- এই মুহূর্তে ন | ন্দ | ন | চ | ত্ব | র
- জুন ২৫, ২০২৬
‘এক নীড়ে বিশ্ব’ : শতাব্দী পেরিয়ে ফের যুদ্ধছায়ার মস্কোয় রবীন্দ্রনাথ
চার দিকে যুদ্ধের ঘনঘটা, আন্তর্জাতিক কূটনীতির টানাপোড়েন, ভূরাজনীতির নতুন মেরুকরণ। এমন এক অশান্ত সময়ে মস্কোভা নদীর তীরে আবার জ্বলে উঠল উদ্ভাসিত রবিকিরণ। প্রায় এক শতাব্দী পরে রাশিয়ার মাটিতে ফের চিত্রকলা প্রদর্শনী। শেষ বার ১৯৩০ সালে নিজের উপস্থিতিতে মস্কোয় শিল্পপ্রদর্শনী করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ । তার পর কেটে গিয়েছে প্রায় ৯৬ বছর। দীর্ঘ বিরতির অবসান ঘটিয়ে ফের রাশিয়ার রাজধানীতে ফিরে এলেন কবিগুরু— তাঁর ছবি, চিন্তাভাবনা, শিক্ষাদর্শ আর বিশ্বমানবতার দর্শন নিয়ে। ২৫ জুন থেকে মস্কোর ‘জিইএস-২ হাউস অব কালচার’-এ শুরু হলো ‘দ্য ওয়ার্ল্ড ইন আ সিঙ্গল নেস্ট: ফলোয়িং দ্য ওয়ে অব টেগোর’ শীর্ষক ভারত-রাশিয়া যৌথ প্রদর্শনী, যা আগামী ২৩ আগস্ট পর্যন্ত চলবে।
শিল্প জগতের মতে, এ শুধু শিল্প-প্রদর্শনী নয়, ভারত ও রাশিয়ার সাংস্কৃতিক সম্পর্কের দীর্ঘ ইতিহাসকে নতুন করে স্মরণ করানোর আয়োজন। শুধু শিল্পী রবীন্দ্রনাথ নন, প্রদর্শনীর কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবেন শিক্ষাবিদ, দার্শনিক, বিশ্বনাগরিক রবীন্দ্রনাথও। বিশেষ করে শান্তিনিকেতনে ১৯২১ সালে প্রতিষ্ঠিত বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়কে ঘিরে তাঁর যে বৃহত্তর মানবতাবাদী স্বপ্ন, সে ভাবনাই প্রদর্শনীর মূল সুর। প্রদর্শনীর নামকরণও হয়েছে বিশ্বভারতীর অনানুষ্ঠানিক মন্ত্র ‘যত্র বিশ্বং ভবত্যেকনীড়ম্’ বা ‘বিশ্ব এক নীড়ে’-র ভাবনা থেকে। আয়োজকদের বক্তব্য, এমন এক সময়ে যখন বিশ্বজুড়ে বিভাজন, সংঘাত আর সাংস্কৃতিক দূরত্ব ক্রমশ প্রকট হয়ে উঠছে, তখন রবীন্দ্রনাথের আন্তর্জাতিকতাবাদ এবং সাংস্কৃতিক সহাবস্থানের ধারণা নতুন করে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে।
মস্কোর ‘গ্যালারি সি-২’-এ আয়োজিত এই প্রদর্শনীতে স্থান পেয়েছে রবীন্দ্রনাথের ৫০টিরও বেশি শিল্পকর্ম। পাশাপাশি রয়েছে নানা বিরল আর্কাইভাল নথি, আলোকচিত্র এবং দলিল। যাতে ১৯৩০ সালে কবিগুরুরত ঐতিহাসিক মস্কো সফর ও প্রদর্শনীর স্মৃতি বহন করছে। সে সময় সোভিয়েত রাশিয়া সফর করে রবীন্দ্রনাথ সাংস্কৃতিক সেতুবন্ধনের সূচনা করেছিলেন, এ প্রদর্শনী যেন সেই স্মৃতিরই নতুন অধ্যায়। বিশ্বজুড়ে রবীন্দ্রনাথ মূলত কবি, সাহিত্যিক এবং নোবেলজয়ী চিন্তক হিসেবেই পরিচিত। কিন্তু তাঁর শিল্পীসত্তা সম্পর্কে এখনো অনেকের ধারণা সীমিত। জীবনের ৬৭ বছর বয়সে চিত্রাঙ্কন শুরু করেছিলেন তিনি। পরবর্তী প্রায় দেড় দশকে সৃষ্টি করেছিলেন আড়াই হাজারেরও