Advertisement
  • স | হ | জ | পা | ঠ
  • আগস্ট ১০, ২০২৬

বালিস্তূপের রহস্য উন্মোচনে বিশ্ব-স্বীকৃতি! ‘ডিরাক মেডেল’ পেলেন পদার্থবিদ দীপক ধর

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
বালিস্তূপের রহস্য উন্মোচনে বিশ্ব-স্বীকৃতি! ‘ডিরাক মেডেল’ পেলেন পদার্থবিদ দীপক ধর

এক মুঠো বালি। একের পর এক কণা জমে তৈরি হচ্ছে ছোট্ট একটি স্তূপ। বাইরে থেকে দেখলে নিছক সাধারণ ঘটনা। কিন্তু, সে স্তূপের ভিতরেই লুকিয়ে থাকতে পারে এমন এক অদ্ভুত নিয়ম, যেখানে সামান্য একটি পরিবর্তন কখনো কোনো প্রভাবই ফেলবে না, আবার কখনো সেই একটি পরিবর্তনেই হুড়মুড় করে ভেঙে পড়তে পারে গোটা ব্যবস্থা। বালির স্তূপের এই আপাত-সরল অথচ গভীর রহস্য নিয়েই দীর্ঘদিন গবেষণা করেছেন ভারতীয় তাত্ত্বিক পদার্থবিদ অধ্যাপক দীপক ধর। প্রকৃতির জটিল ব্যবস্থার আচরণ বোঝার ক্ষেত্রে তাঁর সেই গবেষণাই তাঁকে এনে দিয়েছে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। ২০২৬ সালের ‘ডিরাক মেডেল’ পেলেন দীপক ধর। তাত্ত্বিক পদার্থবিদ্যার অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ এই সম্মানের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে স্টিফেন হকিংয়ের মতো বিজ্ঞানীর নামও।

ইতালির ট্রিয়েস্তেতে অবস্থিত ‘ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর থিওরেটিক্যাল ফিজিক্স’ এ বছর চার জন বিজ্ঞানীর হাতে এ সম্মান তুলে দেওয়ার কথা ঘোষণা করেছে। দীপক ধরের পাশাপাশি রয়েছেন কলেজ দ্য ফ্রঁসের সাম্মানিক অধ্যাপক বার্নার্ড দেরিদা, বোকোনি বিশ্ববিদ্যালয়ের তাত্ত্বিক পদার্থবিদ্যার অধ্যাপক মার্ক মেজার্ড এবং জেরুজালেমের হিব্রু বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হাইম সোমপোলিনস্কি।দীপক ধরের গবেষণার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র ‘স্ট্যাটিস্টিক্যাল মেকানিক্স’ বা পরিসংখ্যানগত বলবিদ্যা। বিপুল সংখ্যক কণা বা উপাদান একসঙ্গে থাকলে কী ভাবে তারা সম্মিলিত ভাবে আচরণ করে, সে আচরণের মধ্যে কী ভাবে নিয়ম তৈরি হয়, আর কখন বা কেন ছোট্ট কোনো পরিবর্তন বড়সড় ঘটনার জন্ম দেয়— এসব প্রশ্নগুলির উত্তর খোঁজে বিজ্ঞানের এই শাখা।

এই ক্ষেত্রেই দীপক ধরের অন্যতম যুগান্তকারী কাজ ‘স্যান্ডপাইল মডেল’। ধরা যাক, একটি জায়গায় ক্রমাগত বালি জমা হচ্ছে। একটি-দুটি বালিকণা পড়ল, কিছুই হলো না। আরও কয়েকটি পড়ল, হয়তো সামান্য বালি গড়িয়ে পড়ল। কিন্তু একটা সময় এমন পরিস্থিতি তৈরি হল, যখন মাত্র একটি নতুন বালিকণা যোগ করতেই গোটা স্তূপে নেমে এল ধস। কেন এমন হয়? এই আপাত সাধারণ প্রশ্নের মধ্যেই রয়েছে জটিল ব্যবস্থার আচরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র। দীপক ধরের গবেষণা দেখিয়েছে, কোনো ব্যবস্থা কীভাবে নিজে থেকেই এমন একটি অবস্থায় পৌঁছতে পারে, যেখানে সামান্য পরিবর্তনও বড়সড় ঘটনার সূত্রপাত করতে পারে। এই ঘটনাকেই বিজ্ঞানের পরিভাষায় বলা হয় ‘স্ব-সংগঠিত সংকটাবস্থা’।

এ ধারণার গুরুত্ব শুধু বালির স্তূপেই আটকে নেই। ভূমিকম্পের মতো প্রাকৃতিক বিপর্যয়, যানজট, আর্থিক বাজারের আচরণ কিংবা বাস্তুতন্ত্রের ভাঙনের মতো জটিল ঘটনাকেও এ ধরনের ধারণার সাহায্যে বোঝার চেষ্টা করা হয়। ‘ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর থিওরেটিক্যাল ফিজিক্স’-এর মতে, দীপক ধরের কাজের অন্যতম তাৎপর্য হলো— কী ভাবে সরল পারস্পরিক ক্রিয়া থেকে একটি বৃহৎ ব্যবস্থায় অত্যন্ত জটিল এবং কখনো কখনো অপ্রত্যাশিত আচরণ তৈরি হতে পারে, তা ব্যাখ্যা করা। স্যান্ডপাইল মডেলের সঙ্গে যুক্ত তাঁর আর একটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান ‘ধরের বার্নিং অ্যালগরিদম’। স্ব-সংগঠিত সংকটাবস্থা এবং জটিল ব্যবস্থা নিয়ে গবেষণায় এই অ্যালগরিদম বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

