- দে । শ
- জুন ৪, ২০২৬
ট্রেনের খাবারে ‘এআই’ নজরদারি! দিল্লির ‘ওয়ার রুম’ থেকে পর্যবেক্ষণে ৮০০-র বেশি রান্নাঘর
ট্রেনের খাবার নিয়ে যাত্রীদের অভিযোগ নতুন নয়। কখনো নিম্নমানের খাবার, কখনো স্বাস্থ্যবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে বারবার কাঠগড়ায় উঠতে হয়েছে ভারতীয় রেলওয়ে ক্যাটারিং অ্যান্ড ট্যুরিজম কর্পোরেশন (আইআরসিটিসি)-কে। সে সমস্যার মোকাবিলায় এ বার প্রযুক্তির উপর আরও বেশি ভরসা করছে রেল কর্তৃপক্ষ। দেশের ইতিহাসে প্রথম বার ট্রেনযাত্রীদের জন্য প্রস্তুত খাবারের মান ও স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)-নির্ভর নজরদারি ব্যবস্থা চালু করেছে সংস্থাটি। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা ৮০০-রও বেশি রান্নাঘরকে আনা হয়েছে এই নজরদারির আওতায়। এ সব রান্নাঘরে বসানো প্রায় ২,৪০০টি এআই-সক্ষম ক্যামেরা থেকে সরাসরি তথ্য পৌঁছে যাচ্ছে দিল্লিতে আইআরসিটিসির সদর দফতরে তৈরি বিশেষ ‘ওয়ার রুমে’।
বুধবার সাংবাদিক বৈঠকে নতুন ব্যবস্থার বিস্তারিত তুলে ধরেন আইআরসিটিসির চেয়ারম্যান ও ম্যানেজিং ডিরেক্টর এস কে জৈন। তাঁর দাবি, প্রযুক্তির সাহায্যে খাবারের গুণমান ও পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখার ক্ষেত্রে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। রান্নাঘরে কর্মীদের আচরণ থেকে শুরু করে খাবার প্রস্তুতির প্রতিটি ধাপ এখন কড়া নজরদারির মধ্যে রয়েছে। আইআরসিটিসি সূত্রে জানা গিয়েছে, এআই-ভিত্তিক এই নজরদারি ব্যবস্থা এমন ভাবে তৈরি করা হয়েছে, যাতে অত্যন্ত সূক্ষ্ম ত্রুটিও ধরা পড়ে। রান্নাঘরে কোনো কর্মী ‘হেয়ারনেট’ না পরে কাজ করছেন কি না, গ্লাভস ব্যবহার করছেন কি না, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার নিয়ম মানা হচ্ছে কি না— সবই নজরে রাখছে ক্যামেরা। এমনকি খাবারের আশপাশে মাছি, আরশোলা বা ইঁদুরের উপস্থিতিও শনাক্ত করতে পারে এই ব্যবস্থা। আধিকারিকদের দাবি, মাত্র ৭ থেকে ৮ মিলিমিটার আকারের পোকামাকড়ও ক্যামেরার চোখ এড়াতে পারবে না।
দিল্লির সদর দফতরে তৈরি বিশেষ ওয়ার রুমে বসে, সারাক্ষণ নজর রাখা হচ্ছে সমস্ত রান্নাঘরের উপর। কোনো অনিয়ম বা ত্রুটি ধরা পড়লেই সংশ্লিষ্ট রান্নাঘরের ম্যানেজারের কাছে তাৎক্ষণিক সতর্কবার্তা পাঠানো হয়। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সমস্যা মেটানো না হলে বিষয়টি উচ্চতর কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছে যায়। আইআরসিটিসির এক আধিকারিক জানিয়েছেন, অধিকাংশ ক্ষেত্রে দু-ঘণ্টার মধ্যেই দায়ী কর্মীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এস কে জৈন জানান, প্রতিদিন ভারতীয় রেলের বিভিন্ন ট্রেনে ১৬ লক্ষ ৫০ হাজারেরও বেশি খাবার পরিবেশন করা হয়। রাজধানী এক্সপ্রেসের মতো প্রিমিয়াম ট্রেন থেকে শুরু করে দূরপাল্লার বহু ট্রেনে যাত্রীদের জন্য যে খাবার প্রস্তুত করা হয়, তার প্রায় পুরোটাই এখন এআই-নজরদারির আওতায় এসেছে। তাঁর মতে, এত বিপুল সংখ্যক খাবারের গুণমান নিশ্চিত করতে প্রযুক্তির সাহায্য নেওয়া ছাড়া অন্য কোনো বাস্তবসম্মত পথ ছিল না।
