- দে । শ
- সেপ্টেম্বর ১০, ২০২৬
শতাধিক অস্থায়ী কর্মী ছাঁটাই, উপপ্রধান-কাউন্সিলরের পদত্যাগ : পূর্ব বর্ধমানে পুর-পরিষেবা ঘিরে তীব্র বিতর্ক
পুজোর মুখে একদিকে কাটোয়া পুরসভায় একসঙ্গে ১০৪ জন অস্থায়ী কর্মী ছাঁটাই। অন্যদিকে, কালনা পুরসভায় নাগরিক পরিষেবা নিয়ে বিজেপির বিক্ষোভ, কাউন্সিলরদের কাজ না করার অভিযোগ এবং উপপুরপ্রধান-সহ ৪ তৃণমূল কাউন্সিলরকে ‘জোর করে’ পদত্যাগপত্রে সই করানোর অভিযোগ। দু-টি পুরসভাকে ঘিরেই পূর্ব বর্ধমানে এখন তুঙ্গে রাজনৈতিক চাপানউতোর। কাটোয়ায় পুরসভার আর্থিক সাশ্রয়ের যুক্তির মুখে কাজ হারানোর আশঙ্কায় সরব কর্মীরা। কালনায় পুর পরিষেবা নিয়ে বিরোধীদের অভিযোগ ঘিরে শাসকদলের অন্দরের টানাপড়েন প্রকাশ্যে এসেছে বলে দাবি বিজেপির।
কাটোয়া পুরসভায় অস্থায়ী কর্মীর সংখ্যা প্রায় ৮০০। তাঁদের কাজের ধরন, সংখ্যা এবং বেতন কাঠামো নিয়ে বেশ কিছু দিন ধরে সমীক্ষা চালানোর পর ১০৪ জনকে আর কাজে না রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে পুরসভা জানিয়েছে। ছাঁটাই হওয়া কর্মীদের মধ্যে ৬১ জন সাফাইকর্মী। বাকিরা স্বাস্থ্য ও ট্রাফিক বিভাগের কর্মী ছিলেন। সাফাইকর্মীদের দৈনিক ১৭৫ টাকা এবং অন্য কর্মীদের ৩৩০ টাকা করে মজুরি দেওয়া হতো। তাঁদের বেতন মেটানো হতো পুরসভার নিজস্ব তহবিল থেকে। পুরসভার নির্বাহী আধিকারিক চঞ্চল কুমার মণ্ডলের বক্তব্য, অস্থায়ী কর্মীদের নিয়ে বিস্তারিত সমীক্ষার পর ‘অতিরিক্ত অস্থায়ী কর্মীদের’ ছাঁটাই করা হয়েছে। পুরসভা সূত্রের দাবি, এই সিদ্ধান্তের ফলে প্রতি মাসে প্রায় সাড়ে ১০ লক্ষ টাকা সাশ্রয় হবে। তবে উৎসবের আগে কাজ হারিয়ে ক্ষুব্ধ ছাঁটাই হওয়া কর্মীরা। তাঁদের বক্তব্য, দীর্ঘ দিন ধরে সামান্য মজুরিতে পুরসভার কাজ করলেও সেটুকুই ছিল সংসার চালানোর অন্যতম ভরসা।
ছাঁটাই হওয়া সাফাইকর্মী আরতি রাউতের বলেছেন, ‘যেটুকু পয়সা এখান থেকে পেতাম, তাতে কোনো রকমে সংসারটা চলত। এখন তো আত্মহত্যা ছাড়া গতি নেই।’ একই সুর পূজা হরিজন, প্রিয়া হরিজনদের গলাতেও। তাঁদের অভিযোগ, ‘দীর্ঘ দিন ধরে শহর পরিচ্ছন্ন করার কাজ করছি। এখন আমাদের পেটে লাথি মারা হলো।’ কর্মী ছাঁটাইয়ের সিদ্ধান্ত নিয়ে রাজনৈতিক তরজাও শুরু হয়েছে। তৃণমূল, সিপিএম এবং কংগ্রেস— তিন দলই এর বিরোধিতা করেছে। কাটোয়ার প্রাক্তন তৃণমূল বিধায়ক রবীন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়ের বক্তব্য, ‘প্রয়োজন ছিল বলেই কর্মী নিয়োগ হয়েছিল। এখন তাঁদের কাজ কেড়ে নিয়ে সংসারগুলি ধ্বংস করে দেওয়া খুবই অন্যায়।’ অন্যদিকে, ছাঁটাইয়ের সিদ্ধান্তকে সমর্থন করেছে বিজেপি। দলের নেতা অশোক রায়ের অভিযোগ, ‘তৃণমূল অবৈধ ভাবে তাদের ক্যাডারদের ঢুকিয়েছিল। তাঁরা কাজ করতেন না। জনসাধারণের টাকায় তাঁদের পোষা হতো। অপ্রয়োজনীয় কর্মীদেরই ছাঁটাই করা হয়েছে।’
