Advertisement
  • দে । শ প্রচ্ছদ রচনা
  • জুলাই ২, ২০২৬

৩৩ লক্ষ আপিল, ১০০ দিনে নিষ্পত্তি ১ শতাংশেরও কম ! এসআইআর ট্রাইবুনাল কর্মপদ্ধতি নিয়ে উঠছে প্রশ্ন

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
৩৩ লক্ষ আপিল, ১০০ দিনে নিষ্পত্তি ১ শতাংশেরও কম ! এসআইআর ট্রাইবুনাল কর্মপদ্ধতি নিয়ে উঠছে প্রশ্ন

পশ্চিমবঙ্গে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা ‘এসআইআর’ ঘিরে বিতর্ক আর উদ্বেগ আরও ঘনীভূত হচ্ছে ট্রাইবুনালগুলোর প্রথম ১০০ দিনের কাজের হিসাবে। সরকারি পরিসংখ্যান বলছেপ্রায় ৩৩ লক্ষ আপিলের মধ্যে নিষ্পত্তি হয়েছে মাত্র ৩০ হাজার। অর্থাৎ মোট মামলার ১ শতাংশেরও কম। ফলে, নির্বাচন কমিশনের তৈরি এই নজিরবিহীন আপিল কাঠামো এখন কার্যত বিপুল মামলার চাপে ন্যুব্জ। আইনি মহলের একাংশের মতেবর্তমান গতিতে বিচারপ্রক্রিয়া চলতে থাকলে শুধুমাত্র ইতিমধ্যেই জমে থাকা আপিলের নিষ্পত্তিতেই দুদশকেরও বেশি সময় লেগে যেতে পারে।  

এসআইআর-পরবর্তী এই আপিল ব্যবস্থা দেশের নির্বাচনী ইতিহাসে কার্যত নজিরবিহীন। পশ্চিমবঙ্গে ভোটার তালিকা সংশোধনকে কেন্দ্র করে বিপুল সংখ্যক অভিযোগ এবং সে প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠার পর সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে নির্বাচন কমিশন অবসরপ্রাপ্ত হাইকোর্ট বিচারপতিদের নিয়ে ১৯টি পৃথক আপিল ট্রাইবুনাল গঠন করে। উদ্দেশ্য ছিলনাম বাদ যাওয়া বা অন্তর্ভুক্তি সংক্রান্ত আপত্তির দ্রুত নিষ্পত্তি। কিন্তু বাস্তবে প্রথম ১০০ দিনের অভিজ্ঞতা দেখাচ্ছেমামলার স্রোতের সামনে সে ব্যবস্থা কার্যত হিমশিম খাচ্ছে। সরকারি হিসাব অনুযায়ীট্রাইবুনালগুলি এ পর্যন্ত মোট ৩০ হাজার মামলার নিষ্পত্তি করেছে। সংখ্যাটি প্রথম দর্শনে বড়ো মনে হলেওসামগ্রিক চিত্রে তার গুরুত্ব অনেকটাই ম্লান। কারণ, এই মুহূর্তে আপিলের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৩ লক্ষে। ফলে নিষ্পত্তির হার এখনও ১ শতাংশের গণ্ডিও ছাড়াতে পারেনি।

তবে, সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান গত কয়েক মাস তুলনায় অবশ্য কিছুটা উন্নতির ইঙ্গিত দিচ্ছে। মে মাসের মাঝামাঝি সরকারি তথ্য অনুযায়ীতখন প্রায় ২৫ লক্ষ আপিলের মধ্যে নিষ্পত্তি হয়েছিল মাত্র ৬ হাজার ৫৮১টি। অর্থাৎ নিষ্পত্তির হার ছিল মাত্র ০.২৬ শতাংশ। পরবর্তী সময়ে নিষ্পত্তির সংখ্যা কয়েক গুণ বাড়লেও আপিলের সংখ্যাও দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ায় সামগ্রিক ছবিতে খুব বেশি পরিবর্তন আসেনি। সহজ অঙ্কেই সমস্যার গভীরতা স্পষ্ট। ১৯টি ট্রাইবুনাল মিলে একশো দিনে ৩০ হাজার মামলা নিষ্পত্তি করেছে। অর্থাৎ প্রতিটি ট্রাইবুনাল গড়ে প্রায় দেড় হাজারের কিছু বেশি মামলার শুনানি শেষ করতে পেরেছে। প্রতিদিন শুনানি হয়েছে ধরে নিলে একটি ট্রাইবুনালের দৈনিক নিষ্পত্তির সংখ্যা গড়ে ১৫ থেকে ১৬টির বেশি নয়।  হারে কাজ চললে, নতুন কোনো আপিল না এলেও বর্তমানে জমে থাকা মামলার নিষ্পত্তি করতে কয়েক দশক সময় লেগে যেতে পারে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকদের একাংশ।