আইআরসিটিসির অভ্যন্তরীণ পরিসংখ্যান বলছে, ভারতীয় রেলে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণে খাবার-দাবার সংক্রান্ত অভিযোগ জমা পড়ে। রান্নাঘরগুলিতে স্বাস্থ্যবিধি সংক্রান্ত সবচেয়ে বেশি যে নিয়মভঙ্গ ধরা পড়ে, তা হেয়ারনেট না পরার দরুণ। নয়া ব্যবস্থায় গড়ে প্রতিদিন প্রায় ৩৫০টি সতর্কবার্তা বা ‘এরর টিকিট’ তৈরি করেছে। গত এক মাসেই এমন সংখ্যা পৌঁছেছে ১৩ হাজার ৫৫০-তে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি অভিযোগ বা ত্রুটি ধরা পড়েছে উত্তরাঞ্চলের রান্নাঘরগুলিতে, ৪,১২৩টি। পূর্বাঞ্চলে সে সংখ্যা ৩,২০৫, পশ্চিমাঞ্চলে ২,৬৮৭, দক্ষিণ-মধ্যাঞ্চলে ২,২২৬ এবং দক্ষিণাঞ্চলে ১,৩০৯। তবে প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। আইআরসিটিসির এক আধিকারিক স্বীকার করেছেন, প্রায় ১০ শতাংশ ক্ষেত্রে ভুল সতর্কবার্তা তৈরি হয়। উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, কোনো কর্মীর মাথায় ‘হেয়ারনেট’ থাকলেও সেটি যদি সামান্য সরে যায়, তা হলে এআই সেটিকে নিয়মভঙ্গ বলে চিহ্নিত করতে পারে। কারণ, তার প্রোগ্রামিং সে ভাবেই করা হয়েছে। তবু সামগ্রিক ভাবে নইয়া ‘এআই ব্যবস্থা’ কার্যকর বলেই দাবি কর্তৃপক্ষের।
রেল মন্ত্রকের তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে ট্রেনের খাবার নিয়ে ১৯ হাজারেরও বেশি অভিযোগ জমা পড়েছে। এর মধ্যে ৩,১৩৭টি ঘটনায় জরিমানা করা হয়েছে। ২০২৩-২৪ অর্থবর্ষে অভিযোগের সংখ্যা ছিল ৭,০২৬। পরের বছরে তা কিছুটা কমে ৬,৬৪৫ হলেও, সংখ্যাটা এখনো উদ্বেগজনক বলেই মনে করছে রেল কর্তৃপক্ষ।খাবারের মান নিয়ে রেলের কড়া অবস্থানের উদাহরণও রয়েছে। সম্প্রতি পাটনা-টাটানগর বন্দে ভারত এক্সপ্রেসে নিম্নমানের দই পরিবেশনের অভিযোগে আইআরসিটিসিকে ১০ লক্ষ টাকা জরিমানা করেছিল রেল মন্ত্রক। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট খাদ্য সরবরাহকারী সংস্থার উপর ধার্য হয়েছিল ৫০ লক্ষ টাকার জরিমানা। ওই ঘটনার পর থেকেই খাবারের গুণমান নিয়ে আরও কঠোর হয়েছে রেল।
খাবারের পাশাপাশি অনলাইন টিকিট বুকিং ব্যবস্থাতেও প্রযুক্তির সাহায্যে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। এস কে জৈন জানান, তৎকাল টিকিট বুকিংয়ের সময় অসাধু চক্র ও স্বয়ংক্রিয় সফ্টওয়্যার বা বটের দৌরাত্ম্য ঠেকাতে বড়ো পদক্ষেপ করেছে আইআরসিটিসি। ২০২৫ সালে প্রায় সাড়ে তিন কোটি ভুয়ো অ্যাকাউন্ট নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। পাশাপাশি বিপুল সংখ্যক বটও সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। শুধু তা-ই নয়, গত এক বছরে ১,৩০০-রও বেশি ক্ষতিকর ই-মেল ডোমেন চিহ্নিত করে ব্লক করা হয়েছে। প্রতারণা রুখতে সাইবার সেলের কাছে ৫০০-রও বেশি অভিযোগও দায়ের করেছে আইআরসিটিসি। রেল কর্তৃপক্ষের দাবি, যাত্রীদের নিরাপদ, স্বাস্থ্যসম্মত ও মানসম্পন্ন খাবার পৌঁছে দিতে প্রযুক্তিনির্ভর এই নজরদারি ব্যবস্থা আগামী দিনে আরও বিস্তৃত করা হবে। প্রতিদিন কোটি কোটি মানুষের যাত্রার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা ভারতীয় রেলের খাদ্য পরিষেবায় ‘এআই’-এর প্রবেশকে অনেকেই ভবিষ্যতের পথপ্রদর্শক হিসাবেই দেখছেন।
❤ Support Us





