- এই মুহূর্তে বি। দে । শ
- জুলাই ২৮, ২০২৬
দক্ষিণ জাপানে তীব্র ভূমিকম্প, জখম বহু। উদ্ধারকাজে সেনা, সুনামির সতর্কতা জারি
ফের প্রকৃতির রোষানলে জাপান। মঙ্গলবার বিকেলে ৭.১ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্পে কেঁপে উঠল দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কিউশু দ্বীপের কুমামোতো প্রদেশ। সমুদ্রপৃষ্ঠের মাত্র ১০ কিলোমিটার গভীরে ভূমিকম্পের উৎপত্তি হওয়ায় প্রবল কম্পনে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে। ভূমিকম্পের পরপরই জাপান আবহাওয়া সংস্থা কিউশুর একাধিক উপকূলবর্তী এলাকায় সুনামির সতর্কতা জারি করে। প্রশাসনের তরফে বাসিন্দাদের অবিলম্বে নিরাপদ উঁচু জায়গায় সরে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। যদিও পরে পরিস্থিতি পর্যালোচনার পর সে সতর্কতা তুলে নেওয়া হয়েছে। তবুও পরবর্তী কয়েক দিন শক্তিশালী আফটারশকের আশঙ্কা থাকায় সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।
জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি জানিয়েছেন, ভূমিকম্পে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বহু মানুষ আহত হয়েছেন। বিভিন্ন জায়গায় বহুতল ভবন, রাস্তা ও সেতুর ক্ষতির খবর মিলছে। কোথাও বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়েছে, কোথাও আবার আগুন লাগার ঘটনাও ঘটেছে। যদিও শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত প্রাণহানির খবর মেলেনি। কোথায় কতটা ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তার পূর্ণাঙ্গ হিসাব এখনো তৈরি হয় নি বলে জানিয়েছে জাপানের প্রশাসন।
জানা গেছে, ভূমিকম্পের কেন্দ্রস্থল ছিল কিউশুর কুমামোতো অঞ্চল, যা টোকিও থেকে প্রায় ৯০০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত। জাপান আবহাওয়া সংস্থা ভূমিকম্পের মাত্রা ৭.১ বলে জানালেও মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা প্রথমে একই মাত্রা উল্লেখ করে পরে তা সংশোধন করে ৬.৮ জানায়। ভূমিকম্পের উৎসস্থল ছিল সমুদ্রপৃষ্ঠের মাত্র ১০ কিলোমিটার নীচে। অগভীর উৎসস্থলের কারণেই কম্পনের তীব্রতা অনেক বেশি অনুভূত হয়েছে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। ভূমিকম্পের পর জাপান সরকারের তরফে কিউশু দ্বীপের নাগাসাকি, কুমামোতো, কাগোশিমা, ফুকুওকা, সাগা, ওইতা এবং মিয়াজাকি প্রিফেকচারে জরুরি ভূমিকম্প সতর্কতা জারি করা হয়। সংবাদসংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, সম্ভাব্য আফটারশকের কথা মাথায় রেখেই এ সতর্কতা জারি করা হয়েছে। একই সঙ্গে আরিয়াকে ও ইয়াতসুশিরো সাগর সংলগ্ন উপকূল এলাকায় এক মিটার পর্যন্ত উঁচু ঢেউ আছড়ে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়। সরকারি সম্প্রচার সংস্থা এনএইচকে জানায়, কিছু এলাকায় সে উচ্চতার ঢেউ ইতিমধ্যেই পৌঁছে থাকতে পারে। যদিও পরে দেখা যায়, বড় ধরনের সুনামি তৈরি হয়নি এবং প্রায় দু’ঘণ্টার মধ্যেই সতর্কতা প্রত্যাহার করা হয়।
প্রধানমন্ত্রী তাকাইচি জরুরি বৈঠকের পর জানান, ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত চিত্র জানতে একটি বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে। তাঁর নির্দেশ, মানবজীবন রক্ষাকেই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। তিনি বলেন, ‘মানুষের জীবনই আমাদের প্রথম অগ্রাধিকার।’ স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় রেখে যত দ্রুত সম্ভব উদ্ধার ও ত্রাণকাজ চালানোর নির্দেশও দিয়েছেন তিনি। কুমামোতো প্রদেশের গভর্নরের অনুরোধে জাপানের সেল্ফ-ডিফেন্স ফোর্সের ৩,৬০০ সদস্যকে দুর্গত এলাকায় মোতায়েন করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর দফতরের বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, সারা রাত ধরে ক্ষয়ক্ষতির মূল্যায়ন, আটকে পড়া মানুষদের উদ্ধার এবং পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের কাজ চলবে। আকাশপথ থেকেও ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলি পর্যবেক্ষণ করছে প্রতিরক্ষা মন্ত্রক।
