- বি। দে । শ
- জুন ৫, ২০২৬
প্রয়াত ‘পার্সেপোলিস’-এর স্রষ্টা মারজান সাত্রাপি
ফ্রান্সের প্যারিস শহরে বৃহস্পতিবার রাতে, মাত্র ৫৬ বছর বয়সে প্রয়াত রয়েছেন লেখক, চিত্রশিল্পী, চলচ্চিত্র নির্মাতা এবং প্রতিবাদের অনমনীয় কণ্ঠস্বর মারজান সাত্রাপি। ইরানের ‘ইসলামি বিপ্লব’-পরবর্তী সমাজবাস্তবতাকে ব্যক্তিগত স্মৃতির সঙ্গে মিশিয়ে তিনি লিখেছিলেন বিশ্বসাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ট গ্রাফিক উপন্যাস ‘পার্সেপোলিস’।
মারজান সাত্রাপির জীবন ও শিল্পকর্ম বরাবরই ব্যক্তিগত বেদনা, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং মানবিক প্রতিরোধের কাহিনি বলেছে। তাঁর আত্মজীবনীমূলক গ্রাফিক উপন্যাস ‘পার্সেপোলিস’ প্রকাশের পর বিশ্বজুড়ে বিপুল সাড়া ফেলেছিল। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লব, ইরান-ইরাক যুদ্ধ এবং সে সময়ের সামাজিক-রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্যে নিজের শৈশব ও কৈশোরের অভিজ্ঞতাকে তিনি তুলে ধরেছিলেন লেখনিতে। পরে সেটি চলচ্চিত্রে রূপান্তরিত হয়। ২০০৭ সালে কান চলচ্চিত্র উৎসবে জুরি পুরস্কার জেতে ছবিটি। ২০০৮ সালে অস্কারের সেরা অ্যানিমেটেড ফিচার বিভাগেও মনোনয়ন পায়।
এক সাক্ষাৎকারে সাত্রাপি বলেছিলেন, ‘আমি এমন একটি দেশ থেকে এসেছি, যেখানে একজন নারীর মূল্য একজন পুরুষের অর্ধেক বলে ধরা হয়। কিন্তু আমি কখনো মনে করিনি, নারী হওয়ার কারণে আমার কিছু কম রয়েছে।’ এই স্পষ্টভাষী অবস্থানই তাঁকে আন্তর্জাতিক পরিসরে গণতন্ত্র, নারীর অধিকার এবং মানবিক স্বাধীনতার অন্যতম মুখ করে তুলেছিল। তাঁর মৃত্যুর পরে নতুন করে আলোচনায় উঠে এসেছে শোক ও দুঃখের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা। বিজ্ঞানীরা বলছেন, মানুষ শোক অনুভব করে কারণ মানুষ ভালোবাসতে পারে। বিবর্তনের ইতিহাসে সামাজিক সম্পর্ক মানুষের টিকে থাকার অন্যতম প্রধান উপাদান ছিল। পরিবার, সঙ্গী বা গোষ্ঠীর সঙ্গে গভীর সম্পর্ক গড়ে ওঠার ফলে মানুষ বিপদের সময়ে বেঁচে থাকার সুযোগ পেয়েছে। কিন্তু সে সম্পর্ক যত গভীর, বিচ্ছেদের আঘাতও তত তীব্র।
শুধু সাহিত্য বা চলচ্চিত্র নয়, রাজনৈতিক অবস্থান নিয়েও বারবার শিরোনামে এসেছেন সাত্রাপি। ইরানের ধর্মতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার কড়া সমালোচক ছিলেন তিনি। নারীর অধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং গণতন্ত্রের দাবিতে হওয়া বিভিন্ন আন্দোলনের প্রতীক ছিলেন সাত্রাপি। ২০২২ সালে মাশা আমিনি-র মৃত্যুর পর শুরু হওয়া নারী-স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রতি প্রকাশ্যে সমর্থন জানান। আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সম্পাদনা করেন ‘নারী, জীবন, স্বাধীনতা’ নামে একটি গ্রাফিক সংকলন। শিল্পের প্রতি তাঁর দৃষ্টিভঙ্গিও ছিল ব্যতিক্রমী। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, ‘আঁকা মানুষের প্রথম ভাষা। লেখার আগে, কথা বলার আগেও মানুষ আঁকত।’ চলচ্চিত্র পরিচালনাতেও তিনি সমান দক্ষতা দেখিয়েছেন। গ্রাফিক নভেল ‘চিকেন উইথ প্লামস’-এর চলচ্চিত্র সংস্করণও তিনি সহকারী হিসেবে পরিচালনা করেন। এ ছাড়াও, নোবেলজয়ী মেরি কুরির উপর নির্মিত ২০১৯ সালের বায়োপিক ‘রেডিওঅ্যাক্টিভ’, রেনল্ডস অভিনীত কমেডি-হরর ছবি ‘দ্য ভয়েসেস’-এ নিজের সাক্ষর রেখে গেছেন মারজান সাত্রাপি।