আইন বিশেষজ্ঞদের মতেএ পরিস্থিতি কেবল সংখ্যার হিসাব নয়এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ভোটাধিকার প্রয়োগ, নাগরিকদের মানসিক যন্ত্রণা, অনিশ্চয়তা, সরকারি প্রকল্প ও সুবিধা থেকে বাদ পড়ার মতো প্রশ্নও। ফলে, এই বিচারপ্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হলে আইনি প্রতিকারের কার্যকারিতাই অনেকাংশে ক্ষুণ্ণ হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হবে। ট্রাইবুনালের সঙ্গে যুক্ত একাধিক সূত্রের বক্তব্যএই ধীরগতির অন্যতম কারণ প্রক্রিয়াগত জটিলতা। প্রতিটি মামলায় সংশ্লিষ্ট ভোটারের নথি পরীক্ষাসহায়ক প্রমাণপত্র যাচাইপ্রয়োজনে উভয় পক্ষের বক্তব্য শোনা এবং তার ভিত্তিতে যুক্তিসঙ্গত আদেশ দিতে হচ্ছে। কার্যত দেওয়ানি আদালতের ধাঁচেই এগোচ্ছে বিচারপ্রক্রিয়া। কিন্তু আদালতের মতো পরিকাঠামো বা প্রশাসনিক সহায়তা ট্রাইবুনালগুলির হাতে নেই। সূত্রের দাবিএখনো পর্যন্ত কোনো সমন্বিত ডিজিটাল কেস ম্যানেজমেন্ট ব্যবস্থা চালু হয়নি। নোটিস পাঠানোশুনানির তারিখ নির্ধারণ কিংবা মামলার অগ্রগতি পর্যবেক্ষণের মতো কাজের বেশিরভাগ অংশই প্রচলিত প্রশাসনিক পদ্ধতির উপর নির্ভরশীল। বহু ক্ষেত্রে জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে নোটিস পাঠাতে হচ্ছে। ফলে শুনানি শুরুর আগেই দীর্ঘ সময় কেটে যাচ্ছে।

বিশেষ করে যেসব জেলায় আপিলের সংখ্যা কয়েক লক্ষে পৌঁছেছেসেখানে পরিস্থিতি আরও কঠিন। প্রশাসনের একাংশের মতেপ্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত সহায়তা ও অতিরিক্ত কর্মী ছাড়া এত বিপুল মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি কার্যত অসম্ভব। এর পাশাপাশি নাগরিকত্ব-সংক্রান্ত মামলাগুলিও বিচারপ্রক্রিয়াকে আরও জটিল করে তুলেছে। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অনুযায়ীকোনো আবেদনকারীর ভোটার হওয়ার আইনগত যোগ্যতা নিয়ে নির্বাচন কমিশনের সন্দেহ থাকলে সে বিষয়টি কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের কাছে পাঠিয়ে মতামত নিতে হবে। ফলে এ ধরনের বহু আপিল এখনো ঝুলে রয়েছে। সংশ্লিষ্ট ট্রাইবুনালগুলি কেন্দ্রের রিপোর্ট না পাওয়া পর্যন্ত চূড়ান্ত নির্দেশ দিতে পারছে না।

শুধু মামলার জটই নয়ট্রাইবুনালের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতিও নতুন করে প্রশ্ন তুলছে। দক্ষিণ ২৪ পরগনার আপিল শুনানির দায়িত্বে থাকা কলকাতা হাইকোর্টের প্রাক্তন বিচারপতি রঞ্জিত বাগ সম্প্রতি স্বাস্থ্যগত কারণ দেখিয়ে পদত্যাগ করেছেন। এর আগে কলকাতা ও উত্তর ২৪ পরগনার দায়িত্বে থাকা কলকাতা হাইকোর্টের প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি টি. এস. শিবজ্ঞানমও একই কারণে দায়িত্ব ছেড়ে দেন। সূত্রের খবরঅন্য একটি রাজ্য থেকে আসা এক অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিও পদত্যাগ করেছেন। বর্তমানে ট্রাইবুনালের দায়িত্বে থাকা অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি বিশ্বজিৎ বসু এবং বিচারপতি সমাপ্তি চট্টোপাধ্যায়কে রাজ্য সরকার পৃথক দুটি তদন্ত কমিশনের চেয়ারপার্সন হিসেবে মনোনীত করেছে। যদিও তাঁরা এখনো ‘এসআইআর সংক্রান্ত মামলার শুনানি চালিয়ে যাচ্ছেনতবু ভবিষ্যতে এই অতিরিক্ত দায়িত্ব তাঁদের ট্রাইবুনালের কাজে কতটা সময় দিতে দেবেতা নিয়েও প্রশাসনিক মহলে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।

