- এই মুহূর্তে দে । শ
- জুন ২৫, ২০২৬
তারাতলার ঘটনায়, শোকপ্রকাশ প্রধানমন্ত্রীর । ‘কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না’: হুঁশিয়ারি মুখ্যমন্ত্রীর । আহত- নিহতের পরিবারকে আর্থিক সহায়তার ঘোষণা
ধ্বংসস্তূপের স্তূপের নীচে আকটে থাকে মানুষের খোঁজ চলছে এখনো। কোথাও কংক্রিটের চাঙড়, কোথাও মোচড় খেয়ে পড়ে থাকা বিশাল লোহার বিম। মাঝেমধ্যে উদ্ধারকারীদের কানে পৌঁছচ্ছে ক্ষীণ আওয়াজ। সে শব্দ আদৌ কোনো আটকে পড়া শ্রমিকের কি না, তা নিশ্চিত করে বলতে পারছেন না কেউ। তবু থামছে না অনুসন্ধান। তারাতলার ব্রেসব্রিজ সংলগ্ন নির্মীয়মাণ গুদাম ধসের প্রায় চব্বিশ ঘণ্টা পরেও একই রকম তৎপর উদ্ধারকারী বাহিনী। আর সে আবহেই বৃহস্পতিবার বিধানসভায় দাঁড়িয়ে বিস্ফোরক দাবি করলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী।
হাতে ধরা একগুচ্ছ নথি দেখিয়ে মুখ্যমন্ত্রী জানান, চলতি বছরের ১৭ জানুয়ারি কলকাতা পুরসভা ওই নির্মীয়মাণ গুদামের বিল্ডিং প্ল্যানে অনুমোদন দিয়েছিল। তাঁর দাবি, অনুমোদনের নথিতে তৎকালীন কলকাতা পুরসভার মেয়র ফিরহাদ হাকিমের সই রয়েছে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট ইঞ্জিনিয়ার এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত আধিকারিকদেরও স্বাক্ষর রয়েছে। বিধানসভার কক্ষে দাঁড়িয়ে সরাসরি প্রাক্তন প্রশাসনের বিরুদ্ধে আক্রমণ শানিয়ে তিনি বলেন, ‘টাকা নিতে নিতে সিটি অফ জয় কলকাতাকে মৃত্যুপুরীতে পরিণত করেছে তৃণমূল সরকার। একের পর এক দুর্ঘটনার পরেও কোনো শিক্ষা নেওয়া হয়নি। এখানে প্রাক্তন মেয়রের সই রয়েছে। কাউকে ছাড়া হবে না। এই মৃত্যুর দায় নির্ধারণ হবেই।’
বুধবার দুপুর ১২টা ৭ মিনিট। কর্মব্যস্ত সময়ে আচমকাই বিপর্যয় নেমে আসে তারাতলার ব্রেসব্রিজ এলাকায়। নির্মীয়মাণ পাঁচতলা গুদামের বিশাল লোহার কাঠামো এবং ছাদের অংশ মুহূর্তের মধ্যে ভেঙে পড়ে। সে সময় সেখানে প্রায় ৫০ থেকে ৬০ জন শ্রমিক কাজ করছিলেন বলে প্রশাসনিক সূত্রের দাবি। বিকট শব্দে কেঁপে ওঠে গোটা এলাকা। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে ধুলোয় ঢেকে যায় চারদিক। প্রথমে কেউই বুঝে উঠতে পারেননি কী ঘটেছে। তারপরই শুরু হয় আর্তনাদ, ছুটোছুটি, ধ্বংসস্তূপ সরানোর মরিয়া চেষ্টা। স্থানীয় বাসিন্দারাই প্রথম উদ্ধারকাজে হাত লাগান। পরে ঘটনাস্থলে পৌঁছয় কলকাতা পুলিশ ও দমকল। সময় যত গড়িয়েছে, ততই উদ্ধার অভিযানে যোগ দেয় সিভিল ডিফেন্স, জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী (এনডিআরএফ) এবং সেনাবাহিনী। এদিন, মুখ্যমন্ত্রী বিধানসভায় জানান, দুর্ঘটনার প্রায় তিরিশ মিনিটের মধ্যেই উদ্ধার অভিযান শুরু হয়েছিল। বুধবার রাতভর সেই অভিযান চলে। বৃহস্পতিবার সকালেও থামেনি কাজ। ধ্বংসস্তূপের নীচে আটকে থাকা শ্রমিকদের খোঁজে ব্যবহার করা হচ্ছে অত্যাধুনিক গ্রাউন্ড পেনিট্রেটিং রেডার। বিশাল লোহার বিম কাটতে নামানো হয়েছে বিশেষ যন্ত্রপাতি।
