- দে । শ প্রচ্ছদ রচনা
- জুলাই ১, ২০২৬
জুলাইয়ের মধ্যেই সম্পূর্ণ করতে হবে রাজ্যের ‘জল জীবন মিশন’-এর কাজ, নির্দেশ জনস্বাস্থ্য কারিগরি মন্ত্রীর
নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ না হলে আর কোনো অজুহাত চলবে না। প্রত্যন্ত গ্রাম পর্যন্ত নিরাপদ পানীয় জল পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে ‘জল জীবন মিশন’-এর কাজে গতি আনতে এ বার কড়া অবস্থান নিল রাজ্য সরকার। জনস্বাস্থ্য কারিগরি (পিএইচই) দফতরকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, আগামী ৩১ জুলাই–এর মধ্যে রাজ্যের অন্তত ৪,১০০টি গ্রামে জল জীবন মিশনের অধীনে ১০০ শতাংশ নলবাহিত পানীয় জল সংযোগের কাজ সম্পূর্ণ করতে হবে। শুধু প্রকল্পের কাজ শেষ করাই নয়, সরকারি বিধি অনুযায়ী ওই গ্রামগুলির চূড়ান্ত শংসাপত্র প্রক্রিয়াও একই সময়সীমার মধ্যে শেষ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
মঙ্গলবার সল্টলেকে জনস্বাস্থ্য কারিগরি দফতরের সদর দফতরে আয়োজিত এক উচ্চপর্যায়ের পর্যালোচনা বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন রাজ্যের জনস্বাস্থ্য কারিগরি মন্ত্রী অজয় কুমার পোদ্দার, প্রতিমন্ত্রী ভাস্কর ভট্টাচার্য, দফতরের সচিব রণধীর কুমার–সহ একাধিক শীর্ষ আধিকারিক। চলতি প্রকল্পগুলির অগ্রগতি খতিয়ে দেখার পাশাপাশি আগামী কয়েক বছরের কর্মপরিকল্পনাও এ দিন বিস্তারিত ভাবে পর্যালোচনা করা হয়।
বৈঠকে মন্ত্রী স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেন, পানীয় জলের মতো জনকল্যাণমূলক প্রকল্পে সময় নষ্ট করার কোনো সুযোগ নেই। মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় এ পরিষেবা পৌঁছে দিতে প্রশাসনের প্রত্যেক স্তরকে নির্ধারিত সময়সীমা মেনে কাজ শেষ করতেই হবে। তিনি বলেন, ‘পানীয় জল সরবরাহের মতো জনকল্যাণমূলক প্রকল্প কোনোভাবেই ফেলে রাখা চলবে না। রাজ্যের সামগ্রিক পানীয় জল সরবরাহ ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করতে সমস্ত প্রকল্প পূর্বনির্ধারিত সময়সীমার মধ্যেই সম্পন্ন করতে হবে।’ প্রশাসনিক মহলের মতে, মন্ত্রীর এ মন্তব্য কার্যত আধিকারিকদের উদ্দেশে কড়া বার্তা। এর আগেই মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট করে দিয়েছে, প্রকল্প বাস্তবায়নে অযথা বিলম্ব বা প্রশাসনিক শৈথিল্য কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হবে না।
জনস্বাস্থ্য কারিগরি দফতর সূত্রে জানা গিয়েছে, ৩১ জুলাইয়ের লক্ষ্যমাত্রা কেবলমাত্র প্রকল্পের অগ্রগতি দেখানোর জন্য নয়। প্রতিটি গ্রামে নলবাহিত পানীয় জল পৌঁছনোর পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট পরিকাঠামোর কার্যকারিতা, জল সরবরাহের স্থায়িত্ব, প্রযুক্তিগত মানদণ্ড এবং সরকারি নির্দেশিকা অনুযায়ী সমস্ত পরীক্ষা সম্পন্ন করে গ্রামগুলিকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘সম্পূর্ণ’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার কাজও শেষ করতে হবে। অর্থাৎ প্রকল্পের নির্মাণ, সংযোগ, পরিষেবা চালু এবং চূড়ান্ত শংসাপত্র— গোটা প্রক্রিয়াই নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রশাসনিক সূত্রের দাবি, গ্রামীণ বাংলার বহু এলাকায় এখনও নিরাপদ পানীয় জলের সমস্যা পুরোপুরি কাটেনি। গ্রীষ্মের সময়ে বিভিন্ন জেলায় সে সমস্যা প্রতিবছর আরও প্রকট হয়ে ওঠে। কোথাও ভূগর্ভস্থ জলে আর্সেনিক বা লৌহের মাত্রা বেশি, কোথাও আবার পর্যাপ্ত জল সরবরাহের অভাব রয়েছে। ফলে, ‘জল জীবন মিশন’-এর কাজকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এগোতে চাইছে সরকার। আধিকারিকদের মতে, নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে ৪,১০০টি গ্রামে কাজ সম্পূর্ণ করা গেলে লক্ষ লক্ষ গ্রামীণ পরিবারের দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় তার সরাসরি প্রভাব পড়বে।