বেশি ছবি। মস্কোর প্রদর্শনীতে বিপুল সৃষ্টিজগতের নির্বাচিত অংশ তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিকৃতি, মুখোশ, পাখি, কল্পলোকের প্রাণী এবং স্বপ্নময় প্রাকৃতিক দৃশ্য— রবীন্দ্রনাথের ছবিতে অনন্য স্বতন্ত্র চিত্রভাষা। ভারতীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে অভিব্যক্তিবাদ, ‘প্রিমিটিভিজম’ এবং ‘আর্ট নুভো’র প্রভাব মিলিয়ে তিনি গড়ে তুলেছিলেন এমন এক শিল্পরীতি, যার কোনো সরাসরি পূর্বসূরি ভারতীয় শিল্প-ইতিহাসে খুঁজে পাওয়া কঠিন।
মস্কোর প্রদর্শনীর কিউরেটর আরতিয়ম তিমোনভ ও এলেনা ইয়াইচনিকোভার মতে, রবীন্দ্রনাথের শিল্পচর্চা ভারতীয় আধুনিকতার দুর্দম প্রকাশ। উপনিবেশিক ভারতের পশ্চিমা অধিপত্যের শিকার হওয়া শিল্পরীতির গণ্ডি ভেঙে তিনি নিজস্ব পথ নির্মাণ করেছিলেন, প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের শিল্পধারার মধ্যে সংলাপের নতুন ক্ষেত্রও তৈরি করেছিলেন। এলেনা ইয়াইচনিকোভা বলেন, ‘নিজের সংস্কৃতির গভীর উপলব্ধি ও অন্য সংস্কৃতির প্রতি উন্মুক্ত মনোভাব— এ দুইয়ের সমন্বয়ই ছিল রবীন্দ্রনাথের দর্শনের ভিত্তি। বিশ্বভারতী সে ভাবনারই বাস্তব রূপ।’ রবীন্দ্রনাথের শিল্পকর্মের পাশাপাশি, প্রদর্শনীর অন্যতম আকর্ষণ সমকালীন ভারতীয় ও রুশ শিল্পীদের অংশগ্রহণ। আট জন ভারতীয় শিল্পী ও শিল্পীগোষ্ঠী, তিন জন রুশ শিল্পী এবং আন্তর্জাতিক শিল্পসমষ্টি ‘দ্য ওটোলিথ গ্রুপ’-এর কাজ এখানে প্রদর্শিত হচ্ছে। তাঁদের অনেকেই বিশ্বভারতীর প্রাক্তন বা সাম্প্রতিক স্নাতক। রবীন্দ্রনাথের ভাবনা, বর্তমান বিশ্বের সামাজিক-সাংস্কৃতিক বাস্তবতার মধ্যে সম্পর্ক অনুসন্ধানই তাঁদের কাজের মূল বিষয়। প্রদর্শনীর জন্য বিশেষ ভাবে নির্মিত হয়েছে তিনটি নতুন শিল্পকর্ম। পাশাপাশি রয়েছে বিশ্বভারতীকে কেন্দ্র করে নির্মিত একটি তথ্যচিত্রও।
আয়োজকদের মতে, শুধুমাত্র শিল্প নয়, রবীন্দ্রনাথের শিক্ষাচিন্তা ও সামাজিক দর্শনকেও সমান গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে এ প্রকল্পে। সে কারণে প্রদর্শনীর স্থাপত্য বিন্যাস, গ্যালারির অভ্যন্তরীণ পরিকল্পনাতেও বিশ্বভারতীর ক্যাম্পাস ও পাঠপদ্ধতির ছাপ রাখা হয়েছে। ‘জিইএস-২ হাউস অব কালচার’ এবং ‘ভি-এ-সি ফাউন্ডেশন’-এর মহাপরিচালক আরতিয়ম বন্দরেভস্কির মতে, ‘রবীন্দ্রনাথকে শুধু কবি বা শিল্পী হিসেবে ব্যাখ্যা করা যায় না। বিশ্বভারতী তাঁর অন্যতম শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি। শিল্প, প্রকৃতি এবং শিক্ষাকে একসূত্রে গেঁথে তিনি যে আদর্শ নির্মাণ করেছিলেন, তা আজও বিস্ময়কর ভাবে প্রাসঙ্গিক।’ প্রদর্শনীর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে বিস্তৃত জনসম্পৃক্ত কর্মসূচিও। ভ্রমণ, স্কুলপড়ুয়াদের জন্য শিক্ষামূলক কর্মশালা, পাঠচক্র, শিল্পীদের সঙ্গে মতবিনিময়, শরীরভিত্তিক সৃজনশীল অনুশীলন এবং নানা আলোচনাসভা আগামী দু–মাস ধরে চলবে। আলোচনাসভা সূচিতে বিশেষভাবে নজর কেড়েছে ‘রেনেসাঁ ম্যান: হু ইজ আ জিনিয়াস ফর আস টুডে?’ শীর্ষক আলোচনা। সেখানে রবীন্দ্রনাথের বহুমাত্রিক ব্যক্তিত্বের আলোকে বর্তমান সময়ে ‘সার্বজনীন মানুষ’-এর ধারণা নিয়ে আলোচনা হবে।
বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়, রবীন্দ্রভবন সংগ্রহশালা, বিড়লা অ্যাকাডেমি অব আর্ট অ্যান্ড কালচার, এমামি আর্ট, পুশকিন স্টেট মিউজিয়াম অব ফাইন আর্টস এবং শ্রাইন এম্পায়ার গ্যালারির সহযোগিতায় এ প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছে। ভারতের সংস্কৃতি মন্ত্রক, ন্যাশনাল গ্যালারি অব মডার্ন আর্ট এবং রাশিয়ায় ভারতীয় দূতাবাসও উদ্যোগের অংশীদার। ১৯১৩ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেয়ে প্রথম অ-ইউরোপীয় হিসেবে বিশ্বমঞ্চে ইতিহাস গড়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। এক শতাব্দীরও বেশি সময় পরে, তাঁর শিল্পকর্মের এই প্রত্যাবর্তন যেন আবার মনে করিয়ে দিল— সাহিত্য, সঙ্গীত, শিল্প, শিক্ষা এবং মানবতার সীমানা অতিক্রম করে তিনি আজও বিশ্বের অন্যতম প্রাসঙ্গিক সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব।
উল্লেখ্য, ১৯৩০ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের বৈদেশিক সাংস্কৃতিক যোগাযোগ সংস্থার আমন্ত্রণে প্রথম বার রাশিয়ায় পা রাখেন প্রায় সত্তরোর্ধ্ব রবীন্দ্রনাথ। তাঁর বহু প্রিয় লেখক— লেভ তলস্তয়, ইভান তুর্গেনেভ এবং ম্যাক্সিম গোর্কির দেশের সঙ্গে তখন তাঁর প্রত্যক্ষ পরিচয় ঘটে। তবে তারও আগে রুশ পাঠকসমাজে পৌঁছে গিয়েছিল রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য। ১৯১৪ সালেই আইভান বুনিনের সম্পাদনায় নিকোলাই পুশেশনিকভের অনুবাদে ‘গীতাঞ্জলি’ রুশ ভাষায় প্রকাশিত হয়। দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে রবীন্দ্রনাথের কবিতা, গল্প, উপন্যাস, নাটক এবং প্রবন্ধ। মস্কো ও লেনিনগ্রাদে তাঁর রচনার অনুবাদ ও পাঠচর্চা এক বিশেষ সাংস্কৃতিক পরিসর তৈরি করেছিল। ১৯৩০ সালের ১১ সেপ্টেম্বর থেকে ২৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মস্কোয় ছিলেন রবীন্দ্রনাথ। ব্যস্ত কর্মসূচির মাঝেই ১৭ সেপ্টেম্বর স্টেট মিউজিয়াম অব নিউ ওয়েস্টার্ন আর্ট-এ আয়োজিত হয় তাঁর ছবির প্রদর্শনী। রাশিয়ার শিল্পপ্রেমীরা ভিড় করেছিলেন সে প্রদর্শনীতে। তখনো রবীন্দ্রনাথের চিত্রকর পরিচয় বিশ্বজুড়ে খুব বেশি পরিচিত হয়ে ওঠেনি। ফলে রুশ দর্শকদের কাছে তাঁর এই শিল্পীসত্তা ছিল প্রায় এক নতুন আবিষ্কার।
