- এই মুহূর্তে দে । শ
- সেপ্টেম্বর ১২, ২০২৬
নন্দীগ্রামে তৃণমূলের প্রার্থী-সংকট, রেকর্ড জয়ের লক্ষ্য বিজেপির
নন্দীগ্রাম উপনির্বাচনে মুখোমুখি লড়াইয়ের আবহ এখনো নেই। বিজেপির লক্ষ্য ব্যবধান বাড়িয়ে রেকর্ড গড়া, আর তৃণমূলের সামনে সবচেয়ে বড়ো প্রশ্ন — প্রার্থীই হবে কে? আগামী ৬ অক্টোবর নন্দীগ্রাম বিধানসভা আসনে উপনির্বাচন। ভোটগণনা হবে ৯ অক্টোবর। মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ দিন আগামী ১৬ সেপ্টেম্বর। কিন্তু ভোটের দিন যত এগিয়ে আসছে, ততই স্পষ্ট হচ্ছে নন্দীগ্রামের নির্বাচনী সমীকরণ। বিজেপি যেখানে বড়ো ব্যবধানে জয়ের লক্ষ্যে মাঠে নেমেছে, সেখানে প্রার্থী বাছাই নিয়েই কার্যত হিমশিম খাচ্ছে তৃণমূল।
২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে নন্দীগ্রামে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ১ হাজার ৯৫৬ ভোটে হারিয়ে রাজনৈতিক চমক তৈরি করেছিলেন শুভেন্দু অধিকারী। পরবর্তী সময়ে ব্যবধান আরও বাড়িয়ে ৯ হাজার ৬৬৫ ভোটে জয় পান তিনি। মমতাকে হারিয়ে জেতা ভবানীপুর আসনটি রেখে নন্দীগ্রাম ছেড়ে দেন বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী। এবার সে নন্দীগ্রামেই উপনির্বাচন। চলতি বছরের বিধানসভা নির্বাচনে ফলতা কেন্দ্রের ভোট বাতিল করে পুনর্নির্বাচনের নির্দেশ দিয়েছিল নির্বাচন কমিশন। সেই পুনর্নির্বাচনে বিজেপি ১ লক্ষ ৯ হাজার ২১ ভোটে জয়ী হয়। সে ব্যবধানকেই নন্দীগ্রামের উপনির্বাচনে বেঞ্চমার্ক হিসেবে ধরেছেন শুভেন্দু। দলীয় নেতা-কর্মীদের তাঁর স্পষ্ট নির্দেশ, ফলতার ব্যবধানকে ছাপিয়ে যেতে হবে।
স্থানীয় বিজেপি নেতাদের দাবি, নন্দীগ্রামে তা সম্ভবও। কারণ, তৃণমূল আদৌ কতটা লড়াই করতে পারবে, কিংবা শেষ পর্যন্ত কোনো শক্তিশালী প্রার্থী দিতে পারবে কি না, তা নিয়েই দলের অন্দরে সংশয় রয়েছে। নন্দীগ্রামের উপনির্বাচনের আগে রাজ্যের প্রধান বিরোধী দল তৃণমূল কার্যত তিনটি শিবিরে বিভক্ত — মমতাপন্থী তৃণমূল, ঋতব্রতপন্থী তৃণমূল এবং এনসিপিআই-তৃণমূল। এনসিপিআই-তৃণমূলের তরফে অবশ্য উপনির্বাচন নিয়ে এখনো কোনো সক্রিয়তা দেখা যায়নি।
অন্যদিকে মমতাপন্থী এবং ঋতব্রতপন্থী — দুই শিবিরই প্রার্থী দেওয়ার কথা জানিয়েছে। দুই পক্ষেরই দাবি, প্রার্থী বাছাই নিয়ে আলোচনা চলছে। তবে নন্দীগ্রামের ‘ভূমিপুত্র’ কোনো নেতাকে শেষ পর্যন্ত প্রার্থী করা সম্ভব হবে কি না, সেটিই এখন সবচেয়ে বড়ো প্রশ্ন।
নন্দীগ্রামে একসময় তৃণমূলের পরিচিত মুখ ছিলেন শেখ সুফিয়ান ও আবু তাহের। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের একদা আস্থাভাজন এই দুই নেতাই এখন দলের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন। আবু তাহের দলের বর্তমান পরিস্থিতির জন্য অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় ও আইপ্যাককে নিশানা করেছেন। উপনির্বাচনে তাঁকে প্রার্থী হওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হলে কী করবেন, সে প্রশ্নের জবাবে তাহের সাফ জানিয়েছেন, এমন প্রস্তাব তিনি প্রত্যাখ্যান করবেন। তাঁর বক্তব্য, সুদিনে দল তাঁকে গুরুত্ব দেয়নি, আর এখন দুর্দিনে তাঁকে ‘বলির পাঁঠা’ করা হলে তিনি সে দায়িত্ব নেবেন না। নিজেকে অবশ্য এখনও মমতাপন্থী বলেই দাবি করেছেন তিনি।
