Advertisement
  • এই মুহূর্তে দে । শ
  • জুন ২৫, ২০২৬

পাঁচ দশক পর এনসিইআরটি পাঠ্যক্রমে জরুরি অবস্থা: নবম শ্রেণিতে পড়ানো হবে ‘গণতন্ত্রের চ্যালেঞ্জ’, তীব্র প্রতিক্রিয়া কংগ্রেসের

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
পাঁচ দশক পর এনসিইআরটি পাঠ্যক্রমে জরুরি অবস্থা: নবম শ্রেণিতে পড়ানো হবে ‘গণতন্ত্রের চ্যালেঞ্জ’, তীব্র প্রতিক্রিয়া কংগ্রেসের

প্রায় পাঁচ দশক পর ভারতের স্কুল পাঠ্যক্রমে জায়গা করে নিল ১৯৭৫ সালের ‘জরুরি অবস্থা’। এনসিইআরটি নবম শ্রেণির সমাজবিজ্ঞান পাঠ্যক্রমে এই গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ঘটনাকে অন্তর্ভুক্ত করেছে। স্বাধীন ভারতের ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত ও বিতর্কিত অধ্যায়গুলির মধ্যে অন্যতম পর্বকে এবার শিক্ষার্থীরা পড়বে ‘গণতন্ত্রের চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক নতুন অধ্যায়ের অংশ হিসেবে।

এনসিইআরটি-এর নতুন পাঠ্যপুস্তক ‘আন্ডারস্ট্যান্ডিং সোসাইটি: ইন্ডিয়া অ্যান্ড বিয়ন্ড’-এ গণতন্ত্রের শক্তি ও তার সামনে থাকা বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ নিয়ে পৃথক অধ্যায় যুক্ত করা হয়েছে। এ অধ্যায়ের মধ্যেই প্রথমবারের মতো জরুরি অবস্থার ইতিহাসকে বিস্তারিতভাবে স্থান দেওয়া হয়েছে। সংস্থার এক আধিকারিকের মতে, নবম শ্রেণির পাঠ্যক্রমে প্রথমবারের মতো জরুরি অবস্থা নিয়ে আলাদা ও বিস্তৃত অংশ অন্তর্ভুক্ত করা হলো। পাঠ্যবই অনুযায়ী, ৭০-এর দশকের গোড়ার দিকে ভারতে বেকারত্ব বৃদ্ধি, মূল্যবৃদ্ধি, প্রশাসনিক ব্যর্থতা এবং সরকারের বিরুদ্ধে জনঅসন্তোষ ক্রমশ বাড়ছিল। রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে ১৯৭৫ সালের জুন মাসে ‘অভ্যন্তরীণ অশান্তি’র কারণ দেখিয়ে জাতীয় জরুরি অবস্থা জারি করা হয়।

বইয়ে উল্লেখ রয়েছে, জরুরি অবস্থার সময় দেশের অধিকাংশ মৌলিক অধিকার স্থগিত করা হয়েছিল। সংবাদমাধ্যমের ওপর কড়াকড়ি সেন্সরশিপ আরোপ করা হয়। বহু রাজনৈতিক নেতা ও আন্দোলনকারীকে গ্রেফতার করা হয়। ফলে সে সময় গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলির ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি হয়, নাগরিক স্বাধীনতা সীমিত হয়ে পড়ে। নতুন অধ্যায়ে শুধু সরকারি পদক্ষেপ নয়, সে সময়ের প্রতিরোধ আন্দোলনের দিকও তুলে ধরা হয়েছে। বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে সমাজবাদী নেতা ও ‘লোকনায়ক’ হিসেবে পরিচিত জয়প্রকাশ নারায়ণের ভূমিকা। ছাত্র, যুবসমাজ ও সাধারণ মানুষের আন্দোলনে তাঁর নেতৃত্বও পাঠ্যে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।

এছাড়া বইয়ে বলা হয়েছে, ৭৭ সালে জরুরি অবস্থা প্রত্যাহার করে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় এবং সে নির্বাচনে তৎকালীন শাসক সরকারের পরাজয় ঘটে। এ ঘটনাকে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার শক্তি ও জনগণের রায়ের গুরুত্বের উদাহরণ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। শুধু ইতিহাস নয়, নতুন পাঠ্যক্রমে বর্তমান সময়ের গণতন্ত্রের চ্যালেঞ্জগুলিও গুরুত্ব পেয়েছে। এতে ভুয়ো খবর, বিভ্রান্তিকর তথ্য, সামাজিক বৈষম্য, আঞ্চলিকতা, লিঙ্গ বৈষম্য, জনসম্পত্তি নষ্ট করা এবং নাগরিক দায়িত্ব পালনের মতো বিষয়গুলিকে গণতন্ত্রের সামনে বড়ো চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর পাশাপাশি ‘Democracy and You’ নামে একটি নতুন বিভাগও যুক্ত করা হয়েছে, যার লক্ষ্য শিক্ষার্থীদের মধ্যে দায়িত্বশীল নাগরিকত্বের বোধ গড়ে তোলা।

