Advertisement
  • দে । শ প্রচ্ছদ রচনা
  • জুন ২৯, ২০২৬

বিধানসভায় পাশ ওবিসি আইনের জোড়া সংশোধনী বিল, বাতিলের মুখে ৭৮টি জনগোষ্ঠীর সংরক্ষণ। ভোটাভুটিতে অংশগ্রহণ করলেন না ঋতব্রতরা

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
বিধানসভায় পাশ ওবিসি আইনের জোড়া সংশোধনী বিল, বাতিলের মুখে ৭৮টি জনগোষ্ঠীর সংরক্ষণ। ভোটাভুটিতে অংশগ্রহণ করলেন না ঋতব্রতরা

ওবিসি সংরক্ষণকে ঘিরে দীর্ঘদিনের আইনি ও রাজনৈতিক বিতর্কের আবহেই সোমবার পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় পাশ হলো দুটি গুরুত্বপূর্ণ সংশোধনী বিল। সরকারের দাবিকলকাতা হাই কোর্টের নির্দেশ মেনেই ২০১২ সালের সংশোধিত আইনের ত্রুটি’ দূর করতে এ পদক্ষেপ। অন্যদিকে বিরোধীদের অভিযোগসংশোধনের আড়ালে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য চরিতার্থের চেষ্টা হচ্ছে। জোড়া বিলকে কেন্দ্র করে সরকার ও বিরোধীদের মধ্যে তুমুল বাদানুবাদে সরগরম বিধানসভা।

এ দিন বিধানসভায় দ্য ওয়েস্ট বেঙ্গল ব্যাকওয়ার্ড ক্লাসেস (আদার দ্যান এসসি অ্যান্ড এসটি) রিজার্ভেশন অফ ভ্যাকেন্সিস ইন সার্ভিসেস অ্যান্ড পোস্টস (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল২০২৬’ এবং দ্য ওয়েস্ট বেঙ্গল কমিশন ফর ব্যাকওয়ার্ড ক্লাসেস (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল২০২৬’ পেশ করেন অনগ্রসর শ্রেণিকল্যাণ মন্ত্রী গৌরীশঙ্কর ঘোষ। প্রথমে ধ্বনিভোটে বিল পাশ করানোর পরিকল্পনা থাকলেও আইএসএফ বিধায়ক নওশাদ সিদ্দিকির আবেদনে স্পিকার রথীন্দ্র বসু ডিভিশনের অনুমতি দেন। ভোটাভুটিতে বিলের পক্ষে পড়ে ১৮৬টি ভোটবিপক্ষে ১৭টি। ছজন বিধায়ক ভোটদানে বিরত থাকেন।

এ সংশোধনীর ফলে, বর্তমান ওবিসি ক্যাটেগরি ’-এর আওতায় থাকা ৬৫টি জনগোষ্ঠীর তালিকায় কোনো পরিবর্তন আনা হয়নি। তবে তৃণমূল সরকারের ২০১২ সালের সংশোধনী আইনে ক্যাটেগরি বি’-তে অন্তর্ভুক্ত ৭৮টি জনগোষ্ঠীর তালিকা সম্বলিত শিডিউল-১ বাতিলের প্রস্তাব কার্যকর করা হয়েছে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে কোনো জনগোষ্ঠীকে ওবিসি তালিকাভুক্ত করা বা তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার ক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গ অনগ্রসর শ্রেণি কমিশন’-এর সুপারিশকে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। কমিশনের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে নাগরিকদের আপত্তি জানানোর সুযোগও রাখা হয়েছে নতুন আইনে।

সরকার পক্ষের দাবি জোড়া সংশোধনের মূল লক্ষ্য ওবিসি সংরক্ষণ ব্যবস্থাকে আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী আরও স্বচ্ছবৈজ্ঞানিক এবং সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসা। বিধানসভায় গৌরীশঙ্কর ঘোষের বক্তব্য, ‘আগের সরকার রাজনৈতিক স্বার্থে অতিরিক্ত বহু সম্প্রদায়কে ওবিসি তালিকাভুক্ত করেছিল। কলকাতা হাই কোর্ট সে প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল। আদালতের পর্যবেক্ষণের সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতেই নতুন সংশোধনী আনা হয়েছে।’ তাঁর আরও দাবিবর্তমান বিলে ১৯৯৩ সালের মূল আইনে স্বীকৃত জনগোষ্ঠীগুলির কোনো পরিবর্তন করা হয়নি। ভবিষ্যতে কমিশন সামাজিক ও শিক্ষাগত অনগ্রসরতার নিরিখে সমীক্ষা করে সুপারিশ করলে তবেই নতুন কোনো সম্প্রদায়কে তালিকাভুক্ত করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে সরকার।

ওবিসি সংরক্ষণ নিয়ে রাজ্যে বিতর্কের সূত্রপাত অবশ্য নতুন নয়। রঙ্গনাথ মিশ্র কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতে বামফ্রন্ট সরকারের আমলে পশ্চিমবঙ্গে ওবিসি সংরক্ষণ চালু হয়। অনগ্রসরতার মাত্রা অনুযায়ী ক্যাটেগরি এ’ এবং ক্যাটেগরি বি’— দুভাগে সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। ক্যাটেগরি ’-এর জন্য ১০ শতাংশ এবং বি’-এর জন্য ৭ শতাংশ সংরক্ষণ নির্ধারিত ছিল। পরে ২০১২ সালে তৃণমূল সরকার আইনে সংশোধন এনে ক্যাটেগরি ’-তে ৬৫টি এবং ক্যাটেগরি বি’-তে ৭৮টি জনগোষ্ঠীর তালিকা যুক্ত করে। সে তালিকাতেই অধিকাংশ মুসলিম সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্তি নিয়ে বিজেপি দীর্ঘদিন ধরেই ভোটব্যাঙ্ক রাজনীতি’ ও মুসলিম তোষণ’-এর অভিযোগ তুলে এসেছে। রবর্তী সময়ে ওবিসি শংসাপত্র প্রদান সংক্রান্ত মামলায় কলকাতা হাই কোর্ট ২০১০ সালের পর জারি হওয়া বহু ওবিসি শংসাপত্র বাতিল করে দেয়। আদালত পর্যবেক্ষণে জানায়যথাযথ সমীক্ষা ও কমিশনের সুপারিশ ছাড়াই বহু সম্প্রদায়কে ওবিসি তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। পালাবদলের পর, আদালতের সে রায়ের উপর ভিত্তি করে আইন সংশোধনের প্রস্তুতি শুরু করে বর্তমান বিজেপি সরকার।