দীপক ধরের এই আন্তর্জাতিক সাফল্যের শুরু অবশ্য অনেক দূরে, উত্তরপ্রদেশের প্রতাপগড়ে। ১৯৫১ সালে সেখানেই জন্ম তাঁর। মফঃস্বল পরিবেশে বড়ো হয়ে ওঠা। ছোটবেলা থেকেই বিজ্ঞানের প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়েছিল। বাড়িতে বিজ্ঞানবিষয়ক পত্রিকা নিয়ে আসতেন তাঁর বাবা। সে পত্রিকার পাতায় চোখ রেখেই বিজ্ঞান সম্পর্কে জানার আগ্রহ আরও গভীর হয় তাঁর। প্রতাপগড় থেকে পড়াশোনার পথ তাঁকে নিয়ে যায় এলাহাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ে। তার পর আইআইটি কানপুরে উচ্চশিক্ষা। সেখান থেকে পাড়ি দেন আমেরিকার ‘ক্যালিফোর্নিয়া ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি’-তে। সেখানে গিয়ে যে অভিজ্ঞতা তাঁর গবেষণাজীবনে বিশেষ ছাপ ফেলেছিল, তা হল বিশ্বখ্যাত পদার্থবিদ রিচার্ড ফাইনম্যানের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ। ফাইনম্যানের শিক্ষণ-সহকারী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন দীপক ধর। ১৯৭৮ সালে ক্যালটেক থেকেই পিএইচডি সম্পূর্ণ করেন তিনি। সে সময় চাইলে আমেরিকাতেই থেকে যেতে পারতেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত নেন দীপক ধর।

পিএইচডি-র পর মুম্বাইয়ের ‘টাটা ইনস্টিটিউট অব ফান্ডামেন্টাল রিসার্চ’-এ যোগ দেন তিনি। সেখানে তাত্ত্বিক পদার্থবিদ্যার শক্তিশালী গবেষণা-পরিবেশের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পরবর্তী কয়েক দশক ধরে মৌলিক বিজ্ঞানের নানা জটিল সমস্যা নিয়ে কাজ করেছেন। পুণের ‘ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স এডুকেশন অ্যান্ড রিসার্চ’-এও অধ্যাপক হিসেবে দীর্ঘ সময় কাজ করেছেন তিনি। গবেষণার পাশাপাশি বহু ছাত্রছাত্রীকে পড়িয়েছেন। বর্তমানে বেঙ্গালুরুর ‘ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর থিওরেটিক্যাল সায়েন্সেস’, টিআইএফআর-এ আইএনএসএ বিশিষ্ট অধ্যাপক হিসাবে যুক্ত রয়েছেন দীপক ধর। ২০২৪ সাল থেকে এই পদে রয়েছেন তিনি।

ডিরাক মেডেল দীপক ধরের দীর্ঘ গবেষণাজীবনের একমাত্র বড়ো সম্মান নয়। তাঁর পুরস্কার প্রাপ্তির তালিকা দীর্ঘ। ২০০১ সালে তিনি পান ‘ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল সায়েন্স অ্যাকাডেমি’-র ‘এস এন বোস মেডেল’। সত্যেন্দ্রনাথ বসুর নামে দেওয়া এই সম্মানের সঙ্গে বাংলার বিজ্ঞানচর্চার একটি সরাসরি যোগ রয়েছে। ২০২২ সালে পরিসংখ্যানগত পদার্থবিদ্যার অন্যতম সর্বোচ্চ সম্মান ‘বোল্টজম্যান মেডেল’ পান তিনি। এই পুরস্কার পাওয়া প্রথম ভারতীয় হিসেবে ইতিহাস তৈরি করেন দীপক ধর। জন হপফিল্ডের সঙ্গে যৌথ ভাবে ওই সম্মান পেয়েছিলেন তিনি। তার পরের বছর, ২০২৩ সালে, ভারত সরকার তাঁকে দেশের অন্যতম সর্বোচ্চ অসামরিক সম্মান ‘পদ্মভূষণ’ প্রদান করে। তারও আগে, ১৯৯১ সালে, তিনি পেয়েছিলেন ‘শান্তি স্বরূপ ভাটনাগর পুরস্কার’।৭৪ বছর বয়সেও গবেষণার জগতে তাঁর সক্রিয়তা এতটুকু কমেনি। বরং নতুন প্রজন্মের গবেষকদের কাছে তাঁর কাজ আজও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে রয়েছে।

প্রসঙ্গত, ব্রিটিশ পদার্থবিদ পল ডিরাক ছিলেন বিংশ শতাব্দীর তাত্ত্বিক পদার্থবিদ্যার অন্যতম শ্রেষ্ঠ নাম। তাঁর স্মৃতিতে ১৯৮৫ সালে ডিরাক মেডেল চালু করে ‘ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর থিওরেটিক্যাল ফিজিক্স’। তাত্ত্বিক পদার্থবিদ্যায় অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসাবেই প্রতিবছর এ সম্মান দেওয়া হয়। পুরস্কার প্রাপকদের তালিকায় রয়েছেন বিশ্বের একাধিক খ্যাতনামা পদার্থবিদ। তাঁদের মধ্যে স্টিফেন হকিংও রয়েছেন। ফলে দীপক ধরের নাম সে তালিকায় যুক্ত হওয়া নিঃসন্দেহে ভারতীয় বিজ্ঞানমহলের কাছে আনন্দের খবর। ‘ডিরাক মেডেল’ তাই শুধু দীপক ধরের ব্যক্তিগত সাফল্য নয়। এটি ভারতের মৌলিক বিজ্ঞান গবেষণার ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য স্বীকৃতি।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!