- এই মুহূর্তে দে । শ
- জুলাই ৪, ২০২৬
পুনর্বাসন ছাড়া উচ্ছেদ নয়: হকার ও রেলবস্তি রক্ষায় কলকাতায় বামেদের জোড়া মিছিল
রুটিরুজি হারানোর আশঙ্কা এক দিকে, অন্য দিকে মাথার উপর থেকে ছাদ সরে যাওয়ার ভয়। সঙ্কটে আর উদ্বেগে দিন গুজরান করছেন হাজার হাজার মানুষ। সাম্প্রতিক উচ্ছেদ ঘিরে অশান্ত পরিবেশে রাস্তায় বামেরা। পুনর্বাসনের ব্যবস্থা না করে হকার ও রেলবস্তি উচ্ছেদ করা যাবে না, এ দাবি নিয়ে শনিবার কলকাতার রাস্তায় বৃহৎ আকারের প্রতিবাদ কর্মসূচি চালাল সিপিআই(এম)। দলটির রাজ্য কমিটির ডাকে শিয়ালদহ ও হাওড়া থেকে দুটি পৃথক মিছিল বেরিয়ে পূর্ব রেলের সদর দফতর ফেয়ার্লি প্লেসে এসে মিলিত হয়। সেখানে অনুষ্ঠিত হয় প্রতিবাদ সভা। একই সঙ্গে মহম্মদ আলি পার্কের সামনে শ্রমজীবী মানুষের সমাবেশও অনুষ্ঠিত হয়।
গত কয়েক সপ্তাহ ধরে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে রেল ও প্রশাসনের উচ্ছেদ অভিযানকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। যাদবপুর, দমদম, হাবড়া, শালিমার, হালিশহর-সহ একাধিক রেল স্টেশন সংলগ্ন এলাকায় হকারদের দোকান সরানো হয়েছে। কোথাও বুলডোজার চালিয়ে ভেঙে দেওয়া হয়েছে বহু বছরের ব্যবসা। শুধু হকারই নন, রেললাইনের ধারে গড়ে ওঠা বহু বস্তিতেও উচ্ছেদের নোটিস পৌঁছেছে। অভিযোগ, নোটিস দেওয়া হলেও বিকল্প বাসস্থান বা পুনর্বাসনের কোনো রূপরেখা এখনও জানানো হয়নি।
বামেদের মিছিলে সে ক্ষোভই যেন রাস্তায় নেমে আসে। শুধু দোকান হারানোর আশঙ্কায় থাকা হকার বা ট্রেনের হকাররা নন, রেল সংলগ্ন বস্তিগুলির বহু পরিবারও পা মেলান মিছিলে। তাঁদের বক্তব্য, জীবিকা হারালে নতুন করে রোজগারের পথ খুঁজে নেওয়া কঠিন, কিন্তু মাথার উপর থেকে ছাদ সরে গেলে বাঁচার পথই বন্ধ হয়ে যাবে। জায়গা খালি করার নোটিশ পাওয়া অধিকাংশ পরিবারের সদস্যই গৃহসহায়িকার কাজ করেন, কেউ রিকশা চালান, কেউ দিনমজুর, কেউ বা ছোটখাটো ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। নোটিসে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে জায়গা ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হলেও, এতগুলো মানুষ কোথায় গিয়ে তাঁরা আশ্রয় নেবেন, সে প্রশ্নের উত্তর অজানা। কারোর আক্ষেপ স্টেশনে, ট্রেনে ঝালমুড়ি, কুলফি, চা, বাদাম, হরেকসামগ্রী বিক্রেতাদের মধ্যেও ক্ষোভ স্পষ্ট। তাঁদের দাবি, রেল বলছে ট্রেনে বা স্টেশনে জিনিস বিক্রি করলে জরিমানা করা হবে। এভাবে আমাদের পেটে লাথি মাড়লে আমরা যাব কোথায়?’
