Advertisement
  • দে । শ
  • জুন ৯, ২০২৬

‘গ্রেট নিকোবর প্রকল্প’ ঘিরে বিতর্কের মাঝেই নতুন বিমানবন্দর গড়তে ১৩ হাজার কোটি টাকার ছাড়পত্র কেন্দ্রের

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
‘গ্রেট নিকোবর প্রকল্প’ ঘিরে বিতর্কের মাঝেই নতুন বিমানবন্দর গড়তে ১৩ হাজার কোটি টাকার ছাড়পত্র কেন্দ্রের

‘গ্রেট নিকোবর প্রকল্প’ ঘিরে বিতর্ক থামার কোনো লক্ষণ নেই। কেন্দ্রের দাবি, এই প্রকল্প দেশের ভবিষ্যৎ সামুদ্রিক নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক শক্তির অন্যতম ভিত্তি হতে চলেছে। অন্যদিকে, ব্যাপক হারে প্রকৃতি ধ্বংস, মূলনিবাসী জনজাতিদের উচ্ছেদের আশঙ্কা, ঐতিহ্যবাহী ভূমির বেসরকারিকরণ ঘিরে পরিবেশকর্মী, নাগরিক অধিকারকর্মী এবং বিরোধীদের তীব্র আপত্তি।তীব্র টানাপড়েনের মাঝেই কেন্দ্রীয় সরকার গ্রেট নিকোবর দ্বীপে ১৩ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে একটি নতুন বিমানবন্দর নির্মাণের সিদ্ধান্তে সিলমোহর দিল। একই সঙ্গে কার্যত বন্ধ হয়ে গেল ভারতীয় নৌবাহিনীর ‘আইএনএস বাজ’ বিমানঘাঁটির রানওয়ে সম্প্রসারণের দীর্ঘদিনের পরিকল্পনা।

সূত্রের খবর, নতুন বিমানবন্দরটি গড়ে উঠবে গ্রেট নিকোবরের দক্ষিণ-পূর্ব উপকূলে গ্যালাথিয়া উপসাগরের কাছে চিনগেন এলাকায়। এটি হবে যৌথ ব্যবহারের বিমানবন্দর; একদিকে বেসামরিক বিমান চলাচল, অন্যদিকে নৌবাহিনীর সামরিক প্রয়োজন। প্রকল্পটির ব্যয় বহন করবে প্রতিরক্ষা মন্ত্রক ও অসামরিক বিমান পরিবহণ মন্ত্রক যৌথ ভাবে। আগামী ৫ বছরের মধ্যে কাজ শেষ করার লক্ষ্য রাখা হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, বিদ্যমান ‘আইএনএস বাজ’-কে সম্প্রসারণ না করে নতুন বিমানবন্দরের প্রয়োজন হলো কেন ?

এ প্রশ্নই সম্প্রতি তুলেছিলেন লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী। গ্রেট নিকোবর সফর শেষে তিনি দাবি করেন, যদি প্রকল্পটির মূল উদ্দেশ্য জাতীয় নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা শক্তিশালী করা হয়, তা হলে বিদ্যমান নৌবাহিনীর বিমানঘাঁটির সম্প্রসারণই যথেষ্ট ছিল। নতুন করে বন্দর, বিমানবন্দর, টাউনশিপ এবং শিল্প অবকাঠামো নির্মাণের প্রয়োজন কোথায়? পাল্টা, প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের বক্তব্য, এ যুক্তি বাস্তবসম্মত নয়। দীর্ঘ সমীক্ষার পরে দেখা গিয়েছে, বর্তমানে ৪,৫০০ ফুট দীর্ঘ ‘আইএনএস বাজ’-এর রানওয়েকে প্রায় ১০,০০০ ফুট পর্যন্ত সম্প্রসারণ করতে গেলে গুরুতর ভৌগোলিক ও প্রযুক্তিগত সমস্যার মুখে পড়তে হবে। এলাকার ভূপ্রকৃতি, পাহাড়ি ঢাল, অবতরণ ও উড্ডয়নের সীমাবদ্ধতা, নতুন পরিকাঠামোর প্রয়োজন— সব মিলিয়ে সেই পরিকল্পনা কার্যকর করা প্রায় অসম্ভব বলেই মত বিশেষজ্ঞদের।

