- এই মুহূর্তে দে । শ
- জুন ৩, ২০২৬
কলকাতার মেয়র পদ ছাড়লেন ফিরহাদ, মমতার অনুমোদনেই ইস্তফা ?
পৌরসভাতেও শুরু হলো পালাবদলের অধ্যায়? নবান্নে প্রশাসনিক বৈঠক, দলীয় অন্দরে টানাপড়েন, একের পর এক জনপ্রতিনিধির পদত্যাগের মধ্যেই কলকাতা পুরসভার মেয়র পদ থেকে ইস্তফা দিলেন ফিরহাদ হাকিম। তৃণমূল সূত্রের দাবি, দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনুমতি নিয়েই বুধবার পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন তিনি। প্রায় আট বছর ধরে কলকাতা পুরসভার শীর্ষপদ সামলানোর পর আচমকা তাঁর সরে দাঁড়ানো ঘিরে রাজনৈতিক মহলে শুরু হয়েছে বিস্তর জল্পনা।
দলীয় সূত্রে খবর, গত কয়েক দিন ধরেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে মেয়র পদ থেকে অব্যাহতি চেয়ে আসছিলেন ফিরহাদ। তাঁর অভিযোগ ছিল, রাজ্যে ক্ষমতার পালাবদলের পর, বর্তমান প্রশাসনিক পরিস্থিতিতে পুরসভায় কার্যকর ভাবে কাজ করা ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠছে। বিভিন্ন সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বাধা তৈরি হচ্ছে। নতুন প্রশাসনিক কাঠামো এবং কর্তৃত্বের প্রশ্নে জটিলতা তৈরি হওয়ায় তিনি অস্বস্তিতে ছিলেন বলেও দাবি ঘনিষ্ঠ মহলের।
বুধবার ঘটনাপ্রবাহ তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে। এ দিন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর ডাকা প্রশাসনিক বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন তৃণমূলের একাধিক বিধায়ক। সে তালিকায় ছিলেন কলকাতা বন্দরের বিধায়ক ফিরহাদও। বৈঠক শেষে তিনি কালীঘাটে গিয়ে মমতার সঙ্গে দেখা করেন বলে দলীয় সূত্রের দাবি। সেখানেই মেয়র পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর ইচ্ছার কথা পুনরায় জানান। প্রথমে তাঁকে নিরস্ত করার চেষ্টা করেন তৃণমূল নেত্রী। কিন্তু নিজের সিদ্ধান্তে অনড় ছিলেন ফিরহাদ। শেষ পর্যন্ত তাঁর আবেদনে সম্মতি দেন মমতা।
তৃণমূল মুখপাত্র কুণাল ঘোষ জানিয়েছেন, ‘ফিরহাদ হাকিম বহু দিন ধরেই দলনেত্রীর কাছে ইস্তফার ইচ্ছা প্রকাশ করছিলেন। তিনি মনে করছিলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে মেয়র হিসেবে কাজ করা যাচ্ছে না। নেত্রী সব দিক বিবেচনা করে তাঁর সম্মান রক্ষার্থে পদত্যাগের অনুমতি দিয়েছেন।’ শুধু তাই নয়, নবান্নের প্রশাসনিক বৈঠকের প্রসঙ্গ টেনেও কুণাল বলেন, ‘সেখানেও আলোচনা হয়েছে যে অনেক ক্ষেত্রে কাজ এগোচ্ছে না। প্রশাসনিক কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এই অবস্থায় ফিরহাদ সম্মানজনক ভাবে সরে দাঁড়াতে চেয়েছেন।’
ঘটনাচক্রে, মেয়রের পদত্যাগের মাত্র এক দিন আগে কলকাতা পুরসভার মেয়র পারিষদ (নিকাশি) পদ থেকে ইস্তফা দিয়েছিলেন তারক সিংহ। দল ও পুর প্রশাসনের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি দায়িত্ব ছেড়েছিলেন। সে সময় ফিরহাদ বলেছিলেন, ‘আমরা একটা টিম হিসাবে কাজ করি। যা করব, একসঙ্গেই করব।’ মেয়রের এ মন্তব্যকে ঘিরেই জল্পনা শুরু হয়েছিল। অনেকের ধারণা ছিল, মেয়রের পদত্যাগ হয়তো সময়ের অপেক্ষা। বুধবারের সিদ্ধান্ত সে জল্পনাকেই সত্যি করল।
২০১৮ সালের নভেম্বরে কলকাতার মেয়র হন ফিরহাদ। সে সময় তিনি রাজ্যের নগরোন্নয়ন মন্ত্রীও ছিলেন। কলকাতা পুরসভার ১৫০ বছরেরও বেশি ইতিহাসে প্রথম সংখ্যালঘু মেয়র হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন তিনি। পরে ২০২১ সালের পুর নির্বাচনের পর দ্বিতীয় বার মেয়রের কুর্সিতে বসেন। একই সঙ্গে রাজ্য রাজনীতিতেও তিনি ছিলেন তৃণমূলের অন্যতম প্রভাবশালী মুখ।
গত কয়েক মাসে রাজ্যের রাজনৈতিক সমীকরণ দ্রুত বদলেছে। ২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর থেকেই তৃণমূলের একাংশের মধ্যে অসন্তোষ প্রকাশ্যে আসতে শুরু করে। বিভিন্ন পুরসভায় কাউন্সিলরদের পদত্যাগ, দলীয় বৈঠকে মতভেদ, প্রশাসনিক কর্তৃত্ব নিয়ে টানাপড়েনের খবর সামনে এসেছে বারবার। বুধবার, তৃণমূল থেকে বহিষ্কৃত ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে ‘বিদ্রোহী’ বিধায়করা বিধানসভার বিরোধী দলের জায়গা ‘দখল’ করেছে। এই প্রেক্ষাপটে ফিরহাদের ইস্তফা নিছক প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, না কি বৃহত্তর রাজনৈতিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত— তা নিয়েই এখন জোর আলোচনা।
কলকাতা পুরসভার ভবিষ্যৎ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। পুর আইনের বিধান অনুযায়ী, মেয়রের পদত্যাগ কার্যকর হলে প্রশাসনিক দায়িত্ব আপাতত পুর কমিশনারের উপর বর্তাতে পারে। পরে রাজ্য সরকার চাইলে প্রশাসক নিয়োগ করতে পারে। যদিও পুরভোট হওয়ার কথা আগামী ডিসেম্বর মাসে, রাজনৈতিক মহলের একাংশ মনে করছে, বর্তমান পরিস্থিতিতে নির্বাচনের সময়সূচি নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হতে পারে।
এ দিকে বর্ষা একেবারে দরজায় কড়া নাড়ছে। কলকাতার নিকাশি ব্যবস্থা, রাস্তা মেরামত, জল জমা মোকাবিলা থেকে শুরু করে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ নাগরিক পরিষেবার দায়িত্ব পুরসভার উপর। এমন এক সময়ে মেয়রের পদত্যাগ প্রশাসনিক স্তরে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করল বলেই মনে করছেন পর্যবেক্ষকদের একাংশ। এক সময় যে ফিরহাদ হাকিমকে কলকাতা পুরসভার সবচেয়ে শক্তিশালী প্রশাসনিক মুখ হিসেবে দেখা হতো, বুধবার সে তিনিই দায়িত্ব ছেড়ে দিলেন। ফলে প্রশ্ন উঠছে— এটি কি শুধুই ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত, না কি কলকাতার ক্ষমতার অলিন্দে আরও বড়ো কোনো পরিবর্তনের সূচনা? উত্তর খুঁজছে রাজনৈতিক মহল।
❤ Support Us