অন্যদিকে, পাঠ্যবইয়ে জরুরি অবস্থার সংযোজনে, বিজেপির বিরুদ্ধে ইতিহাস পুনর্লিখনের অভিযোগ তুলেছে কংগ্রেস ও সহযোগী দলগুলি। বিরোধী শিবিরের দাবি, অতীতের একটি বিতর্কিত অধ্যায়কে সামনে এনে বর্তমানের গণতান্ত্রিক সংকট ও রাজনৈতিক প্রশ্নগুলি থেকে মানুষের দৃষ্টি ঘোরানোর চেষ্টা করছে শাসক দল। কংগ্রেস নেতা সচিন পাইলট অভিযোগ করেছেন, ‘বিজেপি ক্ষমতায় এলেই ইতিহাস, সাহিত্য আর শিক্ষাব্যবস্থাকে নিজেদের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে সাজানোর চেষ্টা করে। সেটাই হয়তো তাদের উদ্দেশ্য। কিন্তু দেশের সামনে এখন আরও বড়ো চ্যালেঞ্জ রয়েছে, সেদিকেও নজর দেওয়া প্রয়োজন।’ সচিনের দাবি, স্বাধীন ভারতের ইতিহাসে গণতন্ত্র আজ যে ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি, তা অভূতপূর্ব। অতীতের ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক প্রচার চালানোর বদলে বর্তমানের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলির অবস্থা এবং নাগরিক স্বাধীনতা নিয়ে আলোচনা হওয়া উচিত বলেও মত প্রকাশ করেন তিনি।

একই সুর শোনা গিয়েছে কংগ্রেসের আর এক নেতা জৈবর্ধন সিংহের গলাতেও। বিজেপির বিরুদ্ধে শিশুদের পাঠ্যবইকে রাজনৈতিক প্রচারের হাতিয়ার করে তোলার অভিযোগ তুলেছেন তিনি। জৈবর্ধনের বক্তব্য, ‘খুব সংকীর্ণ মানসিকতা নিয়ে বিজেপি শিশুদের পাঠ্যবইয়েও রাজনীতি ঢোকানোর চেষ্টা করছে। কংগ্রেস বহু দশক ধরে দেশ শাসন করেছে, কিন্তু কখনো শিশুদের ভবিষ্যৎ নিয়ে রাজনীতি করেনি।’ বিতর্কে কংগ্রেসের পাশে দাঁড়িয়েছে মহারাষ্ট্রের বিরোধী জোটসঙ্গী শিবসেনা (ইউবিটি)-ও। দলের সাংসদ সঞ্জয় রাউত প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর ভূমিকার পক্ষে সওয়াল করে বলেছেন, ‘জরুরি অবস্থাকে শুধু রাজনৈতিক বিতর্কের বিষয় হিসেবে দেখা ঠিক নয়। তাঁর মতে, জরুরি অবস্থা সংবিধান স্বীকৃত একটি সাংবিধানিক ব্যবস্থা। দেশে যদি নৈরাজ্য সৃষ্টি হয়, তা হলে সংবিধান প্রধানমন্ত্রীকে জরুরি অবস্থা জারির অধিকার দিয়েছে। জরুরি অবস্থা জারি হয়েছিল বলেই সংবিধানের প্রতি অসম্মান দেখানো হয়েছে, এমনটা বলা যায় না।’ তিনি আরও দাবি করেছেন, ইন্দিরা গান্ধী কোনো রাজনৈতিক দল ভাঙেননি কিংবা সংবিধান বিলোপের মতো পদক্ষেপও নেননি।

অন্য দিকে, কংগ্রেসের সমালোচনার জবাবে আক্রমণাত্মক অবস্থান নিয়েছে বিজেপি। দলের জাতীয় মুখপাত্র শাহজাদ পুনাওয়ালা বলেন, কংগ্রেস এখনো জরুরি অবস্থার মানসিকতা থেকে বেরোতে পারেনি। তাঁর অভিযোগ, ‘যারা নিজেদের সংবিধানের রক্ষাকর্তা বলে দাবি করে, বাস্তবে তারাই সংবিধানের সবচেয়ে বড়ো ধ্বংসকারী।’ যুযুধান দু-পক্ষের বিতণ্ডায় ৫১ বছর আগে ঘোষিত জরুরি অবস্থার প্রেক্ষাপট নতুন করে যে জাতীয় রাজনীতি দীর্ঘ বিতর্কের সূত্রপাত করল তা সহজেই অনুমেয়। তবে এসবের মাঝে, এনসিইআরটি মনে করছে, নতুন প্রজন্মকে সাংবিধানিক মূল্যবোধ, নাগরিক অধিকার ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের গুরুত্ব সম্পর্কে আরও গভীর ধারণা দেওয়ার ক্ষেত্রেই এ পরিবর্তন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

 


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!