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, এখনো পর্যন্ত ২৯ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। আহত অন্তত ২০ জন। আহতদের মধ্যে ১৫ জনের অবস্থা আপাতত স্থিতিশীল হলেও চার জন গুরুতর এবং এক জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। ফলে মৃতের সংখ্যা আরও বাড়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। প্রশাসনের আশঙ্কা, ধ্বংসস্তূপের নীচে এখনো কয়েক জন আটকে থাকতে পারেন। ঘটনায় নিহতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘অর্থ দিয়ে মৃত্যুর ক্ষতিপূরণ হয় না। তা সত্ত্বেও দায়িত্বশীল সরকার হিসেবে আমরা পরিবারের পাশে দাঁড়াতে অঙ্গীকারবদ্ধ।’ তিনি ঘোষণা করেন, মৃতদের পরিবারপিছু ১০ লক্ষ টাকা এবং আহতদের ১ লক্ষ টাকা করে আর্থিক সাহায্য দেওয়া হবে। হাসপাতালগুলিতে চিকিৎসাধীন আহতদের সমস্ত প্রয়োজনীয় চিকিৎসার ব্যবস্থা করার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।
বিপর্যয়কে ঘিরে জাতীয় স্তরেও প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সমাজমাধ্যমে শোকপ্রকাশ করে লিখেছেন, কলকাতার দুর্ঘটনা অত্যন্ত মর্মান্তিক। প্রধানমন্ত্রীর জাতীয় ত্রাণ তহবিল থেকে মৃতদের পরিবারপিছু ২ লক্ষ টাকা এবং আহতদের ৫০ হাজার টাকা করে আর্থিক সাহায্য দেওয়া হবে। একই সঙ্গে তিনি উল্লেখ করেছেন, ক্ষতিগ্রস্তদের সমস্ত রকম সাহায্য পৌঁছে দিতে রাজ্য সরকার নিরলসভাবে কাজ করছে। বিধানসভায় বুধবারের ঘটনা থেকে শুরু করে প্রশাসনের প্রতিটা পদক্ষেপের বিস্তারিত বিবরণও দেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি জানান, প্রথম থেকেই নবান্ন থেকে পরিস্থিতির উপর নজর রাখা হচ্ছিল। সরকারের তরফে প্রথম ঘটনাস্থলে পৌঁছন ক্রীড়ামন্ত্রী ইন্দ্রনীল খাঁ ও পুরমন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল। পরে সেখানে যান দমকলমন্ত্রী কৌশিক চৌধুরী, স্বাস্থ্যমন্ত্রী শারদ্বত মুখোপাধ্যায়-সহ একাধিক মন্ত্রী ও প্রশাসনিক আধিকারিক। মুখ্যমন্ত্রী নিজেও পরে ঘটনাস্থল এবং হাসপাতালে গিয়ে আহতদের সঙ্গে কথা বলেন। শুভেন্দু জানান, ‘প্রথম দিকে গেলে উদ্ধারকাজে বিঘ্ন ঘটতে পারত। তাই পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসার পর ঘটনাস্থলে যাই।’
ঘটনার তদন্তে ইতিমধ্যেই বিশেষ তদন্তকারী দল গঠন করা হয়েছে। গোয়েন্দা বিভাগের এসিপি জয়সূর্য মুখোপাধ্যায়, হোমিসাইড শাখার অফিসার ইনচার্জ দেবাশিস দত্ত, ইন্সপেক্টর হিরক দলপতি, সরফরাজ আহমেদ-সহ একাধিক আধিকারিককে সেই দলে রাখা হয়েছে। তারাতলা থানার আধিকারিকেরাও তদন্তে যুক্ত রয়েছেন। এই ঘটনায় এ পর্যন্ত পাঁচ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ধৃতদের মধ্যে