কাটোয়ায় কর্মী ছাঁটাইকে কেন্দ্র করে যখন কর্মীদের ভবিষ্যৎ এবং পুরসভার আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে, তখন পাশের কালনায় বিতর্কের কেন্দ্রে পুর পরিষেবা এবং পুরসভার রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ। বিধানসভা ভোটে ভরাডুবির পর থেকেই কালনা পুরসভার তৃণমূল কাউন্সিলরেরা কাজ করছেন না— এমনই অভিযোগ তুলে পুরসভা ঘেরাও করে বিক্ষোভ দেখায় বিজেপি। তাদের অভিযোগ, কাউন্সিলরেরা ওয়ার্ডে যাচ্ছেন না, সাধারণ মানুষের অভাব-অভিযোগ শুনছেন না। এর ফলে নাগরিক পরিষেবা কার্যত ভেঙে পড়েছে। বিক্ষোভ চলাকালীন কয়েক জন তৃণমূল কাউন্সিলরকে লক্ষ্য করে ডিম ছোড়ার অভিযোগও ওঠে।
বিজেপির কালনা নগর মণ্ডলের সভাপতি ডালিয়া সূত্রধরের অভিযোগ, ‘কালনা পুরসভা নাগরিক পরিষেবা দিতে ব্যর্থ। তৃণমূলের ছাপ্পা মারা কাউন্সিলরেরা ঘরের ভিতর বসে আছেন। না ওয়ার্ডে বেরোচ্ছেন, না সাধারণ মানুষকে কোনও পরিষেবা দিচ্ছেন। চুপচাপ পুরসভায় আসছেন। সই করছেন। চলে যাচ্ছেন।’ তাঁর দাবি, ‘হয় কাজ করুন, নাহলে পদত্যাগ করুন। কারণ, বিজেপির কাছে মানুষের অনেক প্রত্যাশা রয়েছে। তৃণমূলের কাউন্সিলরদের জন্য সেই প্রত্যাশা পূর্ণ হচ্ছে না।’ এর মধ্যেই আরও গুরুতর অভিযোগ সামনে আসে। কালনা পুরসভার উপ-পুরপ্রধান তপন পোড়েল-সহ চার তৃণমূল কাউন্সিলরকে জোর করে পদত্যাগপত্রে সই করানো হয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে। যদিও ওই পদত্যাগপত্র গ্রহণের কথা মানেননি পুরপ্রধান রিনা বন্দ্যোপাধ্যায়।
পদত্যাগ নিয়ে তপন পোড়েলের বক্তব্য, ‘একটা চিঠি নিয়ে এসে আমাকে সই করার কথা বললেন বর্তমান শাসকদলের পদাধিকারীরা। শারীরিক অসুস্থতার কারণে আমাকে পদত্যাগ করতে হবে। যেটা বলেছে, সেটাই করে দিয়েছি। কারণ আমরা তো আর লড়াই করতে যাব না।’ অন্যছবি তুলে ধরেছেন পুরপ্রধান। তাঁকে এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন রিনা। বলেন, ‘রোজ সকাল সাড়ে ন-টায় পুরসভায় আসি। সন্ধে ছ-টায় বাড়ি যাই। কাউন্সিলরেরা আমার কথা মতো কাজ করেন। এর পরেও যদি কেউ বলেন পরিষেবা দিতে ব্যর্থ হয়েছি, তা হলে আর বলার কিছু নেই।’ পদত্যাগপত্র নিয়ে তাঁর বক্তব্যও স্পষ্ট। ‘কোনো পদত্যাগপত্র আমি গ্রহণ করিনি। আমি মনে করি না কেউ পদত্যাগ করেছেন’— বলেন রিনা।
ফলে কালনা পুরসভায় এখন একাধিক প্রশ্ন সামনে। বিজেপির অভিযোগ, তৃণমূল কাউন্সিলরেরা মানুষের কাছ থেকে দূরে সরে গিয়েছেন, পুর পরিষেবা ব্যাহত হয়েছে। অন্যদিকে, পুরপ্রধানের দাবি, কাউন্সিলরেরা তাঁর নির্দেশ মেনেই কাজ করছেন এবং কোনও পদত্যাগ কার্যকর হয়নি। উপপুরপ্রধানের বক্তব্য আবার সেই দাবির সঙ্গে পুরোপুরি মেলে না। ফলে পুরসভার প্রশাসনিক কাজকর্মের পাশাপাশি শাসকদলের কাউন্সিলরদের অবস্থান নিয়েও তৈরি হয়েছে ধোঁয়াশা। উল্লেখযোগ্যভাবে, গত পুরভোটে কালনা শহরের ১৮টি ওয়ার্ডের মধ্যে ১৭টিতেই জয় পেয়েছিল তৃণমূল। সেই বোর্ডেরই উপপুরপ্রধান-সহ চার কাউন্সিলরের পদত্যাগ ঘিরে এমন বিতর্ক রাজনৈতিক ভাবে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছে বিরোধীরা।
❤ Support Us






