Advertisement
  • এই মুহূর্তে দে । শ
  • জুলাই ৪, ২০২৬

এআই-ই ভবিষ্যৎ, ৪৪ কোটি টাকা ব্যয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা গবেষণাগারের পরিকল্পনা যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
এআই-ই ভবিষ্যৎ, ৪৪ কোটি টাকা ব্যয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা গবেষণাগারের পরিকল্পনা যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের

দেশের প্রযুক্তি শিক্ষার মানচিত্রে এক সময় উৎকর্ষের সমার্থক ছিল যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় । গত কয়েক বছরে একের পর এক র‌্যাঙ্কিংয়ে পিছিয়ে পড়েছে সে । দেশের আইআইটি, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলি যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, মেশিন লার্নিং, ডেটা সায়েন্সের মতো নতুন প্রজন্মের প্রযুক্তিকে কেন্দ্র করে পাঠ্যক্রম, গবেষণা ও শিল্প-সংযোগের নতুন পরিকাঠামো গড়ে তুলছে, তখন সে প্রতিযোগিতায় পুরোপুরি এঁটে উঠতে পারছে না যাদবপুর, এমনটাই মনে করছেন শিক্ষাবিদদের একাংশ । তবে এবার আর পিছিয়ে থাকতে রাজি নয় রাজ্যের অন্যতম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি ।

প্রযুক্তি শিক্ষায় নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও মেশিন লার্নিং গবেষণাগার তৈরির পরিকল্পনা করেছে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় । কেন্দ্র ও রাজ্যের যৌথ অর্থায়নে পরিচালিত রাষ্ট্রীয় উচ্চতর শিক্ষা অভিযান (আরইউএসএ ২.০) প্রকল্পের আওতায় প্রাপ্ত ৪৪ কোটি টাকার অনুদান ব্যবহার করে এই উচ্চাভিলাষী প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ । শুধু গবেষণাগারই নয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের অতিথিশালাকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করা, ঐতিহ্যবাহী গান্ধী ভবনের সংস্কার, বিভিন্ন বিভাগের গবেষণা পরিকাঠামোর আধুনিকীকরণ এবং নতুন গবেষণা সরঞ্জাম কেনার মতো একাধিক পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রের খবর, গত মঙ্গলবার ‘আরইউএসএ ২.০’ প্রকল্পের অধীনে প্রাপ্ত অর্থ কীভাবে ব্যয় করা হবে, তা নির্ধারণ করতে গঠিত ‘প্রকল্প পর্যবেক্ষণ কমিটি’র বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। উপাচার্য চিরঞ্জীব ভট্টাচার্য জানিয়েছেন, ‘প্রযুক্তির বর্তমান বিশ্বের কেন্দ্রে রয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা । ফলে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় যদি দেশের প্রথম সারির প্রযুক্তি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে চায়, তবে এই ক্ষেত্রকে আর উপেক্ষা করার সুযোগ নেই ।’ উপাচার্যের বক্তব্য, রাজ্যের যৌথ প্রবেশিকা পরীক্ষায় (জেইই) সেরা মেধাবী ছাত্রছাত্রীদের যাদবপুরে ধরে রাখতে হলে তাদের এমন পরিকাঠামো দিতে হবে, যেখানে তারা ‘বিটেক’ পড়ার পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে গবেষণার সুযোগ পাবে। শিক্ষা দফতরের অনুমোদন মিললে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রয়ুক্তি ভবনেই গড়ে তোলা হবে অত্যাধুনিক গবেষণাগার ।