ঋতব্রত শিবির সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তাহের বলেন, ওই শিবিরের সঙ্গে তাঁর কী সম্পর্ক, তা তিনি জানেন না। পাশাপাশি তাঁর মন্তব্য, ‘ঋতব্রত-তৃণমূল আবার কী? যদিও নেত্রীই তাঁকে নিয়ে এসেছেন।’ শেখ সুফিয়ানের ক্ষোভ আরও স্পষ্ট। তাঁর দাবি, ‘তৃণমূল শেষ।’ দলের বর্তমান দুরবস্থার জন্য তিনিও অভিষেকের দিকেই আঙুল তুলেছেন। তাঁর অভিযোগ, নন্দীগ্রামের রাজনীতি পরিচালনায় দীর্ঘদিন ‘বহিরাগতদের’ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এমনকি সাম্প্রতিক সময়ে শুভেন্দু অধিকারীর প্রশংসাও শোনা গিয়েছে সুফিয়ানের মুখে।
গত বিধানসভা নির্বাচনে শুভেন্দু অধিকারীর বিরুদ্ধে তৃণমূলের প্রার্থী ছিলেন পবিত্র কর। ভোটের আগে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাত ধরে তৃণমূলে যোগ দিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু ভোটের পর থেকে নন্দীগ্রামের এলাকায় তাঁর তেমন উপস্থিতি নেই। দলের ভাঙনের মধ্যেও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিবিরে সক্রিয় থাকা নেতাদের মধ্যে অন্যতম অখিল গিরি। ইতিমধ্যেই নন্দীগ্রামের ১ ও ২ নম্বর ব্লকের নেতাদের নিয়ে বৈঠক করেছেন তিনি। অখিল জানিয়েছেন, প্রার্থীর বিষয়ে নেতৃত্বের সঙ্গে আলোচনায় বসার আগে জেলাস্তরে আলোচনা চলছে। এরপর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করা হবে।
অন্যদিকে ঋতব্রতপন্থী শিবিরের বক্তব্য, নন্দীগ্রাম এবং মুর্শিদাবাদের রেজিনগর—দুই আসনেই তারা প্রার্থী দেবে। নাম চূড়ান্ত হলেই তা জানিয়ে দেওয়া হবে। তবে ঋতব্রতপন্থী শিবিরের তরফে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে কার্যত নন্দীগ্রামে ফের লড়াইয়ের আহ্বানও জানানো হয়েছে। তাদের বক্তব্য, মমতা যদি নন্দীগ্রামে প্রার্থী হন, তাহলে তাঁরা নিজেদের প্রার্থী প্রত্যাহার করে নেবেন। কারণ, উপনির্বাচন ছাড়া বিধানসভায় মমতার জয়ের রেকর্ড নেই বলেই তাঁদের দাবি। এরইমধ্যে, নন্দীগ্রাম উপনির্বাচনের আগে শান্তিশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সর্বদলীয় বৈঠক ডেকেছিলেন পূর্ব মেদিনীপুরের জেলাশাসক নিরঞ্জন কুমার। সে বৈঠকে প্রায় সব রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি উপস্থিত থাকলেও তৃণমূলের কোনও প্রতিনিধি ছিলেন না। এই অনুপস্থিতি তৃণমূলের সাংগঠনিক পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। দল আদৌ নন্দীগ্রামে প্রার্থী দেবে কি না, তা নিয়েও জল্পনা আরও বেড়েছে।
অন্যদিকে বিজেপি ইতিমধ্যেই নির্বাচনী প্রচারে অনেকটা এগিয়ে গিয়েছে। উপনির্বাচন ঘোষণার ঠিক আগে নন্দীগ্রামে সভা করতে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী দলীয় কর্মী-সমর্থকদের প্রশ্ন করেছিলেন, ফলতার ১ লক্ষ ৯ হাজার ২১ ভোটের ব্যবধানকে ছাপিয়ে রেকর্ড গড়তে পারবেন কি না। জনতার তরফে জোরালো সাড়া আসে—‘হ্যাঁ, পারব।’ স্থানীয় বিজেপি নেতৃত্বও মনে করছে, ফলতার ব্যবধান ছাপিয়ে যাওয়া অসম্ভব নয়। শুভেন্দু ঘনিষ্ঠ বিজেপি নেতা প্রলয় পাল ইতিমধ্যেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ফের নন্দীগ্রাম থেকে প্রার্থী হওয়ার চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন। প্রলয়ের কটাক্ষ, মমতা অন্তত আরও একবার নন্দীগ্রামে প্রার্থী হওয়ার চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করুন। এমনকি তাঁর পোস্টার-ব্যানার লাগানোর দায়িত্বও নিজের পরিবারের লোকজনকে দিয়ে করবেন বলে ব্যঙ্গ করেছেন তিনি।
