- দে । শ
- জুলাই ২, ২০২৬
পাথর খাদানে ধস, ধ্বংসস্তূপে চাপা পড়ে নিহত ৮ পরিযায়ী শ্রমিক, জখম অন্তত ১৫। তদন্তের নির্দেশ মুখ্যমন্ত্রীর
শহর উপকণ্ঠের একটি পাথর খাদানে ভয়াবহ দুর্ঘটনায় ৮ জন শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন অন্তত ১৫ জন। বৃহস্পতিবার ভোরে বেঙ্গালুরুর একটি স্টোন খাদানে কাজ চলাকালীন প্রায় ৪০ ফুট উপর থেকে বিশাল গ্র্যানাইটের শিলাখণ্ড গড়িয়ে পড়ে শ্রমিকদের উপর। মুহূর্তের মধ্যেই গোটা এলাকা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। শিলাখণ্ডের নীচে চাপা পড়ে ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান ৭ শ্রমিক। আহতদের উদ্ধার করে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলেও পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও এক শ্রমিকের মৃত্যু হয় বলে জানা গেছে।
কর্ণাটক পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনাটি ঘটেছে বেঙ্গালুরু আরবান ও বেঙ্গালুরু দক্ষিণ জেলার সীমানা ঘেঁষা মাদাপাট্টানায় একটি বেসরকারি পাথর খাদানে। এদিন, খাদানের উপরের অংশে এক্সকাভেটর দিয়ে খননের কাজ চলছিল। সে সময় উপরের দিকের একটি বিশাল শিলাখণ্ড আলগা হয়ে নীচে কাজ করা শ্রমিকদের উপর ভেঙে পড়ে। দুর্ঘটনার পরপরই এলাকাজুড়ে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। প্রত্যক্ষদর্শী এক শ্রমিক জানান, ঘটনার সময় খাদানে প্রায় ২০ জনের বেশি শ্রমিক কাজ করছিলেন। আচমকাই প্রায় ৪০ ফুট উপর থেকে বিশাল শিলাখণ্ড নীচে নেমে আসে। কেউ কিছু বোঝার আগেই বহু শ্রমিক তার নীচে চাপা পড়েন। পালানোর সুযোগও মেলেনি।
আরও এক প্রত্যক্ষদর্শীর দাবি, ভোর ৬টা থেকে সাড়ে ৬টার মধ্যে বিস্ফোরণের পর সৃষ্ট কম্পনের জেরে উপরের অংশের আলগা পাথর গড়িয়ে পড়তে শুরু করে। তাঁর অভিযোগ, খাদানের উপরের দিকে বিপজ্জনক অবস্থায় থাকা শিলাখণ্ডগুলি আগেই সরিয়ে ফেলার জন্য তিনি মালিকপক্ষকে সতর্ক করেছিলেন। কিন্তু সে সতর্কবার্তা উপেক্ষা করা হয়। দুর্ঘটনার অভিঘাত এতটাই প্রবল ছিল যে, খাদানে পাথর পরিবহণের কাজে ব্যবহৃত ট্র্যাক্টর ও একাধিক ভারী যানবাহন দুমড়ে মুচড়ে গেছে।
খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছন পুলিশ, দমকল, উদ্ধারকারী দল ও প্রশাসনের আধিকারিকেরা। গোটা এলাকা ঘিরে ফেলে শুরু হয় উদ্ধার অভিযান। ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে আটকে পড়া শ্রমিকদের বের করে আনার চেষ্টা চলে। কয়েক ঘণ্টা ধরে চলা অভিযানে মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়। আহতদের হাসপাতালে পাঠানো হয়। আহত শ্রমিকদের কয়েক জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে বলে জানা গিয়েছে। তাঁদের মধ্যে কয়েক জনের স্থায়ী শারীরিক অক্ষমতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। ফলে মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন উদ্ধারকর্মীরা। প্রশাসন জানিয়েছে, ধ্বংসস্তূপের নীচে আরও কেউ আটকে রয়েছেন কি না, তা খতিয়ে দেখা হয়েছে।
