Advertisement
  • এই মুহূর্তে দে । শ
  • সেপ্টেম্বর ১০, ২০২৬

বিশেষ বিশেষ শব্দ, ঘটনায় আপত্তি, পাঠ্যবইয়ে ব্যাপক বদলের ইঙ্গিত ! যুক্ত হচ্ছেন শ্যামাপ্রসাদ, বাদ পড়তে পারে সিঙ্গুর আন্দোলন

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
বিশেষ বিশেষ শব্দ, ঘটনায় আপত্তি, পাঠ্যবইয়ে ব্যাপক বদলের ইঙ্গিত !  যুক্ত হচ্ছেন শ্যামাপ্রসাদ, বাদ পড়তে পারে সিঙ্গুর আন্দোলন

পশ্চিমবঙ্গে সরকার বদলের পর এ বার স্কুলের পাঠ্যক্রম ও পাঠ্যপুস্তকেও বড়সড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলেছে। ‘আম্মা’, ‘আসমান’, ‘ফজর’, ‘গোসল’, ‘দোস্ত’, ‘নাস্তা’-র মতো শব্দের ব্যবহার নিয়ে ইতিমধ্যেই আপত্তি উঠেছে। পাশাপাশি ইতিহাস, সাহিত্য, কর্মশিক্ষা-সহ বিভিন্ন বিষয়ের পাঠ্যক্রমে কিছু অধ্যায় সংযোজন ও বিয়োজনের প্রস্তাবও সামনে এসেছে। এরই মধ্যে স্কুলের পাঠ্যসূচিতে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের অবদান যুক্ত করার কথা জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। অন্যদিকে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে সিঙ্গুরে টাটার বিরুদ্ধে আন্দোলনের প্রসঙ্গ পাঠ্যবই থেকে বাদ দেওয়ার কথাও তিনি স্পষ্ট করেছেন।

কয়েক দিন আগেই পাঠ্যবইয়ের ভাষা নিয়ে সরব হয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর অভিযোগ, তৃণমূল আমলে পরিকল্পিত ভাবে কিছু শব্দ পাঠ্যবইয়ে ঢোকানো হয়েছিল। তাঁর কথায়, ‘মা-কে আম্মা, আকাশকে আসমান… প্ল্যান করে ভাষার বিকৃতি করা হয়েছিল। শিশুমনে বিভাজন ঘটানো হয়েছিল।’ তবে মুখ্যমন্ত্রীর মন্তব্যের আগেই রাজ্যের শিক্ষা দফতর পাঠ্যক্রমে পরিবর্তনের কাজ শুরু করে দিয়েছিল। প্রথম থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠ্যক্রম পর্যালোচনা ও পরিমার্জনের জন্য সম্প্রতি তিন দিনের আবাসিক শিবির আয়োজন করে পাঠ্যক্রম কমিটি। পরবর্তী শিক্ষাবর্ষ শুরু হওয়ার আগে সময় কম থাকায় এ দফায় পাঠ্যক্রমের পরিবর্তন ১০ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার মৌখিক নির্দেশ দিয়েছেন কমিটির চেয়ারম্যান দেবাশিস চট্টোপাধ্যায়। আপাতত পাঠ্যবইয়ের শব্দভান্ডার ‘শুদ্ধকরণ’-এর উপরেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে শিক্ষা দফতর সূত্রে খবর।

শিক্ষা দফতর সূত্রের দাবি, বাংলা ভাষায় প্রকাশিত তৃণমূল আমলের পাঠ্যবইয়ে ‘ফজর’, ‘আসমান’, ‘গোসল’, ‘দোস্ত’-এর মতো এ-পারে তুলনামূলক ভাবে অপ্রচলিত কিছু শব্দ ব্যবহার করা হয়েছিল। পাঠ্যক্রম কমিটির কয়েক জন বিশেষজ্ঞের বক্তব্য, এগুলিকে নিছক শব্দের পরিবর্তন হিসেবে দেখা উচিত নয়; বরং পরিকল্পিত ভাবে বিদেশি শব্দ ঢোকানো হয়েছিল কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। সরকার বদলের তিন মাস পরে, গত ৪ অগস্ট পাঠ্যক্রম কমিটির প্রথম বৈঠকে নতুন উচ্চশিক্ষামন্ত্রী জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায় শব্দ পরিবর্তনের প্রস্তাব দেন। এর পরেই কমিটির চেয়ারম্যান সদস্যদের ‘জোর করে ঢোকানো’ শব্দগুলি চিহ্নিত করার নির্দেশ দেন। ১৭ অগস্ট থেকে বিধাননগরের নিবেদিতা ভবনে অনুষ্ঠিত তিন দিনের আবাসিক শিবিরে সেই তালিকা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।

