- দে । শ প্রচ্ছদ রচনা
- জুলাই ২, ২০২৬
বিচারব্যবস্থায় এআই-সৃষ্ট ভুয়ো রায়ের ব্যবহার ! বার কাউন্সিলকে বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠনের নির্দেশ শীর্ষ আদালতের
বিচারব্যবস্থার ইতিহাসে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) ব্যবহার নিয়ে সম্ভবত সবচেয়ে কড়া এবং তাৎপর্যপূর্ণ সতর্কবার্তা শোনা গেল দেশের সর্বোচ্চ আদালতের মুখে। আদালতের স্পষ্ট ঘোষণা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যদি এমন কোনো বিচারিক নজির তৈরি করে, যা বাস্তবে কখনো ঘটেনি, অথচ সেটিকে প্রকৃত আদালতের রায় বলে বিচারপ্রক্রিয়ায় ব্যবহার করা হয়, তবে তা কেবল একটি প্রযুক্তিগত ভুল নয়; বরং আইনের শাসন, বিচারব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা ও ন্যায়বিচারের ভিত্তির উপর সরাসরি আঘাত। এ ধরনের ঘটনার বিরুদ্ধে দেশের সমস্ত আদালতকে ‘জিরো টলারেন্স’ বা শূন্য-সহনশীলতার নীতি গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট।
বৃহস্পতিবার বিচারপতি পি এস নরসিমহা এবং বিচারপতি অলোক আরাধের ডিভিশন বেঞ্চ এক মামলার শুনানি করতে গিয়ে পর্যবেক্ষণ করে, ন্যাশনাল কোম্পানি ল’ অ্যাপিলেট ট্রাইব্যুনাল (এনসিএলএটি) তাদের সিদ্ধান্তের সমর্থনে এমন কয়েকটি বিচারিক নজির উদ্ধৃত করেছে, যেগুলির বাস্তবে কোনো অস্তিত্বই নেই, প্রতিটিই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই সৃষ্ট। এ ঘটনা আদালতকে এমন এক বৃহত্তর প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়েছে, যেখানে প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতি ও বিচারব্যবস্থার মৌলিক সততার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা অদূর ভবিষ্যতের অন্যতম বড়ো চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে।
শুনানিতে আদালতের বক্তব্য, বিচারব্যবস্থায় এআই-সৃষ্ট ভুয়ো বা ‘হ্যালুসিনেটেড’ নজির প্রবেশ করা অনেকটা ১৯৮৪ সালের ভোপাল গ্যাস বিপর্যয়ের সময় মিথাইল আইসোসায়ানেট গ্যাস নিঃসরণের মতো। কারণ, এ বিপদ চোখে দেখা যায় না, সহজে ধরা পড়েও না। কিন্তু যখন তার অস্তিত্ব প্রকাশ্যে আসে, তখন দেরি হয়ে গেছে, বিপুল ক্ষতি হয়ে গিয়েছে। আদালতের ভাষায়, এ ধরনের ভুয়ো নজির বিচারপ্রক্রিয়াকে নিঃশব্দে দূষিত করছে, বিচার ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থার ভিত্তিকে নড়বড়ে করে দিচ্ছে। শীর্ষ আদালত বলেছে, ভারতের বিচারব্যবস্থার শক্তি নির্ভর করে বিশ্বাসযোগ্য তথ্য, প্রামাণ্য আইন আর প্রতিষ্ঠিত বিচারিক নজিরের উপর। সে জায়গায় যদি প্রযুক্তির মাধ্যমে তৈরি সম্পূর্ণ মনগড়া তথ্য বিচারিক যুক্তির অংশ হয়ে যায়, তবে ন্যায়বিচারের উপর মানুষের আস্থা নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। আদালত স্পষ্ট ভাষায় বলেছে, বিচারিক সিদ্ধান্তের মধ্যে ভুয়ো বা অস্তিত্বহীন তথ্যের এক কণামাত্র উপস্থিতিও গ্রহণযোগ্য নয়।
