- দে । শ প্রচ্ছদ রচনা
- জুন ৩, ২০২৬
বিধানসভায় ‘মহাবিদ্রোহ’! তার মধ্যেই সংগঠনে ‘অস্ত্রোপচার’, সব কমিটি ভেঙে দিল তৃণমূল
বিধানসভার অন্দরে একের পর এক নাটকীয় ঘটনা। দলেরই একাংশের বিধায়কদের প্রকাশ্য অসন্তোষ, সমান্তরাল বৈঠক, পরিষদীয় নেতৃত্ব নিয়ে টানাপড়েন— এ আবহেই সাংগঠনিক ক্ষেত্রে নজিরবিহীন পদক্ষেপ করল তৃণমূল কংগ্রেস। পশ্চিমবঙ্গে দলের সমস্ত স্তরের কমিটি এবং ছাত্র, যুব, মহিলা, শ্রমিক, সংখ্যালঘু-সহ সব শাখা সংগঠন ভেঙে দেওয়ার ঘোষণা করল শাসকদল। বুধবার সমাজমাধ্যমে প্রকাশিত এক বার্তায় এ সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়েছে। রাজনৈতিক মহলের মতে, বিধানসভার সাম্প্রতিক অস্থিরতার আবহে এমন পদক্ষেপ নিছক সাংগঠনিক রদবদল নয়, বরং দলের ভিতরে বাড়তে থাকা অসন্তোষ ও ভাঙনের জল্পনার বিরুদ্ধে নেতৃত্বের শক্তিশালী বার্তা।
বুধবার দুপুরে তৃণমূলের সরকারি সমাজমাধ্যমের পাতায় প্রকাশিত বিবৃতিতে জানানো হয়, ‘গভীর পর্যালোচনার পর অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেসের পশ্চিমবঙ্গের সমস্ত কমিটি এবং সমস্ত শাখা সংগঠন অবিলম্বে ভেঙে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।’ একই সঙ্গে স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে, সংগঠনের প্রতিটি স্তরে আত্মসমীক্ষা, কর্মদক্ষতার মূল্যায়ন আর সাংগঠনিক পর্যালোচনা চালানো হবে। সে মূল্যায়নের ভিত্তিতেই পরবর্তী সময়ে নতুন সাংগঠনিক কাঠামো গড়ে তোলা হবে এবং দায়িত্বপ্রাপ্তদের নাম ঘোষণা করা হবে। দলের তরফে যুক্তি দেওয়া হয়েছে, ভবিষ্যতের রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা, সংগঠনকে আরও কার্যকর ও শক্তিশালী করে তুলতেই এই সিদ্ধান্ত। কিন্তু রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশের মতে, সময়ের নিরিখে এ সিদ্ধান্তের তাৎপর্য অনেক বেশি। কারণ, ঘোষণার কয়েক ঘণ্টা আগেই বিধানসভার অন্দরে এমন কিছু ঘটনা ঘটেছে, যা কার্যত তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ সংকটকে প্রকাশ্যে এনে দিয়েছে।
জানা যাচ্ছে, বুধবার বিধানসভার অধ্যক্ষ রথীন্দ্রনাথ বসুর কাছে একটি চিঠি জমা পড়েছে, যাতে ৫৮ জন বিধায়কের স্বাক্ষর রয়েছে। সে চিঠিতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে দলের সভানেত্রী হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হলেও পরিষদীয় দলনেতা পদে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম প্রস্তাব করা হয়েছে। শুধু তা-ই নয়, উপদলনেতা হিসেবে সন্দীপন সাহা, জাভেদ খান, শিউলি সাহা এবং সাবিনা ইয়াসমিনের নামও উল্লেখ করা হয়েছে। মুখ্য সচেতকের দায়িত্বে আখরুজ্জামানের নাম প্রস্তাব করা হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। রাজনৈতিক মহলের মতে, পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভার ইতিহাসে এ ধরনের ঘটনা বিরল। কারণ, দলীয় নেতৃত্বের বিরুদ্ধে সরাসরি অবস্থান না নিয়েও পরিষদীয় নেতৃত্বে পরিবর্তনের দাবি জানানো কার্যত এক ধরনের সাংগঠনিক চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে যখন সে তালিকায় এমন দুজন জন বিধায়কের নাম রয়েছে, যাঁরা ইতিমধ্যেই দলের সঙ্গে মতপার্থক্যের কারণে বহিস্কৃত।