সাহিত্যিক বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়ের অভিযোগ, প্রতিবেশী দেশে আরবি ও উর্দু শব্দকে জোর করে বাংলার উপর চাপিয়ে দেওয়ার ফলে ভাষার শব্দভান্ডার বিকৃত হয়েছে। তাঁর দাবি, গত কয়েক বছর ধরে পশ্চিমবঙ্গের স্কুলের পাঠ্যবইতেও একই ধরনের প্রবণতা দেখা গিয়েছে এবং এর পিছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য থাকতে পারে। গৌড়বঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্য, বাংলার অধ্যাপক রজতকিশোর দে-ও ‘গোসল’, ‘ফজর’, ‘আসমান’, ‘দোস্ত’-এর মতো শব্দের ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর বক্তব্য, ছোটোবেলায় গ্রামবাংলায় স্নান করে আসাকে ‘ডুব দিয়ে আসা’ বলা হত, আবার কেউ কেউ ‘চান’ বলতেন। ‘গোসল’ শব্দটি তাঁদের দৈনন্দিন কথ্যভাষায় প্রচলিত ছিল না। একই ভাবে ‘ভোর’-এর পরিবর্তে ‘ফজর’, ‘আকাশ’-এর পরিবর্তে ‘আসমান’ কিংবা ‘বন্ধু’-র পরিবর্তে ‘দোস্ত’ এ-পারের বাংলায় স্বাভাবিক ব্যবহারের শব্দ নয় বলেই তাঁর মত।

তবে আগের পাঠ্যক্রম কমিটির এক প্রাক্তন সদস্য এই অভিযোগ মানতে নারাজ। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তাঁর দাবি, আলোচনায় আসা শব্দগুলি একেবারে অপ্রচলিত নয়; নির্দিষ্ট প্রসঙ্গ ও প্রয়োজন অনুযায়ী সেগুলি ব্যবহার করা হয়েছিল। কোনো একটি ধর্মকে প্রাধান্য দেওয়ার উদ্দেশ্যে শব্দগুলি পাঠ্যবইয়ে ঢোকানো হয়েছিল— এ অভিযোগও তিনি অস্বীকার করেছেন। তাঁর বক্তব্য, ‘ভাষা দিয়ে কোনো ধর্মকে চিহ্নিত করা যায় না, উচিতও নয়।’ পুরনো কমিটির ওই সদস্যের মতে, অন্য ভাষা থেকে শব্দ গ্রহণ বন্ধ করে দিলে বাংলা ভাষার স্বাভাবিক সমৃদ্ধিই বাধাগ্রস্ত হবে। ‘নাস্তা’ শব্দের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, হিন্দিতে শব্দটি অত্যন্ত প্রচলিত। পাঠ্যবইয়ে ‘নাস্তা’র পাশাপাশি ‘জলখাবার’ শব্দটিও রয়েছে।

জয়পুরিয়া কলেজের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক অর্ণব সাহাও শব্দ পরিবর্তনের এই উদ্যোগ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর বক্তব্য, ‘সরকার’ শব্দটিও ফারসি থেকে এসেছে। সে ক্ষেত্রে ‘পশ্চিমবঙ্গ সরকার’-এর পরিবর্তে কী বলা হবে, সে প্রশ্নও তুলেছেন তিনি। অর্ণবের অভিযোগ, বিষয়টির সঙ্গে বাংলা ভাষার স্বাভাবিক গতিপ্রকৃতির চেয়ে হিন্দু-মুসলিম বিভাজনের রাজনীতি বেশি জড়িত। তাঁর প্রশ্ন, ‘হিন্দু বাঙালির আলাদা ভাষা আর মুসলমান বাঙালির আলাদা ভাষা— এমনটা কি তৈরি করার চেষ্টা হচ্ছে?’ তাঁর মতে, এ ধরনের উদ্যোগ হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির তাত্ত্বিক কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। অন্যদিকে পরিবর্তনের পক্ষে থাকা বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য, স্বাভাবিক ভাষাচর্চার মাধ্যমে বাংলা ভাষায় যে বিদেশি শব্দগুলি ঢুকেছে, সেগুলি নিয়ে তাঁদের আপত্তি নেই। কিন্তু পরিকল্পিত ভাবে কোনো শব্দ পাঠ্যবইয়ে চাপিয়ে দেওয়া হয়ে থাকলে তা আলাদা বিষয়। বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়ের দাবি, চেয়ার, টেবিল, বারুদ, বোঁচকার মতো বহু বিদেশি শব্দ যুগে যুগে বাংলা ভাষায় জায়গা করে নিয়েছে, কিন্তু সেগুলি কাউকে জোর করে চাপিয়ে দিতে হয়নি।

