Advertisement
  • এই মুহূর্তে দে । শ
  • জুন ৮, ২০২৬

ভোটের পর থেকে বেপাত্তা, নেপাল সীমান্ত থেকে গ্রেফতার ফলতার ‘পুষ্পা’  জাহাঙ্গির। কলকাতায় আনছে এসটিএফ

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
ভোটের পর থেকে বেপাত্তা, নেপাল সীমান্ত থেকে গ্রেফতার ফলতার ‘পুষ্পা’  জাহাঙ্গির। কলকাতায় আনছে এসটিএফ

দীর্ঘ দিন ধরেই তাঁর খোঁজে তল্লাশি চলছিল। ভোটের ফল ঘোষণার পর থেকে বেপাত্তা ছিলেন তিনি। শেষ পর্যন্ত রাজ্য পুলিশের স্পেশ্যাল টাস্ক ফোর্স (এসটিএফ)-এর জালে ধরা পড়লেন ফলতার ‘পুষ্পা’, বিতর্কিত তৃণমূল নেতা জাহাঙ্গির খান। পুলিশ সূত্রে খবর, ভারত-নেপাল সীমান্ত সংলগ্ন এলাকা থেকে সোমবার তাঁকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ইতিমধ্যেই তাঁকে কলকাতায় নিয়ে আসার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। তদন্তকারীদের প্রাথমিক অনুমান, সীমান্ত পেরিয়ে নেপালে পালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন ফলতার প্রাক্তন তৃণমূল প্রার্থী। তার আগেই গোপন সূত্রে খবর পেয়ে অভিযান চালিয়ে তাঁকে পাকড়াও করে এসটিএফ।

রাজ্যের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে জাহাঙ্গির খান এমন এক চরিত্র, যাঁকে ঘিরে বিতর্ক, অভিযোগ এবং রাজনৈতিক সংঘাত কখনোই থামেনি। ফলতা বিধানসভা কেন্দ্রের পুনর্নির্বাচনের আগে পর্যন্ত তিনি ছিলেন তৃণমূলের অন্যতম আলোচিত মুখ। অথচ ভোটের মাত্র ৪৮ ঘণ্টা আগে আচমকাই সাংবাদিক বৈঠক ডেকে নির্বাচনী লড়াই থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা করেছিলেন তিনি। সে সময় জাহাঙ্গির দাবি করেছিলেন, তাঁর স্বপ্ন ‘সোনার ফলতা’ গড়ে তোলা। মুখ্যমন্ত্রীর উন্নয়ন পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করে তিনি জানিয়েছিলেন, শান্তি ও উন্নয়নের স্বার্থেই তিনি ভোটের ময়দান ছাড়ছেন।

কিন্তু তাঁর সে সিদ্ধান্তে রাজনৈতিক মহলের বিস্ময় কাটেনি। কারণ, প্রার্থীতা প্রত্যাহারের সময়সীমা অতিক্রান্ত হয়ে যাওয়ায় ইভিএমে তৃণমূলের প্রতীকের পাশেই থেকে গিয়েছিল জাহাঙ্গিরের নাম। পরে ২৪ মে ফল ঘোষণার দিন দেখা যায়, ফলতায় বিজেপি ১ লক্ষ ৯ হাজারেরও বেশি ভোটে জয় পেয়েছে। দ্বিতীয় স্থানে উঠে এসেছে সিপিএম। আর জাহাঙ্গির পেয়েছেন মাত্র ৭,৭৮৩ ভোট। চতুর্থ স্থানেই শেষ হয়েছে তাঁর নির্বাচনী যাত্রা। ফল প্রকাশের পর থেকেই কার্যত উধাও হয়ে যান তিনি। বাড়ি, দলীয় কার্যালয় কিংবা ঘনিষ্ঠ মহল— কোথাও তাঁর দেখা মেলেনি। তদন্তকারী সংস্থার দাবি, নিজের অবস্থান গোপন রাখতে একাধিক সতর্ক পদক্ষেপ করেছিলেন জাহাঙ্গির। মোবাইল ফোন বন্ধ করে রাখার পাশাপাশি সমস্ত ডিজিটাল যোগাযোগ প্রায় বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছিলেন। এমনকি হোয়াটসঅ্যাপ থেকেও লগ-আউট করে গিয়েছিলেন বলে তদন্তকারীদের দাবি। ফলে তাঁর গতিবিধি সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করতে যথেষ্ট বেগ পেতে হয়েছে পুলিশকে।