তিনি আরও বলেন, ‘বর্তমানে দেশের বহু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এবং স্বশাসিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ইতিমধ্যেই আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ও ডেটা সায়েন্সে ‘বিটেক’ এবং ‘বিএসসি’ পাঠ্যক্রম চালু করেছে। সে তুলনায় যাদবপুর এখনো এ ক্ষেত্রগুলিতে পিছিয়ে।’ তাঁর মতে, সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে এবং ছাত্রছাত্রীদের কর্মসংস্থানের উপযুক্ত করে তুলতে ‘এআই’-এ বিনিয়োগ অপরিহার্য । ভবিষ্যতে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়কে যদি প্রকৃত অর্থে ‘ইনস্টিটিউট অব এমিনেন্স’-এর পর্যায়ে নিয়ে যেতে হয়, তবে নতুন প্রযুক্তি ও নতুন ভাবনাকে গ্রহণ করতেই হবে । যদিও, এর আগে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডেটা সায়েন্সের ওপর বিশেষ কোর্স চালু করেছে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়, যা পরিচালনা করছে কম্পিউটার সায়েন্স বিভাগের ‘সিমেটার’। চাকুরিজীবী ও গবেষকদের জন্য ৩ বছরের সান্ধ্যকালীন এম.টেক এবং দ্বাদশ উত্তীর্ণদের জন্য ৬ মাসের সার্টিফিকেট কোর্সের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে, যেখানে পাইথন ও মেশিন লার্নিংয়ের মতো আধুনিক প্রযুক্তির পাঠ দেওয়া হচ্ছে ।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রের খবর, শুধু ‘এআই’ গবেষণাগারই নয়, প্রাপ্ত অর্থ ব্যবহার করে আরও একাধিক পরিকাঠামোগত উন্নয়নের পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে । বিশ্ববিদ্যালয়ের অতিথিশালাকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করা, ঐতিহ্যবাহী গান্ধী ভবনের সংস্কার, বিভিন্ন বিভাগের ভবন মেরামত, আধুনিক গবেষণা সরঞ্জাম ও সফ্টওয়্যার লাইসেন্স কেনা এবং জাতীয়-আন্তর্জাতিক স্তরের সেমিনারের জন্য আর্থিক সহায়তা দেওয়ার প্রস্তাবও ওই বৈঠকে গৃহীত হয়েছে । তবে কর্তৃপক্ষের একাংশের মতে, পরিকল্পনা যতই উচ্চাভিলাষী হোক, সময়সীমাই এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে বড়ো উদ্বেগ । রাজ্য সরকার জানিয়েছে, ‘আরইউএসএ ২.০’ প্রকল্পের অধীনে অনুমোদিত ৪৪ কোটি টাকা চলতি বছরের সেপ্টেম্বরের মধ্যেই ব্যয় করতে হবে । প্রকল্পের অর্থায়নের নিয়ম অনুযায়ী, মোট ব্যয়ের ৬০ শতাংশ বহন করবে কেন্দ্র এবং বাকি ৪০ শতাংশ দেবে রাজ্য সরকার ।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকল্প পর্যবেক্ষণ কমিটির সদস্য এক শিক্ষক জানান, এত অল্প সময়ের মধ্যে এমন বিপুল অঙ্কের অর্থ সুষ্ঠুভাবে ব্যয় করা অত্যন্ত কঠিন । তাঁর কথায়, যন্ত্রপাতির বার্ষিক রক্ষণাবেক্ষণ, নতুন গবেষণা সরঞ্জাম কেনা, সফ্টওয়্যার লাইসেন্স সংগ্রহ এবং সেমিনারের মতো কিছু খাতে অর্থ ব্যয় করা সম্ভব হলেও, ভবন সংস্কার ও অতিথিশালাকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার মতো কাজ সম্পূর্ণ করতে সময়ের প্রয়োজন । সে কারণেই উচ্চশিক্ষা দফতর ও শিক্ষা মন্ত্রকের কাছে অতিরিক্ত ৬ মাস সময় চাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় । অন্য এক শিক্ষক জানান, এআই ও মেশিন লার্নিং গবেষণাগার গড়ে তুলতেই প্রয়োজন হবে প্রায় ৮ থেকে ৯ কোটি টাকা । কিন্তু মাত্র তিন মাসের মধ্যে সেই অর্থ যথাযথভাবে ব্যবহার করা এবং প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো তৈরি করা নিঃসন্দেহে বড়ো চ্যালেঞ্জ । তবে, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের বক্তব্য, দীর্ঘদিন ধরে আর্থিক সঙ্কটে থাকা যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষে এত বড়ো পরিকাঠামো গড়ে তোলা কার্যত অসম্ভব ছিল । ‘আরইউএসএ’-এর অর্থ বরাদ্দই সেই পথ খুলে দিয়েছে ।

প্রসঙ্গত, সম্প্রতি রাজ্যের অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত ঘোষণা করেছিলেন, আগামী পাঁচ বছরে কেন্দ্রের ১,০০০ কোটি টাকা এবং রাজ্যের ২৫০ কোটি টাকার যৌথ বিনিয়োগে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়কে ‘ইনস্টিটিউট অব এক্সেলেন্স’ হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে । দীর্ঘদিন ধরে কেন্দ্রের শিক্ষা মন্ত্রক ও রাজ্য সরকারের টানাপোড়েনের কারণে যে মর্যাদা অধরাই থেকে গিয়েছিল, এ ঘোষণার পরে তা বাস্তবায়নের সম্ভাবনা নতুন করে জোরদার হয়েছে বলে মনে করছে শিক্ষা মহল। একই রাজনৈতিক অচলাবস্থার জেরেই ‘আরইউএসএ’ প্রকল্পের অর্থ বরাদ্দও দীর্ঘদিন আটকে ছিল । শিক্ষাবিদদের একাংশের মতে, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবিষ্যৎ এখন অনেকটাই নির্ভর করছে প্রযুক্তির এই নতুন দিগন্তে কত দ্রুত তারা নিজেদের মানিয়ে নিতে পারে তার উপর । আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের মতো উদীয়মান প্রযুক্তিক্ষেত্রে উৎকর্ষ অর্জন করতে না পারলে দেশের সেরা প্রকৌশল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলির মধ্যে যাদবপুরের অবস্থান আরও দুর্বল হতে পারে ।

ইতিমধ্যেই কেন্দ্রীয় শিক্ষা মন্ত্রকের ‘ন্যাশনাল ইনস্টিটিউশনাল র‌্যাঙ্কিং ফ্রেমওয়ার্ক’-এর ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থান ক্রমশ নীচের দিকে নেমেছে । ‘এআই’-সহ নতুন প্রজন্মের গবেষণাগার চালু করতে পারলে শুধু র‌্যাঙ্কিং-ই নয়, দেশের সেরা মেধাবী ছাত্রছাত্রীদেরও আরও বেশি আকৃষ্ট করা সম্ভব হবে। উল্লেখ্য, আইআইটি খড়্গপুর ইতিমধ্যেই আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সে বিটেক এবং এমটেক পাঠ্যক্রম চালু করেছে । এখন শিক্ষা মহলের নজর রাজ্যের শিক্ষা দফতরের সিদ্ধান্তের দিকে । অনুমোদন মিললেই প্রযুক্তি ভবনে শুরু হতে পারে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম অত্যাধুনিক ‘এআই’ গবেষণাগার গড়ে তোলার কাজ । প্রযুক্তি শিক্ষার নতুন অধ্যায়ে পা রাখার সে প্রস্তুতিই এখন শুরু করেছে রাজ্যের ঐতিহ্যবাহী বিশ্ববিদ্যালয় ।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!