রবীন্দ্রনাথের রাশিয়া-যোগের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে আরও কয়েকটি উল্লেখযোগ্য নাম। তাঁদের মধ্যে অন্যতম আইভান বুনিন এবং বিশ্বখ্যাত চিত্রশিল্পী নিকোলাই রোয়েরিখ। ১৯২০ সালে লন্ডনে রবীন্দ্রনাথ ও রোয়েরিখের প্রথম সাক্ষাৎ হয়েছিল। রোয়েরিখের প্রকৃতিচেতনা এবং শিল্পভাবনা কবিকে গভীর ভাবে আকৃষ্ট করেছিল। দু–জনের শিল্পভাষা আলাদা হলেও মানবিক সংবেদন এবং সৌন্দর্যসন্ধানী মনন তাঁদের এক সুতোয় বেঁধেছিল। রাশিয়া সফরে গিয়ে সোভিয়েত সমাজের সাম্যবাদের বাস্তবতা, সাংস্কৃতিক সংরক্ষণ প্রচেষ্টাও মুগ্ধ করেছিল রবীন্দ্রনাথকে। পর্যবেক্ষণ করেছিলেন নবগঠিত সোভিয়েত রাষ্ট্রের গণশিক্ষা কর্মসূচি। বিপ্লব-পরবর্তী অস্থিরতার মধ্যেও পরিত্যক্ত প্রাসাদ ও ব্যক্তিগত সংগ্রহ থেকে মূল্যবান শিল্পসম্পদ উদ্ধার করে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগ্রহশালায় সংরক্ষণের কাজ তাঁকে বিস্মিত করেছিল। সে অভিজ্ঞতার কথা তিনি নিজেই লিখে গিয়েছেন। ফলে, তাঁর ‘রাশিয়ার চিঠি’ শুধু ভ্রমণবৃত্তান্ত নয়, বরং শিক্ষা, সংস্কৃতি ও সমাজগঠনের এক অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন দলিল।
সে সময়, মস্কোয় তাঁর চিত্রপ্রদর্শনী দেখতে হাজার হাজার মানুষের ভিড় হয়েছিল; একই সঙ্গে তিনি ঘুরে দেখেছিলেন গ্রন্থাগার, বিদ্যালয়, জাদুঘর ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান। রাশিয়ায় ফিরে গিয়ে শিক্ষাগ্রহণের জন্য শ্রীনিকেতনের কর্মীদের পাঠানোর ইচ্ছার কথাও লিখেছিলেন তিনি। সে সূত্র আজও অটুট। বিশ্বভারতী ও রাশিয়ার বিভিন্ন সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই গবেষণা, অনুবাদ, শিল্পচর্চা এবং অ্যাকাডেমিক আদানপ্রদান চলেছে। ভারত-রাশিয়া যৌথ উদ্যোগে প্রতি বছর হাজার হাজার ভারতীয় শিক্ষানবিশ ও প্রযুক্তি-শিক্ষার্থী রাশিয়ায় প্রশিক্ষণ নিতে যাচ্ছেন। নীতি আয়োগের ‘অটল ইনোভেশন মিশন’ এবং রাশিয়ার সোচি-ভিত্তিক ‘সিরিয়াস এডুকেশনাল সেন্টার’-এর মধ্যে সহযোগিতাও ক্রমশ বিস্তৃত হচ্ছে। প্রযুক্তি, শিল্পোদ্যোগ, দক্ষতা উন্নয়ন এবং কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে দুই দেশের সহযোগিতা নতুন মাত্রা পেয়েছে। তাই মস্কোয় রবীন্দ্রনাথের ছবির সাম্প্রতিক প্রদর্শনী কেবল একটি শিল্প-অনুষ্ঠান নয়; এটি প্রায় এক শতাব্দী ধরে গড়ে ওঠা ভারত-রাশিয়া সাংস্কৃতিক বন্ধুত্বের ইতিহাসেরই নতুন অধ্যায়, যেখানে কবির মানবতাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি আবারও দু–দেশের মধ্যে সংলাপের সেতু নির্মাণ করছে।
❤ Support Us