এ মামলার সূত্রপাত, ‘এসেল ইনফ্রাপ্রজেক্টস লিমিটেড’কে ঘিরে একটি দেউলিয়া সংক্রান্ত বিরোধ থেকে। জম্মু ও কাশ্মীর ব্যাঙ্ক ‘ইনসলভেন্সি অ্যান্ড ব্যাঙ্করাপ্সি কোড’-এর (আইবিসি) ধারা ৭ অনুযায়ী সংস্থাটির বিরুদ্ধে দেউলিয়া প্রক্রিয়া শুরু করার আবেদন জানায়। ‘এসেল ইনফ্রাপ্রজেক্টস’, ‘প্যান ইন্ডিয়া ইউটিলিটিজ ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড’-এর ঋণের জন্য কর্পোরেট গ্যারান্টি দিয়েছিল। ২০২৪ সালের ২৮ আগস্ট ‘এনসিএলটি’, মুম্বই বেঞ্চ প্রায় ৮৭.৪৩ কোটি টাকার ঋণখেলাপির বিষয়টি নথিভুক্ত করে আবেদন গ্রহণ করে। ২০২৫ সালের ১১ সেপ্টেম্বর সে সিদ্ধান্তই বহাল রাখে ইএনসিএলএটি’। ওই সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করে সুপ্রিম কোর্টে যান সংস্থার স্থগিতপ্রাপ্ত পরিচালক পূজা রমেশ সিংহ। তাঁর পক্ষে অভিজ্ঞ আইনজীবী মাধবী দিবান আদালতের সামনে দাবি করেন, ট্রাইব্যুনালের সিদ্ধান্তে যেসব বিচারিক নজির উদ্ধৃত হয়েছে, তার কয়েকটি সম্পূর্ণ মনগড়া। আবার কিছু ক্ষেত্রে প্রকৃত মামলার নাম ব্যবহার করা হলেও তার সঙ্গে এমন আইনি নীতি জুড়ে দেওয়া হয়েছে, যার সঙ্গে সে রায়ের কোনো সম্পর্কই নেই।
শীর্ষ আদালতের বিচারপতিরা বিষয়টি যাচাই করতে গিয়ে স্তম্ভিত হয়ে যান। তাঁদের নজরে আসে, ট্রাইব্যুনালের রায়ে ‘ICICI Bank Ltd vs Urban Infrastructure Real Estate Ltd (2019) 16 SCC 528’ এবং ‘Sarbjit Singh vs Union Bank of India (2022) 7 SCC 464’-এর মতো কয়েকটি তথাকথিত নজির উদ্ধৃত হয়েছে। অথচ দেশের কোনো স্বীকৃত আইনভিত্তিক ডেটাবেসেই ওই মামলাগুলির অস্তিত্ব নেই। কোথাও মামলার নাম সম্পূর্ণ বানানো হয়েছে, কোথাও আবার প্রকৃত রায়ের পর্যবেক্ষণ অন্য একটি কাল্পনিক মামলার নামে বসিয়ে দেওয়া হয়েছে। আদালতের মতে, এগুলি বর্তমান প্রজন্মের ‘এআই’ ব্যবস্থার তথাকথিত ‘হ্যালুসিনেশন’-এরই উদাহরণ, যেখানে প্রযুক্তি আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে এমন তথ্য তৈরি করে, যার বাস্তব ভিত্তি নেই।
এ পর্যায়ে ‘জম্মু ও কাশ্মীর ব্যাঙ্ক’ একটি হলফনামা দাখিল করে জানায়, তাদের আইনজীবীরা নজিরগুলি আদালতে উপস্থাপন করেননি। বরং ‘এনসিএলটি’ নিজস্ব গবেষণার মাধ্যমে সেগুলি সংগ্রহ করেছিল। এরপরই সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেয়, ভুলের উৎস কোথায়, সেটি এখানে মুখ্য নয়। বিচারব্যবস্থার ভিতরে ভুয়ো তথ্য প্রবেশ করেছে—এ ঘটনাটিই সবচেয়ে উদ্বেগজনক। আদালতের মতে, বিচারিক সিদ্ধান্তের ভিত্তি যদি ত্রুটিপূর্ণ হয়, তবে সে সিদ্ধান্তও আইনগতভাবে টিকতে পারে না। রায়ে আদালত আরও এক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্থাপন করেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কি বিচারকের বিকল্প হতে পারে? বেঞ্চের উত্তর স্পষ্ট—না। বিচারপতিরা বলেছেন, প্রযুক্তি বিচারক এবং আইনজীবীদের কাজকে দ্রুততর ও সহজতর করতে পারে, বিপুল তথ্য বিশ্লেষণে সাহায্য করতে পারে, গবেষণার গতি বাড়াতে পারে। কিন্তু বিচারিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ এমন একটি মানবিক ও নৈতিক প্রক্রিয়া, যার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে মানুষের বিচারবোধ, অভিজ্ঞতা আর দায়িত্ববোধ। প্রযুক্তি কখনো সে দায়িত্ব পালন করতে পারে না।
এ কারণেই সুপ্রিম কোর্ট ‘হিউম্যান ইন দ্য লুপ’ নীতির উপর বিশেষ জোর দিয়েছে। আদালতের বক্তব্য, বিচারপ্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপে মানুষের প্রত্যক্ষ উপস্থিতি, সক্রিয় যাচাই নিশ্চিত করতে হবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কেবল সহায়ক হতে পারে; বিচারকার্যের উপর তার কোনো স্বাধীন নিয়ন্ত্রণ থাকতে পারে না। মানুষেরই থাকবে বিচারপ্রক্রিয়ার ‘সম্পূর্ণ ও চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রণ’। একই সঙ্গে আদালত স্পষ্ট করেছে, এ রায়ের উদ্দেশ্য ‘এআই’ প্রযুক্তিকে নিরুৎসাহিত করা নয়। বরং দায়িত্বশীল, যাচাইকৃত ব্যবহারকে উৎসাহ দেওয়া। আপত্তি কেবল তখনই, যখন প্রযুক্তি-সৃষ্ট মনগড়া তথ্যকে প্রকৃত আদালতের রায় বলে উপস্থাপন করা হয় অথবা তার উপর নির্ভর করে বিচারিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। আদালতের মতে, প্রযুক্তির সুবিধা গ্রহণ এবং বিচারব্যবস্থার অখণ্ডতা রক্ষা— এ দুইয়ের মধ্যে সূক্ষ্ম ভারসাম্য বজায় রাখাই ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড়ো দায়িত্ব।
শুধু সংশ্লিষ্ট রায় বাতিল করেই থেমে থাকেনি সুপ্রিম কোর্ট। দেশের সর্বোচ্চ আইনজীবী নিয়ন্ত্রক সংস্থা ‘বার কাউন্সিল অফ ইন্ডিয়া’কে একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠনের নির্দেশ দিয়েছে বেঞ্চ। বিচারকদের মতে, আইনজীবীদের মধ্যে ‘এআই’ ব্যবহারের নৈতিকতা, যাচাইয়ের বাধ্যবাধকতা এবং আদালতে তথ্য উপস্থাপনের মানদণ্ড নিয়ে সুস্পষ্ট নীতিমালা তৈরি করা এখন সময়ের দাবি। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা ঘটলে কী ধরনের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে, তাও নির্ধারণ করা প্রয়োজন। সবশেষে সুপ্রিম কোর্ট ‘এনসিএলটি’ এবং ‘এনসিএলএটি’ উভয়ের রায় বাতিল করে মামলাটি পুনরায় শুনানির জন্য ‘এনসিএলটি’-তে ফেরত পাঠিয়েছে। নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, এবার মামলার নিষ্পত্তি করতে হবে শুধুমাত্র প্রকৃত নথি, বৈধ বিচারিক নজির এবং আইনসম্মত প্রমাণের ভিত্তিতে।
❤ Support Us