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, মৃতদের অধিকাংশই দৈনিক মজুরির পরিযায়ী শ্রমিক। বিভিন্ন সূত্রে তাঁদের পরিচয় নিয়ে ভিন্ন তথ্য সামনে এসেছে। প্রাথমিকভাবে জানা গেছে, নিহত শ্রমিকরা বিহার, পশ্চিমবঙ্গ, মধ্যপ্রদেশ, ছত্তিশগড়ের বাসিন্দা। নিহতদের পরিচয় নিশ্চিত করার পাশাপাশি তাঁদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা চলছে। কর্ণাটকের মুখ্যমন্ত্রী ডি কে শিবকুমার জানিয়েছেন, প্রাথমিক রিপোর্টে বিস্ফোরণের পরিবর্তে মাটির ক্ষয় এবং শিলাস্তরের অস্থিতিশীলতাকে সম্ভাব্য কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে, অন্যদিকে ক্রাশার ইউনিটের অপারেটরের দাবি, বিস্ফোরণের ফলে সৃষ্ট কম্পনের জেরেই উপরের বিশাল পাথরগুলি নীচে গড়িয়ে আসে। এই পরস্পরবিরোধী দাবির সত্যতা খতিয়ে দেখছে তদন্তকারী সংস্থা।
ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করেছেন শিবকুমার। তিনি বলেছেন, ‘মাগাদি রোড সংলগ্ন খাদানে অত্যন্ত দুঃখজনক এ দুর্ঘটনার খবর পাওয়ার পরই সমস্ত সংশ্লিষ্ট আধিকারিককে ঘটনাস্থলে পাঠানো হয়েছে।’ তিনি জানান, পূর্ণাঙ্গ তদন্ত রিপোর্ট হাতে পাওয়ার পর দেখা হবে খাদানটি সমস্ত সরকারি নিয়ম মেনে পরিচালিত হচ্ছিল কি না, নিরাপত্তা সংক্রান্ত কোনো গাফিলতি ছিল কি না। মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট করে বলেছেন, খাদানে কর্মরত শ্রমিকদের জীবন ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা মালিকপক্ষের দায়িত্ব। তদন্তে যদি নিরাপত্তা বিধি লঙ্ঘনের প্রমাণ মেলে, তবে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনা রুখতে গোটা রাজ্যে পাথর খাদান পরিচালনার ক্ষেত্রে নতুন নিরাপত্তা নির্দেশিকা জারি করার কথাও জানান তিনি।
অন্যদিকে, এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন যশবন্তপুরের বিধায়ক এস টি সোমশেখর। তাঁর অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরেই ওই এলাকায় বেআইনি খাদান পরিচালনার বিষয়টি তিনি প্রশাসনের নজরে এনেছিলেন, বিধানসভাতেও বিষয়টি উত্থাপন করেছিলেন। কিন্তু কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয় নি। তাঁর দাবি, প্রশাসন সময়মতো ব্যবস্থা নিলে এমন প্রাণহানি এড়ানো সম্ভব হতো। সোমশেখরের আরও অভিযোগ, খাদান সংক্রান্ত একাধিক অনিয়মে পুলিশ, বন দফতর ও খনি দফতরের কিছু আধিকারিকের ভূমিকা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। তাঁর মতে, শুধুমাত্র খাদান মালিক নয়, দায়িত্বে গাফিলতি করা সরকারি আধিকারিকদের বিরুদ্ধেও ফৌজদারি মামলা হওয়া উচিত। তাঁর আশঙ্কা, প্রভাবশালী ব্যক্তিদের কারণে তদন্ত প্রভাবিত হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। নিহত প্রত্যেক শ্রমিকের পরিবারের জন্য এক কোটি টাকা ক্ষতিপূরণের দাবিও জানিয়েছেন তিনি।
পুলিশ ইতিমধ্যেই অস্বাভাবিক মৃত্যুর মামলা রুজু করে তদন্ত শুরু করেছে। খাদানে নিরাপত্তা বিধি যথাযথভাবে মানা হচ্ছিল কি না, বিস্ফোরণের নিয়ম অনুসরণ করা হয়েছিল কি না, শিলাস্তরের স্থায়িত্ব পরীক্ষা করা হয়েছিল কি না এবং কর্তৃপক্ষের কোনো গাফিলতি ছিল কি না— সে সমস্ত দিক খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্ত রিপোর্টের ভিত্তিতেই পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে বলে প্রশাসন জানিয়েছে।
❤ Support Us