তাঁর মৃত্যুতে শোকপ্রকাশ করেছেন বিশ্ব সাহিত্য, শিল্প জগতের বিশিষ্টরা। শোকজ্ঞাপন করেছেন ফরাসি রাষ্ট্রপতি এম্যনুয়েল ম্যক্রোও। ফরাসি প্রেসিডেন্টের কার্যালয়ের তরফে তাঁকে ‘স্বাধীনতার পক্ষে নিরলস কণ্ঠস্বর’ হিসেবে স্মরণ করা হয়েছে। ১৯৬৯ সালে ইরানের রাশত শহরে জন্ম সাত্রাপির। বেড়ে ওঠা তেহরান-এ। ইসলামি বিপ্লব-পরবর্তী ইরানের সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতা খুব কাছ থেকে দেখেছেন তিনি। কৈশোরে তাঁকে পড়াশোনার জন্য অস্ট্রিয়ায় পাঠানো হয়। পরে তিনি ইরানে ফিরে এলেও, শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের রোষানলে দেশ ছেড়ে ফ্রান্সে বসবাস করতে বাধ্য হন। ২০০৬ সালে ফরাসি নাগরিকত্ব গ্রহণ করেন। বিদেশের নাগরিকত্ব গ্রহণ করলেও নিজের মাতৃভূমি ইরানের রাজনৈতিক বাস্তবতা থেকে কখনো দূরে সরে যাননি।
তাঁর পরিবার ও বন্ধু-স্বজনরা বলছেন তাঁর স্বামী, সুইডিশ প্রযোজক, অভিনেতা, চিত্রনাট্যকার ম্যাতিয়াস রিপার মৃত্যুর শোক সহ্য করতে না পেরেই, একবছরের মধ্যে চলে গেলেন সাত্রাপি। মরমের ব্যথায় মারা যায় কত লোকে… সাধারণত গল্পে-কবিতায়-গানে এমন বাক্য ব্যবহার করা হলেও আধুনিক বিজ্ঞান বলছে, এর মধ্যে কেবল আবেগ নয়, বাস্তব জৈবিক সত্যও লুকিয়ে রয়েছে। অ্যারিজোনা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নায়ুবিজ্ঞানী মেরি-ফ্রান্সেস ও’কনরের গবেষণায় দেখা গিয়েছে, প্রিয়জন কেবল স্মৃতির অংশ হয়ে থাকেন না; তাঁরা মস্তিষ্কের পুরস্কার-ব্যবস্থার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠেন। বিজ্ঞান অবশ্য এ অন্ধকারের মধ্যেও আশার কথা শোনায়। গবেষকদের মতে, শোকের অর্থ ভুলে যাওয়া নয়। বরং মস্তিষ্ক ধীরে ধীরে এমন এক নতুন বাস্তবতার সঙ্গে নিজেকে খাপ খাইয়ে নেয়, যেখানে প্রিয়জনের স্মৃতি রয়ে যায়। স্মৃতি তখন বেদনার উৎস না হয়ে সম্পর্কের এক স্থায়ী চিহ্নে পরিণত হয়। মারজান সাত্রাপির জীবনও সে সত্যেরই প্রতিফলন। ব্যক্তিগত ক্ষতি, রাজনৈতিক নিপীড়ন এবং নির্বাসনের অভিজ্ঞতাকে তিনি শিল্পে রূপ দিয়েছিলেন। ২০২৪ সালে ফ্রান্সের সর্বোচ্চ নাগরিক সম্মান ‘লিজিয়ঁ দ’অনর’ গ্রহণের প্রস্তাবও ফিরিয়ে দিয়েছিলেন তিনি। কারণ, তাঁর মতে, ইরানের গণতন্ত্রপন্থী আন্দোলনের প্রতি ফ্রান্সের সমর্থন যথেষ্ট ছিল না। ‘মানুষ যখন গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করে, তখন তাদের পাশে দাঁড়ানো উচিত’— ফরাসি কর্তৃপক্ষকে লেখা এক চিঠিতে এমনই মন্তব্য করেছিলেন তিনি।
❤ Support Us








