Advertisement
  • এই মুহূর্তে দে । শ
  • জুলাই ৪, ২০২৬

১৪ বছর পর ফের বরুণ বিশ্বাস হত্যা মামলার তদন্তের দাবি, মুখ্যমন্ত্রীর দ্বারস্থ নিহত শিক্ষকের পরিবার

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
১৪ বছর পর ফের বরুণ বিশ্বাস হত্যা মামলার তদন্তের দাবি, মুখ্যমন্ত্রীর দ্বারস্থ নিহত শিক্ষকের পরিবার

২০১২ সালের ৫ জুলাই। স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার পথে উত্তর ২৪ পরগনার গোবরডাঙা রেলস্টেশন চত্বরে দুষ্কৃতীদের গুলিতে নিহত হন কলকাতার মিত্র ইনস্টিটিউশনের শিক্ষক, সমাজ আন্দোলনের কর্মী বরুণ বিশ্বাস। সুঁটিয়া অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকা অপরাধ, নারী নির্যাতন এবং দুষ্কৃতীদের দৌরাত্ম্যের বিরুদ্ধে স্থানীয় বাসিন্দাদের সংগঠিত করে প্রতিবাদ গড়ে তুলেছিলেন তিনি। সে কারণেই তিনি অপরাধচক্রের লক্ষ্যবস্তু হয়ে ওঠেন বলে পরিবারের অভিযোগ।

মাঝে কেটে গেছে ১৪ বছর। বাংলার ক্ষমতায় পালাবদল ঘটেছে। এবং আবারও নতুন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে বরুণ বিশ্বাস হত্যাকাণ্ড। ঘটনার ১৪ বছর পূর্তির প্রাক্কালে নতুন করে মামলার তদন্ত শুরুর দাবি জানিয়ে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর দ্বারস্থ হয়েছেন নিহত শিক্ষকের পরিবারের সদস্যরা। তাঁদের অভিযোগ, দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় ধরে তদন্তের নামে প্রহসন হয়েছে। প্রকৃত ষড়যন্ত্রকারীদের আড়াল করা হয়েছে। সে কারণেই কলকাতা হাই কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত কোনো বিচারপতির তত্ত্বাবধানে বিশেষ তদন্তকারী দল (সিট) গঠন করে গোটা ঘটনার পুনর্তদন্তের আর্জি জানিয়েছেন তাঁরা।

শনিবার মুখ্যমন্ত্রীর ‘জনতার দরবার’-এ উপস্থিত হয়ে পরিবারের সদস্যরা তাঁদের দাবি তুলে ধরেন। একই সঙ্গে পুলিশের কাছেও পৃথকভাবে আবেদন জানানো হয়েছে বলে পরিবার সূত্রের দাবি। তাঁদের বক্তব্য, রাজ্যে সরকার পরিবর্তনের পর অতীতের একাধিক আলোচিত মামলার তদন্ত নতুন করে শুরু হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে বরুণ বিশ্বাস হত্যাকাণ্ডেও নিরপেক্ষ তদন্তের সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে তাঁদের বিশ্বাস।

উত্তর ২৪ পরগনার সুঁটিয়া অঞ্চলে এক সময় দুষ্কৃতীদের বিরুদ্ধে সংগঠিত প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন বরুণ বিশ্বাস। কলকাতার মিত্র ইনস্টিটিউশনের শিক্ষক হলেও গ্রামের মানুষের পাশে দাঁড়াতে কখনো পিছিয়ে যাননি তিনি। স্থানীয় বাসিন্দাদের নিয়ে প্রতিবাদী মঞ্চ গড়ে তোলেন। প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের কাছেও লিখিত অভিযোগ পাঠান। পরে মহিলা কমিশনের প্রতিনিধিদল এলাকায় যায় এবং পুলিশের অভিযানও শুরু হয়। একাধিক অভিযুক্ত গ্রেফতার হয়েছিল। কিন্তু পরিবারের দাবি, সে ঘটনার পর থেকেই বরুণ বিশ্বাস অপরাধচক্রের চোখে কাঁটা হয়ে ওঠেন। ২০১২ সালের ৫ জুলাই। প্রতিদিনের মতো স্কুল থেকে বাড়ি ফিরছিলেন বরুণ বিশ্বাস। অভিযোগ, গোবরডাঙা রেলস্টেশন চত্বরে ওঁৎ পেতে থাকা দুষ্কৃতীরা তাঁকে লক্ষ্য করে একাধিক রাউন্ড গুলি চালায়। ঘটনাস্থলেই লুটিয়ে পড়েন তিনি। পরে হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসকেরা তাঁকে মৃত বলে ঘোষণা করেন।

এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডে রাজ্যজুড়ে ব্যাপক চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়ে। তদন্তে নেমে পুলিশ ৯ জনকে গ্রেফতার করে। তাঁদের মধ্যে এক অভিযুক্ত বিচারাধীন অবস্থায় জেলেই মারা যান। বাকি অভিযুক্তরা বর্তমানে জামিনে মুক্ত। কিন্তু পরিবারের অভিযোগ, তদন্তের গোড়া থেকেই প্রকৃত ষড়যন্ত্রকারীদের আড়াল করার চেষ্টা হয়েছে। বরুণ বিশ্বাসের দাদা অসিত বিশ্বাসের অভিযোগ, তদন্তের গতিপথ ইচ্ছাকৃত ভাবে অন্যদিকে ঘুরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। তাঁর দাবি, মূল অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে তদন্ত সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছিল কয়েক জনের মধ্যে। এমনকি সিআইডি তদন্ত চলাকালেও পরিবারের সঙ্গে তদন্তকারীরা কোনো যোগাযোগ করেননি বলেও অভিযোগ।

সম্প্রতি বনগাঁর পুলিশ সুপার এবং জিআরপি-র কাছে পৃথক অভিযোগপত্র জমা দিয়েছেন অসিত বিশ্বাস।  অভিযোগপত্রে তিনি প্রাক্তন খাদ্যমন্ত্রী জ্যোতিপ্রিয় মল্লিকের নাম উল্লেখ করে দাবি করেছেন, গোটা ঘটনার নেপথ্যে তাঁর ভূমিকা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। তবে এ অভিযোগের বিষয়ে এখনো পর্যন্ত আদালত বা তদন্তকারী সংস্থা আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করেনি। বরুণের দিদি প্রমীলা রায় বিশ্বাসেরও অভিযোগ, অতীতে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মুখ না-খোলার জন্য তাঁদের উপর বিভিন্ন ধরনের চাপ সৃষ্টি করা হয়েছিল। কখনো চাকরির প্রস্তাব, কখনো ভয় দেখানো— এমন নানা ঘটনার মুখোমুখি হতে হয়েছে বলেও তাঁর দাবি। যদিও এ অভিযোগেরও সত্যতা এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি।

বিশ্বাস পরিবারের অভিযোগের সুর আরও তীব্র হয়েছে সাম্প্রতিক সময়ে। অসিত বিশ্বাসের দাবি, তৎকালীন খাদ্যমন্ত্রী জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক নেপথ্য থেকে গোটা ঘটনার নিয়ন্ত্রণ করেছিলেন। তাঁর দাবি, ‘আমরা প্রথম দিন থেকেই বলে আসছি, তদন্তকে অন্য পথে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। প্রকৃত ষড়যন্ত্রকারীর বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ করা হয়নি।’ বরুণ বিশ্বাসের বাবা জগদীশ বিশ্বাসও অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, পরিবারের একমাত্র চাওয়া— এত বছর পর হলেও প্রকৃত অপরাধীদের আইনের মুখোমুখি করা হোক। এ আবহে প্রাক্তন সিবিআই আধিকারিক উপেন বিশ্বাসের একটি সামাজিক মাধ্যমের পোস্ট নতুন করে আলোচনায় এসেছে। সেখানে তিনি দাবি করেন, বরুণ বিশ্বাস হত্যাকাণ্ডে জ্যোতিপ্রিয় মল্লিকের নাম নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই নানা আলোচনা রয়েছে। একই সঙ্গে তিনি অভিযোগ করেন, এক সময়ে জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক নাকি বরুণের বাবার কাছ থেকে তাঁর বিরুদ্ধে ‘ক্লিনচিট’-সদৃশ বিবৃতি আদায়েরও চেষ্টা করেছিলেন। যদিও এই দাবিরও স্বাধীন কোনও সরকারি বা বিচারিক প্রমাণ এখনও প্রকাশ্যে আসেনি।

রাজ্যে সরকার পরিবর্তনের পর, বরুণ বিশ্বাস হত্যা মামলার পুনর্তদন্তের দাবি নিয়ে রাজনৈতিক তরজাও শুরু হয়েছে। রাজ্যের পুর ও নগরোন্নয়ন মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল বলেছেন, বরুণ বিশ্বাস হত্যাকাণ্ডের পূর্ণাঙ্গ তদন্ত হওয়া উচিত এবং প্রকৃত দোষীদের শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। অন্যদিকে তৃণমূল কংগ্রেসের মুখপাত্র কুণাল ঘোষ জানিয়েছেন, নতুন করে তদন্তে তাঁদের আপত্তি নেই। তবে তাঁর বক্তব্য, তদন্ত যেন নিরপেক্ষ হয় এবং কোনো রাজনৈতিক প্রতিহিংসার হাতিয়ার না-হয়ে ওঠে, তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। তাঁর বিরুদ্ধে সরাসরি অভিযোগ ওঠার পরও প্রাক্তন খাদ্যমন্ত্রী জ্যোতিপ্রিয় মল্লিকের কোনো প্রতিক্রিয়া প্রকাশ্যে আসেনি।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!