সরকারি মূল্যায়নে আরও উঠে এসেছে, রানওয়ে সম্প্রসারণের ফলে আশপাশের বনাঞ্চল, বন্যপ্রাণীর আবাসভূমি এবং আদিবাসী বসতির উপর প্রভাব নতুন বিমানবন্দর নির্মাণের তুলনায় বেশি হতে পারত। সে কারণেই বিকল্প পথ হিসেবে গ্যালাথিয়া উপসাগরের কাছে নতুন বিমানবন্দরের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। নতুন বিমানবন্দর তৈরির পরিকল্পনায় এর অবস্থানই তাকে বিশেষ তাৎপর্য দিচ্ছে। গ্যালাথিয়া উপসাগর থেকে খুব বেশি দূরে নয় ‘সিক্স ডিগ্রি চ্যানেল’। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ এটি। এই চ্যানেল হয়ে জাহাজগুলি মালাক্কা প্রণালীর দিকে যায়, যা ভারত মহাসাগর এবং দক্ষিণ চিন সাগরকে সংযুক্ত করেছে। এশিয়ার বিপুল পরিমাণ পরিবহণ, তেল ও গ্যাস সরবরাহ এই পথেই সম্পন্ন হয়।

প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, গ্রেট নিকোবর এই সমুদ্রপথের উপর নজরদারির ক্ষেত্রে প্রাকৃতিক পর্যবেক্ষণকেন্দ্র। এখান থেকে ভারত শুধু জাহাজ চলাচলের উপর নজর রাখতে পারবে না, প্রয়োজন হলে দ্রুত সামরিক প্রতিক্রিয়াও জানাতে পারবে। বিশেষত ভারত মহাসাগর অঞ্চলে চিনের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতির প্রেক্ষাপটে এই অবকাঠামোগত বিনিয়োগকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছে কেন্দ্র। তবে, ‘গ্রেট নিকোবর প্রকল্প’ শুধুমাত্র বিমানবন্দরেই সীমাবদ্ধ নয়। প্রায় ৮১ হাজার কোটি টাকার এই মেগা প্রকল্পের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে গ্যালাথিয়া উপসাগরে একটি আন্তর্জাতিক কনটেনার ট্রান্স-শিপমেন্ট বন্দর নির্মাণের পরিকল্পনা। সরকারের আশা, এর ফলে পণ্য পরিবহণের ক্ষেত্রে সিঙ্গাপুর এবং কলম্বোর মতো বিদেশি বন্দরের উপর ভারতের নির্ভরতা উল্লেখযোগ্য ভাবে কমবে। পাশাপাশি গড়ে তোলা হবে একটি আধুনিক টাউনশিপ, বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র এবং বিভিন্ন সহায়ক অবকাঠামো। সরকারের বক্তব্য, আগামী কয়েক দশকে গ্রেট নিকোবরকে একটি আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক ও অর্থনৈতিক কেন্দ্রে পরিণত করাই এ প্রকল্পের লক্ষ্য।

তবে বিশাল এই কর্মযজ্ঞের বিরোধিতা ক্রমেই তীব্র হচ্ছে। সম্প্রতি নিকোবার দ্বীপে গিয়েছিলেন লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী। দিল্লি ফিরে তিনি প্রস্তাবিত প্রকল্পকে ‘দেশের প্রাকৃতিক এবং মূলনিবাসী ঐতিহ্যের বিরুদ্ধে সবচেয়ে গুরুতর আক্রমণগুলির একটি’ বলে মন্তব্য করেন। তাঁর অভিযোগ, প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে বিপুল পরিমাণ ‘বৃষ্টি অরণ্য’ ধ্বংস হবে, দেড় কোটিরও বেশি গাছ কাটা পড়বে, প্রবালপ্রাচীর ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং শোমপেন-সহ একাধিক আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রা বিপন্ন হবে। বিশ্ব পরিবেশ দিবসে তিনি ‘গ্রিন ওভার গ্রিড’ নামে একটি প্রচারাভিযানও শুরু করেছেন। কংগ্রেসের দাবি, নিকোবারের প্রকল্পটির পরিবেশগত ছাড়পত্র, আর্থিক কার্যকারিতা ও মূলনিবাসী অধিকার সংক্রান্ত নানা প্রশ্ন এখনো অমীমাংসিত।