এ দিনের ঘটনাপ্রবাহে আরও তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, চিঠি জমা পড়ার পাশাপাশি বিধানসভার বাইরে ও ভিতরে বিদ্রোহী শিবিরের একাধিক বৈঠকের খবরও সামনে এসেছে। বহিষ্কৃত বিধায়ক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় এবং সন্দীপন সাহাকে ঘিরে যে সমান্তরাল রাজনৈতিক তৎপরতা তৈরি হয়েছে, তা নিয়ে তৃণমূলের অন্দরে দীর্ঘদিন ধরেই জল্পনা চলছিল। বুধবারের ঘটনাবলির পর সেই জল্পনা আরও তীব্র হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে রাজ্যের সমস্ত সাংগঠনিক কাঠামো এক ঝটকায় ভেঙে দেওয়ার সিদ্ধান্তকে অনেকেই নেতৃত্বের ‘মাস্টারস্ট্রোক’ বলে ব্যাখ্যা করছেন। তাঁদের মতে, জেলা থেকে বুথ, ছাত্র সংগঠন থেকে শ্রমিক সংগঠন— সর্বত্র নতুন করে মূল্যায়নের ঘোষণা দিয়ে শীর্ষ নেতৃত্ব কার্যত গোটা সংগঠনকে নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে এল। এর ফলে পুরনো ক্ষমতার কেন্দ্রগুলি দুর্বল হবে এবং নতুন করে সাংগঠনিক ভারসাম্য গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি হবে।
উল্লেখযোগ্য ভাবে, ভেঙে দেওয়া সংগঠনগুলির মধ্যে রয়েছে তৃণমূল ছাত্র পরিষদ, তৃণমূল যুব কংগ্রেস, মহিলা তৃণমূল কংগ্রেস, আইএনটিটিইউসি, সংখ্যালঘু সেল-সহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ শাখা সংগঠন। ফলে এ সিদ্ধান্তের প্রভাব শুধু রাজনৈতিক নেতৃত্বেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, দলের তৃণমূল স্তরের সাংগঠনিক কাঠামোতেও তার গভীর প্রভাব পড়বে। দলের একাংশ মনে করছে, সাম্প্রতিক নির্বাচনী বিপর্যয়ের পর সংগঠনের কার্যকারিতা নিয়ে নেতৃত্বের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছিল। বিভিন্ন স্তরে সাংগঠনিক শিথিলতা, গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব এবং নেতৃত্বের প্রশ্নে মতবিরোধের অভিযোগও উঠছিল। সেই প্রেক্ষাপটেই আত্মসমীক্ষার পথে হাঁটতে চাইছে দল। অন্য দিকে বিরোধীদের দাবি, সংগঠনের ভিতরে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, এই সিদ্ধান্ত তারই প্রতিফলন।
তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হল— নতুন সাংগঠনিক কাঠামো কবে ঘোষণা হবে, হলে সেখানে কারা জায়গা পাবেন। একই সঙ্গে নজর থাকবে বিধানসভার বিদ্রোহী শিবিরের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকেও। কারণ, ৫৮ জন বিধায়কের স্বাক্ষরিত চিঠি এবং তার পরপরই সংগঠনের সর্বস্তর ভেঙে দেওয়া, এই দুই ঘটনার মধ্যে যোগসূত্র খুঁজতে শুরু করেছে রাজ্যের রাজনৈতিক মহল।
❤ Support Us