পশ্চিমবঙ্গে ‘এসআইআর’ এবং তার পরবর্তী ব্যবস্থার আর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, দেশের অন্য কোনো রাজ্যে এমন পৃথক আপিল ট্রাইবুনাল কাঠামো গড়ে ওঠেনি।

উত্তরপ্রদেশগুজরাটরাজস্থানমধ্যপ্রদেশত্তিশগড়, তামিলনাড়ুকেরালা বা বিহার— একাধিক রাজ্যেই এসআইআর হয়েছে। কিন্তু কোথাও অবসরপ্রাপ্ত হাইকোর্ট বিচারপতিদের নিয়ে পৃথক ট্রাইবুনাল গঠন করা হয়নি। সেখানে ভোটার তালিকা সংক্রান্ত বিরোধ এখনো গণপ্রতিনিধিত্ব আইন অনুযায়ী নির্বাচনী নিবন্ধন আধিকারিক এবং প্রচলিত আপিল কর্তৃপক্ষের মাধ্যমেই নিষ্পত্তি হচ্ছে। ফলে পশ্চিমবঙ্গের নিষ্পত্তির হার অন্য কোনো রাজ্যের সঙ্গে সরাসরি তুলনা করার সুযোগও নেই। তবে, ‘এসআইআর-এর পরিসর যে কত বড়ো, তার ইঙ্গিত মিলছে নির্বাচন কমিশনের  তথ্যেই। বিভিন্ন রাজ্যে লক্ষ লক্ষ ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। উত্তরপ্রদেশে প্রায় ২.০৫ কোটিগুজরাটে প্রায় ৬৮ লক্ষমধ্যপ্রদেশে ৩৪ লক্ষের বেশিরাজস্থানে প্রায় ৩১ লক্ষত্তিশগড়ে প্রায় ২৫ লক্ষ এবং পশ্চিমবঙ্গে প্রায় ৮৪ লক্ষ ভোটারের নাম বাদ গিয়েছে। এত বড়ো মাত্রার সংশোধন সত্ত্বেও পশ্চিমবঙ্গ ছাড়া অন্য কোথাও পৃথক ট্রাইবুনাল গঠন করা হয়নি।

নির্বাচনী আইন বিশেষজ্ঞদের মতেএ পরিস্থিতিতে পশ্চিমবঙ্গ কার্যত একটি প্রাতিষ্ঠানিক পরীক্ষাগারে পরিণত হয়েছে। ভোটার তালিকা সংশোধনের বিরুদ্ধে দ্রুত প্রতিকার নিশ্চিত করতে যে বিচারিক সুরক্ষা কাঠামো তৈরি করা হয়েছিলবাস্তবে তার কার্যকারিতা এখন কঠিন পরীক্ষার মুখে। তাঁদের বক্তব্যঅতিরিক্ত ট্রাইবুনালআরও বিচারকশক্তিশালী ডিজিটাল পরিকাঠামো এবং প্রশাসনিক সহায়তা না বাড়ালে মামলার জট আরও বাড়বে। সুপ্রিম কোর্টও একাধিক শুনানিতে এই বিপুল সংখ্যক বিচারাধীন আপিল নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। আদালত প্রয়োজনে ক্ষুব্ধ ভোটারদের কলকাতা হাইকোর্টে যাওয়ার পথ খোলা রেখেছে। একই সঙ্গে যেসব মামলায় ভোটাধিকার সরাসরি প্রভাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছেসেগুলিকে অগ্রাধিকার দিয়ে দ্রুত শুনানির পরামর্শও দিয়েছে। নজিরবিহীন মামলার চাপে প্রশ্ন উঠছে, আদতে কি ট্রাইব্যুনাল সময়মতো ন্যায়বিচার দিতে পারবে? না কি বছরে পর বছর ধরে নাগরিকত্ব, ভোটাধিকার, নাগরিক অধিকার সংক্রান্ত অনিশ্চয়তা আর উদ্বেগে ভুগবেন বাংলার লাখ লাখ মানুষ!


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!