সবচেয়ে ভয়াবহ ঘটনাগুলির মধ্যে একটি ঘটেছে একটি বাণিজ্যিক শপিং কমপ্লেক্সে। এনএইচকে-র প্রতিবেদনে এক প্রত্যক্ষদর্শীর দাবি, ভবনটিতে প্রথমে বিস্ফোরণের মতো শব্দ শোনা যায় এবং ধোঁয়া বের হতে দেখা যায়। তারপরই দ্বিতীয় তলার বেশিরভাগ অংশ ধসে পড়ে। বহু ক্রেতা ও কর্মচারী ভিতরে আটকে পড়েছেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। পরে জাপানের ফায়ার অ্যান্ড ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট এজেন্সিও নিশ্চিত করে যে, একটি বাণিজ্যিক ভবনের দ্বিতীয় তলা ধসে পড়েছে, ভিতরে বহু মানুষ আটকে রয়েছেন। তাঁদের উদ্ধারে যুদ্ধকালীন তৎপরতায় কাজ করছে উদ্ধারকারী দল। কিয়োদো নিউজ জানিয়েছে, ইয়াতসুশিরো শহরের একটি হাসপাতালে ইতিমধ্যেই প্রায় ৪০ জন আহতকে ভর্তি করা হয়েছে। একই সঙ্গে ইয়াতসুশিরো রেলস্টেশনে একটি ট্রেন লাইনচ্যুত হয়ে একদিকে কাত হয়ে পড়েছে। ঐতিহাসিক কুমামোতো দুর্গের পাথরের প্রাচীরেরও কিছু অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ভূমিকম্পের অভিঘাতে কিউশুর যোগাযোগ ব্যবস্থাও কার্যত বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। নিরাপত্তার খাতিরে শিনকানসেন বুলেট ট্রেন এবং স্থানীয় ট্রেন পরিষেবা সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়। আসো কুমামোতো বিমানবন্দরের রানওয়েও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নিরাপত্তা পরীক্ষা সম্পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত বিমান ওঠানামা শুরু করা সম্ভব নয়। যদিও বিভিন্ন জায়গায় বাড়িঘর, রাস্তা, সেতু এবং অন্যান্য অবকাঠামোর ক্ষতির খবর মিলছে, তবুও জাপানের নিউক্লিয়ার রেগুলেশন অথরিটি জানিয়েছে, কাছাকাছি তিনটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে কোনো অস্বাভাবিকতা ধরা পড়েনি। পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলি নিরাপদ রয়েছে বলেই প্রাথমিক রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে।
উল্লেখ্য, মাত্র কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে এটি জাপানে দ্বিতীয় বড় ভূমিকম্প। গত ২৫ জুন উত্তর জাপানে ৭.২ মাত্রার একটি ভূমিকম্প আঘাত হেনেছিল। যদিও সে ঘটনায় প্রাণহানি বা বড়ো ধরনেরক্ষয়ক্ষতি হয়নি। চলতি বছরের ২০ এপ্রিলও দেশের উত্তরাঞ্চলে ৭.৭ মাত্রার একটি ভূমিকম্পে অন্তত ১০ জন আহত হন। সে ঘটনার পর ৮.০ বা তার বেশি মাত্রার ভূমিকম্পের ঝুঁকি নিয়ে বিশেষ সতর্কতাও জারি করেছিল জাপান সরকার, যা এক সপ্তাহ পরে প্রত্যাহার করা হয়। বিশ্বের অন্যতম ভূমিকম্পপ্রবণ দেশ জাপান প্রশান্ত মহাসাগরের অগ্নিবলয় বা ‘রিং অফ ফায়ার’-এর উপর অবস্থিত। চারটি প্রধান টেকটোনিক প্লেটের সংযোগস্থলে অবস্থানের কারণে বছরে প্রায় ১,৫০০টি ভূমিকম্প অনুভূত হয় সে দেশে। বিশ্বের মোট ভূমিকম্পের প্রায় ১৮ শতাংশই ঘটে জাপানে। অধিকাংশ কম্পন কম শক্তির হলেও, অগভীর উৎসস্থল বা জনবহুল এলাকায় আঘাত হানলে তার প্রভাব ভয়াবহ হতে পারে।
প্রসঙ্গপ্ত, ২০১১ সালের ৯.০ মাত্রার বিধ্বংসী সমুদ্রতল ভূমিকম্প এবং তার পরবর্তী সুনামির স্মৃতি এখনো তাড়া করে বেড়ায় জাপানকে। সে বিপর্যয়ে প্রায় ১৮,৫০০ মানুষ নিহত বা নিখোঁজ হয়েছিলেন। ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছিল ফুকুশিমা পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রও। আবার ২০১৬ সালে কুমামোতোয় শক্তিশালী ভূমিকম্পে ৫০ জনেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছিল, আহত হয়েছিলেন প্রায় ১,৮০০ জন এবং কয়েক হাজার বাড়িঘর ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। মঙ্গলবারের ভূমিকম্প তাই ফের একবার মনে করিয়ে দিল, অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ও কঠোর বিপর্যয় মোকাবিলা ব্যবস্থার পরেও প্রকৃতির সামনে এখনো কতটা অসহায় বিশ্বের অন্যতম ভূকম্পপ্রবণ এই দ্বীপরাষ্ট্র।
❤ Support Us







