- দে । শ প্রচ্ছদ রচনা
- জুন ৮, ২০২৬
দিল্লিতে ‘ইন্ডিয়া’র শক্তিপ্রদর্শন, বৈঠকে সনিয়া-মমতা-রাহুল-অখিলেশ। অনুপস্থিত আপ-ডিএমকে-টিভিকে
বিধানসভা ভোটে পশ্চিমবঙ্গ ও তামিলনাড়ুতে বিরোধী শিবিরের ভরাডুবির পর, এবার নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান পুনর্মূল্যায়নের লক্ষ্যে দিল্লিতে বৈঠকে বসল বিজেপি-বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’। সোমবার দুপুরে রাজধানীর কনস্টিটিউশন ক্লাবে আয়োজিত ওই বৈঠকে উপস্থিত হয়েছেন ২৩টি বিরোধী দলের নেতা ও প্রতিনিধিরা। তবে বৈঠকের শুরু থেকেই নজর কেড়েছে এক দিকে যেমন কংগ্রেস ও তৃণমূলের ক্রমশ ঘনিষ্ঠ হতে থাকা রাজনৈতিক সমীকরণ, অন্যদিকে তেমনই জোটের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শরিক আপ ও ডিএমকে-র অনুপস্থিতি।
বৈঠকের যে ছবি প্রকাশ্যে এসেছে, তা নিয়েই শুরু হয়েছে রাজনৈতিক জল্পনা। ছবিতে দেখা যাচ্ছে, কংগ্রেস সংসদীয় দলের চেয়ারপার্সন সনিয়া গান্ধীর পাশের আসনেই বসে রয়েছেন তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। মমতার অন্য পাশে রয়েছেন পিডিপি নেত্রী মেহবুবা মুফতি। সনিয়ার ডান দিকে বসেছেন কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়্গে, লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী। বৈঠকের মাঝেই তাঁদের মধ্যে দীর্ঘ আলোচনা করতে দেখা যায়। রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, সাম্প্রতিক অতীতে কংগ্রেস ও তৃণমূলের মধ্যে যে দূরত্ব তৈরি হয়েছিল, সে প্রেক্ষাপটে এই দৃশ্য নিছক প্রোটোকল নয়, রাজনৈতিক বার্তা।
বৈঠকে যোগ দিতে রবিবারই দিল্লিতে পৌঁছেছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় আগের দিন থেকেই রাজধানীতে ছিলেন। উপস্থিত ছিলেন সমাজবাদী পার্টির প্রধান অখিলেশ যাদব, আরজেডি নেতা তেজস্বী যাদব, ন্যাশনাল কনফারেন্সের ওমর আবদুল্লা, সিপিএমের রাজ্যসভার সাংসদ জন ব্রিটাস-সহ একাধিক বিরোধী নেতা। তবে বৈঠকের আগে থেকেই জোটের ভিতরে অস্বস্তির ইঙ্গিত মিলছিল। আম আদমি পার্টি স্পষ্ট জানিয়েছে, তারা এ বৈঠকে অংশ নেবে না। দলের জাতীয় মুখপাত্র প্রিয়ঙ্কা কক্কর কংগ্রেসের বিরুদ্ধে সরাসরি আক্রমণ শানিয়ে অভিযোগ করেছেন, বিজেপির বিরুদ্ধে কার্যকর বিরোধিতা গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়েছে কংগ্রেস। একই সঙ্গে ছোটো ও আঞ্চলিক দলগুলির রাজনৈতিক জমি দখলের চেষ্টা করছে তারা। ফলে বর্তমান পরিস্থিতিতে কংগ্রেসের সঙ্গে এক মঞ্চে আসার কোনো প্রশ্নই নেই বলে জানিয়ে দিয়েছে আপ।