বামেদের তরফে হকার উচ্ছেদের বিরুদ্ধে এত দিন মূলত শ্রমিক সংগঠনগুলিই আন্দোলনের নেতৃত্ব দিচ্ছিল। এ বার সরাসরি দলীয় স্তরে আন্দোলনের ঝাঁঝ বাড়িয়েছে সিপিআই(এম)। শনিবারের কর্মসূচিকে ঘিরে দলের রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম বলেছেন, উচ্ছেদের ক্ষেত্রে আইনসম্মত পদ্ধতি অনুসরণ করা হচ্ছে না। তাঁর দাবি, হকাররা শুধু নিজেদের জীবিকা নির্বাহ করেন না, গ্রামের উৎপাদিত নানা পণ্য শহরের বাজারে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাঁদের উচ্ছেদ মানে গ্রামীণ অর্থনীতির উপরেও আঘাত। তাঁর অভিযোগ, ‘কাজ দেওয়ার বদলে সরকার কাজ কেড়ে নিচ্ছে। বহুজাতিক সংস্থার জন্য জায়গা তৈরি হচ্ছে, অথচ সাধারণ মানুষ বেকার হয়ে পড়ছেন।’ সিটুর রাজ্য সম্পাদক জিয়াউল আলমও অভিযোগ করেন, কোনো আলোচনা বা পরিকল্পনা ছাড়াই উচ্ছেদ অভিযান চালানো হচ্ছে। তাঁর বক্তব্য, রেল ও সরকারের উচিত হকার সংগঠনগুলির সঙ্গে আলোচনায় বসে গ্রহণযোগ্য সমাধানের পথ খোঁজা। পুনর্বাসন নিশ্চিত না করে উচ্ছেদ চালানো হলে বৃহত্তর আন্দোলনের পথে হাঁটার হুঁশিয়ারিও দেন তিনি।
এ ইস্যুতে শুধু বামেরাই নয়, সরব হয়েছে অন্যান্য বিরোধী দল ও সংগঠনও। এসইউসি-র শ্রমিক সংগঠন ‘এআইইউটিইউসি’ কলকাতা পুরসভায় স্মারকলিপি জমা দিয়ে পুনর্বাসনের দাবিতে আন্দোলন জোরদার করার কথা জানিয়েছে। সংগঠনের দাবি, পুরসভার তরফে বিষয়টি নিয়ে হকার সংগঠনগুলির সঙ্গে আলোচনার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। দক্ষিণ কলকাতা জেলা কংগ্রেসের অভিযোগ, ভবানীপুর মেট্রো স্টেশনের নির্দিষ্ট এলাকার মধ্যে হকারদের বসতে না দেওয়ার সিদ্ধান্তে বহু পরিবারের জীবিকা বিপন্ন হবে। অন্য দিকে পশ্চিমবঙ্গ বস্তি উন্নয়ন সমিতিও বুলডোজার অভিযানের প্রতিবাদে আগামী ১৪ জুলাই কলকাতা পুরসভা অভিযানের ডাক দিয়েছে।
তবে আন্দোলনের আবহের মধ্যেই হকারদের জন্য সাময়িক স্বস্তির ইঙ্গিত মিলেছে। ‘হকার্স জয়েন্ট অ্যাকশন কমিটি’র রাজ্য সভাপতি অসিত সাহা দাবি করেছেন, মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে বৈঠকে তাঁরা আশ্বাস পেয়েছেন যে দুর্গাপুজো পর্যন্ত রাজ্য সরকারের অধীন এলাকায় হকার উচ্ছেদ করা হবে না। তবে রেলের জমিতে উচ্ছেদের বিষয়টি কেন্দ্রীয় সরকারের অধীন হওয়ায় সেই বিষয়ে রেল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনার অনুরোধ জানানো হয়েছে। প্রসঙ্গত, সরকারি ও রেল জমি দখলমুক্ত করার সিদ্ধান্তের পর থেকেই রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে উচ্ছেদ অভিযান শুরু হয়েছে। শিয়ালদহের শিশির মার্কেট, ধর্মতলার হগ মার্কেট, যাদবপুর, গড়িয়াহাট, ঢাকুরিয়া সহ বিভিন্ন উড়ালপুলের নীচে গড়ে ওঠা ব্যবসা এবং রেল সংলগ্ন বসতিগুলিতেও নোটিস জারি করা হয়েছে। উচ্ছেদকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে একাধিক মামলা দায়ের হয়েছে কলকাতা হাই কোর্টে। আদালত পরবর্তী সময়ে ৩১ জুলাই পর্যন্ত হকার উচ্ছেদে অন্তর্বর্তী স্থগিতাদেশ দিলেও, তার আগে একাধিক এলাকায় বুলডোজার চালিয়ে দোকান ভাঙার অভিযোগ উঠেছে।
রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, সরকারি জমি দখলমুক্ত করা যেমন প্রশাসনের দায়িত্ব, তেমনই জীবিকা ও বাসস্থানের প্রশ্নে মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। আন্দোলনকারীদের বক্তব্যও একই— উন্নয়ন বা দখলমুক্তির নামে হাজার হাজার মানুষকে পথে বসানো যাবে না। বিকল্প জীবিকা ও পুনর্বাসনের স্পষ্ট পরিকল্পনা ছাড়া উচ্ছেদ কোনওভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।এ মুহূর্তে তাই প্রশ্ন একটাই— উচ্ছেদ আগে, না পুনর্বাসন? সে প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে কলকাতার রাজপথে এসে এদিন এক কণ্ঠে ধ্বনিত হল স্লোগান, ‘পুনর্বাসন ছাড়া উচ্ছেদ নয়।’
❤ Support Us