রয়েছেন অয়ন ট্রেডার্সের সুপারভাইজার গুলজার হোসেন, লোহার কাঠামো প্রস্তুতকারক কমল সামন্ত, জমির লিজগ্রহীতা শম্ভুনাথ বেহেরা, শ্রমিক সরবরাহকারী ও ট্রাইমেক্স ঠিকাদার দিবারক ভাণ্ডারি এবং কলকাতা পুরসভায় নির্মাণ পরিকল্পনার অনুমোদনের জন্য মধ্যস্থতার অভিযোগে আবদুল হামিদ। তদন্তকারীরা মনে করছেন, নির্মাণের বিভিন্ন স্তরে গাফিলতি এবং অনিয়মের যোগ থাকতে পারে। সে কারণেই গ্রেফতারের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে ইঙ্গিত মিলেছে।
বিধানসভায় মুখ্যমন্ত্রী শুধু দুর্ঘটনার তদন্ত নয়, গোটা নির্মাণ অনুমোদন প্রক্রিয়াকেই কাঠগড়ায় তোলেন। তাঁর অভিযোগ, ‘অর্থের বিনিময়ে, কাটমানির বিনিময়ে যে সব বিল্ডিং প্ল্যান অনুমোদন দেওয়া হয়েছে, সেগুলির পূর্ণাঙ্গ অডিট না করে কোনো নির্মাণকাজ চলতে দেওয়া হবে না।’ তিনি ঘোষণা করেন, কলকাতা পুরসভা, রাজারহাট নিউটাউন, মহেশতলা, বজবজ, পুজালি, সোনারপুর এবং বারুইপুর পুর এলাকার নির্মীয়মাণ প্রকল্পগুলিতে সাময়িক স্থগিতাদেশ জারি করা হচ্ছে। আগামী কয়েক সপ্তাহ ধরে প্রতিটি নির্মাণ প্রকল্পের নকশা, অনুমোদন এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা খতিয়ে দেখা হবে। রাজেশ পাণ্ডের নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠনের কথাও জানান মুখ্যমন্ত্রী। কমিটিতে থাকবেন স্মিতা পাণ্ডে, রচনা ভগত, রাজেশ সিনহা, খলিল আহমেদ, আইআইটির বিশেষজ্ঞ, পূর্ত দফতরের প্রধান প্রকৌশলী এবং ডিজি বিল্ডিং। কমিটির কাজ হবে বিভিন্ন প্রকল্পের নকশা ও অনুমোদন পরীক্ষা করা এবং কোথাও কোনও গলদ রয়েছে কি না তা নির্ণয় করা। মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট ভাষায় বলেন, ‘অডিটে অনিয়ম ধরা পড়লে সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হবে। জেলও খাটতে হবে। দুর্নীতির ক্ষেত্রে বিজেপি সরকারের অবস্থান শূন্য সহনশীলতার।’
অন্যদিকে, তারাতলার ঘটনাকে ঘিরে নতুন বিতর্ক উস্কে দিয়েছেন সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম। তাঁর দাবি, সম্ভাব্য বিপর্যয়ের আশঙ্কা আগেই করা হয়েছিল। বন্দর কর্মী ইউনিয়ন গত ১১ জুন কলকাতা বন্দর কর্তৃপক্ষকে চিঠি দিয়ে নির্মাণস্থলে গুরুতর নিরাপত্তা লঙ্ঘনের অভিযোগ জানিয়েছিল। সে চিঠিতে নাজিরাবাদের একটি গুদামে অগ্নিদগ্ধ হয়ে শ্রমিক মৃত্যুর ঘটনার উল্লেখও ছিল। একই সঙ্গে অভিযোগ করা হয়েছিল, ‘কুখ্যাত’ আসগরের তত্ত্বাবধানে তারাতলার গুদাম নির্মাণে শ্রমিক নিরাপত্তার ন্যূনতম বিধিও মানা হচ্ছিল না। কিন্তু সে সতর্কবার্তা গুরুত্ব পায়নি বলেই দাবি সেলিমের। যদিও কলকাতা বন্দর কর্তৃপক্ষ দায় এড়িয়ে জানিয়েছে, জমির মালিকানা তাদের হলেও নির্মাণ অনুমোদনের দায়িত্ব ছিল কলকাতা পুরসভার। ফলে ভবন নির্মাণ সংক্রান্ত দায়-দায়িত্ব কার, তা তদন্তেই স্পষ্ট হবে।
❤ Support Us








