘ওই জমি আমাদের পূর্বপুরুষদের। বহু প্রজন্ম ধরে সেখানে আমরা শিকার করেছি, চাষ করেছি, গবাদি পশু চরিয়েছি এবং বনজ সম্পদ সংগ্রহ করেছি।’ তাঁর অভিযোগ, এখন ওই এলাকাগুলিতে স্থানীয় গ্রামবাসীদের প্রবেশে বাধা দিচ্ছে লাল ফৌজ। ফলে শুধু জমিই নয়, হারিয়ে যাচ্ছে মানুষের জীবিকা, জীবনযাত্রা এবং পূর্বপুরুষদের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা ঐতিহ্যও।
স্মারকলিপিতে পাঁচটি নির্দিষ্ট জায়গার নামও উল্লেখ করা হয়েছে। সংগঠনের দাবি, আসাফিলা এলাকার ওয়িং, চুজার্তা এলাকার পানিয়ার, মারনাফে এলাকার মারপান, পোত্রাং হ্রদ এবং টিন্ডিংটাং (টিজি) এলাকায় চিনা বাহিনী স্থায়ী রাস্তা, সেতু, সামরিক শিবির ও অন্যান্য পরিকাঠামো নির্মাণ করেছে। ওই অঞ্চলগুলির কয়েকটি টাকসিং সদর দফতরের কাছাকাছি। আবার কয়েকটি ৎসারি অঞ্চলের ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় গুরুত্বসম্পন্ন তীর্থপথের অংশ বলেও দাবি করেছে সংগঠনটি। তাঁদের আশঙ্কা, সীমান্তে চিনা আগ্রাসন অব্যাহত থাকলে স্থানীয়দের জীবিকার পাশাপাশি বহু প্রাচীন সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় যোগাযোগও ব্যাহত হবে। স্মারকলিপির ভাষায় ক্ষোভ যেমন রয়েছে, তেমনই রয়েছে উদ্বেগ ও ভারতীয় সেনাবাহিনীর উপর আস্থার কথাও। সংগঠনটি লিখেছে, ‘ভারতীয় সেনাবাহিনীর উপর আমাদের অগাধ আস্থা রয়েছে। তাঁরা বহু বছর ধরে সীমান্ত রক্ষা করছেন। কিন্তু বর্তমানে টাকসিং এলাকায় পিএলএ-র কর্মকাণ্ডের গতি ও উদ্দেশ্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক। আমরা প্রতিদিন ইঞ্চি ইঞ্চি করে আমাদের জমি হারাচ্ছি।’ সংগঠনটি অরুণাচল প্রদেশ সরকার ও কেন্দ্রের কাছে অবিলম্বে অভিযোগগুলির সত্যতা যাচাই, সীমান্তে নিরাপত্তা জোরদার এবং ভারতের দাবি করা ভূখণ্ড রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের আবেদন জানিয়েছে।
অভিযোগ সামনে আসার পরেই রাজনৈতিক মহলেও প্রতিক্রিয়া শুরু হয়েছে। অরুণাচল প্রদেশের প্রাক্তন বিধায়ক তথা ন্যাশনাল পিপলস পার্টির নেতা পাকঙ্গা বাগে পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলে বর্ণনা করেছেন। তাঁর মতে, এ খবর সীমান্তবর্তী অঞ্চলের মানুষের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। ১৯৬২ সালের ভারত-চিন যুদ্ধের স্মৃতিকে ফের উস্কে দিয়েছে। তিনি মুখ্যমন্ত্রী পেমা খান্ডু-র কাছে অবিলম্বে বিষয়টি খতিয়ে দেখার আবেদন জানান। পাশাপাশি অভিযোগ সত্য হলে কেন্দ্রের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় কৌশলগত পদক্ষেপ গ্রহণেরও আহ্বান জানিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং, অরুণাচলের সাংসদ এবং রাজ্য সরকারের কাছেও টাকসিং সেক্টরের প্রকৃত পরিস্থিতি নিয়ে স্পষ্ট সরকারি বিবৃতি দেওয়ার দাবি তুলেছেন তিনি। ঘটনায় প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন নাচো কেন্দ্রের বিধায়ক নাকাপ নালো-ও। তাঁর বক্তব্য, অভিযোগগুলি জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে সম্পর্কিত। ফলে প্রশাসনের তরফে আনুষ্ঠানিক তদন্ত ও যাচাই হওয়া জরুরি। অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলে দেশের অখণ্ডতার জন্য তা অত্যন্ত গুরুতর বিষয় হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
এদিকে, সাম্প্রতিক এ অভিযোগের জেরে আবারও সামনে এসেছে অরুণাচল প্রদেশে সীমান্ত নিরাপত্তা নিয়ে পুরনো বিতর্ক। প্রায় ছয় বছর আগে লোকসভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে অরুণাচলের সাংসদ তাপির গাও দাবি করেছিলেন, চিন ইতিমধ্যেই অরুণাচল প্রদেশে ভারতের প্রায় ৫০ কিলোমিটার ভূখণ্ড দখল করে নিয়েছে। সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহের পর সেই সংসদীয় বক্তৃতার ভিডিও ফের সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। এ বিতর্কে নতুন করে আলোচনায় এসেছে চিন ও তিব্বতের ইতিহাসও। বিংশ শতাব্দীর পঞ্চাশের দশকে মাও সে তুং-এর নির্দেশে চিনের ‘পিপলস লিবারেশন আর্মি’ স্বাধীন ও সার্বভৌম তিব্বতে সামরিক অভিযান চালিয়ে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। তার পর থেকেই শুরু হয় তিব্বতিদের উপর দমন-পীড়নের অভিযোগ। পরিস্থিতির জেরে তিব্বতি বৌদ্ধ ধর্মগুরু দলাই লামা বহু অনুগামীকে নিয়ে ভারতে আশ্রয় নেন। ভারত সরকার তাঁকে আশ্রয় দেয়। হিমাচল প্রদেশ ও উত্তরাখণ্ডের পাশাপাশি অরুণাচলের বিভিন্ন এলাকাতেও তিব্বতি শরণার্থীদের বসবাসের ব্যবস্থা করা হয়। তার পর থেকেই বেজিং সমগ্র অরুণাচল প্রদেশকে ‘দক্ষিণ তিব্বত’ বা চিনের অংশ বলে দাবি করে আসছে। সময়ে সময়ে বেজিং সে দাবিকে আরও জোরালো করেছে।
তবে, ভারত-চিন সীমান্তে অনুপ্রবেশের অভিযোগ অবশ্য এই প্রথম নয়। ২০২০ সালের পূর্ব লাদাখ সংঘাতের সময়ও ভারতীয় ভূখণ্ডে ঢুকে স্থানীয় পশুপালকদের ঐতিহ্যগত চরাঞ্চলে প্রবেশে বাধা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছিল ‘পিএলএ’-র বিরুদ্ধে। যদিও সে সময় কেন্দ্র সরকার জানিয়েছিল, লাদাখে ভারতের এক ইঞ্চি জমিও চিন দখল করেনি। পরে ২০২৪ সালেও অরুণাচলের অঞ্জো জেলার কাপাপু এলাকায় ভারতীয় ভূখণ্ডে প্রবেশ করে অস্থায়ী শিবির স্থাপনের অভিযোগ উঠেছিল চিনা বাহিনীর বিরুদ্ধে।
❤ Support Us