পাঠ্যবইয়ের আর একটি বিতর্কিত শব্দ ‘রংধনু’। অভিযোগ উঠেছে, ‘রাম’ শব্দটি এড়ানোর জন্য আগের পাঠ্যক্রম কমিটি ‘রামধনু’র পরিবর্তে ‘রংধনু’ ব্যবহার করেছিল। তবে পুরনো কমিটির সদস্য এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাঁর দাবি, নবম শ্রেণির বইয়ে ‘রামধনু’ শব্দই রয়েছে। তৃতীয় শ্রেণির বইয়ে রবীন্দ্রনাথের ‘ইন্দ্রধনু’ ব্যবহারের প্রস্তাব করেছিলেন কয়েক জন বাংলা শিক্ষক। শেষ পর্যন্ত জীবনানন্দ দাশের ‘ঝরাপালক’ থেকে ‘রংধনু’ শব্দটি নেওয়া হয়। অর্ণব সাহার বক্তব্য, ‘রামধনু’ বাদ দেওয়ার পিছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য থাকতেই পারে, কিন্তু নির্দেশ দিয়ে তা করানো হয়েছিল, এমনটা বলা ঠিক হবে না।

এ ছাড়াও পাঠ্যবইয়ের চরিত্রগুলির ব্যক্তিনাম নিয়েও নতুন করে পর্যালোচনার প্রস্তাব এসেছে। রজতকিশোর দে-র মতে, আগে রাম, গোপাল, সুবোধের মতো পরিচিত বাংলা নাম বেশি ব্যবহৃত হতো। সাম্প্রতিক পাঠ্যবইয়ে নাজমা, সালমা, বিলকিসের মতো নামের ব্যবহার বেড়েছে। তাঁর মতে, এর পিছনে নির্দিষ্ট অভিসন্ধি থাকতে পারে। যদিও, পুরনো কমিটির এক সদস্যের ব্যাখ্যা, ভারত ধর্মনিরপেক্ষ দেশ এবং পশ্চিমবঙ্গেও বিভিন্ন ধর্মের পড়ুয়া রয়েছে। তাই বইয়ের চরিত্রগুলির নামের মধ্যেও বৈচিত্র্য রাখা হয়েছিল, যাতে সব পড়ুয়া পাঠ্যবইয়ের সঙ্গে নিজেদের সম্পর্ক খুঁজে পায়।

নতুন পাঠ্যক্রমে ইতিহাসের বিষয়বস্তুতেও পরিবর্তনের প্রস্তাব রয়েছে। দেশভাগের সঙ্গে লক্ষ লক্ষ মানুষের উদ্বাস্তু হয়ে পড়ার ঘটনা আরও বিশদে পাঠ্যবইয়ে থাকা উচিত বলে মত দিয়েছেন রাজ্য বিজেপির প্রাক্তন সভাপতি তথা অধ্যাপক তথাগত রায়। পাঠ্যক্রম কমিটির প্রথম বৈঠকে আমন্ত্রিত হয়ে তিনি এই প্রস্তাব দেন। কেন মানুষকে উদ্বাস্তু হতে হয়েছিল এবং তাঁদের কী ধরনের অত্যাচারের মুখে পড়তে হয়েছিল, তার অন্তত একটি সুস্পষ্ট ধারণা ইতিহাসের বইয়ে থাকা প্রয়োজন বলে তাঁর মত। বিকাশ ভবন সূত্রের খবর, তাঁর প্রস্তাব গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা হচ্ছে। এরই পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গের স্কুলের পাঠ্যসূচিতে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের অবদান যুক্ত করার কথা ঘোষণা করেছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী।