আরও তাৎপর্যপূর্ণ ডিএমকে-র অনুপস্থিতি। তামিলনাড়ুতে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পালাবদলের পর থেকেই কংগ্রেসের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি হয়েছে স্ট্যালিনের দলের। বিধানসভা নির্বাচনে পরাজয়ের পর কংগ্রেসের নতুন রাজনৈতিক সমীকরণকে ‘বিশ্বাসঘাতকতা’ বলে আখ্যা দিয়েছিল ডিএমকে। সে ক্ষোভের জেরেই দিল্লির বৈঠক বয়কট করেছে তারা। ফলে ‘ইন্ডিয়া’ জোটের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শরিকের অনুপস্থিতি জোটের ভবিষ্যৎ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে। জল্পনা থাকলেও, বিজয়ের টিভিকে-এরও কোনো প্রতিনিধি বৈঠকে যোগ দেন নি।
২০২৩ সালে পটনায় প্রথম বিরোধী বৈঠকের মাধ্যমে যে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার সূচনা হয়েছিল, তারই পরিণতি ছিল ‘ইন্ডিয়া’ জোটের আত্মপ্রকাশ। সে সময় ২৬টি বিরোধী দলকে এক ছাতার নীচে আনার কৃতিত্ব গিয়েছিল কংগ্রেস, তৃণমূল, জেডিইউ, আপ, ডিএমকে-সহ একাধিক আঞ্চলিক শক্তির কাছে। পাটনা, বেঙ্গালুরুর বৈঠকে নীতীশ কুমার, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, অরবিন্দ কেজরীবাল, এম কে স্ট্যালিন, সীতারাম ইয়েচুরি এবং রাহুল গান্ধীদের এক মঞ্চে দেখা গিয়েছিল। তখন বিরোধী শিবিরের আশা ছিল, বিজেপির বিরুদ্ধে একটি সর্বভারতীয় বিকল্প রাজনৈতিক মঞ্চ গড়ে তোলা সম্ভব হবে। কিন্তু ৩ বছরের ব্যবধানে সমীকরণে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। একাধিক আঞ্চলিক দল ক্ষমতা হারিয়েছে। কেউ কেউ আবার এনডিএ-র দিকে ঝুঁকেছে। পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূলের ক্ষমতাচ্যুতি, তামিলনাড়ুতে ডিএমকে-র পরাজয় বিরোধী রাজনীতির মানচিত্রই বদলে দিয়েছে। অন্যদিকে, জাতীয় স্তরে কংগ্রেসও নিজেদের সাংগঠনিক দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে পারেনি বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা।
এই পরিস্থিতিতে সোমবারের বৈঠকের অন্যতম উদ্দেশ্য বিরোধী শিবিরের মধ্যে আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং আগামী দিনের রাজনৈতিক লড়াইয়ের রূপরেখা তৈরি করা। উত্তরপ্রদেশ-সহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ রাজ্যে আগামী দিনে নির্বাচন রয়েছে। সে প্রেক্ষাপটে বিজেপির বিরুদ্ধে আসন সমঝোতা, যৌথ আন্দোলন ও সংসদের ভিতরে-বাইরে সমন্বিত কৌশল নিয়ে আলোচনা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, বৈঠকের মূল প্রশ্ন অন্যত্র। ‘ইন্ডিয়া’ জোট আদৌ আগের মতো কার্যকর রাজনৈতিক মঞ্চ হিসেবে টিকে থাকতে পারবে কি না, সে উত্তরই খুঁজছে বিরোধী শিবির। কারণ, এক দিকে যখন সনিয়ার পাশে বসে মমতা ঐক্যের বার্তা দিচ্ছেন, অন্য দিকে জোটেরই কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শরিক প্রকাশ্যে কংগ্রেসের বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগরে দিচ্ছে। ফলে দিল্লির বৈঠক যতটা না রাজনৈতিক শক্তিপ্রদর্শনের, তার চেয়ে অনেক বেশি অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই বলেই মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।
❤ Support Us