জাহাঙ্গিরের বিরুদ্ধে একাধিক মামলার তদন্ত চলছিল। ২০১৯ সালের একটি মামলায় তিনি আদালতের রক্ষাকবচ পেয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে ফলতার পুনর্নির্বাচনের আবহে আরও একটি আইনি সুরক্ষা লাভ করেন। কিন্তু গত ২৬ মে কলকাতা হাই কোর্ট সেই সমস্ত অন্তর্বর্তী রক্ষাকবচ প্রত্যাহার করে নেয়। আদালতের ওই সিদ্ধান্তের পরই তদন্তকারী সংস্থাগুলি নতুন করে সক্রিয় হয়ে ওঠে। রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকেও আদালতে জানানো হয়েছিল, একাধিক মামলার তদন্তের স্বার্থে জাহাঙ্গিরকে হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা প্রয়োজন। তার পর থেকেই শুরু হয় তাঁর খোঁজে ব্যাপক অভিযান। ডায়মন্ড হারবার জেলা পুলিশ এবং এসটিএফ যৌথ ভাবে একাধিক জায়গায় তল্লাশি চালায়। তদন্তকারীদের দাবি, প্রযুক্তিগত নজরদারি, গোয়েন্দা তথ্য এবং বিভিন্ন সূত্র থেকে পাওয়া খবর বিশ্লেষণ করেই তাঁরা জাহাঙ্গিরের অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত হন। শেষ পর্যন্ত নেপাল সীমান্ত সংলগ্ন এলাকায় তাঁর গতিবিধির খবর পেয়ে সেখানে পৌঁছে যায় এসটিএফ-এর একটি বিশেষ দল। সেখান থেকেই তাঁকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

তদন্তকারী মহলের মতে, জাহাঙ্গিরের গ্রেফতারি শুধুমাত্র একটি রাজনৈতিক ঘটনাই নয়, বরং দক্ষিণ ২৪ পরগনার একাধিক পুরনো মামলার তদন্তে নতুন মোড় আনতে পারে। তাঁর বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরেই এলাকায় প্রভাব বিস্তার, ভয় দেখিয়ে জমি দখল, ভোটারদের হুমকি, বেআইনি অস্ত্র সরবরাহ ও অসামাজিক কার্যকলাপের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। যদিও এ বিষয়ে আদালতে এখনও চূড়ান্ত রায় হয়নি। তবে পুলিশ সূত্রের দাবি, বিভিন্ন মামলার সূত্র একত্র করলে তাঁর ভূমিকা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উঠে আসতে পারে।

ফলতার ভোটের আগে কেন্দ্রীয় বাহিনী ও পুলিশের অভিযানের পর তিনি রাজ্য রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসেন জাহাঙ্গির খান। উত্তরপ্রদেশের পুলিশ পর্যবেক্ষক অজয়পাল শর্মার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে সে সময় নিজেকে ‘পুষ্পা’ বলে উল্লেখ করেছিলেন জাহাঙ্গির। জনপ্রিয় তেলুগু চলচ্চিত্রের সংলাপ ধার করে তিনি বলেছিলেন, ‘পুষ্পা ঝুকেগা নেহি।’ তাঁর সে মন্তব্য ঘিরে তুমুল রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়েছিল। তৃণমূল নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল। অন্য দিকে বিরোধীরা অভিযোগ করেছিল, এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে ভয় ও প্রভাবের রাজনীতি চালিয়েছেন জাহাঙ্গির। রাজনীতির ময়দানে তিনি তখন ঝুঁকবেন না বলে ঘোষণা করেছিলেন। কিন্তু বাস্তবে ভোটের লড়াই থেকে সরে দাঁড়াতে হয়েছিল তাঁকে। তার পর আত্মগোপন। আর এ বার গ্রেফতারি। ফলে ফলতার রাজনৈতিক অভিঘাত কত দূর গড়ায়, তা নিয়েও শুরু হয়েছে নতুন জল্পনা।

এখন তদন্তকারীদের নজর জাহাঙ্গিরের জিজ্ঞাসাবাদে। পলাতক থাকার সময় কারা তাঁকে সাহায্য করেছিলেন, কোথায় কোথায় আশ্রয় নিয়েছিলেন, কার সঙ্গে যোগাযোগ ছিল এবং তাঁর বিরুদ্ধে থাকা অভিযোগগুলির সঙ্গে বাস্তবিক যোগ কতটা— সে সব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই তাঁকে কলকাতায় এনে জেরা করা হবে বলে পুলিশ সূত্রের খবর। দক্ষিণ ২৪ পরগনার রাজনৈতিক সমীকরণে যার নাম দীর্ঘদিন ধরে আলোচনার কেন্দ্রে ছিল, সেই জাহাঙ্গির খানের গ্রেফতারি যে আগামী কয়েক দিন রাজ্য রাজনীতির অন্যতম আলোচ্য বিষয় হয়ে থাকবে, তা নিয়ে সংশয় নেই।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!