বিরোধীদের সমালোচনায় আরও একটি বিষয় বারবার উঠে আসছে। অর্থ মন্ত্রকের অধীনস্ত ‘পাবলিক ইনভেস্টমেন্ট বোর্ড’ ২০২৪ সালে এক মূল্যায়নে জানিয়েছিল, প্রস্তাবিত ‘ট্রান্স-শিপমেন্ট’ বন্দরের কোনো স্পষ্ট কৌশলগত লক্ষ্য খুঁজে পাওয়া যায়নি। আবার ‘পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ অ্যাপ্রেইজাল কমিটি’ প্রকল্পটির জন্য চাওয়া ১২,২৩০ কোটি টাকা মঞ্জুর করতে অস্বীকার করে। ফলে সমালোচকদের প্রশ্ন, প্রকল্পটি যদি বাণিজ্যিক ভাবে লাভজনক না হয়, তবে তার অর্থনৈতিক ভিত্তি কোথায়? অন্যদিকে কেন্দ্রের দাবি, সমালোচনার অনেকটাই বাস্তবতার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, দ্বীপটির মোট আয়তনের মাত্র ১৬৬.১ বর্গকিলোমিটার উন্নয়নের জন্য নির্ধারিত হয়েছে। অর্থাৎ গ্রেট নিকোবরের ৮১ শতাংশেরও বেশি এলাকা বনভূমি, জাতীয় উদ্যান, জীবমণ্ডল সংরক্ষণ অঞ্চল এবং মূলনিবাসী সংরক্ষিত এলাকা হিসেবেই থেকে যাবে।

কেন্দ্র সরকার জানিয়েছে, পরিবেশগত মূল্যায়নের কাজে যুক্ত ছিল ‘জুলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়া’, ‘ওয়াইল্ডলাইফ ইনস্টিটিউট অব ইন্ডিয়া’ এবং ‘সেলিম আলি সেন্টার ফর অর্নিথোলজি অ্যান্ড ন্যাচারাল হিস্ট্রি’-র মতো সংস্থা। লেদারব্যাক কচ্ছপ, নিকোবর মেগাপোড, কুমির, প্রবালপ্রাচীর এবং ম্যানগ্রোভ সংরক্ষণের জন্য ৩০ বছরে ২,২২০ কোটি টাকার পৃথক সংরক্ষণ কর্মসূচিও নেওয়া হয়েছে। মোদি সরকার আরও দাবি করছে, কোনো মূলনিবাসী সম্প্রদায়কে জোরপূর্বক উচ্ছেদ করার পরিকল্পনা তাঁদের নেই। সংশ্লিষ্ট কল্যাণ সংস্থা ও প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করেই প্রকল্পের বিভিন্ন ধাপ এগিয়েছে।

তবে, কেন্দ্রের এসব যুক্তিতে বিতর্ক থামছে না। পরিবেশবিদদের একাংশের মতে, গ্রেট নিকোবরের মতো একটি অতি সংবেদনশীল দ্বীপে এত বড়ো মাপের অবকাঠামো প্রকল্পের প্রভাব শুধুমাত্র সংখ্যার অঙ্কে বিচার করা সম্ভব নয়। শতাব্দীপ্রাচীন বৃষ্টিঅরণ্য, বিরল জীববৈচিত্র্য, প্রবালপ্রাচীর আর জনজাতি সংস্কৃতির যে ক্ষতি হবে, তা কোনো ক্ষতিপূরণ প্রকল্প দিয়ে পূরণ করা সম্ভব নয়। মূলনিবাসী সংগঠনগুলিরও অভিযোগ, এই প্রকল্পের জন্য সম্মতি নেওয়ার সময় পূর্ণাঙ্গ তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। ২০০৪ সালের সুনামির পর পুনর্বাসনের প্রতিশ্রুতি এবং ঐতিহ্যগত ভূমি অধিকারের বিষয়টিও উপেক্ষা করা হয়েছে বলে তারা দাবি করেছে। ফলে ‘গ্রেট নিকোবর প্রজেক্ট’ এখন শুধু একটি উন্নয়ন প্রকল্প নয়; এটি পরিণত হয়েছে ভারতের ভবিষ্যৎ উন্নয়ন মডেলকে ঘিরে এক বৃহত্তর বিতর্কের কেন্দ্র। এক দিকে জাতীয় নিরাপত্তা, সামুদ্রিক কৌশল এবং অর্থনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা। অন্যদিকে পরিবেশ সংরক্ষণ, জীববৈচিত্র্য এবং আদিবাসী অধিকারের প্রশ্ন। 


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!