কাঁথির শান্তিকুঞ্জ থেকে শিশির অধিকারীও মমতাকে কটাক্ষ করেছেন। তাঁর দাবি, মমতা যদি এবারও নন্দীগ্রামে ভোটে লড়তে আসেন, তাহলে পরাজয়ের সংখ্যা তিনে পৌঁছবে। তাঁর মতে, বিজেপি এবার ভালো ব্যবধানে জিতবে এবং পূর্ব মেদিনীপুরের রাজনৈতিক পরিবেশ অন্যরকম। কাঁথির সাংসদ সৌমেন্দু অধিকারীও জানিয়েছেন, বিজেপির লক্ষ্য ফলতার ব্যবধানকে ছাপিয়ে যাওয়া। তাঁদের টার্গেট অন্তত ১ লক্ষ ১০ হাজার ভোটের ব্যবধান।
তৃণমূলের সাংগঠনিক দুর্বলতার সুযোগে নন্দীগ্রামে বিরোধী রাজনীতির জায়গা দখলের চেষ্টা শুরু করেছে বামেরাও। ইতিমধ্যে কোথাও বাড়ি বাড়ি জনসংযোগ, কোথাও দেওয়াল লিখনের প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। বসে যাওয়া কর্মী-সমর্থকদেরও ফের সক্রিয় করার চেষ্টা চলছে। তবে বামেদের প্রার্থী কে হবেন, তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি। ২০২১ সাল বাদ দিলে সাম্প্রতিক একাধিক নির্বাচনে নন্দীগ্রামে প্রার্থী দিয়েছে সিপিআই। ২০২১ সালে মমতা-শুভেন্দু দ্বৈরথের সময়ে সিপিআইএম প্রার্থী করেছিল মিনাক্ষী মুখোপাধ্যায়কে। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনেও নন্দীগ্রামে সিপিআই প্রার্থী দিয়েছিল। পাশাপাশি আইএসএফও প্রার্থী দিয়েছিল।
বৃহস্পতিবার বামফ্রন্ট নেতৃত্ব এ বিষয়ে বৈঠকে বসে। সূত্রের খবর, সিপিআই তাদের ‘নিজের আসন’ ছাড়তে নারাজ। এ নিয়ে সিপিএম ও সিপিআই আলাদা করেও বৈঠক করেছে। যদিও এখনো জট পুরোপুরি কাটেনি। সিপিআইয়ের রাজ্য সম্পাদক তপন বন্দ্যোপাধ্যায়ের বক্তব্য, নন্দীগ্রাম ঐতিহ্যগত ভাবে তাঁদের আসন। বামফ্রন্ট এবং সিপিএমের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে সে অবস্থান জানানো হয়েছে। আরও কিছু আলোচনা বাকি রয়েছে। সিদ্ধান্ত হলে তা জানানো হবে। সিপিএমের জেলা কমিটির সদস্য তথা শ্রমিক সংগঠনের নেতা পরিতোষ পট্টনায়ক জানিয়েছেন, দলের কর্মীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে জনসংযোগ করছেন। দীর্ঘদিন ধরে নিষ্ক্রিয় কর্মী-সমর্থকদের সঙ্গেও যোগাযোগ করা হচ্ছে। তাঁর দাবি, তৃণমূল ধীরে ধীরে রাজনৈতিক ভাবে দুর্বল হয়ে পড়ছে। তবে বিজেপিই তৃণমূলকে টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ তাঁর। তাঁর কটাক্ষ, ‘ক্ষমতার মোহে দল টিকে ছিল। ক্ষমতা শেষ, দল শেষ।’
নন্দীগ্রামে কংগ্রেসের সাংগঠনিক দুর্বলতা দীর্ঘদিনের। উপনির্বাচনের আগে সেই দুর্বলতা আরও স্পষ্ট হয়েছে বলে রাজনৈতিক মহলের মত। যদিও জেলা কংগ্রেস নেতৃত্বের দাবি, তারা আশানুরূপ ফল করবে। অন্যদের তুলনায় আগে নন্দীগ্রামে প্রার্থী ঘোষণা করেছে কংগ্রেস। উপনির্বাচনে তাদের প্রার্থী মিলন প্রধান। সব মিলিয়ে আগামী ৬ অক্টোবরের নন্দীগ্রাম উপনির্বাচনের ময়দান এখনও অনেকটাই নিস্তরঙ্গ। একদিকে বিজেপি যখন ফলতার ১ লক্ষ ৯ হাজার ২১ ভোটের ব্যবধানকে ছাপিয়ে অন্তত ১ লক্ষ ১০ হাজার ভোটে জয়ের লক্ষ্য নিয়েছে, অন্যদিকে তৃণমূলের সামনে এখনও সবচেয়ে বড় প্রশ্ন — প্রার্থী কে? মনোনয়ন জমা দেওয়ার শেষ দিন ১৬ সেপ্টেম্বর। তার আগে তৃণমূল শেষ পর্যন্ত কোনও শক্তিশালী ‘ভূমিপুত্র’কে সামনে আনতে পারে কি না, নাকি নন্দীগ্রামে বিজেপির জয় কার্যত একতরফা হয়ে যাবে — এখন সেটাই দেখার।
❤ Support Us