শ্যামাপ্রসাদের ১২৫তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে তাঁর স্মৃতিবিজড়িত বিদ্যালয় মিত্র ইনস্টিটিউশনে আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, পাঠ্যবইয়ে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের অবদানের উল্লেখ থাকা উচিত। একই সঙ্গে যাঁরা টাটাকে রাজ্য থেকে তাড়িয়েছিলেন, তাঁদের আন্দোলনের উল্লেখ পাঠ্যবইয়ে থাকা উচিত নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি। মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, স্কুলশিক্ষামন্ত্রী, উচ্চশিক্ষামন্ত্রী এবং সংশ্লিষ্ট সচিবদের কাছে তিনি বিষয়টি নিয়ে অনুরোধ করেছেন। ভবিষ্যতে গঠিত সিলেবাস কমিটির কাছেও তিনি এই প্রস্তাব রাখবেন। তবে শেষ পর্যন্ত পাঠ্যসূচিতে কী থাকবে, সেই সিদ্ধান্ত সিলেবাস কমিটিই নেবে—কোনও রাজনৈতিক দলের নেতা নয়—এ কথাও স্পষ্ট করেছেন তিনি। নিজের বিধায়ক হিসেবে তিনি কেবল প্রস্তাব রাখছেন বলেই জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।  সে অনুষ্ঠানে তাঁর সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন রাজ্যের স্কুলশিক্ষামন্ত্রী দীপক বর্মন এবং উচ্চশিক্ষামন্ত্রী জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায়।

২০১১ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর স্কুলের পাঠ্যবইয়ে তাঁর নেতৃত্বে সিঙ্গুর আন্দোলনের প্রসঙ্গ যুক্ত করা হয়েছিল। সে অংশে সিঙ্গুর থেকে টাটাগোষ্ঠীর সরে যাওয়ার ঘটনাও উল্লেখ ছিল। এ বার শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের প্রসঙ্গ যুক্ত করার পাশাপাশি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সিঙ্গুর আন্দোলনের অংশ বাদ দেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন শুভেন্দু অধিকারী। তাঁর বক্তব্য থেকেই বিষয়টি কার্যত স্পষ্ট হয়েছে। আগের সরকার বিভিন্ন বিষয়কে উপেক্ষা করেছে বলেও অভিযোগ করেন মুখ্যমন্ত্রী। মিত্র ইনস্টিটিউশনের ভবনটিকে হেরিটেজ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার সুপারিশ করার কথাও জানিয়েছেন তিনি। তাঁর দাবি, আগের সরকার হেরিটেজ কমিশন তুলে দিয়েছিল।

ভবানীপুরে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের বাড়ি সংরক্ষণ নিয়ে প্রশ্ন করা হলে মুখ্যমন্ত্রী জানান, বাড়িটির মালিকানা বর্তমানে একটি ট্রাস্টের হাতে রয়েছে। তবে হুগলির জিরাটে রাজ্য সরকার জমি কিনে চুক্তি সম্পন্ন করেছে। সেখানে শ্যামাপ্রসাদের নামে একটি আধুনিক লাইব্রেরি বা গ্রন্থাগার ১৯২৪ থেকে ১৯৩৮ সাল পর্যন্ত তিনি ওই স্কুলের পরিচালন সমিতির সভাপতির দায়িত্বও পালন করেন। ফলে তাঁর ১২৫তম জন্মবার্ষিক গড়ে তোলা হবে। মিত্র ইনস্টিটিউশনের উন্নয়নের জন্য নিজের বিধায়ক তহবিল থেকে ২৫ লক্ষ টাকা অনুদান দেওয়ার কথাও ঘোষণা করেছেন মুখ্যমন্ত্রী।

তিনি জানান, ১৯০৬ থেকে ১৯১৭ সাল পর্যন্ত শ্যামাপ্রসাদ এই স্কুলের ছাত্র ছিলেন। পরে ১৯২৪ থেকে ১৯৩৮ সাল পর্যন্ত তিনি ওই স্কুলের পরিচালন সমিতির সভাপতির দায়িত্বও পালন করেন। ফলে তাঁর ১২৫তম জন্মবার্ষিকীতে স্কুলটির প্রতি বর্তমান সরকারের বিশেষ দায়িত্ব রয়েছে বলে মনে করেন মুখ্যমন্ত্রী। শ্যামাপ্রসাদের ব্যবহৃত সামগ্রী ও তাঁর স্মৃতি সংরক্ষণের জন্য রাজ্য সরকার ইতিমধ্যেই একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করেছে। মুখ্যমন্ত্রী ও মুখ্যসচিব-সহ রাজ্য সরকারের ১০ জন প্রতিনিধি এবং সমাজের আরও ১০ জন বিশিষ্ট ব্যক্তিকে নিয়ে কমিটিটি তৈরি হয়েছে। এই কমিটির কাজের জন্য রাজ্য বাজেটে ২০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। পাশাপাশি ঝাড়খণ্ডের মধুপুরে শ্যামাপ্রসাদের স্মৃতিবিজড়িত স্থান সংরক্ষণের জন্য সেই রাজ্যের সরকারের সঙ্গেও আলোচনা করা হবে বলে জানানো হয়েছে। 