মঙ্গলবারের বৈঠকে কেবল বর্তমান প্রকল্পের অগ্রগতি নিয়েই আলোচনা হয়নি। দফতরের দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা নিয়েও বিস্তারিত পর্যালোচনা হয়েছে। আগামী পাঁচ বছরের ‘ভিশন প্ল্যান‘ নিয়ে মন্ত্রী আধিকারিকদের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা করেন। একই সঙ্গে ৩১ মার্চ, ২০২৭ পর্যন্ত ধাপে ধাপে কোন এলাকায় কীভাবে পানীয় জল প্রকল্প বাস্তবায়িত হবে, তা নিয়ে নির্দিষ্ট ‘অ্যাকশন প্ল্যান’ বা কর্মপরিকল্পনাও চূড়ান্ত করা হয়েছে। প্রশাসনের আশা, এই রূপরেখা অনুসরণ করলে প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি আরও বাড়বে, তৃণমূল স্তরে পরিষেবা পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে সমন্বয় অনেক বেশি কার্যকর হবে। বৈঠকের পর, এক শীর্ষ আধিকারিক জানান, এখন থেকে প্রকল্পের প্রতিটি ধাপে নিয়মিত নজরদারি করা হবে। কোথায় কাজ আটকে রয়েছে, কোথায় জমি, বিদ্যুৎ, পাইপলাইন বা প্রযুক্তিগত কোনো সমস্যা রয়েছে, তা দ্রুত চিহ্নিত করে সমাধানের ব্যবস্থা করা হবে। সময়সীমা মেনে কাজ শেষ করতে জেলা প্রশাসন, প্রকৌশলী, নির্মাণকারী সংস্থা এবং স্থানীয় স্তরের আধিকারিকদের মধ্যে সমন্বয় আরও জোরদার করার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।
এ দিনের বৈঠকে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে পূর্ব মেদিনীপুর এবং পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার একাধিক বৃহৎ পানীয় জল প্রকল্প। প্রশাসনের পর্যবেক্ষণ, এই দুই জেলায় বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প এখনো নির্মীয়মাণ অবস্থায় রয়েছে। কোথাও জল পরিশোধন কেন্দ্রের কাজ চলছে, কোথাও আবার পাইপলাইন সম্প্রসারণ ও গৃহসংযোগের কাজ এগোচ্ছে। এ সমস্ত প্রকল্প দ্রুত শেষ করতে আধিকারিকদের নির্দেশ দিয়েছেন মন্ত্রী। তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন, পূর্ব ও পশ্চিম মেদিনীপুরের বড়োড পানীয় জল প্রকল্পগুলির কাজের গতি অবিলম্বে বাড়াতে হবে, যাতে সাধারণ মানুষ আর অপেক্ষা না করে দ্রুত তার সুবিধা পান। প্রশাসনিক সূত্রে আরও জানা গিয়েছে, প্রতিটি পরিবারে জল পৌঁছনোর পরে তারা পর্যাপ্ত এবং নিয়মিত জল পাচ্ছেন কি না, সেই বিষয়েও নজরদারির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কোথাও সমস্যা দেখা দিলে দ্রুত তার সমাধান করতে হবে। প্রকল্পের সাফল্য কেবল পাইপলাইন বসানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বাস্তবে পরিষেবা কতটা কার্যকর, সেটাই হবে মূল্যায়নের অন্যতম প্রধান মাপকাঠি।
রাজ্যের এ তৎপরতার পিছনে রয়েছে সম্প্রতি কেন্দ্রের সঙ্গে হওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ সমঝোতা। গত ১৮ মে দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই জনস্বাস্থ্য কারিগরি দফতরের উদ্যোগে পশ্চিমবঙ্গ সরকার এবং কেন্দ্রীয় জলশক্তি মন্ত্রক ‘জল জীবন মিশন’-এর কার্যকর বাস্তবায়নের লক্ষ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সমঝোতা স্মারক (মউ) স্বাক্ষর করে। প্রশাসনিক সূত্রের খবর, প্রকল্পের দ্বিতীয় পর্যায়ের জন্য প্রায় ৩৯ হাজার কোটি টাকার বৃহৎ আর্থিক চুক্তিও চূড়ান্ত হয়েছে। এ অর্থ ব্যয় করে গ্রামীণ বাংলার আরও বিস্তীর্ণ এলাকায় নলবাহিত পরিশোধিত পানীয় জল পৌঁছে দেওয়ার কাজ আরও দ্রুত এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে। দফতরের মতে, দ্বিতীয় পর্যায়ের এই বিপুল বিনিয়োগ শুধু নতুন জল সংযোগ দেওয়ার জন্য নয়। জল পরিশোধন কেন্দ্র নির্মাণ, ওভারহেড রিজার্ভার, ট্রান্সমিশন পাইপলাইন, গ্রামীণ বিতরণ ব্যবস্থা, বিদ্যমান পরিকাঠামোর আধুনিকীকরণ এবং দীর্ঘমেয়াদে নিরবচ্ছিন্ন জল সরবরাহ নিশ্চিত করাও কর্মসূচির অন্যতম লক্ষ্য। বিশেষ করে যেসব এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে পানীয় জলের সমস্যা রয়েছে, সেখানে স্থায়ী সমাধান গড়ে তোলার উপর বিশেষ জোর দেওয়া হচ্ছে।
প্রশাসনিক মহলের একাংশের মত, নতুন অর্থবরাদ্দ ও নির্দিষ্ট সময়সীমা— এ দুইয়ের সমন্বয়েই জল জীবন মিশনের কাজকে যুদ্ধকালীন তৎপরতায় এগিয়ে নিয়ে যেতে চাইছে সরকার। তাই আগামী কয়েক সপ্তাহে জেলা প্রশাসন থেকে শুরু করে প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থাগুলির উপর নজরদারি আরও বাড়বে বলেই মনে করা হচ্ছে।
❤ Support Us