এদিন, বিধানসভার আলোচনায় বিজেপি বিধায়ক অরিজিৎ বক্সী অভিযোগ করেন, ‘আগের সরকার ধর্মের ভিত্তিতে সংরক্ষণের সুযোগ বাড়িয়ে ভোটব্যাঙ্কের রাজনীতি করেছে। এ সংশোধনী সেই অন্যায় সংশোধনের উদ্যোগ।অন্য দিকে বিলের তীব্র বিরোধিতা করেন আইএসএফ বিধায়ক নওশাদ সিদ্দিকি। তাঁর বক্তব্য, ‘সংরক্ষণের প্রশ্নে ধর্ম নয়আর্থসামাজিক ও শিক্ষাগত অনগ্রসরতাই হওয়া উচিত একমাত্র মানদণ্ড। এ সংশোধনের কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। এতে অনগ্রসর সমাজের মধ্যেই বিভাজন তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।’ তিনি কেরল ও তামিলনাড়ুর সংরক্ষণ মডেল বিবেচনা করারও পরামর্শ দেন। সিপিআইএম-এর একমাত্র বিধায়ক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘আগের তালিকার ভিত্তিতে যাঁরা ইতিমধ্যে চাকরিতে যোগ দিয়েছেন বা সংরক্ষণের সুবিধা পেয়েছেনতাঁদের স্বার্থ যাতে কোনো ভাবেই ক্ষুণ্ণ না হয়তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।’  জয়নগরের তৃণমূল বিধায়ক বিশ্বনাথ দাসও দাবি করেন, ‘অনগ্রসর শ্রেণির প্রকৃত অধিকার যেন নিশ্চিত করা হয় নতুন বিলে।’ জলঙ্গির তৃণমূল বিধায়ক বাবর আলি সরকারের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তাঁর বক্তব্যকেন্দ্রীয় ও রাজ্য স্তরের একাধিক কমিশন কোনো সম্প্রদায়কে অনগ্রসর বলে চিহ্নিত করার পর কোন সমীক্ষার ভিত্তিতে তাদের তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছেতার ব্যাখ্যা সরকারকে দিতে হবে।

তবে, শুধু সংরক্ষণের তালিকাই নয়দ্বিতীয় সংশোধনী বিলের মাধ্যমে পশ্চিমবঙ্গ অনগ্রসর শ্রেণি কমিশনের প্রশাসনিক কাঠামোতেও একাধিক পরিবর্তন আনা হয়েছে। সদস্য-সচিব পদে এতদিন সচিব পদমর্যাদার আধিকারিক নিয়োগের বিধান থাকলেও এখন থেকে জয়েন্ট সেক্রেটারি বা তার ঊর্ধ্বতন পদমর্যাদার আধিকারিককে নিয়োগ করা যাবে। কমিশনের সদস্যদের মেয়াদ তিন বছর নির্দিষ্ট করা হয়েছে। পাশাপাশি কোনো সম্প্রদায়কে ওবিসি তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করাতালিকা থেকে বাদ দেওয়াঅতিরিক্ত অন্তর্ভুক্তি বা কম অন্তর্ভুক্তি— এসব বিষয়ে সরাসরি অভিযোগ গ্রহণ ও তার সুপারিশ করার ক্ষমতাও কমিশনকে দেওয়া হয়েছে। বিধানসভায় কক্ষে বিল নিয়ে ভোটাভুটির সময়েও প্রবল নাটকীয়তা দেখা যায়। ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন তৃণমূলের একাংশ ভোটাভুটির আগেই ওয়াকআউট করে,  দলের অন্য অংশ ভোটাভুটিতে অংশ নেয়। পরে কয়েক জন বিধায়ক মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলে নিজেদের আসনে ফিরে যান। স্পিকার রথীন্দ্র বসু সময়মতো কক্ষত্যাগ না করায় কয়েক জন বিধায়ককে ভর্ৎসনাও করেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ওবিসি সংরক্ষণ নিয়ে রাজ্যে যে রাজনৈতিক সংঘাত আগামী দিনেও অব্যাহত থাকবেবিধানসভার সোমবারের অধিবেশন তারই স্পষ্ট ইঙ্গিত দিল। এক দিকে সরকারের দাবিআদালতের নির্দেশ মেনে সংরক্ষণ ব্যবস্থাকে নতুন আইনি ভিত্তি দেওয়া হচ্ছে। অন্যদিকে বিরোধীদের অভিযোগসংরক্ষণের প্রশ্নকে রাজনৈতিক মেরুকরণের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। এখন নজর রাজ্যপালের অনুমোদনের দিকে। তাঁর অনুমোদন মিললেই কার্যকর হবে সংশোধিত আইনআর তার পরই শুরু হবে নতুন নিয়মে ওবিসি তালিকা পুনর্বিন্যাসের প্রক্রিয়া।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!