রবিবার হুগলির বলাগড়ের জিরাটে শ্যামাপ্রসাদের পৈতৃক ভিটেবাড়িতে আয়োজিত অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন রাজ্যের মন্ত্রী সুমনা সরকার। সেখানে তিনি বলেন, বিষয়টি নিয়ে সরকার অবশ্যই আলোচনা করবে। একই সঙ্গে তিনি মন্তব্য করেন, ইতিহাসের পাতায় ‘মোগল সাম্রাজ্য’ নয়, ‘সনাতন সাম্রাজ্য’ থাকা উচিত। শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের নাতি বাণীপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় অবশ্য জানিয়েছেন, পাঠ্যপুস্তকে কী থাকবে, তা সম্পূর্ণ সরকারি সিদ্ধান্তের বিষয়। পরিবারের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কোনো ভূমিকা থাকবে না। তবে শুধু শ্যামাপ্রসাদ নয়, তাঁর ভাইদের নামও পাঠ্যপুস্তকে থাকা উচিত বলে তিনি মনে করেন। তাঁর অভিযোগ, বিভিন্ন দিক থেকে দীর্ঘদিন ধরে তাঁরা বাংলায় বঞ্চিত হয়েছেন।

পাঠ্যক্রম সংস্কারের প্রস্তাব শুধু ভাষা বা ইতিহাসেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। কর্মশিক্ষা ও শারীরশিক্ষার পাঠ্যক্রমও আধুনিক করার প্রস্তাব এসেছে। দীর্ঘদিন ধরে কর্মশিক্ষার পাঠ্যক্রমে বিশেষ পরিবর্তন হয়নি। ফলে এখনও ধানচাষ, পাটচাষের মতো বিষয় রয়েছে। শহরের পড়ুয়াদের কাছে এগুলির আকর্ষণ কম এবং গ্রামাঞ্চলের পড়ুয়ারা অনেক ক্ষেত্রেই পারিবারিক সূত্রে এই কাজগুলি শিখে থাকে—এই যুক্তিতে পাঠ্যক্রম আধুনিক করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। চাষাবাদ শেখানোর প্রয়োজন থাকলে আধুনিক কৃষি ও শহুরে জীবনের সঙ্গে সম্পর্কিত বিষয় যুক্ত করার কথা বলা হয়েছে। প্রস্তাবগুলির মধ্যে রয়েছে ছাদবাগান, কিচেন গার্ডেনে সব্জি চাষ, ইনডোর প্ল্যান্টসের পরিচর্যা এবং সেই সব গাছ বিক্রি করে কী ভাবে আয় করা যায়—এই ধরনের বিষয়।

পাঠ্যবইয়ের উদাহরণগুলির ক্ষেত্রেও সামাজিক সংবেদনশীলতার বিষয়টি বিবেচনা করার প্রস্তাব এসেছে। গণিতের অনুপাত শেখাতে দীর্ঘদিন ধরে ‘গোয়ালা দুধে জল মেশাচ্ছেন’—এমন উদাহরণ ব্যবহৃত হয়ে আসছে। অনেকের মতে, এ ধরনের উদাহরণ শিশুদের মনে গোয়ালা সম্প্রদায় সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা তৈরি করতে পারে। তাই কোনো নির্দিষ্ট সমাজ বা সম্প্রদায়ের নাম ব্যবহার না করে শুধুমাত্র ব্যক্তির নাম ব্যবহার করে উদাহরণ তৈরি করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

সব মিলিয়ে, পশ্চিমবঙ্গে সরকার পরিবর্তনের পর স্কুলের পাঠ্যক্রম ও পাঠ্যপুস্তককে ঘিরে একাধিক পরিবর্তনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এক দিকে ভাষার ‘শুদ্ধকরণ’ ও ইতিহাসে নতুন বিষয় সংযোজনের উদ্যোগ, অন্য দিকে রাজনৈতিক ও সামাজিক পক্ষপাতের অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ—সব মিলিয়ে পাঠ্যবই সংস্কার ঘিরে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। আগামী শিক্ষাবর্ষের আগে কতটা পরিবর্তন বাস্তবে কার্যকর হয়, এখন সেটিই দেখার।

 


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!